কয়েক দিন আগের কথা। সকালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নতুন একটা গাছের খোঁজে নার্সারির ভেতর ঘুরছিলাম। রোদের তীব্রতায় চোখ পুড়ছে। সকালের রোদকে দেখাচ্ছে জন্ডিস রোগীর চোখের মতো হলুদ। নার্সারিতে কাঙ্ক্ষিত সেই গাছ পেলাম না, কিন্তু বলকামিনীগাছে দেখলাম ফুল ফুটেছে। বলকামিনীগাছ ছোট বলের মতো ঝোপালো হয়ে থাকে। পাতাগুলো খুব ক্ষুদ্র। পাতার ফাঁক দিয়ে ছোট্ট ছোট্ট ঘণ্টাকৃতির সাদা ফুল ফুটেছে। সে ফুলেও কি কামিনীর মতো সুরভী ও মধু আছে? তা না হলে ওই ফুলের বুকে অমন সুন্দর হলদে শাড়ি পরে কে নেমে এল? হলুদ প্রজাপতিটাকে যতই দেখছি, ততই মুগ্ধ হচ্ছি। প্রজাপতিটা ডানা চারটিকে ঊর্ধ্বমুখী করে মাতালের মতো বলকামিনীর শুরা পান করে চলেছে। পাশে থেকে কেউ যে ওর এসব দেখে যাচ্ছে, সেদিকে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। মিনিট দুয়েক সে ওভাবে বসে রইল। এরপর ডানাগুলো পতপত করতে করতে উড়ে গেল। এই ফাঁকে আমার যা করার আমি তাই করে নিলাম।
খুব চেনা এ প্রজাপতিটা। এ দেশে প্রায় সর্বত্রই এদের দেখা যায়। কপি ও মুলা খেতেও দেখেছি কয়েকবার। দেহ ও ডানা হলুদ রঙের বলে ওর নামটাই হয়ে গেছে হলুদ প্রজাপতি। বাংলায় ওর আরও একটা পোশাকি নাম আছে, তা হলো ‘তৃণ গোধূম’। এ নামের তাৎপর্য জানি না। মনে হয়, এর ইংরেজি নাম ‘কমন গ্রাস ইয়েলো’ থেকে বাংলায় এই নামকরণ করা হয়েছে। গ্রাস মানে তৃণ বা ঘাস। ইয়েলো মানে হলুদ বা হরিদ্রা। বৈজ্ঞানিক নাম বা প্রজাতি Eurema hecabe, গোত্র পিয়েরিডি।
এ প্রজাপতির রং হলুদ, তবে ডানার দাগগুলো বদলে যায়। বর্ষাকালে পুরুষ প্রজাপতির রং হয় উজ্জ্বল হলুদ ও ওপরের সামনের ডানায় এবং কিনারায় মোটা কালো দাগ বা পাড় দেখা যায়। এই কালো দাগ ডানার তলায় দেখা যায় না। ডানার ওপরে থাকা দাগগুলো সরু, তবে স্ত্রীদের দাগগুলো মোটা। গ্রীষ্ম মৌসুমে এই দাগগুলো সরু হয়ে যায়। এ প্রজাপতির ডানার বিস্তার ৪০ থেকে ৫০ মিলিমিটার। এরা সাধারণত মাটির কাছাকাছি উড়ে বেড়ায়। ওড়ে বেশ ধীরে ধীরে। বিভিন্ন ফুল গাছ, ঝোপঝাড়, পার্ক, অরণ্য প্রভৃতি স্থানে এদের সহজে চোখে পড়ে। ফুল ও স্যাঁতসেঁতে জায়গা এদের খুব পছন্দ। কুঁচ, সোনালু, ধইঞ্চা, খইয়াবাবলা, চাকুন্দে, অমলতাস, বাবলা ইত্যাদি এ প্রজাপতির পোষক গাছ।
ওসব গাছের পাতায় স্ত্রী প্রজাপতি ডিম পাড়ে। এদের দলবদ্ধভাবে প্রজনন করতে দেখা যায়। ডিম মাকু আকৃতির, দুই প্রান্ত চোখা। সেখানেই ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়। বাচ্চারা ওই সব গাছের পাতা খেতে খেতে বড় হয়। এসব বাচ্চা কীড়া অবস্থায় প্রায় ৮ থেকে ১০ দিন থাকে। কীড়া লম্বা, সরু, খসখসে ত্বক, মাথা বড়, ধূসর সবুজ। কীড়াদের শত্রু পাখি। তারা কীড়াদের খেয়ে ফেলে। বোলতা মৌমাছিরা কীড়ার দেহে হুল ফোটায়। এরপর কীড়ার দেহের ভেতর বোলতারা ডিম পাড়ে। বোলতার ডিম ফুটে কীড়ার দেহের ভেতরে যে বাচ্চাগুলো জন্মে, ওরা কীড়ার মাংস খেয়ে মেরে ফেলে। এ ছাড়া কীড়া উলবাচিয়াগণের ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে নষ্ট হয়। যেগুলো শত্রুর হাত থেকে রক্ষা পায়, সেগুলো আশপাশের শুকনো বা মরা ডালে পুত্তলি বা পিউপা হয়ে ঝুলতে থাকে।
জীবনের এই শেষ রূপান্তরে এরা একটা সবুজ রঙের খোলসের মধ্যে গুটিসুটি মেরে ৬ থেকে ১০ দিন প্রায় নিশ্চল থাকে। এরপর সেই খোলসের এক পাশে ফুটো করে পূর্ণাঙ্গ প্রজাপতি হয়ে বেরিয়ে আসে। ঘুম ভাঙার পর আমরা যেমন আড়মোড়া দিই, ওরাও তেমনি ডানার ভাঁজগুলো আড়মোড়া দেওয়ার মতো করে আস্তে আস্তে খুলতে থাকে। এরপর রোদের মধ্যে বের হয় নিজেদের একটু শুকিয়ে নিতে। আর্দ্র ও শুষ্ক মৌসুমে ওদের দুই রকমের চেহারা দেখা যায়। এ প্রজাপতির জীবনচক্র সম্পন্ন হতে ১৫ থেকে ২০ দিন লাগে। বছরে এরা কয়েকবার বংশবৃদ্ধি করে। এ দেশে প্রায় সব জায়গায় সব সময় এদের দেখা যায়। ওদের বিলুপ্তি নিয়ে আপাতত দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই।
লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ
