১৫ বছর আগের কথা। বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা ছেড়ে গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (তৎকালীন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়) সবে যোগদান করেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ অত্যন্ত মনোরম। তখনো প্রাণিচিকিৎসা অনুষদের কার্যক্রম ঠিকমতো শুরু হয়নি।
আমার অনুষদ বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ প্রান্তে, একবারেই শালবনের কোল ঘেঁষে। কাজেই সময় পেলেই ক্যামেরা হাতে প্রকৃতি অবগাহনে বেরিয়ে পড়তাম। এমনকি মাঝে মাঝে ভরদুপুরেও। ২০১০ সালের নভেম্বরের তেমনি রৌদ্রকরোজ্জ্বল এক দুপুরে ক্যাম্পাসের কলাবাগানের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম। হঠাৎই চোখ গেল পাশের নিচু জলামতো জায়গাটির দিকে। ছোট্ট এই জলার মধ্যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দ্বীপের মতো বেশ কয়েকটি উঁচু জায়গার দেখা মিলল। আর জলার ঠিক মাঝখানের ক্ষুদ্র দ্বীপটিতে পাঁচটি লম্বা পেয়ে পাখিকে স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। জলার টলটলে পানিতে ওদের প্রতিবিম্ব পড়েছে। প্রতিবিম্বসহ পাখিগুলোকে চমৎকার লাগছে। এক মিনিটও দেরি না করে দুর্লভ পাখিগুলোর কিছু ঝকঝকে ছবি তুললাম।
এরপর বেশ কয়েক বছর ক্যাম্পাসে পাখিগুলোর প্রজনন প্রতিবেশ নিয়ে গবেষণা করেছি। কিন্তু দুঃখের বিষয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন নতুন অনুষদ ভবন ও অন্যান্য দালানকোঠা তৈরি হওয়ার কারণে পাখিগুলোর প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র একবারেই শেষ হয়ে গেছে। বহু চেষ্টা করেও ওদের আবাসভূমি রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছি। কয়েক বছর ধরে ক্যাম্পাসে এই প্রজাতির একটি পাখিও দেখিনি। অথচ আমি যখন গবেষণা করেছি, তখন ক্যাম্পাসে সব সময়ই ২০-২৫টি পাখি থাকত এবং প্রতি প্রজনন মৌসুমে ক্যাম্পাসের মাঠে চার থেকে ছয়টি বাসা নিয়মিত দেখা যেত। কিন্তু আফসোস! বর্তমানে ওরা এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পুরোপুরি হারিয়ে গেছে।
লম্বা পাওয়ালা মাঠে বিচরণকারী এই পাখি এবং এদের গোত্রের অন্য সদস্যদের নিয়ে প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যে বহু কল্পকাহিনি আছে, যা থেকে নানা উপকথা বা মিথের জন্ম হয়েছে। এদের লম্বা পা নিয়ে একটি জনপ্রিয় মিথ এ রকম- ‘সৃষ্টির শুরুতে লম্বা পাওয়ালা এই পাখির গর্ব ছিল যে সে স্বর্গ, আকাশ আর পৃথিবীর ভার বহন করতে পারে। আর এই গর্বের কথা সে প্রত্যেকটি পাখির কাছে সর্বদা বলে বেড়াত। পাখিরা তাই শুনে-শুনে তার ওপর বেশ বিরক্ত হয়ে উঠল। শেষে একদিন আর সহ্য করতে না পেরে সবাই মিলে বিধাতার কাছে গেল, এই গর্বের বিহিত করতে হবে। বিধাতা পাখিদের মুখে সব শুনে অভিশাপ দিলেন: ‘বংশবৃদ্ধির জন্য তাকে আকাশ বহন করতে হবে, ডিমে তা দেওয়ার সময় তাকে আকাশের দিকে দুই পা তুলে ধরে থাকতে হবে।’ এ জন্যই নাকি এই গোত্রের পাখিদের দেহের তুলনায় পা বেশি লম্বা। আর আকাশ ভেঙে পড়ার ভয়ে ওরা পা দুটি আকাশপানে তুলে শয়ন করে। বাস্তবে যদিও কখনো এই পাখিদের আকাশের দিকে পা উঁচু করে থাকতে দেখা যায় না; তবে আঙুলের গঠনবৈশিষ্ট্যের কারণে এরা গাছের ডালে বসতে পারে না, তাই আহার, বিশ্রাম, চলাফেরা, প্রেম-ভালোবাসা, বংশবৃদ্ধি সবকিছু মাটির ওপরই সম্পন্ন করে।
এতক্ষণ লম্বাপেয়ে যে পাখিগুলোর গল্প বললাম ওরা এ দেশের দুর্লভ ও প্রায় বিপন্ন আবাসিক পাখি হলুদ-লতিকা হট্টিটি বা হট টি-টি। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বলে হলদে টিট্টি। ইংরেজি নাম Yellow-wattled Lapwing। চ্যারাড্রিইডি (Charadriidae) বা টিট্রিভ গোত্রের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Vanellus malabaricus (ভেনেলাস মালাবারিকাস)। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, পাকিস্তানসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ওদের দেখা মেলে।
হলুদ-লতিকা মাঝারি আকারের পাখি। প্রাপ্তবয়স্ক পাখির দেহের দৈর্ঘ্য ২৪ থেকে ২৮ সেন্টিমিটার। প্রসারিত অবস্থায় ডানার মাপ ৬৫ থেকে ৬৯ সেন্টিমিটার। ওজন ১০৮ থেকে ২০৩ গ্রাম। ওদের লম্বা পাগুলো পানিপথে চলার উপযোগী। ডানা বড় ও সুচালো। পিঠের রং ধূসরাভ-বাদামি। কানের লতি হলুদ ও ত্রিকোনাকার। মাথার চাঁদি কালো, তার নিচে সাদা মোটা ঘের, বুক থেকে লেজের নিচ পর্যন্ত সাদা ও লেজের শেষ প্রান্তে চওড়া কালো পট্টি। চিবুক কালো, গলা ও বুক বালু-বাদামি। বুকের শেষে সাদা শুরু হওয়ার আগে একটা কালো সরু লাইন। চোখের রং হালকা হলুদ। চঞ্চু সরু ও কালো, চঞ্চুর গোড়া হলদেটে বা সবুজ-হলদেটে; পা ও আঙুল উজ্জ্বল হলুদ। স্ত্রী-পুরুষ দেখতে একই রকম। ছানাদের লতিকা হালকা হলদে, মাথার চাঁদি বাদামি-ধূসর ও ফোটাযুক্ত, দেহের ওপরের অংশ হালকা বাদামি ও তাতে গাঢ় রঙের দাগ থাকে।
হলুদ-লতিকা হট্টিটি মূলত ঢাকা, রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের খোলা ঘাস ও ঝোপঝাড়পূর্ণ মাঠ, কৃষিজমি, পাথুরে মাঠ ও অল্প পানির জলার আশপাশের ভূমিতে বসবাস করে। সচরারচর পাঁচ-সাতটি পাখি মিলে বিচরণ করে। তবে প্রজনন মৌসুমে জোড়ায় জোড়ায় দেখা যায়। ওরা দিনে ও চাঁদনি রাতে অত্যন্ত সক্রিয়। সারা দিন মাঠে চরে বিভিন্ন ধরনের কীটপতঙ্গ, যেমন- বিটল, ঘাসফড়িং ইত্যাদি খায়। এ ছাড়া কেঁচো ও পানিতে বাসকারী সুতার মতো একধরনের পোকা খেতে ভালোবাসে। ওড়ার সময় ‘চি-ইট--চি-ইট--চি-ইট---’ শব্দে ডাকে।
মার্চ থেকে আগস্ট প্রজননকাল। এ সময় ওরা বেশ ডাকাডাকি করে। ফাঁকা শুকনো মাঠে কয়েকটি মাটির ঢেলা দিয়ে লাইনিং করে বাসা তৈরি করে। ডিম পাড়ে চারটি, রং লালচে ছিটছোপসহ জলপাই-বাদামি। পা ও চঞ্চু ছাড়া সদ্যফোটা ছানাগুলো দেখতে একদম ডিমের রঙের মতো। ডিম ফোটে ২৮ থেকে ২৯ দিনে। ফোটার ২৪ থেকে ৩৬ ঘণ্টার মধ্যেই ছানারা মা-বাবার সঙ্গে বাসা ছেড়ে হাঁটা দেয় ও খাদ্যের সন্ধানে ঘোরাঘুরি শুরু করে। ওদের গায়ের রং এমন যে তা সহজেই পরিবেশের সঙ্গে মিলেমিশে ছদ্মবেশ ধারণ করতে পারে। ছানাগুলো বিপদের গন্ধ পেলে বা মা-বাবার সংকেত পেলে মুহূর্তের মধ্যে মাটির সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। মা-বাবা আকাশে উড়ে উড়ে ছানাদের বিভিন্ন ধরনের সংকেত দেয় ও ছানারা তা মেনে চলে। দালানের ছাদে বাসা করলে ছানারা সাত-আট দিনের মাথায় বাসা থেকে লাফিয়ে নিচে নেমে যায়। প্রায় ১৫ দিন বয়সে ছানারা নিজে নিজে খাবার খেতে শেখে। দেহের পালক পুরোপুরি গজাতে ২৫ থেকে ৩০ দিন সময় লাগে ও ৩০ থেকে ৩৫ দিনে উড়তে শেখে। আয়ুষ্কাল প্রায় ৯ বছর।
লেখক: পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ,
গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়