এক বছর দুমাস আগের ঘটনা। বিরল কালো-গলা ডুবুরির (Black-necked Grebe) সন্ধানে পক্ষী আলোকচিত্রী ইমরুল হাসানকে সঙ্গে নিয়ে অনিক মাঝির নৌকায় উঠলাম রাজশাহীর পুলিশ লাইনের বটতলা ঘাট থেকে। খানপুর চরে গিয়ে নামলাম। এখানে বেশকিছু শিকারি পাখির দেখা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
চরে নামতে নামতেই দেখা হয়ে গেল বিচিত্র এক প্যাঁচার সঙ্গে, যে কিনা দিনের শিকারি। এ দেশে যত প্রজাতির প্যাঁচা বাস করে তার সবগুলোই দিনে ঘুমায় ও রাতে খাদ্যের সন্ধানে শিকারে বের হয়। কিন্তু এটিই এ দেশের একমাত্র প্যাঁচা যে দিনে শিকার করে ও রাতে ঘুমায়। আবার এটিই একমাত্র প্যাঁচা যে শীতে পরিযায়ী হয়ে এ দেশে আসে, প্যাঁচার বাকি প্রজাতিগুলো এ দেশের আবাসিক পাখি। ওর কটি ছবি তুলতে তুলতেই একে একে দেখা হলো শিকারি পাখি পোকামারা বাজ (Common Kestrel), ছোট দস্যু ঈগল (Indian Spotted Eagle), জাপানি বাজ (Japanese/Eastern Byyuard) এবং সবশেষে সাদা চিলের (Black-shouldered Kite) সঙ্গে।
দিনের শিকারি প্যাঁচাটিকে প্রথম দেখি চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার ভারত সীমান্তবর্তী রহনপুরের চরইল বিলের এক চরে। এরপর বহুদিন ওকে আর দেখিনি। যাহোক প্যাঁচাসহ পাঁচটি শিকারি পাখির ছবি তুলে যখন নৌকায় উঠার চিন্তা করছিলাম এমন সময় হঠাৎ করেই প্যাঁচাটিকে ছোট দস্যুবাজ আক্রমণ করে বসল। দস্যুবাজটি এমনভাবে তিরবেগে প্যাঁচাটির দিকে ছুটে এলো যেন প্যাঁচাটিকেই সে শিকার করে ফেলবে। এরকম দৃশ্য জীবনে কমই দেখেছি। শিকারি পাখিরা সচরাচর খাদ্য নিয়ে নিজেদের মধ্যে মারামারি করলেও একটি অন্যটিকে কমই আক্রমণ করে। কিন্তু এবারই এরকম ঘটনা দেখলাম। তবে প্যাঁচাটিও কম যায় না। সে এমনভাবে দস্যুবাজের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করল যা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। ওদের এই দুর্লভ মুহূর্তগুলো ক্যামেরাবন্দি করতে আমি মোটেও ভুল করলাম না। এরপর ধীরে ধীরে নৌকার দিকে এগিয়ে গেলাম আরেকটি গন্তব্যের দিকে পাখির ছবি তুলব বলে।
রাজশাহীর পদ্মার চরের দিনের শিকারি এই প্যাঁচাটি আর কেউ নয় এদেশের বিরল ও স্বল্প ঝুঁকিসম্পন্ন এক পরিযায়ী পাখি ভ্রমণকারী প্যাঁচা। পরিযায়ী প্যাঁচা নামেও পরিচিত। পশ্চিমবঙ্গে ওর নাম ছোটকান প্যাঁচা। ইংরেজি নাম ‘Short-eared Owl’। স্ট্রিজিডি গোত্রের প্যাঁচাটির বৈজ্ঞানিক নাম ‘Asio flammeus’। উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা, ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ার আবাসিক পাখিটি শীতে এদেশে পরিযায়ন করে।
ভ্রমণকারী প্যাঁচা বড় মাথা ও চোখ এবং খাটো ঘাড় ও চওড়া ডানার পাখি। প্রাপ্তবয়স্ক প্যাঁচার দেহের দৈর্ঘ্য ৩৪ থেকে ৪৩ সেন্টিমিটার, প্রসারিত ডানা ৮৫ থেকে ১১০ সেন্টিমিটার ও ওজন ২০৬ থেকে ৪৭৫ গ্রাম। দেহের ওপরের পালক গাঢ় ছিটযুক্ত তামাটে থেকে বাদামি। দেহের নিচটা হলদেটে; বুকের ওপরে রয়েছে গাঢ় ডোরা। ডানা ও লেজে কালো ও গোলাপি ডোরা। কালচে-বাদামি কানঝুঁটিটি ছোট। মুখমণ্ডলের গোলক দুটি সুস্পষ্ট। চোখ হলদে। গলায় রয়েছে ঘন বাদামি গলাবন্ধ। আঙুলের খোলা অংশ কালচে-বাদামি ও নখ শিঙ-কালো। চঞ্চু কালো ও পা হলদে। প্যাঁচা ও পেঁচির চেহারায় কোনো পার্থক্য নেই।
ওরা দেশব্যাপী বড় নদীর চর, ঝোপঝাড়, খোলা প্রান্তর এবং উপকূলীয় এলাকায় সচরাচর একাকী, জোড়ায় বা ৫ থেকে ৬টির ছোট দলে বিচরণ করে। অন্য প্রজাতির প্যাঁচার মতো গাছে আশ্রয় না নিয়ে মাটিতে বসে থাকে। প্যাঁচাটি দিবাচর এবং সান্ধ্যচারীও। ভূমির কিছুটা ওপর দিয়ে উড়ে উড়ে পায়ের তীক্ষ্ণ নখ দিয়ে পাখি, ইঁদুর, পঙ্গপাল, ফড়িং, গুবরে পোকা ইত্যাদি শিকার করে খায়। আতংকিত হলে হিস হিস শব্দ করে। মথ বা বাদুড়ের মতো করে উড়ে। একটানা ‘ওয়াক-ওয়াক-ওয়াক---’ বা ‘টুট-টুট-টুট-টুট-টুট---’ শব্দে ডাকে।
মার্চ থেকে জুন প্রজননকাল। এ সময় আবাস এলাকার অর্থাৎ উত্তর মেরুর ভূমিতে ঘাসের গোড়ায় ঘাস ও পালক দিয়ে বাসা তৈরি করে। ডিম পাড়ে ৪ থেকে ১২টি। ডিমের রং সাদা। পেঁচি একাই ডিমে তা দেয়। ছানাদের ওড়ার পালক গজাতে এক মাসের বেশি সময় লাগে। ছানারা একবছর বয়সে প্রজননক্ষম হয়। আয়ুষ্কাল সাত বছরের বেশি।
লেখক- পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ