চট্টগ্রামের খুলশীতে অবস্থিত চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিভাসু) চতুর্থ বর্ষের ছাত্রদের বন্য প্রাণী চিকিৎসা বিষয়ের ব্যবহারিক পরীক্ষা নিতে এসেছি। গত ২৬ এপ্রিল সকালে গেস্ট হাউসে নাশতা সেরে চা-পানের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটের বাইরে ছোট্ট একটি চায়ের দোকানে এসেছি। চা-পান শেষে যখন বিল দিতে গিয়েছি, ঠিক তখনই দোকানের মেঝেতে কালচে-বাদামি রঙের কেঁচোর মতো দেখতে, কিন্তু চকচকে একটি প্রাণীকে নড়াচড়া করতে দেখলাম। হঠাৎ দেখায় কেঁচোর মতো লাগলেও ওর নড়াচড়া বা আচরণ কিন্তু পুরোপুরি সাপের মতো ছিল। দ্রুত প্রাণীটির কয়েকটি ছবি তুলে নিলাম। এরপর উপস্থিত লোকজন ও দোকানিকে প্রাণীটি সম্পর্কে বললাম।
সাপ শুনে লোকজন ভয় পেলেও যখন বললাম প্রাণীটি একেবারেই নিরীহ ও অবিষধর এবং আমি যখন ওটিকে ধরলাম তখন ওদের ভয় কেটে গেল। ছবি তোলা শেষে ক্ষুদ্র সাপটিকে দোকানের শেলফের নিচে, যেখান থেকে ও বেরিয়ে এসেছিল, সেখানে ঢুকিয়ে দিলাম। এরপর দোকানিকে অনুরোধ করলাম নিরীহ সাপটিকে যেন না মারে। তিনি আমাকে কথা দিলেন যে মারবেন না। তবে আমি চলে আসার পর ওটার ভাগ্যে কী ঘটেছিল জানি না।
বছর দশেক আগে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা নিতে গিয়ে গেস্ট হাউসে আমার রুমের মেঝেতে একজোড়া একই সাপ পেয়েছিলাম। ছবি তুলে ওদের গেস্ট হাউসের বাইরে একটি ফুলের টবে রেখে এসেছিলাম। সেই ছেলেবেলা থেকেই প্রাণীটিকে দেখছি। গ্রামবাসীর কাছে এটি ‘আতল কেঁচো’ নামে পরিচিত। কিন্তু নিরীহ প্রাণীটিকে দেখলেই ওরা এটিকে আগুন দিয়ে পুড়ে ফেলত। কেন এ কাজ করত জানি না। সেদিন সিভাসুতে পরীক্ষার সময় অন্তত দুজন ছাত্র বলল যে তাদের এলাকার গ্রামবাসীরাও এ রকম আচরণ করে। কাজেই গ্রামবাসীকে আমাদের বোঝাতে হবে যেন প্রাণীগুলোকে এভাবে না মারা হয়, ওরা আমাদের শত্রু নয়।
দেখা এই খুদে সাপটি এ দেশের সচরাচর দৃশ্যমান ও স্বল্প ঝুঁকিসম্পন্ন বামন দুমুখো সাপ বা দুমুখো সাপ। ইংরেজি নাম Brahminy Blind Snake, Common Blind Snake, Flowerpot Snake ev Brahminy Worm Snake। টাইফ্লোপিডি গোত্রের সাপটির বৈজ্ঞানিক নাম Indotyphlops braminus (ইন্ডোটাইফ্লোপস ব্রামিনাস)। এরা দেশজুড়ে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত। বাংলাদেশসহ এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশের বিভিন্ন দেশে ওদের দেখা মেলে। ফুলের টবের মাধ্যমে পুরো বিশ্বে ওরা ছড়িয়ে পড়েছে।
এ দেশের সাপগুলোর মধ্যে এটিই ক্ষুদ্রতম। আর পুরো পৃথিবীর মধ্যে এর অবস্থান দ্বিতীয়। পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম সাপের নাম বারবাডোস থ্রেড স্নেক। বামন দুমুখো সাপের দেহের দৈর্ঘ্য ৫ দশমিক ১ থেকে ১০ দশমিক ২ সেন্টিমিটার। তবে সর্বোচ্চ ১৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে। সদ্যফোটা বাচ্চাগুলো প্রায় ৫ সেন্টিমিটার হয়ে থাকে। দেখতে কেঁচোর মতো হলেও নলাকার দেহটি খণ্ডিত নয়। বরং তা চৌদ্দ সারি ঘনসন্নিবিষ্ট চকচকে ছোট ছোট আঁশে আবৃত থাকে। অন্যান্য সাপের মতো মাথার আঁশগুলো ভিন্ন রকম হয় না, বরং তা দেখতে দেহের অন্যান্য অংশের আঁশের মতোই। দেহের ওপরটা লালচে-বাদামি, কাঠ-কয়লার মতো ধূসর, রুপালি ধূসর বা বেগুনি রঙের। আর নিচটা কিছুটা ফ্যাকাশে। ওদের কোনো চোখ নেই, চোখের জায়গায় সরু ক্ষুদ্র কালো ফোঁটার মতো থাকে। চোখে দৃষ্টিশক্তি না থাকলেও আলোর তীব্রতা বোঝার ক্ষমতা রয়েছে। মাথা ও ঘাড়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য না থাকায় মাথা ও লেজ দেখতে প্রায় একই রকম লাগে। তবে গোলাকার লেজটির আগা কিছুটা চোখা। আকার ছাড়া বাচ্চা সাপগুলো দেখতে হুবহু বড়গুলোর মতো।
ওরা অন্ধ, মাটির নিচে বসবাস করে। আর্দ্র বন, শুষ্ক জঙ্গল, গ্রামীণ এলাকা ও কৃষিজমি, পাথরের নিচের আর্দ্র স্থান, কলাবাগান, শহরের বাগানসহ মানুষের আবাস এলাকার কাছাকাছি থাকতে পছন্দ করে। তবে ফুলের টব ওদের সবচেয়ে প্রিয় জায়গা। ফুলের টবের মাধ্যমে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সহজেই স্থানান্তরিত হতে পারে। অবিষধর বা নির্বিষ সাপগুলো অলসপ্রকৃতির হলেও প্রয়োজনে বেশ উদ্যমী হয়ে ওঠে। মাটির নিচে পিঁপড়া ও উইপোকার বাসা ছাড়াও গাছের গোড়ার ভেতর একাকী বাস করে। ভারী বৃষ্টিপাতের পর মাটির ওপর গড়াতে দেখা যায়। অন্ধ সাপগুলো দিবাচর। আলোর তীব্রতা এড়াতে দ্রুত মাটি বা পাতার আবর্জনার নিচে লুকিয়ে যায়। এরা মূলত কীটপতঙ্গভুক; পিঁপড়া, উইপোকা এবং ওদের ডিম ও শূককীট খায়।
ওরা একলিঙ্গবিশিষ্ট, সবই উর্বর স্ত্রী সাপ। পুরুষের মাধ্যমে নিষেক ছাড়াই একলিঙ্গিক প্রজনন বা অযৌন প্রজননের মাধ্যমে বংশবিস্তার করে। একসঙ্গে তিন থেকে সাতটি চাল আকৃতির ডিম পাড়ে। কিন্তু ডিমগুলো সক্রিয় হয় এবং জিনগতভাবে অভিন্ন স্ত্রী বাচ্চার জন্ম হয়। অবশ্য কোনো কোনো বিশেষজ্ঞের মতে, ওরা সরাসরি জীবিত স্ত্রী বাচ্চার জন্ম দেয়।