‘গ্রীষ্মকাল, জ্যৈষ্ঠের ত্রিশ তারিখ, সকাল সাতটা সাঁইত্রিশ মিনিট। অবশেষে দেখা হলো চামেলির সঙ্গে। আহা কী শুভ্র স্নিগ্ধ ফুল! তীব্র সুগন্ধে ভরা ফুলের ঝোপটার নিচে দাঁড়িয়ে আমি বিমোহিত হয়ে গেলাম। এক অনাবিল আনন্দে মনটা ভরে উঠল। আহা, কতদিন যে এই ক্ষণটির জন্য অপেক্ষা করেছি!’
গত বসন্ত থেকে প্রতি মাসেই দু-চারবার করে জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে যাই আর চামেলিকে দেখব বলে নার্সারির গেটে কড়া নাড়ি, লতানো ঝোপটার কাছে যাই। প্রতিবারই হতাশ হই। অবশেষে ১২ জুন বৃক্ষবন্ধু আজহার ভাইয়ের একটা পোস্টে চামেলি ফুলের ছবি দেখে ভোর হতেই ছুটে যাই সে ফুল চাক্ষুষ করতে। রোদের তেজ নেই, ফুল সকালেও সতেজ রয়েছে।
কত জায়গায় যে খুঁজেছি চামেলিকে! কিন্তু প্রতিবারই হতাশ হয়ে ফিরে এসেছি। এর আগে রমনা ও বলধায় খুঁজেছি চামেলিকে, দেখা পাইনি। নিসর্গী বিপ্রদাশ বড়ুয়া বলেছিলেন, চামেলি হাউসে (সিরডাপ) চামেলি আছে, এখন সেখানেও নেই। অবশেষে জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের এই সবেধন নীলমণি একটি গাছের চামেলি ফুলকে দেখে নজরুলসংগীতের একটা লাইন মনে পড়ল–‘বনে মোর ফুটেছে হেনা চামেলি যূথী বেলি।’
পাঁচ পাপড়ির ফুলগুলো যেন সদ্যঃস্নাতা রমণী, পবিত্র ও শুভ্র। মিষ্টি গন্ধের নেশায় তার কাছে ছুটে গেলাম। খুব কাছ থেকে এই প্রথম চামেলিকে দেখা। চামেলি ফুলকে একজন সুন্দরী রমণীর সঙ্গে তুলনা করা বোধহয় ভুলই হলো। কেননা, সে তুলনা তো কবি কাজী নজরুল ইসলামই করতে পারেননি। তার একটি গানেই তিনি এ কথা স্বীকার করে লিখেছেন: ‘গোলাপ বেলী যুঁই চামেলী–কোন্ ফুল তারি তুল্ গো/ তার যৌবন-নদী বয় নিরবধি ভাসায়ে দুকূল গো..।’ চামেলির সঙ্গে আর কোনো ফুলের তুলনাই যেন হয় না। চামেলি যেন কবিদের ফুল, এ জন্য এর এক ইংরেজি নাম রাখা হয়েছে পোয়েট’স জেসমিন।
চামেলিকে দেখে মনে হলো, ফুল ও নারী–এর মধ্যে কোনটি বেশি সুন্দর? ফুল যেমন বীজ উৎপাদী, নারী তেমন সন্তান উৎপাদী। দুটিই উর্বরতার প্রতীক। প্রকৃতিকে টিকিয়ে রাখতে এ দুটি সত্তারই প্রয়োজন অনিবার্য, এ দুটির কোনো একটি না থাকলেই এ বিশ্ব সৃষ্টিতে ঘটবে চরম বিশৃঙ্খলা। এসব কথা চিন্তা করতে করতেই ভাবলাম চামেলিকে নিয়ে বাংলা সাহিত্যে কত যে মাতামাতি, সেই চামেলি এখন আমার সামনে ফুটে রয়েছে, লতায় লতায় দোল খাচ্ছে। অবাক হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম। কেননা, চামেলি এ দেশে দুষ্প্রাপ্য ফুল বলে প্রকৃতিবন্ধু মোকারম হোসেন তার বাংলাদেশের পুষ্প-বৃক্ষ লতা-গুল্ম বইয়ে লিখেছেন। সেই দুষ্প্রাপ্য ফুলকে দেখতে পাব ভাবিনি। সঙ্গে ছিলেন আরেক প্রকৃতিবন্ধু সৌমিক। দুজনে তখন চামেলির ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে উঠলাম।
চামেলির আরেক বাংলা নাম জাঁতি। চামেলি জুঁইজাতীয় ফুল হলেও জুঁই ফুলের সঙ্গে এর কিছুটা পার্থক্য আছে। সেটি খুব ভালো করে খেয়াল না করলে চামেলিকেই জুঁই বলে মনে হতে পারে। চামেলি ফুল জুঁই ফুলের চেয়ে বড়, পাপড়ি জুঁই ফুলের চেয়ে লম্বা ও সরু, কিন্তু রং ও সুগন্ধ প্রায় জুঁই ফুলের মতোই, যেন আতরের ঘ্রাণমাখা। প্রধানত গ্রীষ্ম-বর্ষায় ফুল ফোটে।
চামেলি ফুলের উর্দু নাম চাম্বেলী। ধারণা করা হয়, সেই উর্দু নাম কালক্রমে বাংলায় হয়েছে চামেলী বা চামেলি। চামেলি মূলত সংস্কৃত ভাষার মিলগত স্ত্রীবাচক নাম, যা সৌন্দর্য, পবিত্রতা, ভালোবাসা ও সুগন্ধকে প্রকাশ করে। এর ইংরেজি নাম স্প্যানিশ জেসমিন ও রয়্যাল জেসমিন। সব জুঁইজাতীয় ফুলকেই জেসমিন বলা হয়, পার্সি ভাষায় বলে ইয়াসমিন। সেখান থেকেই এর গণগত নাম হয়েছে জেসমিনাম ও প্রজাতিগত নাম Jasminum grandiflorum. গ্র্যান্ডিফ্লোরোম অর্থ ‘মিষ্টি সুগন্ধযুক্ত’, গোত্র ওলিয়েসি।
চামেলি একটি চিরসবুজ কাষ্ঠল লতা। লতার গিঁট থেকে কোনো আকর্ষি বের হয় না। প্রতিটি গিঁটের দুপাশে বিপরীতমুখীভাবে দুটি যৌগিক পক্ষল পাতা জন্মে। পত্রক ডিম্বাকার, ছোট, অগ্রভাগ সরু, চকচকে সবুজ, মসৃণ। বাইতে দিলে এ গাছ ২ থেকে ৩ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। তবে গাছ ছেঁটে ছোট করে রাখা যায়। ফুলের পাপড়ি সাদা, সুগন্ধী ও ফোটা ফুলের বিস্তৃতি প্রায় ৫ সেন্টিমিটার। গাছ কষ্ট সইতে পারে, দিনের প্রখর রোদ ও গরমেও গাছের ক্ষতি হয় না, এমনকি রাতে নিম্ন তাপমাত্রাতেও গাছের কোনো ক্ষতি হয় না। ধীর বৃদ্ধিসম্পন্ন গাছ, বিশেষ করে চারা লাগানোর পর প্রথম দুই বছর পর্যন্ত বাড়ে কম, ভোরে ফুল ফোটে, বেলা বাড়লেই নেতিয়ে যায়। বীজ ও গুটিকলমের মাধ্যমে চারা তৈরি করা যায়।
লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ