রাজধানীর গুলশানের ডিপ্লোম্যাটিক জোনটা সুন্দর, ছিমছাম। সে এলাকাটাকে আরও মনোরম করেছে গুলশান ঝিল ও ঝিলপাড়ের উদ্যান। তাই ওখানে গেলে সেই উদ্যানে মাঝে মাঝে যাই। এই গ্রীষ্মের এক সকালে সৌদি দূতাবাসের পাশে পশ্চিম দিকে সেই ঝিল-উদ্যানের গেট দিয়ে ঢুকে গাছপালার শোভা দেখতে দেখতে এগিয়ে যাই। গ্রীষ্মে সে উদ্যানের অনেক গাছে ফুল ফুটেছে। লাল-হলদে ফুলের চিংড়িনমি বা হেলিকোনিয়া, ঘিয়া রঙা ফুলের আলপিনিয়া, দুধসাদা রঙের শ্বেতকাঞ্চন ও সুখদর্শন ফুল, রক্তরঙা ফুলের রাসেলিয়া, লাল রঙা গোলাপ। এসব ফুলের শোভা দেখতে দেখতে হঠাৎ একটা হাসনাহেনা গাছের তকতকে সবুজ পাতার ওপর বসতে দেখলাম একটি অনিন্দ্যসুন্দর প্রজাপতিকে। ভারি সুন্দর তার রূপ। ফুল ছেড়ে তাই ওর পিছু নিলাম।
রোদ উঠেছে, সে রোদে বিচিত্রবর্ণা ডানাগুলো যেন ঝিলিক দিচ্ছে। এমন নকশাদার ডানা! কিছুক্ষণ আগে এক পশলা বৃষ্টি হওয়ায় হাসনাহেনা পাতার ওপর শিশিরের মতো বৃষ্টিকণা লেগে আছে। প্রজাপতিটাকে দেখলাম, সে পাতায় বসে সেই পানি পানের চেষ্টা করছে। এটাই সুযোগ ওর ছবি তোলার। সুযোগটাকে কাজে লাগালাম। কিন্তু কিছুতেই সে আর ডানা মেলল না। সে জন্য ভাঁজ করা ডানার নিচের পিঠের ছবিটাই তুলতে হলো। আর ডানা মেললেই বা কী, ডানা মেললেই তো ফুড়ুৎ করে উড়ে পালাবে, ছবি কি আর তুলতে পারব? প্রজাপতিদের স্বভাবটাই তো এমন। বসার সময় ডানা চারটে আকাশের দিকে ভাঁজ করে রাখে।
সাতডোরা প্রজাপতিকে কোনো কোনো অঞ্চলে রুরু প্রজাপতি নামেও ডাকা হয়, অন্য নাম দোলবাসন্তী। এর ইংরেজি নাম লাইম সোয়ালোটেইল বা সাইট্রাস বাটারফ্লাই, বৈজ্ঞানিক নাম প্যাপিলিও ডেমোলিয়াস, গোত্র প্যাপিওলিনিডি ও বর্গ লেপিডোপ্টেরা।
নাম সোয়ালোটেইল হলেও প্রকৃতপক্ষে সোয়ালোটেইল প্রজাপতিদের মতো এদের ডানার শেষ প্রান্ত লেজের মতো থাকে না। এর ইংরেজি নাম থেকেই বোঝা যায় এদের সঙ্গে লাইম তথা সাইট্রাসগাছের একটা সম্বন্ধ আছে। লেবুজাতীয় গাছগুলোকে এক নামে বলা হয় সাইট্রাস। এ প্রজাপতি দেখতে যতটা সুন্দর, এর বাচ্চারা ততটাই অসুন্দর। প্রজপতিরা ফুল থেকে মধু নেওয়ার সময় পরাগায়ণ ঘটিয়ে উপকার করে, কিন্তু ওর বাচ্চারা লেবুগাছের পাতা খেয়ে সর্বনাশ করে।
সাতডোরা প্রজাপতি বাংলাদেশের প্রায় সব জায়গায় দেখা যায়। পার্বত্য চট্টগ্রামের অরণ্য থেকে সুন্দরবনেও এ প্রজাপতি রয়েছে। প্রায় ৬ হাজার ফুট ওপরে পাহাড়ি অরণ্যেও এদের দেখা গেছে। এরা মায়ানমার, শ্রীলঙ্কা ও ভারতেও আছে। এরা উড়তে উড়তে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকা, এমনকি অন্য দেশেও চলে যায়। পরিযায়ী স্বভাব ওদের আছে। গ্রীষ্মকালে ওদের এক অদ্ভুত আচরণ দেখা যায়। এরা ঝাঁক বেঁধে বৃষ্টির পর কাদা হলে সেখানে নেমে আসে ও ভেজা মাটির রস চোষে বা মাডপাডল করতে থাকে। লেবু ও বন্য লেবুগোত্রীয় গাছ এদের প্রধান পোষক বা আশ্রয়দাতা। এদের বাচ্চারা লেবুপাতা খায়। এরা লেজবিহীন হলুদ ফুটকিযুক্ত কালো রঙের প্রজাপতি। স্ত্রী ও পুরুষ সাতডোরা দেখতে প্রায় একই রকম। সামনের ডানায় ওপরে ও নিচে অনিয়ত হলুদ ডোরার নকশা থাকে। পেছনের ডানায় ভূমিকোণ প্রান্তে লাল গোলাকার ও শীর্ষ প্রান্তে কালোর ওপর নীল ফুটকি থাকে। এরা বেশ চঞ্চল ও দ্রুত উড়তে পারে। গাছে খুব কম বসে। ফুলের মধু খায়।
সাতডোরারা সাধারণত গ্রামীণ ঝোপজঙ্গল ও লেবুবাগানে ঘুরে বেড়ায়। গ্রীষ্মকালে এদের সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। শীতকালে তেমন চোখে পড়ে না। ডানা ঝাঁকি দিয়ে দিয়ে এরা সকালের রোদে উড়তে বেশি পছন্দ করে। এক ফুলে বসে মধু খাওয়ার পর অন্য ফুলে যায়, বেশ দ্রুত তারা উড়ে উড়ে স্থান পাল্টায়। এরা বহু রকমের ফুল থেকে মধু খেলেও মিলনের পর মেয়ে প্রজাপতি ডিম পাড়ে লেবুজাতীয় গাছের পাতায়। ডিমের রং হালকা হলুদ ও গোলাকার। ডিম ফুটে কালচে বা সবুজ খয়েরি রঙের বাচ্চা বের হয় এবং পাতা খাওয়া শুরু করে। সবুজ পাতা খেতে খেতে বাচ্চারা বড় হয় ও দেহের রং বদলাতে থাকে। পূর্ণবর্ধিত কীড়া বা বাচ্চার রং হয় হালকা বা ধূসর সবুজ। বাচ্চাগুলো খাবার পেলে বেশ নাদুসনুদুস হয়। এরা খেতে খেতে পাতার বোঁটা ছাড়া প্রায় সব অংশই চিবিয়ে চিবিয়ে রাক্ষসের মতো খায়। এরপর একটা খোলের ভেতর মূককীট বা পুত্তলি দশায় গিয়ে কিছুদিন নিস্তেজ অবস্থায় থাকে। একদিন সেই খোলের এক পাশ ছিদ্র করে প্রজাপতি হয়ে বেরিয়ে আসে। এদের জীবনচক্র সম্পন্ন হতে ৩০ থেকে ৪৩ দিন লাগে। পূর্ণাঙ্গ প্রজাপতি বাঁচে মাত্র ৩ থেকে ৬ দিন। আপাতত এদের জীবন ঝুঁকিতে কোনো কারণ নেই। তবে কেউ কেউ লেবুবাগানে কীটনাশক স্প্রে করায় সেখানে ওদের বিচরণ কমে যাচ্ছে।