কিছু পোকা নিয়ে বেশ গালগল্প ছড়িয়ে আছে আমাদের মধ্যে। তেমনই একটা পোকা কানকোটারি। অনেকের ধারণা, এ পোকা বলা নেই, কওয়া নেই হঠাৎ করে কানের ফুটো দিয়ে ঢুকে পড়ে। এরপর ওদের পেছনে থাকা সাঁড়াশির মতো অঙ্গ দিয়ে কানের পর্দা ছ্যাড়াব্যাড়া করে দেয়। এ জন্য এই পোকার নাম রাখা হয়েছে কানকোটারি। আবার আরও একদল মানুষ আছেন, তারা মনে করেন, এ পোকা উড়ে এসে গায়ে পড়ে, চিমটা দিয়ে চামড়া ফুটো করতে বা খামচাতে শুরু করে, এতে জ্বালা-যন্ত্রণা হয়। একটা পোকার নামে এ রকম বদনাম দিতে আমাদের মোটেই বাধল না। অথচ এ পোকাটা আমাদের উপকার করে। ধানখেতে কোনো পাতা মুড়ে যদি তার ভেতরে কোনো ক্ষতিকর পোকা লুকিয়ে লুকিয়ে পাতা খেতে থাকে, কানকোটারি সুড় সুড় করে সেই সুড়ঙ্গের মধ্যে ঢুকে পড়ে। আর পেছনে থাকা চিমটা দিয়ে সেই ক্ষতিকর পোকাটাকে টেনে বের করে খেয়ে ফেলে। এমনকি নচ্ছার বিছে পোকাদেরও সে খেয়ে ফেলে।
গরমকাল। ঘরের কাছের খেত থেকে বোরো ধানগুলো কাটা হয়ে গেছে। এক দিন রাতে টেবিলে টেবিল ল্যাম্প জ্বেলে কাজ করছিলাম। জানালা খোলা। হঠাৎ খেয়াল করলাম টেবিল ল্যাম্পের আলোতে আকৃষ্ট হয়ে অনেক পোকা টেবিলের ওপর চলে এসেছে। শ্যামা পোকা, বাদামি গাছ ফড়িং, গান্ধি পোকা, আঁকাবাঁকা পাতা ফড়িং, কয়েক পদের বোলতা, মাজরা পোকার মথ, এমনকি পানি থেকে টেবিলের ওপর চলে এসেছে ওয়াটার স্ট্রাইডার, ব্যাক সুইমার, ওয়াটার বোটম্যান, ওয়াটার স্করপিয়নের মতো পোকারাও।
সব পোকার মধ্যে একটা পোকার দিকে চোখটা যেন বেশি গেল। একটা সাদা কাগজ বিছিয়ে দিলাম টেবিলের ওপর যাতে পোকাগুলোকে আরও ভালো করে দেখা যায়। সে কাগজের ওপর দেখলাম, সেই একই রকমের আরও দু-একটা পোকা এসে উড়ে উড়ে টেবিল ল্যাম্পের বাল্বের দিকে ছুটে যেতে চাইছে। আবার কখনো কখনো ওরা নিজেদের মধ্যে ঝগড়াও করছে। পোকাগুলোর গায়ের রং কালচে, পেছনটা চিমটা বা সাঁড়াশির মতো, ঠিক যেন কাঁকড়ার ঠ্যাংয়ের চিমটা। পোকাগুলো বেশ ছোট, লম্বায় বড়জোর ১৫ থেকে ২০ মিলিমিটার হবে। দেহে সূক্ষ্ম পশম আছে, মাথাটা চওড়ার তুলনায় বেশি লম্বা, শুঁড় কালচে। মজার ব্যাপার হলো, পোকাটাকে উড়তে দেখছি, কিন্তু ওর ডানা দেখছি না। পিঠের ঠিক ওপরের দিকে শক্ত খোলার মতো দুটি আবরণ দেখছি। ওখানেই তো পোকাদের ডানা থাকে, কিন্তু এর নেই কেন? আবার ডানা না থাকলে উড়ছেই বা কী করে? হঠাৎ একটা পোকা ল্যাম্পের আলোর দিকে উড়াল দিল। শক্ত খোলস দুটি দরজার মতো ফাঁক হয়ে গেল। দেখলাম সে ফাঁক দিয়ে প্যারাস্যুটের কাপড়ের মতো পাতলা ফিনফিনে অর্ধস্বচ্ছ সাদা পাখা বের হচ্ছে। মাঝে মাঝে দেখলাম, কাগজের ওপরে হাঁটছে, উড়াল দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিতে ডানাগুলো বের করছে। ডানাগুলো প্যারাস্যুটের মতো ভাঁজ করা। অদ্ভুত বটে! সেই অদেখা ডানাগুলোর দর্শন পেয়ে আমিও চট করে তার ছবি তুলে নিলাম।
এ পোকার বাংলা নাম কানকোটারি হলেও এ নামে সাধারণত কেউ চেনেন না। বরং ইংরেজি ইয়ার উইগ নামেই এ পোকার বেশি পরিচিতি। কানকোটারি ডার্মাপ্টেরা বর্গের পোকা। এ বর্গে সারা বিশ্বে ১২টি গোত্রে প্রায় ২ হাজার প্রজাতির পোকা আছে। কানকোটারি তার দেহের চেয়ে ৫৩০ গুণ বেশি ওজন বহন করতে পারে। এরা নিশাচর। দিনের বেলা সাধারণত লুকিয়ে থাকে। এরা নিরীহ প্রাণী। মানুষকে কামড়ায় না। বিরক্ত করলে বা বিপদের সংকেত পেলে এরা পেটের খণ্ডগুলো থেকে হলুদ রঙের একধরনের দুর্গন্ধযুক্ত রস ছুড়ে দেয়। তাতে কাজ না হলে শেষ অস্ত্র হিসেবে সাঁড়াশির মতো অঙ্গটা ব্যবহার করে। এরা গাছের অনিষ্টকারী অনেক পোকার বাচ্চা ও ডিম খেয়ে উপকার করে। এরা মাটিতে গর্ত করে বা গাছের কোটরে বাসা বানায়। জুন-জুলাই হলো ওদের প্রজনন মৌসুম। পুরো শীতকাল এরা ঘুমিয়ে কাটিয়ে দেয়। গ্রীষ্মের শুরুতে এদের ঘুম ভাঙে ও বেরিয়ে মিলন করতে যায়। জীবনে একবার মিলন হলেও ওরা কয়েক দফায় ২০ থেকে ৩০টি ডিম পাড়ে। প্রায় ১৫ থেকে ১৬ দিন পর ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়। তবে ডিমগুলো ফোটার আগে শত্রু ও বিরূপ পরিবেশ থেকে বাঁচাতে মা মাঝে মাঝে ডিমগুলো এখান থেকে ওখানে সরিয়ে রাখে। প্রথম দফায় পাড়া ডিম ফুটে বাচ্চা বের হলে মা পোকারা সেসব বাচ্চাকে দেখভাল করে।
এমনকি বাচ্চাদের খাওয়ার জন্য মা সেখানে খাদ্য এনে জমা করে রাখে। বাচ্চারা সাবালক না হওয়া পর্যন্ত মা ওদের ছেড়ে কোথাও যায় না। এরপর মা পোকা আরেক দফায় ডিম পাড়ে। বাচ্চারা অনেক সময় মায়ের চোখকে ফাঁকি দিয়ে সেসব ডিম খেয়ে ফেলতে চায়। কিন্তু সতর্ক মা পেছনের পা দিয়ে লাথি দিয়ে ওদের সেখান থেকে সরিয়ে দেয়। লাথিটা যাতে ভালোভাবে দিতে পারে, সে জন্য মা পোকা তার পেছনের পায়ের মাথায় কাদা মাখিয়ে শুকিয়ে মুগুরের মতো ভারী করে রাখে। বাচ্চারা মায়ের আশপাশেই ঘোরাফেরা করে, বিপদ দেখলে মায়ের গায়ের কাছে এসে নিশ্চল অবস্থায় পড়ে থাকে। বিপদ কেটে গেলে আবার ছড়িয়ে পড়ে। বাচ্চারা সাবালক হলে মাকে ছেড়ে চলে যায়।
