ঢাকা ১০ আষাঢ় ১৪৩৩, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
বিশ্ব সংগীত দিবসে প্রকাশিত হলো নজরুলের গান ‘বরষা ঋতু এলো এলো’ সৌদিতে শুটিংয়ের মাঝেই হলিউড অভিনেতার ইসলাম গ্রহণ দেশজুড়ে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল ক্যাম্পেইন ২৮ জুন ইরান যুদ্ধ বন্ধে মার্কিন সিনেটে বড় ধাক্কা খেলেন ট্রাম্প মেসিকে নিয়ে প্রশ্নে নাখোশ রোনালদো, আর্জেন্টিনার ম্যাচ নিয়ে দিলেন বার্তা নাভানা গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান গ্রেপ্তার শেরপুরে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিজিবির টহল ঝিনাইদহে ট্রাক্টরের ধাক্কায় প্রাণ গেল ইজিবাইকের যাত্রীর অপেক্ষা ফুরোচ্ছে নেইমারের নোয়াখালীতে পিকআপ-মোটরসাইকেল সংঘর্ষে ২ বন্ধু নিহত সংসদীয় কমিটি গঠনে বিলম্ব নজরদারি প্রশ্নবিদ্ধ নওগাঁ সীমান্তে ৯ জনকে পুশইনের চেষ্টা গ্রুপ এল: যেভাবে নকআউটে যেতে পারে ইংল্যান্ড, ঘানা ও ক্রোয়েশিয়া নকআউটের টিকিট পেতে কার সমীকরণ কেমন? পণ্যের মান ও বৈচিত্র্যকরণে রপ্তানি বাড়বে ব্রাজিলকে চ্যালেঞ্জ জানাতে চায় স্কটল্যান্ড বিদেশি ঋণ পরিশোধে রেকর্ড পাবনায় ১৩ মাসে ৫৯ খুন, ৭১ ধর্ষণ নদীবন্দরে সতর্কতা, দেশের ১৬ জেলায় ঝড়ের শঙ্কা সূচকের উত্থান হলেও কমেছে লেনদেন শিশু ধর্ষণের অভিযোগে কারাগারে ইমাম বদলে গেল গ্রুপ পর্বের টাইব্রেকার নিয়ম! ভাগ্য নির্ধারণ হবে যেভাবে মেম্বার থেকে এমপি, রাজনৈতিক উত্থানের গল্প শোনালেন আবদুল গফুর বরিশাল নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ: এক চেয়ারে নজর ৭ নেতার বিপিসির প্রধান কার্যালয় ঢাকায় নিতে চিঠি টানা জয়েও মেক্সিকোর পারফরম্যান্সে অসন্তুষ্ট কোচ আগুয়েরে যুদ্ধের পর প্রথম বিদেশ সফরে পাকিস্তানে ইরানের প্রেসিডেন্ট সিন্ডিকেটের কবলে চট্টগ্রাম বন্দর: প্রতিযোগিতা রুখতে সুপরিকল্পিত ‘খেলা’ ২৪ জুন: তুলা, বৃশ্চিক, ধনু, মকর, কুম্ভ ও মীনের আজকের রাশিফল ২৪ জুন: মেষ, বৃষ, মিথুন, কর্কট, সিংহ ও কন্যার আজকের রাশিফল

হলুদ রোদে হলুদ প্রজাপতি

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১১:৩৯ এএম
হলুদ রোদে হলুদ প্রজাপতি
ঢাকার আগারগাঁওয়ে দেখা হলুদ প্রজাপতি। ছবি: লেখক

কয়েক দিন আগের কথা। সকালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নতুন একটা গাছের খোঁজে নার্সারির ভেতর ঘুরছিলাম। রোদের তীব্রতায় চোখ পুড়ছে। সকালের রোদকে দেখাচ্ছে জন্ডিস রোগীর চোখের মতো হলুদ। নার্সারিতে কাঙ্ক্ষিত সেই গাছ পেলাম না, কিন্তু বলকামিনীগাছে দেখলাম ফুল ফুটেছে। বলকামিনীগাছ ছোট বলের মতো ঝোপালো হয়ে থাকে। পাতাগুলো খুব ক্ষুদ্র। পাতার ফাঁক দিয়ে ছোট্ট ছোট্ট ঘণ্টাকৃতির সাদা ফুল ফুটেছে। সে ফুলেও কি কামিনীর মতো সুরভী ও মধু আছে? তা না হলে ওই ফুলের বুকে অমন সুন্দর হলদে শাড়ি পরে কে নেমে এল? হলুদ প্রজাপতিটাকে যতই দেখছি, ততই মুগ্ধ হচ্ছি। প্রজাপতিটা ডানা চারটিকে ঊর্ধ্বমুখী করে মাতালের মতো বলকামিনীর শুরা পান করে চলেছে। পাশে থেকে কেউ যে ওর এসব দেখে যাচ্ছে, সেদিকে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। মিনিট দুয়েক সে ওভাবে বসে রইল। এরপর ডানাগুলো পতপত করতে করতে উড়ে গেল। এই ফাঁকে আমার যা করার আমি তাই করে নিলাম।

খুব চেনা এ প্রজাপতিটা। এ দেশে প্রায় সর্বত্রই এদের দেখা যায়। কপি ও মুলা খেতেও দেখেছি কয়েকবার। দেহ ও ডানা হলুদ রঙের বলে ওর নামটাই হয়ে গেছে হলুদ প্রজাপতি। বাংলায় ওর আরও একটা পোশাকি নাম আছে, তা হলো ‘তৃণ গোধূম’। এ নামের তাৎপর্য জানি না। মনে হয়, এর ইংরেজি নাম ‘কমন গ্রাস ইয়েলো’ থেকে বাংলায় এই নামকরণ করা হয়েছে। গ্রাস মানে তৃণ বা ঘাস। ইয়েলো মানে হলুদ বা হরিদ্রা। বৈজ্ঞানিক নাম বা প্রজাতি Eurema hecabe, গোত্র পিয়েরিডি।

এ প্রজাপতির রং হলুদ, তবে ডানার দাগগুলো বদলে যায়। বর্ষাকালে পুরুষ প্রজাপতির রং হয় উজ্জ্বল হলুদ ও ওপরের সামনের ডানায় এবং কিনারায় মোটা কালো দাগ বা পাড় দেখা যায়। এই কালো দাগ ডানার তলায় দেখা যায় না। ডানার ওপরে থাকা দাগগুলো সরু, তবে স্ত্রীদের দাগগুলো মোটা। গ্রীষ্ম মৌসুমে এই দাগগুলো সরু হয়ে যায়। এ প্রজাপতির ডানার বিস্তার ৪০ থেকে ৫০ মিলিমিটার। এরা সাধারণত মাটির কাছাকাছি উড়ে বেড়ায়। ওড়ে বেশ ধীরে ধীরে। বিভিন্ন ফুল গাছ, ঝোপঝাড়, পার্ক, অরণ্য প্রভৃতি স্থানে এদের সহজে চোখে পড়ে। ফুল ও স্যাঁতসেঁতে জায়গা এদের খুব পছন্দ। কুঁচ, সোনালু, ধইঞ্চা, খইয়াবাবলা, চাকুন্দে, অমলতাস, বাবলা ইত্যাদি এ প্রজাপতির পোষক গাছ। 

ওসব গাছের পাতায় স্ত্রী প্রজাপতি ডিম পাড়ে। এদের দলবদ্ধভাবে প্রজনন করতে দেখা যায়। ডিম মাকু আকৃতির, দুই প্রান্ত চোখা। সেখানেই ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়। বাচ্চারা ওই সব গাছের পাতা খেতে খেতে বড় হয়। এসব বাচ্চা কীড়া অবস্থায় প্রায় ৮ থেকে ১০ দিন থাকে। কীড়া লম্বা, সরু, খসখসে ত্বক, মাথা বড়, ধূসর সবুজ। কীড়াদের শত্রু পাখি। তারা কীড়াদের খেয়ে ফেলে। বোলতা মৌমাছিরা কীড়ার দেহে হুল ফোটায়। এরপর কীড়ার দেহের ভেতর বোলতারা ডিম পাড়ে। বোলতার ডিম ফুটে কীড়ার দেহের ভেতরে যে বাচ্চাগুলো জন্মে, ওরা কীড়ার মাংস খেয়ে মেরে ফেলে। এ ছাড়া কীড়া উলবাচিয়াগণের ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে নষ্ট হয়। যেগুলো শত্রুর হাত থেকে রক্ষা পায়, সেগুলো আশপাশের শুকনো বা মরা ডালে পুত্তলি বা পিউপা হয়ে ঝুলতে থাকে।

জীবনের এই শেষ রূপান্তরে এরা একটা সবুজ রঙের খোলসের মধ্যে গুটিসুটি মেরে ৬ থেকে ১০ দিন প্রায় নিশ্চল থাকে। এরপর সেই খোলসের এক পাশে ফুটো করে পূর্ণাঙ্গ প্রজাপতি হয়ে বেরিয়ে আসে। ঘুম ভাঙার পর আমরা যেমন আড়মোড়া দিই, ওরাও তেমনি ডানার ভাঁজগুলো আড়মোড়া দেওয়ার মতো করে আস্তে আস্তে খুলতে থাকে। এরপর রোদের মধ্যে বের হয় নিজেদের একটু শুকিয়ে নিতে। আর্দ্র ও শুষ্ক মৌসুমে ওদের দুই রকমের চেহারা দেখা যায়। এ প্রজাপতির জীবনচক্র সম্পন্ন হতে ১৫ থেকে ২০ দিন লাগে। বছরে এরা কয়েকবার বংশবৃদ্ধি করে। এ দেশে প্রায় সব জায়গায় সব সময় এদের দেখা যায়। ওদের বিলুপ্তি নিয়ে আপাতত দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই।

লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ

সৌন্দর্যে অনন্য গোলাপি অলকানন্দা

প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২৬, ০৮:১৭ এএম
সৌন্দর্যে অনন্য গোলাপি অলকানন্দা
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানিক্যাল গার্ডেনে গোলাপি অলকানন্দা ছবি: লেখক

গোলাপি অলকানন্দা একটি চমৎকার লতানো গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ। এর মনোহরা গোলাপি রঙের ফুলের জন্য এটি বাগানবিলাসী মানুষের কাছে ভীষণ জনপ্রিয়। মূলত ব্রাজিলের আদি বাসিন্দা হলেও ক্রান্তীয় এবং উপক্রান্তীয় অঞ্চলের আবহাওয়ায় এ গাছটি দারুণভাবে মানিয়ে নিয়েছে। উদ্ভিদের বৈজ্ঞানিক নাম Allamanda blanchetii, এটি Apocynacae পরিবারের উদ্ভিদ। ইংরেজিতে এই উদ্ভিদ purple allamanda, violet allamanda নামে পরিচিত। 

গোলাপি অলকানন্দা একটি চিরসবুজ লতানো গুল্ম। উপযুক্ত অবলম্বন পেলে এটি লতার মতো বেয়ে ১০ থেকে ১৫ ফুট বা তার বেশি উঁচুতে উঠতে পারে। আবার নিয়মিত ছাঁটাই করলে একে সাধারণ গুল্ম বা ঝোপ হিসেবেও চমৎকারভাবে রাখা যায়। এর কাণ্ড কিছুটা নমনীয়, কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা কাষ্ঠল রূপ নেয়।

এর পাতাগুলো গাঢ় সবুজ, মসৃণ এবং চকচকে। পাতাগুলো সাধারণত উপবৃত্তাকার বা ডিম্বাকার হয়ে থাকে। কাণ্ডের চারপাশ ঘিরে চার বা পাঁচটি পাতা চক্রাকারে (Whorled) সাজানো থাকে। পাতার এই ঘন বিন্যাস ফুলহীন অবস্থাতেও গাছটিকে বেশ দৃষ্টিনন্দন করে রাখে।

গোলাপি অলকানন্দার সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হলো এর ফুল। ফুলগুলো দেখতে অনেকটা মাইক বা ট্রাম্পেটের (Trumpet-shaped) মতো। ফুল সাধারণত আড়াই থেকে তিন ইঞ্চি চওড়া হয়। এর রঙের শেডটি অসাধারণ। ফুলের পাপড়িগুলো হালকা বেগুনি থেকে শুরু করে গভীর ম্যাজেন্টা বা পার্পল রঙের হয়ে থাকে, আর ফুলের ভেতরের দিকটা বা গলাটা কিছুটা কালচে বা গাঢ় তামাটে বেগুনি রঙের হয়।

অনুকূল পরিবেশে ফুল শেষে গাছে ছোট, গোলাকার এবং কাঁটাযুক্ত ফল হতে দেখা যায়। তবে গৃহস্থালি বাগানে এই ফল খুব একটা চোখে পড়ে না। এই গাছটি যেমন সুন্দর, এর পরিচর্যা করাও কিন্তু বেশ সহজ। সামান্য যত্নেই এই গাছ থেকে প্রচুর ফুল পাওয়া সম্ভব। 

এই ফুল গাছ মূলত রৌদ্রোজ্জ্বল পরিবেশ পছন্দ করে। প্রচুর আলো পেলে এর ফুলের রং যেমন উজ্জ্বল হয়, তেমনি ফুলের সংখ্যাও বাড়ে। তবে হালকা ছায়াতেও এটি বেঁচে থাকতে পারে। সুনিষ্কাশিত এবং জৈব উপাদানসমৃদ্ধ সামান্য অম্লীয় মাটি এই গাছের বৃদ্ধির জন্য সবচেয়ে ভালো। গাছে নিয়মিত পানি দেওয়া উচিত, তবে গোড়ায় যেন পানি জমে না থাকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

বছরের শুরুর দিকে বা শীতের শেষে গাছটিকে হালকা ছেঁটে দিলে নতুন ডালপালা গজায় এবং বসন্ত ও গ্রীষ্মে প্রচুর ফুল ফোটে।

গোলাপি অলকানন্দা বহুবর্ষজীবী হওয়ায় বছরের প্রায় সিংহভাগ সময়ই, বিশেষ করে গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে এটি ফুলে ফুলে ভরে থাকে। বাগানের দেয়াল, তোরণ (Arch), ট্রেলিস বা বারান্দার গ্রিল বেয়ে ওঠার জন্য এটি আদর্শ। আবার বড় টবে লাগিয়ে ছাঁটাইয়ের মাধ্যমে একে সুন্দর একটি ঝোপের আকারও দেওয়া যায়।

Apocynaceae পরিবারের অন্যান্য গাছের মতো এর কাণ্ড বা পাতা ভাঙলে একধরনের সাদা আঠালো রস বা কষ বের হয়। এই রস ত্বকে লাগলে চুলকানি বা অ্যালার্জি হতে পারে, তাই গাছ ছাঁটাইয়ের সময় কিছুটা সতর্ক থাকা ভালো।

পরিশেষে বলা যায়, গোলাপি অলকানন্দার রাজকীয় বেগুনি আভা যেকোনো প্রকৃতিপ্রেমীর মন কেড়ে নিতে পারে। সামান্য পরিচর্যা আর প্রচুর ভালোবাসায় এ গাছটি আপনার বাগান বা বাড়ির আঙিনাকে করে তুলতে পারে অনন্য ও দৃষ্টিনন্দন।

লেখক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, মুমিনুন্নিসা সরকারি মহিলা কলেজ, ময়মনসিংহ

রূপবতী সাদা মথ গাছফড়িং

প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬, ০৮:২৩ এএম
রূপবতী সাদা মথ গাছফড়িং
মিরপুরে জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে সম্প্রতি দেখা সাদা মথ গাছফড়িং। ছবি: লেখক

মিরপুর থেকে প্রকৃতিবন্ধু জিয়া ভাই গত ২৩ মে খবর দিলেন, জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে বন আসরা গাছে ফুল ফুটেছে। দেখতে হলে যেন চট করে চলে যাই সেখানে। পরদিন যেতে পারলাম না, গেলাম তার পরের দিন, ২৫ মে। সকাল সকাল গিয়েও ব্যর্থ হলাম সে ফুল দেখতে। হায়! সব যে ঝরে গেছে। তলায় বাসি ও শুকনো বাদামি ফুল পড়ে আছে। ইয়া লম্বা বিশাল গাছের ডালপালার দিকে যতই তাকিয়ে ফুল খুঁজতে থাকি, কোথাও পাই না। হতাশ হয়ে তাই এবার নিচের দিকে তাকালাম। আশপাশের ঝোপঝাড়ে পোকামাকড় খুঁজতে লাগলাম। বেশ কয়েক রকমের মাকড়সার দেখা পেলাম। কিন্তু একটা গাছের ডালে পাতার আড়ালে লুকিয়ে বসে থাকা এমন একটি পোকার দেখা পেলাম, যা আগে দেখিনি।

পোকাটি দেখতে ছোট সাদা মথের মতো, কিন্তু এর তাঁবুর মতো ডানার গড়ন, সূক্ষ্ম মলিন মেরুন দাগের আঁকিবুঁকির দুধেল চেহারা দেখে মুগ্ধ হলাম। কে সে সুন্দরী? ছবি তুলে সেদিনের মতো ফিরে এলাম। আবার  ১৩ জুন গেলাম সে উদ্যানে। এবার অন্য স্পট, ক্যান্টিনের কাছাকাছি বাতিলতাগাছ।

এবার আরও বিস্মিত হলাম। একটা ডালে অনেকগুলো পোকা লাইন ধরে বসে আছে। একসঙ্গে এত পোকা? ১০-১২টা হবে। বিরক্ত করলেও উড়াল দিল না বা লাফাল না, একটু পাশ ফিরে শোয়ার মতো অবস্থানটা সামান্য বদলাল। কৌতূহল হলো এবার তাদের নিয়ে। এবারও ছবি তুলে ফিরে এসে তাকে চিনতে বসলাম বইপত্র ও ইন্টারনেট নিয়ে। ইন্টারনেট ঘেঁটে ওর পরিচয় জানা গেল অবশেষে। নাম তার সাদা মথ গাছফড়িং বা হোয়াইট মথ প্ল্যান্টহপার, তবে সে মথ না- হপার। এ পোকাটিকে নিয়ে কিছু গবেষণাপত্রও পেলাম নেটে। কিন্তু বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের ২০তম খণ্ডে হেমিপ্টেরা বর্গের মধ্যে এ পোকাটির কোনো উল্লেখ পেলাম না। বাংলাদেশে এটি নথিভুক্ত কি না, তা জানা নেই।

একটি গবেষণাপত্রে দেখলাম, ভারতীয় কীটতত্ত্ববিদরা এ পোকাকে লাক্ষা উৎপাদী উদ্ভিদের ক্ষতিকর পোকা হিসেবে নতুনভাবে চিনেছেন। এ পোকার আশ্রয়দাতা বা পোষক গাছ হিসেবে তারা অড়হর, পলাশ, বরই, শিশুগাছজাতীয় বৃক্ষ ইত্যাদিকে চিহ্নিত করেছেন। এর আগে ফিলিপিন্স ও ভারতে কোকোয়া এবং কাঞ্চনগাছে এ পোকার আক্রমণ লক্ষ্য করা গেছে। এমনকি আসামে লেবুজাতীয় গাছ এদের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেখা গেছে। ডালিয়া, জুঁই ও আমের মুকুলও এ পোকা দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যদিও এদের ক্ষতির মাত্রা খুব কম, তবুও তাকে এসব গাছের অপ্রধান ক্ষতিকর পোকা হিসেবে গণ্য করা হয়। 

গবেষকরা ঝাড়খন্ড রাজ্যের রাজধানী রাঁচির নামকুমে ফেব্রুয়ারি-মার্চে প্রাপ্তবয়স্ক পোকা ও নভেম্বর-ডিসেম্বরে এদের বাচ্চাদের দেখতে পেয়েছেন। আমি প্রাপ্তবয়স্ক পোকার দেখা পেলাম এ দেশে মে-জুনে। প্রাপ্তবয়স্ক স্ত্রী সাদা মথ গাছফড়িং কচি নরম পাতার মধ্যশিরায় ডিম পাড়ে। ডিম ফুটে বাচ্চারা বেরিয়েই প্রাপ্তবয়স্কদের মতো লাফাতে শুরু করে। বয়স ও বৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে বাচ্চাদের আকার ছোট-বড় হয়। পূর্ণবর্ধিত নিম্ফ বা বাচ্চার দেহের দৈর্ঘ্য প্রায় ৪ মিলিমিটার ও মোমবৎ সূক্ষ্ম আঁশ দ্বারা আবৃত। রসাল পাতার নিচের দিকে বা শাখার ডগায় মোমজাতীয় ক্ষরিত পদার্থের লম্বা, কোঁকড়ানো পশমের মতো আঁশ বা তন্তু প্রায়শই বাচ্চাদের আড়াল করে রাখে। এদের ডানার প্যাডগুলো সুগঠিত, তাতে একটি কালো রঙের আড়াআড়ি রেখা ও পায়ুখণ্ডের পিঠে একটি কালো দাগ থাকে। পূর্ণাঙ্গ পোকা সাধারণত সাদা রঙের, ১০ থেকে ২০ মিলিমিটার লম্বা হয়। সবচেয়ে চওড়া অংশের মাপ হয় ৪-৫ মিলিমিটার। এদের সামনের ডানাজোড়া চওড়া, ত্রিভুজাকার, গোড়ার অংশে দুটি কমলা রঙের ডোরা দাগ থাকে। পোকাটিকে হঠাৎ দেখে একটা গোজ বা কীলক-আকৃতির বলে মনে হয়, যা ওপর থেকে দেখলে পার্শ্বীয়ভাবে চাপা দেখায়। পিছনের ডানাজোড়া স্বচ্ছ। 

এই গাছফড়িংরা সাধারণত গাছের কচি ডগা, নতুন পাতা ও ফুল থেকে রস চুষে খেয়ে শুকিয়ে ফেলে। শুধু তাই না, খাওয়ার সময় এরা একধরনের মিষ্টি মধুরস ছাড়ে যার কারণে সেখানে আঠালো চটচটে দাগ হয় ও সেসব আঠালো অংশে এক ধরনের কালো ছাতার মতো আবরণ পড়ে। এটি এক ধরনের ছত্রাক, কালি ছত্রাক বা শুঁটি মোল্ড। এতে পোষকগাছ দুর্বল ও রোগগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এমনকি এর বাচ্চারাও রস চুষে খাওয়ার সময় একই কাজ করে, নিম্ফ বা বাচ্চার নিঃসৃত রসে কচি ডগা ঢেকে যায়।

সাদা মথ গাছফড়িং হেমিপ্টেরা বর্গের ফ্ল্যাটিডি গোত্রের এক ধরনের শোষক পোকা, প্রজাতিগত নাম Lawana conspersa. তিনটি ধাপে এদের জীবনচক্র সম্পন্ন হয়- ডিম, নিম্ফ ও পূর্ণাঙ্গ। যেহেতু এদের জীবনচক্রে কোনো পিউপা বা পুত্তলি  দশা নেই, তাই এদের জীবনচক্রকে অসম্পূর্ণ বলে গণ্য করা হয়। কোকোয়া গাছে এদের জীবনচক্র ১০৪.৭ দিনে সম্পন্ন হতে দেখা গেছে। এ দেশে এ পোকাটি নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা হতে পারে।  

লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ

হঠাৎ দেখা নীলমাথা হাঁস

প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬, ০৮:৩০ এএম
আপডেট: ২০ জুন ২০২৬, ০৮:৩২ এএম
হঠাৎ দেখা নীলমাথা হাঁস
রাজশাহী শহরের কাছে পদ্মা নদীর ওপর একটি উড়ন্ত নীলমাথা হাঁসা। ছবি: লেখক

চলতি বছরের ১৬ জানুয়ারি। বিরল শ্যামলা কাঁকাল (Isabelline Wheatear) পাখির সন্ধানে রাজশাহীর চরসাতবাড়িয়ার ডোগার ঘাটে এসেছি পদ্মা নদীর ১০ নম্বর চরে যাওয়ার জন্য। সঙ্গে আছে রাজশাহীর পক্ষী আলোকচিত্রী মারুফ রানা এবং দুই সহযোগীসহ চুয়াডাঙ্গার পাখি ও বন্যপ্রাণীপ্রেমী বখতিয়ার হামিদ। সকাল সাড়ে ৮টায় জাকারুল মাঝি নৌকা ছাড়লেন। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ভারত সীমান্তবর্তী ১০ নম্বর চরে পৌঁছে গেলাম। পথিমধ্যে চখাচখি (Ruddy Shelduck) ও পিয়ং হাঁসের (Gadwall) ঝাঁক ছাড়াও বড় খোঁপা ডুবুরি (Great-crested Grebe), ছোট সাদা বক (Little Egret) ও বিভিন্ন প্রজাতির সৈকত পাখির (Wader) দেখা পেলাম। চরে নামার ১৫ মিনিটের মধ্যে অতি আরাধ্য শ্যামলা কাঁকালের দেখা পেয়ে গেলাম। কিন্তু এর পরও আরও কটি বিরল ও দুর্লভ পাখির খোঁজে দুপুর সোয়া ২টা পর্যন্ত চরে থাকলাম। 

ফিরতি পথে আবারও চখাচখি ও পিয়ং হাঁসের ঝাঁক এবং বড় খোঁপা ডুবুরির দেখা পেলাম। সঙ্গে ধূপনি বক (Grey Heron), বড় জিরিয়া (Grey Plover), বড় বদরকৈতর (Pallas’s Gull) এবং বড় পানকৌড়িও (Great Cormorant) ছিল। ওদের ছবি তুলে প্রায় আধা ঘণ্টায় ডোগার ঘাটের কাছাকাছি আসতেই বিশাল এক হাঁসের ঝাঁকের দেখা মিলল। মিনিট দশেকের মধ্যেই ডোগার ঘাটে পৌঁছাব। কিন্তু চুয়াডাঙ্গা থেকে আসা পক্ষীপ্রেমী বখতিয়ার হামিদ ও তার সঙ্গীরা হাঁসের ঝাঁকের ছবি তুলতে চাওয়ায় নৌকার ইঞ্জিন থামিয়ে মাঝিকে ধীরে ধীরে বৈঠা মেরে ঝাঁকের পিছু নিতে বললাম।

ঝাঁকের প্রায় সবগুলোই ছিল পিয়ং হাঁস। তবে ওদের ভেতর তিনটি ভিন্ন প্রজাতির হাঁসও দেখলাম। লালচে কমলা রঙের চখাচখি, মাথায় কমলা সিঁথির লালশির এবং নীল মাথার এক দুর্লভ হাঁস। আমি ও মারুফ রানা একসঙ্গে প্রায় ১০ বছর পদ্মা নদীর চরে বহুবার ঘুরেও যে হাঁসটিকে খুঁজে পাইনি আজ সেই নীলমাথার হাঁসটি আমাদের চোখের সামনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ফিরতি পথে বিকেলটাই অর্থপূর্ণ হয়ে উঠল। মারুফ রানা পেল একটি নতুন হাঁস। অন্যরা পেল দুটি। আমি যদিও কোনো নতুন হাঁস পেলাম না, কিন্তু সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরের বাইরে এই প্রথম অন্য কোথাও এই হাঁসটির দেখা পেলাম। নীলমাথার এই হাঁসটিকে ১০ বছর আগে ২০১৬-এ সর্বপ্রথম টাঙ্গুয়ার হাওরেই দেখেছিলাম। এর পর থেকে টাঙ্গুয়ার প্রতিটি অভিযানেই ওকে দেখেছি। খুশি মনে ওর বেশ কিছু ছবি তুলে ডোগার ঘাটে ফিরে এলাম।

নীল মাথার সুদর্শন ও দুর্লভ এই পরিযায়ী হাঁসটির নাম নীলমাথা হাঁস বা নীলশির। বৈরাগী হাঁস নামেও পরিচিত। এরাই পুরো বিশ্বের গৃহপালিত হাঁসের পূর্বপুরুষ, যারা এখনো বুনো পরিবেশে প্রচুর সংখ্যায় বেঁচে আছে। ইংরেজি নাম Mallard। অ্যানাটিডি (Anatidae) গোত্রের হাঁসটির বৈজ্ঞানিক নাম Anas platyrhynchos (অ্যানাস প্ল্যাটিরিনকস)। উত্তর গোলার্ধের বিভিন্ন দেশের আবাসিক এই হাঁসকে দক্ষিণ আমেরিকা ও এশিয়াও দেখা যায়। শীতে পরিযায়ী হয়ে স্বল্পসংখ্যক হাঁস এ দেশে আসে।

নীলমাথা হাঁসের দেহের দৈর্ঘ্য ৫০-৬৫ সেন্টিমিটার। ওজনে হাঁসা ও হাঁসি যথাক্রমে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ ও ৭৯০ থেকে ১ হাজার ৩৫০ গ্রাম। হাঁসা ও হাঁসি দেখতে একেবারেই আলাদা, যদিও দুটিরই ডানায় গাঢ় নীল বন্ধনী থাকে। প্রজননকালীন হাঁসার মাথা ও ঘাড় ধাতব সবুজ, সূর্যের আলোয় যা চিকচিক করে। গলায় থাকে সাদা মালা। পালকের রং গাঢ় ধূসর, পেট হালকা, বুক বেগুনি-বাদামি এবং কালো লেজের মাঝখানের কয়েকটি পালক ওপরের দিকে বাঁকানো। ঠোঁট হলুদ ও পা কমলা। প্রজননকাল বাদে অন্য সময় হাঁসার পালকের রং অনেকটাই হাঁসির মতো হয়ে যায়। হাঁসির পুরো দেহ বাদামি, তার ওপর থাকে গাঢ় বাদামি ও হালকা হলদে দাগছোপ। হাঁসা-হাঁসি নির্বিশেষে চোখ বাদামি, চঞ্চু কালচে কমলা, পা ও পায়ের পাতা কমলা-হলুদ থেকে প্রবাল-লাল। অপ্রাপ্তবয়স্কগুলো দেখতে হাঁসির মতো।

মূল আবাস এলাকায় নীলমাথা হাঁস অগভীর হ্রদ, নদী, পুকুর ও উদ্যানে সচরাচর ঝাঁক বেঁধে ঘুরে বেড়ায়। শীতে এ দেশের সিলেট, বরিশাল ও ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন হাওর ও বিলে বিচরণ করতে দেখা যায়। পানিতে মাথা ডুবিয়ে জলজ লতাপাতা, ঘাস, বিচি, শামুক-গুগলি, ব্যাঙাচি, পোনা মাছ, কেঁচো ইত্যাদি খুঁজে খায়। হাঁসা নিচু স্বরে ‘ওয়াক-ওয়াক-ওয়াক…’ বা ‘মেক-মেক-মেক…’ এবং হাঁসি উচ্চস্বরে ‘কোয়াক-কোয়াক-কোয়াক…’ শব্দে ডাকে।

এপ্রিল থেকে জুলাই এদের প্রজননকাল। প্রজননের পর পরই হাঁসা অন্যত্র চলে যায়। কাজেই বাসা বানানো, ডিমে তা দেওয়া, ছানাদের যত্ন নেওয়া ইত্যাদি সবকিছু হাঁসিকেই একা একা করতে হয়। প্রজনন এলাকায় পানির কাছাকাছি মাটিতে ঘাস ও লতাপাতা দিয়ে হাঁসি বাসা বানায় ও তার ওপর বুকের পালক বিছিয়ে দেয়। ডিম পাড়ে ৬ থেকে ১৩টি। ডিমের রং ফ্যাকাশে সবুজাভ, নীলচে বা ঘিয়ে সাদা। ডিম ফোটে ২৬-২৮ দিনে। ছানারা মায়ের সঙ্গে প্রায় দুই মাস থাকে। চার মাস বয়সে ওরা উড়তে শেখে ও এক বছরে বয়ঃপ্রাপ্ত হয়। আয়ুষ্কাল ছয়-সাত বছর।

লেখক: পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর 

ইয়াংজির বুনো পরিবেশেই হচ্ছে স্টার্জন মাছের প্রজনন

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ০৬:২৩ পিএম
ইয়াংজির বুনো পরিবেশেই হচ্ছে স্টার্জন মাছের প্রজনন
স্টার্জন মাছ।

চীনের সিছুয়ান প্রদেশের চিয়াং’আন কাউন্টিতে ইয়াংজি নদীর উজান অংশে ইয়াংজি স্টার্জন মাছকে ঘিরে রচিত হচ্ছে আশাব্যঞ্জক নতুন অধ্যায়। সেখানে এখন বুনো পরিবেশেই এ মাছের প্রজনন ঘটে চলেছে। 


ইয়াংজি স্টার্জন হলো পৃথিবীর প্রাচীনতম মেরুদণ্ডী প্রাণীগুলোর একটি। ডাইনোসরদের যুগেও এরা ছিল। এখন শুধু ইয়াংজি নদী অববাহিকায় পাওয়া এই মাছ চীনের প্রথম শ্রেণির জাতীয় সুরক্ষাপ্রাপ্ত বন্যপ্রাণী হিসেবে তালিকাভুক্ত।


২০২২ সালের জুলাইয়ে আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সুরক্ষা ইউনিয়ন ইয়াংজি স্টার্জনকে প্রকৃতিতে বিলুপ্ত ঘোষণা করেছিল। এরপর থেকে চীন এই বিরল প্রজাতি রক্ষায় ব্যাপক উদ্যোগ নেয়। এরপরই এ মাছটি ধরায় নিষেধাজ্ঞা, আইনগত সুরক্ষা, কৃত্রিম প্রজনন, নদীতে মাছ অবমুক্তকরণ এবং প্রাকৃতিক পরিবেশে স্বাভাবিক প্রজনন উৎসাহিত করার কর্মসূচি শুরু হয় জোরেসোরে।

 


২০২২ সালের শেষ দিকে একাধিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইয়াংজি স্টার্জনের বন্য পরিবেশে প্রজনন ঘটানোর লক্ষ্যে পরীক্ষামূলক প্রকল্প শুরু করে। সেই প্রচেষ্টার ফল পাওয়া যায় চলতি বছরের ১৪ এপ্রিল, যখন একটি বৈজ্ঞানিক দল ঘোষণা করে—প্রথমবারের মতো মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই প্রাকৃতিক ডিম পাড়ার স্থানে ইয়াংজি স্টার্জনের ডিম পাড়া এবং সফলভাবে পোনা ফোটার ঘটনা পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।


গবেষকদের মতে, এটি প্রকৃতিতে বিলুপ্ত ঘোষিত একটি প্রজাতির সংখ্যা বৃদ্ধির পথে ঐতিহাসিক অগ্রগতি এবং ইয়াংজি নদীর পরিবেশগত পুনরুদ্ধার ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।


পূর্ব চীন সাগর ফিশারিস গবেষণা কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক চুয়াং পিং জানালেন প্রাকৃতিক প্রজননের এই ঘটনা অত্যন্ত উৎসাহব্যঞ্জক এবং এটি প্রমাণ করে ইয়াংজি নদীর পরিবেশ পুনরুদ্ধার কার্যক্রম ইতিবাচক ফল দিচ্ছে।


তিনি আরও উল্লেখ করেন, শুধু উজান অংশেই ১০০টিরও বেশি বিরল মাছের প্রজাতি রয়েছে, যেগুলো পৃথিবীর অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। তাই ইয়াংজি স্টার্জনের দীর্ঘমেয়াদি পুনরুদ্ধারের জন্য পুরো নদী অববাহিকার বাস্তুতন্ত্রের সুস্থতা নিশ্চিত করা জরুরি বলেও জানান তিনি।


ভবিষ্যতে গবেষকরা ডিম পাড়ার স্থানের পরিবেশগত পরিবর্তন সারা বছর পর্যবেক্ষণ করবেন এবং স্টার্জনের অভিবাসন আচরণ নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাবেন, যাতে প্রাকৃতিক প্রজনন কর্মসূচির সাফল্য বৈজ্ঞানিকভাবে মূল্যায়ন করা যায়। সূত্র: সিএমজি

দেখা পেলাম দুষ্প্রাপ্য চামেলির

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ১০:০৩ এএম
আপডেট: ১৯ জুন ২০২৬, ১০:৩৪ এএম
দেখা পেলাম দুষ্প্রাপ্য চামেলির
মিরপুরে জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে সম্প্রতি ফোটা চামেলি ফুল। ছবি: লেখক

‘গ্রীষ্মকাল, জ্যৈষ্ঠের ত্রিশ তারিখ, সকাল সাতটা সাঁইত্রিশ মিনিট। অবশেষে দেখা হলো চামেলির সঙ্গে। আহা কী শুভ্র স্নিগ্ধ ফুল! তীব্র সুগন্ধে ভরা ফুলের ঝোপটার নিচে দাঁড়িয়ে আমি বিমোহিত হয়ে গেলাম। এক অনাবিল আনন্দে মনটা ভরে উঠল। আহা, কতদিন যে এই ক্ষণটির জন্য অপেক্ষা করেছি!’

গত বসন্ত থেকে প্রতি মাসেই দু-চারবার করে জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে যাই আর চামেলিকে দেখব বলে নার্সারির গেটে কড়া নাড়ি, লতানো ঝোপটার কাছে যাই। প্রতিবারই হতাশ হই। অবশেষে ১২ জুন বৃক্ষবন্ধু আজহার ভাইয়ের একটা পোস্টে চামেলি ফুলের ছবি দেখে ভোর হতেই ছুটে যাই সে ফুল চাক্ষুষ করতে। রোদের তেজ নেই, ফুল সকালেও সতেজ রয়েছে।

কত জায়গায় যে খুঁজেছি চামেলিকে! কিন্তু প্রতিবারই হতাশ হয়ে ফিরে এসেছি। এর আগে রমনা ও বলধায় খুঁজেছি চামেলিকে, দেখা পাইনি। নিসর্গী বিপ্রদাশ বড়ুয়া বলেছিলেন, চামেলি হাউসে (সিরডাপ) চামেলি আছে, এখন সেখানেও নেই। অবশেষে জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের এই সবেধন নীলমণি একটি গাছের চামেলি ফুলকে দেখে নজরুলসংগীতের একটা লাইন মনে পড়ল–‘বনে মোর ফুটেছে হেনা চামেলি যূথী বেলি।’

পাঁচ পাপড়ির ফুলগুলো যেন সদ্যঃস্নাতা রমণী, পবিত্র ও শুভ্র। মিষ্টি গন্ধের নেশায় তার কাছে ছুটে গেলাম। খুব কাছ থেকে এই প্রথম চামেলিকে দেখা। চামেলি ফুলকে একজন সুন্দরী রমণীর সঙ্গে তুলনা করা বোধহয় ভুলই হলো। কেননা, সে তুলনা তো কবি কাজী নজরুল ইসলামই করতে পারেননি। তার একটি গানেই তিনি এ কথা স্বীকার করে লিখেছেন: ‘গোলাপ বেলী যুঁই চামেলী–কোন্ ফুল তারি তুল্ গো/ তার যৌবন-নদী বয় নিরবধি ভাসায়ে দুকূল গো..।’ চামেলির সঙ্গে আর কোনো ফুলের তুলনাই যেন হয় না। চামেলি যেন কবিদের ফুল, এ জন্য এর এক ইংরেজি নাম রাখা হয়েছে পোয়েট’স জেসমিন।

চামেলিকে দেখে মনে হলো, ফুল ও নারী–এর মধ্যে কোনটি বেশি সুন্দর? ফুল যেমন বীজ উৎপাদী, নারী তেমন সন্তান উৎপাদী। দুটিই উর্বরতার প্রতীক। প্রকৃতিকে টিকিয়ে রাখতে এ দুটি সত্তারই প্রয়োজন অনিবার্য, এ দুটির কোনো একটি না থাকলেই এ বিশ্ব সৃষ্টিতে ঘটবে চরম বিশৃঙ্খলা। এসব কথা চিন্তা করতে করতেই ভাবলাম চামেলিকে নিয়ে বাংলা সাহিত্যে কত যে মাতামাতি, সেই চামেলি এখন আমার সামনে ফুটে রয়েছে, লতায় লতায় দোল খাচ্ছে। অবাক হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম। কেননা, চামেলি এ দেশে দুষ্প্রাপ্য ফুল বলে প্রকৃতিবন্ধু মোকারম হোসেন তার বাংলাদেশের পুষ্প-বৃক্ষ লতা-গুল্ম বইয়ে লিখেছেন। সেই দুষ্প্রাপ্য ফুলকে দেখতে পাব ভাবিনি। সঙ্গে ছিলেন আরেক প্রকৃতিবন্ধু সৌমিক। দুজনে তখন চামেলির ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে উঠলাম।

চামেলির আরেক বাংলা নাম জাঁতি। চামেলি জুঁইজাতীয় ফুল হলেও জুঁই ফুলের সঙ্গে এর কিছুটা পার্থক্য আছে। সেটি খুব ভালো করে খেয়াল না করলে চামেলিকেই জুঁই বলে মনে হতে পারে। চামেলি ফুল জুঁই ফুলের চেয়ে বড়, পাপড়ি জুঁই ফুলের চেয়ে লম্বা ও সরু, কিন্তু রং ও সুগন্ধ প্রায় জুঁই ফুলের মতোই, যেন আতরের ঘ্রাণমাখা। প্রধানত গ্রীষ্ম-বর্ষায় ফুল ফোটে।

চামেলি ফুলের উর্দু নাম চাম্বেলী। ধারণা করা হয়, সেই উর্দু নাম কালক্রমে বাংলায় হয়েছে চামেলী বা চামেলি। চামেলি মূলত সংস্কৃত ভাষার মিলগত স্ত্রীবাচক নাম, যা সৌন্দর্য, পবিত্রতা, ভালোবাসা ও সুগন্ধকে প্রকাশ করে। এর ইংরেজি নাম স্প্যানিশ জেসমিন ও রয়্যাল জেসমিন। সব জুঁইজাতীয় ফুলকেই জেসমিন বলা হয়, পার্সি ভাষায় বলে ইয়াসমিন। সেখান থেকেই এর গণগত নাম হয়েছে জেসমিনাম ও প্রজাতিগত নাম Jasminum grandiflorum. গ্র্যান্ডিফ্লোরোম অর্থ ‘মিষ্টি সুগন্ধযুক্ত’, গোত্র ওলিয়েসি।

চামেলি একটি চিরসবুজ কাষ্ঠল লতা। লতার গিঁট থেকে কোনো আকর্ষি বের হয় না। প্রতিটি গিঁটের দুপাশে বিপরীতমুখীভাবে দুটি যৌগিক পক্ষল পাতা জন্মে। পত্রক ডিম্বাকার, ছোট, অগ্রভাগ সরু, চকচকে সবুজ, মসৃণ। বাইতে দিলে এ গাছ ২ থেকে ৩ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। তবে গাছ ছেঁটে ছোট করে রাখা যায়। ফুলের পাপড়ি সাদা, সুগন্ধী ও ফোটা ফুলের বিস্তৃতি প্রায় ৫ সেন্টিমিটার। গাছ কষ্ট সইতে পারে, দিনের প্রখর রোদ ও গরমেও গাছের ক্ষতি হয় না, এমনকি রাতে নিম্ন তাপমাত্রাতেও গাছের কোনো ক্ষতি হয় না। ধীর বৃদ্ধিসম্পন্ন গাছ, বিশেষ করে চারা লাগানোর পর প্রথম দুই বছর পর্যন্ত বাড়ে কম, ভোরে ফুল ফোটে, বেলা বাড়লেই নেতিয়ে যায়। বীজ ও গুটিকলমের মাধ্যমে চারা তৈরি করা যায়।

লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ