চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি গিয়েছিলাম পুষ্প, বৃক্ষ, লতাগুল্মেসমৃদ্ধ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানিক্যাল গার্ডেনে। গেট দিয়ে ঢুকে খোলা সবুজ জায়গা পেরিয়ে সোজা চলে গেলে হাঁটাপথের বাম দিকে নগ্নবীজী উদ্ভিদের বাগান। এখানেই পেয়ে গেলাম নগ্নবীজী উদ্ভিদ জামিয়ার দেখা।
একটি স্ত্রী উদ্ভিদের মেগাস্ট্রোবিলাস ভেঙে লাল বীজ বেরিয়ে পড়েছে। নগ্নবীজী উদ্ভিদ (Gymnosperms) হলো উদ্ভিদের একটি শ্রেণি, যাদের ফুলে গর্ভাশয় থাকে না। গর্ভাশয় না থাকার কারণে ফল উৎপন্ন হয় না, তাই বীজ নগ্ন থাকে।
যদিও পামগাছ নয়, তবে এর বৃদ্ধির ধরন অতিমাত্রায় পামের মতোই। তাই এটি সাধারণত কার্ডবোর্ড পাম নামে পরিচিত। এটি বেশি উঁচু হয় না। এদের কাণ্ড ভূনিম্নস্থ রূপান্তরিত রাইজোম। এর বৈজ্ঞানিক নাম Zamia furfuracea, এটি Zamiaceae পরিবারের নগ্নবীজী উদ্ভিদ। ইংরেজি নামের মধ্যে রয়েছে cardboard plant, cardboard sago, Jamaican sago, Mexican cycad ও cardboard cycad। উদ্ভিদের বৈজ্ঞানিক নামের গণ অংশটি এসেছে লাতিন Zamia থেকে। এর অর্থ পাইন বাদাম আর প্রজাতিক পদ furfuracea-এর অর্থ ‘mealy’ বা ‘scurfy’। mealy শব্দের মানে হচ্ছে সাদাটে বা ময়দার মতো আর scurfy মানে হচ্ছে স্কার্ফ বা স্কেলযুক্ত। আলংকারিক উদ্ভিদ হিসেবে বাগানে লাগানোর জন্য খুবই জনপ্রিয় এই উদ্ভিদ।
এই গাছের দীর্ঘদিন কাটে শৈশবে, যখন এর কাণ্ড মাটিতে প্রোথিত থাকে। কাণ্ড মাটির ওপরে উঠে গেলে গাছের বৃদ্ধি কিছুটা ত্বরান্বিত হয়। পাতাসহ পুরো উদ্ভিদটি সাধারণত প্রস্থে প্রায় ২ মিটার এবং দৈর্ঘ্যে ১ দশমিক ৩ মিটার হয়।
জামিয়ার পাতা পক্ষল, দেখতে খুব সুন্দর। পাতা কাণ্ডকে কেন্দ্র করে চারদিকে চক্রাকারে ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিটি পাতা ৫০-১৫০ সেন্টিমিটার লম্বা হয়। পত্রবৃন্ত ১৫-৩০ সেন্টিমিটার লম্বা হয়। পত্রক সবুজ, অত্যন্ত শক্ত, পুরু। ধরলে মনে হয় প্লাস্টিকের কার্ডবোর্ড। তাই এই উদ্ভিদের নাম কার্ডবোর্ড পাম। প্রতি পাতায় ৬-১২ জোড়া পত্রক থাকে। এরাই গাছের সৌন্দর্য। প্রতিটি পত্রক ৮-২০ সেন্টিমিটার লম্বা এবং ৩-৫ সেন্টিমিটার চওড়া হয়। মাঝে মাঝে পত্রকগুলো দাঁতযুক্ত হয়। পাতা বৃত্তাকার মুকুট ফার্ন বা পাম পাতার মতো। পাতা পূর্ণ রোদে খাড়া এবং ছায়ায় আনুভূমিক হয় । জামিয়া তার কাণ্ডের ভেতর দুর্দিনের পানি সঞ্চয় করে রাখতে পারে। পুষ্ট মেগাস্পোরোফিল থেকে উগ্র গন্ধ বের হয় এবং গুবরে পোকার মতো একধরনের পোকা এর পরাগায়ন ঘটায়।
উদ্ভিদের সব অংশে সাইকাসিন ও ম্যাক্রোজামিন টক্সিন রয়েছে। এ ছাড়া রয়েছে বিএমএএ নামের নিউরোটক্সিন, যা মানুষসহ প্রাণীর জন্য বিষাক্ত। জামিয়ার বীজও বিষাক্ত। এ বীজ খেলে কুকুর, বিড়ালের মতো ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণীর মৃত্যু হতে পারে। যকৃত ও কিডনিকে অকার্যকর করার পাশাপাশি মানুষকে প্যারালাইসিস করে ফেলে এই বীজ।
উদ্ভিদটি একটি ভিন্নবাসী প্রজাতি, যার অর্থ হলো স্ত্রী এবং পুরুষ প্রজনন অঙ্গগুলো আলাদা উদ্ভিদে উৎপন্ন হয়। স্ত্রী উদ্ভিদে মরিচা-বাদামি রঙের স্ত্রী স্ট্রোবিলাস তৈরি হয়, যেখানে ডিম্বক বা বীজ উৎপাদনকারী মেগাস্পোরোফিল থাকে। পুরুষ উদ্ভিদে মাইক্রোস্পোরোফিল উৎপন্ন হয়। এই উদ্ভিদের পরাগায়ন কিছু কীটপতঙ্গের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।
শুধু স্ত্রী উদ্ভিদে উৎপাদিত মাংসল, উজ্জ্বল লাল রঙের বীজ দ্বারা জামিয়ার পুনরুৎপাদন করা যেতে পারে। অঙ্কুরোদ্গম প্রক্রিয়া খুবই ধীর। বীজ থেকে চারা উৎপাদন করতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হয় বলে অনেক কার্ডবোর্ড পাম অবৈধভাবে বন থেকে সংগ্রহ করা হয় উদ্যানে লাগানোর জন্য বিক্রি করতে। তাই এই উদ্ভিদ বিপন্ন হয়ে পড়ছে।
জামিয়ার যত্ন সহজ, যা আর্দ্র এবং ভালো নিষ্কাশিত মাটিতে ভালো জন্মায়। এটি রোদ এবং ছায়া উভয় স্থানেই জন্মাতে পারে, তবে গভীর ছায়া এর জন্য উপযুক্ত নয়। জামিয়ার কন্দ বা রাইজোম থেকে স্টার্চ পাওয়া যায়, যা খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
লেখক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ; মুমিনুন্নিসা সরকারি মহিলা কলেজ, ময়মনসিংহ