প্রকৃতিতে এখন শরৎকাল। গত ৪ সেপ্টেম্বর ময়মনসিংহের শশীলজ জাদুঘরের সামনে দিয়ে হাঁটছিলাম। হঠাৎ সড়কের বিপরীত দিকে জেলা পরিষদ ভবনের সামনের রাস্তায় চোখ আটকে গেল। রাধাচূড়াগাছে লালচে ফুল ফুটে রাঙিয়ে দিয়েছে চারদিক। সড়ক অতিক্রম করে ছবি তুলে ফেললাম ঝটপট।
রাধাচূড়া গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ। এরা ৩ থেকে ৬ মিটার পর্যন্ত উঁচু হয়। রাধাচূড়ার শাখা-প্রশাখা মসৃণ ও চকচকে। কৃষ্ণচূড়ার মতোই রাধাচূড়ার ফুলের রং লাল, কমলা ও হলুদ হতে পারে। আর হতে পারে দুটি রঙের মিশ্রণও। কৃষ্ণচূড়া বড় বৃক্ষ আর রাধাচূড়া ছোট ঝোপজাতীয় উদ্ভিদ হওয়ায় সহজেই এদের পার্থক্য করা যায়। রাধাচূড়াগাছে প্রায় সারা বছর ফুল ফোটে। যেন সারা বছর রাধা অপেক্ষা করে তার কৃষ্ণের জন্য। কৃষ্ণচূড়া ফুল ফোটে শুধু তপ্ত গ্রীষ্মে। এটি ক্যারিবিয়ান আইল্যান্ড অব বার্বাডোজের জাতীয় ফুল। ভারতীয় উপমহাদেশে রাধাচূড়ার আগমন আজ থেকে প্রায় ৪০০ বছর আগে। এর অন্য নাম হচ্ছে রত্নগণ্ডি, সিদ্ধেশ্বর।
রাধাচূড়ার বৈজ্ঞানিক নাম Caesalpinia pulcherrima, এটি Fabaceae পরিবারের উদ্ভিদ। ইংরেজিতে এই গুল্ম Peacock Flower, Paradise Flower, Barbados Pride, Flower-fence, Dwarf Poinciana ইত্যাদি নামে পরিচিত। সারা বিশ্বে এই গাছ এমনভাবে ছড়িয়ে গেছে যে এর আদি নিবাস সম্পর্কে সঠিকভাবে বলা কঠিন। অনেকের মতে, এর আদি নিবাস ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং আমেরিকার ক্রান্তীয় অঞ্চল। এই গুল্ম সড়ক বিভাজক, উদ্যানে বা বাগানে লাগানোর উপযোগী। রাধাচূড়ার বৈজ্ঞানিক নামের শেষ অংশ Pulcherrima একটি লাতিন শব্দ। এর অর্থ সবচেয়ে সুন্দর। রঙিন, সুন্দর ফুলের জন্য মৌমাছি, প্রজাপতি এবং হামিংবার্ডের কাছে রাধাচূড়া খুব প্রিয়।
রাধাচূড়ার পাতা দ্বিপক্ষল যৌগিক। পাতা ২০ থেকে ৪০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা এবং ১০ থেকে ১৫ মিলিমিটার চওড়া হয়। পুষ্পস্তবক প্রায় ২০ সেন্টিমিটার দীর্ঘ। প্রতিটি ফুলে পাঁচটি করে পাপড়ি থাকে। একটি পাপড়ি অন্য চারটি থেকে দৃশ্যমানভাবে আলাদা। ফুল ঝরে গেলে ফুল থেকে শিমের মতো দেখতে লম্বা ফল হয়। শিম, রাধাচূড়া, কৃষ্ণচূড়া একই গোত্রের সদস্য। রাধাচূড়ার ফল কাঁচা অবস্থায় সবুজ এবং পরিপক্ব অবস্থায় গাঢ় খয়েরি রং ধারণ করে। ফলগুলো ৬ থেকে ১২ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। ফলের ভেতর এক বা একাধিক বীজ থাকতে পারে। বীজ থেকে খুব সহজেই রাধাচূড়ার বংশবিস্তার করা যায়। রাধাচূড়ার বীজ বিষাক্ত।
এই উদ্ভিদের ফুল, পাতা ও বীজ ভারতে ভেষজ ওষুধ তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। রাধাচূড়ার ফুল গরম পানিতে দিয়ে সেদ্ধ করে সেই পানি থেকে যে বাষ্প ওপরে ওঠে তা নাক-মুখ দিয়ে গ্রহণ করলে পুরোনো সর্দি, কাশি, হাঁপানি ও ম্যালেরিয়া জ্বর থেকে আরোগ্য পাওয়া যায়।
লেখক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, মুমিনুন্নিসা সরকারি মহিলা কলেজ, ময়মনসিংহ
