রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের চরম মুহূর্ত তখন; বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলে গেরিলা বাহিনীর মুহুর্মুহু আক্রমণে পর্যুদস্ত পাক হানাদার বাহিনী। মহান মুক্তিযুদ্ধের ২ ডিসেম্বর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিন। এদিন গেরিলা বাহিনী চোরাগোপ্তা আক্রমণ ছেড়ে সম্মুখযুদ্ধ শুরু করে।
২ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধাদের হামলায় ও বোমা বিস্ফোরণে ঢাকার রামপুরা বিদ্যুৎ সরবরাহ কেন্দ্র, চট্টগ্রামের পাঁচটি বিদ্যুৎ সাব-স্টেশন ও দুটি পেট্রলপাম্প বিধ্বস্ত হয়। ঘটনাটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ফলাও করে ছাপা হয়। এদিন চট্টগ্রামের উত্তরে ফটিকছড়ি ও রাউজান থানা এবং দক্ষিণে আনোয়ারার অধিকাংশ এলাকা মুক্তিবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।
যৌথ বাহিনী এদিন পঞ্চগড় মুক্ত করে এবং ঠাকুরগাঁওয়ের দিকে বিজয়ের বেশে এগিয়ে যেতে থাকে। মুক্তিযোদ্ধারা টাঙ্গাইলের নাগরপুর থানা মুক্ত করেন এবং টাঙ্গাইল আক্রমণের প্রস্তুতি নিতে থাকেন।
এদিন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া সেক্টরে মুক্তিবাহিনী প্রচণ্ড আক্রমণ শুরু করে। পরাজয় নিশ্চিত জেনে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী আজমপুর রেলওয়ে স্টেশন ছেড়ে পালিয়ে যায়। আজমপুর রেলওয়ে স্টেশন মুক্তিবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে এলেও পাকিস্তানি সৈন্যরা মুক্তিবাহিনীর ওপর পাল্টা আক্রমণ করে। মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পেরে না উঠে পাকবাহিনী ট্যাংক ব্যবহার করে। প্রচণ্ড যুদ্ধে আখাউড়া এলাকা কেঁপে ওঠে।
কসবা, মুকুন্দপুর, উজানিসার এলাকাতেও প্রচণ্ড যুদ্ধ শুরু হয়। এদিন কুমিল্লা-সিলেট সিঅ্যান্ডবি রোডের সংযোগ মুক্তিযোদ্ধারা বিচ্ছিন্ন করে দেন। চট্টগ্রাম-কুমিল্লা-ঢাকা রেল যোগাযোগও সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেন তারা।
সিলেটের গুরুত্বপূর্ণ শমশেরনগর বিমানবন্দর মুক্তিবাহিনী সম্পূর্ণ দখল করে নেয়। নরসিংদীর ঘোড়াশালে পাকিস্তানি বাহিনীকে বিপর্যস্ত করে তোলেন মুক্তিযোদ্ধারা। এখান থেকে বেশ কিছু গোলাবারুদও উদ্ধার করে মুক্তিবাহিনী।
লেফটেন্যান্ট জিয়াউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন মুক্তিবাহিনী সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ এলাকা আগেই শত্রুমুক্ত করে। পরে পাকিস্তানি সেনাদের পিছু হটিয়ে মুক্তিবাহিনী সাতক্ষীরার উপকণ্ঠে পৌঁছে যায়। রূপসা নদীর ওপারে খুলনার কাছে ঘাঁটি স্থাপন করে মুক্তিযোদ্ধাদের আরেকটি দল।
একাত্তরের এই দিনে ময়মনসিংহ, জামালপুরসহ দেশের বেশ কয়েকটি এলাকায় গণহত্যা চালায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী।