বৈশাখ মাস। সোনারগাঁয়ের আনন্দবাজার ঘাট থেকে ট্রলারে চেপে মেঘনা নদীর বুকে যাত্রা করলাম একটা দ্বীপে। সঙ্গে দুই বন্ধু রুবাইয়াত রবিন আর মোহাম্মদ মহসীন। তিনজনের উদ্দেশ্য সে দ্বীপের প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য দেখা। দ্বীপটা আসলে একটা বড় চর। একসময় সেখানে গুচ্ছগ্রাম গড়ে উঠেছিল, নাম হয়েছিল এরশাদনগর। পরে দ্বীপের সৌন্দর্যের কারণে লোকমুখে তার নাম হয়েছে মায়াদ্বীপ। নুইনারটেক ছাড়িয়ে সে দ্বীপে পৌঁছাতে পৌঁছাতে বেলা গড়িয়ে গেল। ট্রলার থেকে কাদাময় পাড় পেরিয়ে উঠলাম ডাঙায়। পশ্চিম থেকে পূর্বে একটা হেরিংবোন রাস্তা চলে গেছে। সে রাস্তা দিয়ে হাঁটছি আর চারদিকে তাকাচ্ছি। পিটুলি, গুলঞ্চ, খুদিজাম, হাতিশুঁড়, ছিটকি ইত্যাদি গাছে একটা জায়গা ঝোপ হয়ে আছে। জায়গাটা রাস্তা থেকে খানিকটা নিচু। হঠাৎ একটা ছিটকি গাছের সবুজ পাতার ওপর চোখ পড়ল। আকরিক সোনার মতো পাতার ওপর কী যেন চকচক করছে, যেন সোনার বার। ভালো করে তাকাতেই দেখলাম এক জোড়া টাইগার ক্রেন ফ্লাই মহাসুখে সঙ্গমরত রয়েছে। কোনো দিকে ওদের খেয়াল নেই। সরু লম্বা কালচে বাদামি ঠ্যাংগুলো দিয়ে পাতা আঁকড়ে ধরেছে। উড়ে পালানোর আগে ছবি তোলার মোক্ষম সুযোগ পেলাম।
টাইগার ক্রেন ফ্লাই ওর ইংরেজি নাম, বাংলায় বলা হয় টাইগার সারস মাছি। ওদের হলদে দেহে কালো ডোরা দাগ থাকায় এবং পাগুলো ক্রেনের মতো বলেই সম্ভবত নাম হয়েছে টাইগার সারস মাছি। পূর্ণবয়স্ক টাইগার সারস মাছিদের সাধারণত বসন্ত ও গ্রীষ্মে দেখা যায়। এ সময় পুরুষ ও মেয়ে টাইগার সারস মাছিরা মিলনে যায়। এরা সাধারণত রাতের বেলায় ওড়ে ও সঙ্গম করে। সঙ্গমের সময়টা বেশ দীর্ঘ হয়। কিন্তু সৌভাগ্য যে বিকেল বেলাতেই মেঘনার মায়াদ্বীপে একজোড়া পুরুষ ও মেয়ে টাইগার মাছিকে সঙ্গমরত অবস্থায় দেখলাম। সঙ্গমের পর মেয়ে মাছি মাটিতে ডিম পাড়ে। ডিম ফুটে কীড়া বা বাচ্চা বের হয় ও তারা গাছের শিকড় খায়। মাটিতেই তারা শীতকাল কাটায়। বসন্তের শুরুতে কীড়ারা আবার গাছের শিকড় খেতে শুরু করে ও শূককীট বা পিউপা দশায় যায়। গ্রীষ্মে পূর্ণাঙ্গ সারস মাছি হয়ে পিউপার খোলস ভেঙে বেরিয়ে আসে। ঝোপঝাড় ও আগাছার মধ্যে সাধারণত এরা উড়ে বেড়ায় এবং বনফুলের মধু ও পরাগরেণু খেয়ে বাঁচে। পুরুষ টাইগার সারস মাছির দেহ প্রায় ১৮ মিলিমিটার লম্বা মেয়েরা পুরুষদের চেয়ে কিছুটা বেশি লম্বা হয়। এদের বক্ষদেশ হলুদ ও কালচে। হলদে পেটের মাঝখানে একটি কালো ডোরা থাকে, পুরুষদের পেট আয়তাকার বা চতুষ্কোনাকার লম্বা। মেয়েদের পেটও তেমনি, মেয়েদের পেটের শেষ প্রান্তে শুধু একটা সূক্ষ্ম ডিমপাড়ার অঙ্গ বা ওভিপজিটর থাকে। এরা লম্বা পেটবিশিষ্ট একটি উড়ন্ত পোকা। এর কীড়া বা বাচ্চারা মাটিতে থাকা পচা আবর্জনা খায়।
সারস মাছিরা টিপুলিডি গোত্রের নেফ্রোটোমা (Nephrotoma) গণের পোকা। এর অনেকগুলো প্রজাতি আছে। সারা বিশ্বে এ পর্যন্ত নেফ্রোটোমা গণের ৪৫৫ প্রজাতির ক্রেন ফ্লাই শনাক্ত করা হয়েছে। এটি নেফ্রোটোমা ফেরুগিনিয়া (Nephrotoma ferruginea) প্রজাতির। এরা ডিপ্টেরা বর্গের অন্তর্ভুক্ত। ডিপ্টেরা শব্দটি এসেছে ইংরেজি ডাই শব্দ থেকে, যার অর্থ দুটি ও প্টেরা অর্থ ডানা। সব মাছিই এ বর্গের অধীন। সে জন্য টাইগার সারস মাছিদেরও দুটি ডানা থাকে। টাইগার সারস মাছিদের ডানাজোড়া স্বচ্ছ ও কালো শিরাযুক্ত। ডানাগুলো প্রায় এক ইঞ্চির মতো লম্বা। প্রতিটি ডানার পেছনে একটি রূপান্তরিত ডানার কাঠামো থাকে, যাকে বলে হল্টেয়ার। অন্য মাছিদের এই হল্টেয়ার সাধারণত খালি চোখে দেখা যায় না। কিন্তু সারস মাছিদের হল্টেয়ার আতশী কাচ বা হ্যান্ড লেন্স ছাড়া খালি চোখেই দেখা যায়। হল্টেয়ার ফ্লাইট স্ট্যাবিলাইজার হিসেবে কাজ করে। উড়োজাহজের জাইরোস্কোপের মতো হল্টেয়ার সারস মাছিদের ওড়া নিয়ন্ত্রণ করে।
সাধারণত বনভূমি, জঙ্গল, ঝোপঝাড়ের আর্দ্র পরিবেশে এদের দেখা যায়। সারস মাছিরা সাধারণত রাতে বেশি সক্রিয় থাকে। এরা আলোতে আকৃষ্ট হয়। ঘরের জানালা-দরজা খোলা পেলে রাতের বেলায় তারা ঘরেও ঢুকে পড়ে ও অশান্তি সৃষ্টি করে। তবে এদের পূর্ণবয়স্ক পোকারা মানুষ ও গাছের জন্য ক্ষতিকর নয়, এরা কামড়ায় না, এমনকি কোনো রোগজীবাণুও বহন করে না। বরং এদের বাচ্চারা জৈব দ্রব্য পচনক্রিয়ায় সাহায্য করে।
প্রাপ্তবয়স্ক পোকারা বাঁচে মাত্র কয়েক দিন, কিন্তু বাচ্চারা বাঁচে কয়েক মাস। বাচ্চারা কখনো কখনো ফসলের শিকড় খেয়ে ক্ষতি করে। তবে জৈব দ্রব্য পচনকারী হিসেবে ওদের ভূমিকাটা বেশি। প্রাপ্তবয়স্ক পোকারা স্বল্প জীবদ্দশায় একপ্রকার উপবাস করে কাটায়, সামান্য মধুর সন্ধানে ফুলে ফুলে ঘোরে, পরাগায়ণ ঘটায়। সে অর্থে টাইগার সারস মাছি একটি উপকারী পোকা।
মৃত্যুঞ্জয় রায়: কৃষিবিদ ও প্রকৃতিবিষয়ক লেখক