৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের শেষার্ধে এদেশীয় রাজাকার, আলবদর, আলশামসদের সহযোগিতায় বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের ছক কষতে শুরু করে হানাদার বাহিনী। পরাজয় আসন্ন জেনে হানাদাররা একে একে দেশের প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ, চিকিৎসক, কবি, সংগীতশিল্পী, সাংবাদিকদের হত্যার মিশনে নামে।
ঢাকায় এ হত্যাযজ্ঞের নেতৃত্ব দেন পাকিস্তানের সামরিক উপদেষ্টা রাও ফরমান আলী। ১০ ডিসেম্বর ঢাকার শান্তিনগরের চামেলীবাগের ভাড়া বাড়ি থেকে প্রখ্যাত সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনকে তুলে নেয় পাকিস্তান বাহিনী। এতে সহযোগিতা করে আলবদর বাহিনী। এদিন বীর মুক্তিযোদ্ধারা সিলেট ও খুলনার অনেক এলাকা শত্রুমুক্ত করেন।
১০ ডিসেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘের মহাসচিব উ থান্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন পাকিস্তানের স্থায়ী প্রতিনিধি আগা শাহী। তিনি বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহারের দাবি করেন। ১০ ডিসেম্বর জানা যায় মার্কিন সপ্তম নৌবহর মালাক্কা প্রণালির পূর্বে অবস্থান করছে। এদিন মুক্তিবাহিনী জামালপুর শহর মুক্ত করতে হানাদার বাহিনীর ওপর তীব্র আক্রমণ চালায়।
সাভারের নয়ারহাটে ভারতীয় মিত্রবাহিনীর বিমান রেডিও ট্রান্সমিশনের ওপর বোমা হামলা চালালে বেতারের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। প্রচণ্ড যুদ্ধের পরে ১০ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম ও চালনা বন্দর অচল হয়ে পড়ে। কয়েকটা জাহাজে করে পাকিস্তানি সেনারা পালানোর সময় বঙ্গোপসাগরে ধরা পড়ে। এদিন দিনাজপুর, রংপুর ও সৈয়দপুরে পর্যুদস্ত হয় পাকিস্তানি বাহিনী। মুক্তিযোদ্ধারা হানাদার বাহিনীর সব রসদ বন্ধ করে দেন।
১০ ডিসেম্বর ময়মনসিংহ, মাদারীপুর, নড়াইল, ভোলা হানাদারমুক্ত হয়। এদিন ভোরের দিকে মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার কাজী জয়নাল আহমেদের নেতৃত্বে ১৩ জন মুক্তিযোদ্ধার একটি দল পাকিস্তানি বাহিনীকে ধাওয়া দেয়। হানাদার বাহিনী লঞ্চে করে চাঁদপুরের দিকে পালিয়ে যায়।
ফজলুর রহমান জিন্নাহর নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনীর একটি দল নড়াইলের চিত্রা নদীর পূর্ব দিক ও কমান্ডার শরীফ হুমায়ুন কবীরের নেতৃত্বে নড়াইল ভিক্টোরিয়া কলেজের দক্ষিণ দিক থেকে পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর প্রচণ্ড আক্রমণ করে। মুক্তিবাহিনী প্রথমে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিলেও হানাদার বাহিনী যুদ্ধ চালিয়ে যায়। মুক্তিবাহিনীর ত্রিমুখী হামলায় হানাদার বাহিনী টিকতে না পেরে বিকেলের দিকে মুক্তিবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে।
১০ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গলের একটি দলের ওপর হামলা চালায় হানাদার বাহিনীর ২৪ ফ্রন্টিয়ার রেজিমেন্ট। এরপর চতুর্থ বেঙ্গলের অধিনায়ক ক্যাপ্টেন গাফফার চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গলকে দুই ভাগে বিভক্ত করে ফটিকছড়ি ও কাজীরহাটের দিকে যাত্রা শুরুর নির্দেশ দেন।
১০ ডিসেম্বর নবম বেঙ্গলের মুক্তিযোদ্ধারা কুমিল্লা শহরের রেলওয়ে ক্রসিং থেকে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের দিকে অগ্রসর হয়। এ সময় মেজর আইন উদ্দিনের নেতৃত্বে ভারতীয় মিত্র বাহিনীর ৩টি ট্যাংক রেলওয়ে ক্রসিং থেকে হানাদার বাহিনীর ওপর উপর্যুপরি গোলা নিক্ষেপ শুরু করে।
১০ ডিসেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ হানাদারমুক্ত হয়। এদিন ভোরে ভারতীয় বাহিনীর দশম বিহার রেজিমেন্ট ও এস ফোর্সের অধীনে ১১ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের দুই কোম্পানি মুক্তিযোদ্ধার একটি অংশ দুর্গাপুর থেকে আশুগঞ্জ আক্রমণ করে। অন্যদিকে আরেকটি দল ভৈরব সেতুর আশুগঞ্জ অংশ ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দেয়। এদিন বীর মুক্তিযোদ্ধারা সিলেট ও খুলনার অনেক এলাকা শত্রুমুক্ত করেন।