ঢাকা ৭ আষাঢ় ১৪৩৩, রোববার, ২১ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
তিউনিসিয়াকে উড়িয়ে নকআউটের আশা বাঁচিয়ে রাখল জাপান বদলির সাড়ে চার মাসেও দায়িত্বভার হস্তান্তরে গড়িমসি ইউএইচএফপিওর ইরাক ম্যাচের আগে ছোটখাটো পরিবর্তনের পথে ফ্রান্স শিশু গৃহকর্মীর মৃত্যু: রিমান্ডে প্রকৌশলী সবিবুর ও তার স্ত্রী নিউমার্কেটে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মিছিল, আটক ৪ শাহজালালের তৃতীয় টার্মিনাল উদ্বোধন চলতি বছরেই: বিমানমন্ত্রী রূপগঞ্জে আন্তর্জাতিক ইয়োগা দিবস পালিত প্রোগ্রামিং ভাষা অধ্যায়ের ১৬টি বহুনির্বাচনি প্রশ্ন ও উত্তর, ৯ম পর্ব, এইচএসসির তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি জার্মানদের ওপর চটেছেন আইভরি কোস্টের কোচ নবীগঞ্জে ট্রাকচাপায় অটোচালক নিহত, সড়ক অবরোধ লন্ডনে হাসনাত আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধে মামলা শান্তি আলোচনায় অংশ নিতে সুইজারল্যান্ডে জেডি ভ্যান্স ভোগান্তি থেকে রক্ষা পেতে চাহিদা বাড়ছে ই-বাইকের বেফাঁস মন্তব্যে প্রত্যাহার কেএমপির অতিরিক্ত কমিশনার গাজায় ইসরায়েলি হামলায় আল জাজিরার ক্যামেরাম্যান নিহত পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক বাইক হবে আগামীর স্মার্ট বাহন টিভিতে আজকের খেলা প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়া সফরে যাচ্ছেন বিকেলে বাজেটে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর স্বার্থ প্রতিফলিত হয়েছে: সমাজকল্যাণ মন্ত্রী প্রথমার্ধে ২-০ গোলে এগিয়ে জাপান পেকুয়ায় শ্বশুরবাড়িতে গৃহবধূর রহস্যজনক মৃত্যু তিউনিসিয়া-জাপান ম্যাচে রেফারির কেন বিশেষ পোশাক? গোয়ালন্দে প্রশাসনের ওপর হামলা চালিয়ে আসামিকে ছিনিয়ে নিল মাদক ব্যাবসায়ীরা ৬ষ্ঠ জাতীয় চা পুরস্কার ২০২৬-এ ইস্পাহানির অনন্য অর্জন মোহাম্মদপুরের সন্ত্রাসী ‘মাওরা সোহেল’ গ্রেপ্তার মাদকে জড়িত বিএনপি নেতাকর্মীদের আগে গ্রেপ্তার করুন: এমপি মামুন দিনাজপুরে পুরাতন বইয়ের বাজারে মন্দা, কমেছে পাঠক বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উপলক্ষে নোবিপ্রবিতে উৎসবের আমেজ কুষ্টিয়ায় পাথরবোঝাই ট্রাক উল্টে চালক ও সহকারী নিহত মা-বাবাকে অবহেলা করো না, জাহান্নাম নেমে আসবে পৃথিবীতে!

সৌন্দর্যে অনন্য রাধাচূড়া

প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১০:৪৪ এএম
সৌন্দর্যে অনন্য রাধাচূড়া
ময়মনসিংহের জেলা পরিষদের সামনে রাধাচূড়াগাছ। ছবি: লেখক

প্রকৃতিতে এখন শরৎকাল। গত ৪ সেপ্টেম্বর ময়মনসিংহের শশীলজ জাদুঘরের সামনে দিয়ে হাঁটছিলাম। হঠাৎ সড়কের বিপরীত দিকে জেলা পরিষদ ভবনের সামনের রাস্তায় চোখ আটকে গেল। রাধাচূড়াগাছে লালচে ফুল ফুটে রাঙিয়ে দিয়েছে চারদিক। সড়ক অতিক্রম করে ছবি তুলে ফেললাম ঝটপট।

রাধাচূড়া গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ। এরা ৩ থেকে ৬ মিটার পর্যন্ত উঁচু হয়। রাধাচূড়ার শাখা-প্রশাখা মসৃণ ও চকচকে। কৃষ্ণচূড়ার মতোই রাধাচূড়ার ফুলের রং লাল, কমলা ও হলুদ হতে পারে। আর হতে পারে দুটি রঙের মিশ্রণও। কৃষ্ণচূড়া বড় বৃক্ষ আর রাধাচূড়া ছোট ঝোপজাতীয় উদ্ভিদ হওয়ায় সহজেই এদের পার্থক্য করা যায়। রাধাচূড়াগাছে প্রায় সারা বছর ফুল ফোটে। যেন সারা বছর রাধা অপেক্ষা করে তার কৃষ্ণের জন্য। কৃষ্ণচূড়া ফুল ফোটে শুধু তপ্ত গ্রীষ্মে। এটি ক্যারিবিয়ান আইল্যান্ড অব বার্বাডোজের জাতীয় ফুল। ভারতীয় উপমহাদেশে রাধাচূড়ার আগমন আজ থেকে প্রায় ৪০০ বছর আগে। এর অন্য নাম হচ্ছে রত্নগণ্ডি, সিদ্ধেশ্বর।

রাধাচূড়ার বৈজ্ঞানিক নাম Caesalpinia pulcherrima, এটি Fabaceae পরিবারের উদ্ভিদ। ইংরেজিতে এই গুল্ম Peacock Flower, Paradise Flower, Barbados Pride, Flower-fence, Dwarf Poinciana ইত্যাদি নামে পরিচিত। সারা বিশ্বে এই গাছ এমনভাবে ছড়িয়ে গেছে যে এর আদি নিবাস সম্পর্কে সঠিকভাবে বলা কঠিন। অনেকের মতে, এর আদি নিবাস ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং আমেরিকার ক্রান্তীয় অঞ্চল। এই গুল্ম সড়ক বিভাজক, উদ্যানে বা বাগানে লাগানোর উপযোগী। রাধাচূড়ার বৈজ্ঞানিক নামের শেষ অংশ Pulcherrima একটি লাতিন শব্দ। এর অর্থ সবচেয়ে সুন্দর। রঙিন, সুন্দর ফুলের জন্য মৌমাছি, প্রজাপতি এবং হামিংবার্ডের কাছে রাধাচূড়া খুব প্রিয়।
 
রাধাচূড়ার পাতা দ্বিপক্ষল যৌগিক। পাতা ২০ থেকে ৪০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা এবং ১০ থেকে ১৫ মিলিমিটার চওড়া হয়। পুষ্পস্তবক প্রায় ২০ সেন্টিমিটার দীর্ঘ। প্রতিটি ফুলে পাঁচটি করে পাপড়ি থাকে। একটি পাপড়ি অন্য চারটি থেকে দৃশ্যমানভাবে আলাদা। ফুল ঝরে গেলে ফুল থেকে শিমের মতো দেখতে লম্বা ফল হয়। শিম, রাধাচূড়া, কৃষ্ণচূড়া একই গোত্রের সদস্য। রাধাচূড়ার ফল কাঁচা অবস্থায় সবুজ এবং পরিপক্ব অবস্থায় গাঢ় খয়েরি রং ধারণ করে। ফলগুলো ৬ থেকে ১২ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। ফলের ভেতর এক বা একাধিক বীজ থাকতে পারে। বীজ থেকে খুব সহজেই রাধাচূড়ার বংশবিস্তার করা যায়। রাধাচূড়ার বীজ বিষাক্ত।

এই উদ্ভিদের ফুল, পাতা ও বীজ ভারতে ভেষজ ওষুধ তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। রাধাচূড়ার ফুল গরম পানিতে দিয়ে সেদ্ধ করে সেই পানি থেকে যে বাষ্প ওপরে ওঠে তা নাক-মুখ দিয়ে গ্রহণ করলে পুরোনো সর্দি, কাশি, হাঁপানি ও ম্যালেরিয়া জ্বর থেকে আরোগ্য পাওয়া যায়।

লেখক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, মুমিনুন্নিসা সরকারি মহিলা কলেজ, ময়মনসিংহ

হঠাৎ দেখা নীলমাথা হাঁস

প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬, ০৮:৩০ এএম
আপডেট: ২০ জুন ২০২৬, ০৮:৩২ এএম
হঠাৎ দেখা নীলমাথা হাঁস
রাজশাহী শহরের কাছে পদ্মা নদীর ওপর একটি উড়ন্ত নীলমাথা হাঁসা। ছবি: লেখক

চলতি বছরের ১৬ জানুয়ারি। বিরল শ্যামলা কাঁকাল (Isabelline Wheatear) পাখির সন্ধানে রাজশাহীর চরসাতবাড়িয়ার ডোগার ঘাটে এসেছি পদ্মা নদীর ১০ নম্বর চরে যাওয়ার জন্য। সঙ্গে আছে রাজশাহীর পক্ষী আলোকচিত্রী মারুফ রানা এবং দুই সহযোগীসহ চুয়াডাঙ্গার পাখি ও বন্যপ্রাণীপ্রেমী বখতিয়ার হামিদ। সকাল সাড়ে ৮টায় জাকারুল মাঝি নৌকা ছাড়লেন। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ভারত সীমান্তবর্তী ১০ নম্বর চরে পৌঁছে গেলাম। পথিমধ্যে চখাচখি (Ruddy Shelduck) ও পিয়ং হাঁসের (Gadwall) ঝাঁক ছাড়াও বড় খোঁপা ডুবুরি (Great-crested Grebe), ছোট সাদা বক (Little Egret) ও বিভিন্ন প্রজাতির সৈকত পাখির (Wader) দেখা পেলাম। চরে নামার ১৫ মিনিটের মধ্যে অতি আরাধ্য শ্যামলা কাঁকালের দেখা পেয়ে গেলাম। কিন্তু এর পরও আরও কটি বিরল ও দুর্লভ পাখির খোঁজে দুপুর সোয়া ২টা পর্যন্ত চরে থাকলাম। 

ফিরতি পথে আবারও চখাচখি ও পিয়ং হাঁসের ঝাঁক এবং বড় খোঁপা ডুবুরির দেখা পেলাম। সঙ্গে ধূপনি বক (Grey Heron), বড় জিরিয়া (Grey Plover), বড় বদরকৈতর (Pallas’s Gull) এবং বড় পানকৌড়িও (Great Cormorant) ছিল। ওদের ছবি তুলে প্রায় আধা ঘণ্টায় ডোগার ঘাটের কাছাকাছি আসতেই বিশাল এক হাঁসের ঝাঁকের দেখা মিলল। মিনিট দশেকের মধ্যেই ডোগার ঘাটে পৌঁছাব। কিন্তু চুয়াডাঙ্গা থেকে আসা পক্ষীপ্রেমী বখতিয়ার হামিদ ও তার সঙ্গীরা হাঁসের ঝাঁকের ছবি তুলতে চাওয়ায় নৌকার ইঞ্জিন থামিয়ে মাঝিকে ধীরে ধীরে বৈঠা মেরে ঝাঁকের পিছু নিতে বললাম।

ঝাঁকের প্রায় সবগুলোই ছিল পিয়ং হাঁস। তবে ওদের ভেতর তিনটি ভিন্ন প্রজাতির হাঁসও দেখলাম। লালচে কমলা রঙের চখাচখি, মাথায় কমলা সিঁথির লালশির এবং নীল মাথার এক দুর্লভ হাঁস। আমি ও মারুফ রানা একসঙ্গে প্রায় ১০ বছর পদ্মা নদীর চরে বহুবার ঘুরেও যে হাঁসটিকে খুঁজে পাইনি আজ সেই নীলমাথার হাঁসটি আমাদের চোখের সামনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ফিরতি পথে বিকেলটাই অর্থপূর্ণ হয়ে উঠল। মারুফ রানা পেল একটি নতুন হাঁস। অন্যরা পেল দুটি। আমি যদিও কোনো নতুন হাঁস পেলাম না, কিন্তু সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরের বাইরে এই প্রথম অন্য কোথাও এই হাঁসটির দেখা পেলাম। নীলমাথার এই হাঁসটিকে ১০ বছর আগে ২০১৬-এ সর্বপ্রথম টাঙ্গুয়ার হাওরেই দেখেছিলাম। এর পর থেকে টাঙ্গুয়ার প্রতিটি অভিযানেই ওকে দেখেছি। খুশি মনে ওর বেশ কিছু ছবি তুলে ডোগার ঘাটে ফিরে এলাম।

নীল মাথার সুদর্শন ও দুর্লভ এই পরিযায়ী হাঁসটির নাম নীলমাথা হাঁস বা নীলশির। বৈরাগী হাঁস নামেও পরিচিত। এরাই পুরো বিশ্বের গৃহপালিত হাঁসের পূর্বপুরুষ, যারা এখনো বুনো পরিবেশে প্রচুর সংখ্যায় বেঁচে আছে। ইংরেজি নাম Mallard। অ্যানাটিডি (Anatidae) গোত্রের হাঁসটির বৈজ্ঞানিক নাম Anas platyrhynchos (অ্যানাস প্ল্যাটিরিনকস)। উত্তর গোলার্ধের বিভিন্ন দেশের আবাসিক এই হাঁসকে দক্ষিণ আমেরিকা ও এশিয়াও দেখা যায়। শীতে পরিযায়ী হয়ে স্বল্পসংখ্যক হাঁস এ দেশে আসে।

নীলমাথা হাঁসের দেহের দৈর্ঘ্য ৫০-৬৫ সেন্টিমিটার। ওজনে হাঁসা ও হাঁসি যথাক্রমে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ ও ৭৯০ থেকে ১ হাজার ৩৫০ গ্রাম। হাঁসা ও হাঁসি দেখতে একেবারেই আলাদা, যদিও দুটিরই ডানায় গাঢ় নীল বন্ধনী থাকে। প্রজননকালীন হাঁসার মাথা ও ঘাড় ধাতব সবুজ, সূর্যের আলোয় যা চিকচিক করে। গলায় থাকে সাদা মালা। পালকের রং গাঢ় ধূসর, পেট হালকা, বুক বেগুনি-বাদামি এবং কালো লেজের মাঝখানের কয়েকটি পালক ওপরের দিকে বাঁকানো। ঠোঁট হলুদ ও পা কমলা। প্রজননকাল বাদে অন্য সময় হাঁসার পালকের রং অনেকটাই হাঁসির মতো হয়ে যায়। হাঁসির পুরো দেহ বাদামি, তার ওপর থাকে গাঢ় বাদামি ও হালকা হলদে দাগছোপ। হাঁসা-হাঁসি নির্বিশেষে চোখ বাদামি, চঞ্চু কালচে কমলা, পা ও পায়ের পাতা কমলা-হলুদ থেকে প্রবাল-লাল। অপ্রাপ্তবয়স্কগুলো দেখতে হাঁসির মতো।

মূল আবাস এলাকায় নীলমাথা হাঁস অগভীর হ্রদ, নদী, পুকুর ও উদ্যানে সচরাচর ঝাঁক বেঁধে ঘুরে বেড়ায়। শীতে এ দেশের সিলেট, বরিশাল ও ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন হাওর ও বিলে বিচরণ করতে দেখা যায়। পানিতে মাথা ডুবিয়ে জলজ লতাপাতা, ঘাস, বিচি, শামুক-গুগলি, ব্যাঙাচি, পোনা মাছ, কেঁচো ইত্যাদি খুঁজে খায়। হাঁসা নিচু স্বরে ‘ওয়াক-ওয়াক-ওয়াক…’ বা ‘মেক-মেক-মেক…’ এবং হাঁসি উচ্চস্বরে ‘কোয়াক-কোয়াক-কোয়াক…’ শব্দে ডাকে।

এপ্রিল থেকে জুলাই এদের প্রজননকাল। প্রজননের পর পরই হাঁসা অন্যত্র চলে যায়। কাজেই বাসা বানানো, ডিমে তা দেওয়া, ছানাদের যত্ন নেওয়া ইত্যাদি সবকিছু হাঁসিকেই একা একা করতে হয়। প্রজনন এলাকায় পানির কাছাকাছি মাটিতে ঘাস ও লতাপাতা দিয়ে হাঁসি বাসা বানায় ও তার ওপর বুকের পালক বিছিয়ে দেয়। ডিম পাড়ে ৬ থেকে ১৩টি। ডিমের রং ফ্যাকাশে সবুজাভ, নীলচে বা ঘিয়ে সাদা। ডিম ফোটে ২৬-২৮ দিনে। ছানারা মায়ের সঙ্গে প্রায় দুই মাস থাকে। চার মাস বয়সে ওরা উড়তে শেখে ও এক বছরে বয়ঃপ্রাপ্ত হয়। আয়ুষ্কাল ছয়-সাত বছর।

লেখক: পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর 

ইয়াংজির বুনো পরিবেশেই হচ্ছে স্টার্জন মাছের প্রজনন

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ০৬:২৩ পিএম
ইয়াংজির বুনো পরিবেশেই হচ্ছে স্টার্জন মাছের প্রজনন
স্টার্জন মাছ।

চীনের সিছুয়ান প্রদেশের চিয়াং’আন কাউন্টিতে ইয়াংজি নদীর উজান অংশে ইয়াংজি স্টার্জন মাছকে ঘিরে রচিত হচ্ছে আশাব্যঞ্জক নতুন অধ্যায়। সেখানে এখন বুনো পরিবেশেই এ মাছের প্রজনন ঘটে চলেছে। 


ইয়াংজি স্টার্জন হলো পৃথিবীর প্রাচীনতম মেরুদণ্ডী প্রাণীগুলোর একটি। ডাইনোসরদের যুগেও এরা ছিল। এখন শুধু ইয়াংজি নদী অববাহিকায় পাওয়া এই মাছ চীনের প্রথম শ্রেণির জাতীয় সুরক্ষাপ্রাপ্ত বন্যপ্রাণী হিসেবে তালিকাভুক্ত।


২০২২ সালের জুলাইয়ে আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সুরক্ষা ইউনিয়ন ইয়াংজি স্টার্জনকে প্রকৃতিতে বিলুপ্ত ঘোষণা করেছিল। এরপর থেকে চীন এই বিরল প্রজাতি রক্ষায় ব্যাপক উদ্যোগ নেয়। এরপরই এ মাছটি ধরায় নিষেধাজ্ঞা, আইনগত সুরক্ষা, কৃত্রিম প্রজনন, নদীতে মাছ অবমুক্তকরণ এবং প্রাকৃতিক পরিবেশে স্বাভাবিক প্রজনন উৎসাহিত করার কর্মসূচি শুরু হয় জোরেসোরে।

 


২০২২ সালের শেষ দিকে একাধিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইয়াংজি স্টার্জনের বন্য পরিবেশে প্রজনন ঘটানোর লক্ষ্যে পরীক্ষামূলক প্রকল্প শুরু করে। সেই প্রচেষ্টার ফল পাওয়া যায় চলতি বছরের ১৪ এপ্রিল, যখন একটি বৈজ্ঞানিক দল ঘোষণা করে—প্রথমবারের মতো মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই প্রাকৃতিক ডিম পাড়ার স্থানে ইয়াংজি স্টার্জনের ডিম পাড়া এবং সফলভাবে পোনা ফোটার ঘটনা পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।


গবেষকদের মতে, এটি প্রকৃতিতে বিলুপ্ত ঘোষিত একটি প্রজাতির সংখ্যা বৃদ্ধির পথে ঐতিহাসিক অগ্রগতি এবং ইয়াংজি নদীর পরিবেশগত পুনরুদ্ধার ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।


পূর্ব চীন সাগর ফিশারিস গবেষণা কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক চুয়াং পিং জানালেন প্রাকৃতিক প্রজননের এই ঘটনা অত্যন্ত উৎসাহব্যঞ্জক এবং এটি প্রমাণ করে ইয়াংজি নদীর পরিবেশ পুনরুদ্ধার কার্যক্রম ইতিবাচক ফল দিচ্ছে।


তিনি আরও উল্লেখ করেন, শুধু উজান অংশেই ১০০টিরও বেশি বিরল মাছের প্রজাতি রয়েছে, যেগুলো পৃথিবীর অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। তাই ইয়াংজি স্টার্জনের দীর্ঘমেয়াদি পুনরুদ্ধারের জন্য পুরো নদী অববাহিকার বাস্তুতন্ত্রের সুস্থতা নিশ্চিত করা জরুরি বলেও জানান তিনি।


ভবিষ্যতে গবেষকরা ডিম পাড়ার স্থানের পরিবেশগত পরিবর্তন সারা বছর পর্যবেক্ষণ করবেন এবং স্টার্জনের অভিবাসন আচরণ নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাবেন, যাতে প্রাকৃতিক প্রজনন কর্মসূচির সাফল্য বৈজ্ঞানিকভাবে মূল্যায়ন করা যায়। সূত্র: সিএমজি

দেখা পেলাম দুষ্প্রাপ্য চামেলির

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ১০:০৩ এএম
আপডেট: ১৯ জুন ২০২৬, ১০:৩৪ এএম
দেখা পেলাম দুষ্প্রাপ্য চামেলির
মিরপুরে জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে সম্প্রতি ফোটা চামেলি ফুল। ছবি: লেখক

‘গ্রীষ্মকাল, জ্যৈষ্ঠের ত্রিশ তারিখ, সকাল সাতটা সাঁইত্রিশ মিনিট। অবশেষে দেখা হলো চামেলির সঙ্গে। আহা কী শুভ্র স্নিগ্ধ ফুল! তীব্র সুগন্ধে ভরা ফুলের ঝোপটার নিচে দাঁড়িয়ে আমি বিমোহিত হয়ে গেলাম। এক অনাবিল আনন্দে মনটা ভরে উঠল। আহা, কতদিন যে এই ক্ষণটির জন্য অপেক্ষা করেছি!’

গত বসন্ত থেকে প্রতি মাসেই দু-চারবার করে জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে যাই আর চামেলিকে দেখব বলে নার্সারির গেটে কড়া নাড়ি, লতানো ঝোপটার কাছে যাই। প্রতিবারই হতাশ হই। অবশেষে ১২ জুন বৃক্ষবন্ধু আজহার ভাইয়ের একটা পোস্টে চামেলি ফুলের ছবি দেখে ভোর হতেই ছুটে যাই সে ফুল চাক্ষুষ করতে। রোদের তেজ নেই, ফুল সকালেও সতেজ রয়েছে।

কত জায়গায় যে খুঁজেছি চামেলিকে! কিন্তু প্রতিবারই হতাশ হয়ে ফিরে এসেছি। এর আগে রমনা ও বলধায় খুঁজেছি চামেলিকে, দেখা পাইনি। নিসর্গী বিপ্রদাশ বড়ুয়া বলেছিলেন, চামেলি হাউসে (সিরডাপ) চামেলি আছে, এখন সেখানেও নেই। অবশেষে জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের এই সবেধন নীলমণি একটি গাছের চামেলি ফুলকে দেখে নজরুলসংগীতের একটা লাইন মনে পড়ল–‘বনে মোর ফুটেছে হেনা চামেলি যূথী বেলি।’

পাঁচ পাপড়ির ফুলগুলো যেন সদ্যঃস্নাতা রমণী, পবিত্র ও শুভ্র। মিষ্টি গন্ধের নেশায় তার কাছে ছুটে গেলাম। খুব কাছ থেকে এই প্রথম চামেলিকে দেখা। চামেলি ফুলকে একজন সুন্দরী রমণীর সঙ্গে তুলনা করা বোধহয় ভুলই হলো। কেননা, সে তুলনা তো কবি কাজী নজরুল ইসলামই করতে পারেননি। তার একটি গানেই তিনি এ কথা স্বীকার করে লিখেছেন: ‘গোলাপ বেলী যুঁই চামেলী–কোন্ ফুল তারি তুল্ গো/ তার যৌবন-নদী বয় নিরবধি ভাসায়ে দুকূল গো..।’ চামেলির সঙ্গে আর কোনো ফুলের তুলনাই যেন হয় না। চামেলি যেন কবিদের ফুল, এ জন্য এর এক ইংরেজি নাম রাখা হয়েছে পোয়েট’স জেসমিন।

চামেলিকে দেখে মনে হলো, ফুল ও নারী–এর মধ্যে কোনটি বেশি সুন্দর? ফুল যেমন বীজ উৎপাদী, নারী তেমন সন্তান উৎপাদী। দুটিই উর্বরতার প্রতীক। প্রকৃতিকে টিকিয়ে রাখতে এ দুটি সত্তারই প্রয়োজন অনিবার্য, এ দুটির কোনো একটি না থাকলেই এ বিশ্ব সৃষ্টিতে ঘটবে চরম বিশৃঙ্খলা। এসব কথা চিন্তা করতে করতেই ভাবলাম চামেলিকে নিয়ে বাংলা সাহিত্যে কত যে মাতামাতি, সেই চামেলি এখন আমার সামনে ফুটে রয়েছে, লতায় লতায় দোল খাচ্ছে। অবাক হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম। কেননা, চামেলি এ দেশে দুষ্প্রাপ্য ফুল বলে প্রকৃতিবন্ধু মোকারম হোসেন তার বাংলাদেশের পুষ্প-বৃক্ষ লতা-গুল্ম বইয়ে লিখেছেন। সেই দুষ্প্রাপ্য ফুলকে দেখতে পাব ভাবিনি। সঙ্গে ছিলেন আরেক প্রকৃতিবন্ধু সৌমিক। দুজনে তখন চামেলির ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে উঠলাম।

চামেলির আরেক বাংলা নাম জাঁতি। চামেলি জুঁইজাতীয় ফুল হলেও জুঁই ফুলের সঙ্গে এর কিছুটা পার্থক্য আছে। সেটি খুব ভালো করে খেয়াল না করলে চামেলিকেই জুঁই বলে মনে হতে পারে। চামেলি ফুল জুঁই ফুলের চেয়ে বড়, পাপড়ি জুঁই ফুলের চেয়ে লম্বা ও সরু, কিন্তু রং ও সুগন্ধ প্রায় জুঁই ফুলের মতোই, যেন আতরের ঘ্রাণমাখা। প্রধানত গ্রীষ্ম-বর্ষায় ফুল ফোটে।

চামেলি ফুলের উর্দু নাম চাম্বেলী। ধারণা করা হয়, সেই উর্দু নাম কালক্রমে বাংলায় হয়েছে চামেলী বা চামেলি। চামেলি মূলত সংস্কৃত ভাষার মিলগত স্ত্রীবাচক নাম, যা সৌন্দর্য, পবিত্রতা, ভালোবাসা ও সুগন্ধকে প্রকাশ করে। এর ইংরেজি নাম স্প্যানিশ জেসমিন ও রয়্যাল জেসমিন। সব জুঁইজাতীয় ফুলকেই জেসমিন বলা হয়, পার্সি ভাষায় বলে ইয়াসমিন। সেখান থেকেই এর গণগত নাম হয়েছে জেসমিনাম ও প্রজাতিগত নাম Jasminum grandiflorum. গ্র্যান্ডিফ্লোরোম অর্থ ‘মিষ্টি সুগন্ধযুক্ত’, গোত্র ওলিয়েসি।

চামেলি একটি চিরসবুজ কাষ্ঠল লতা। লতার গিঁট থেকে কোনো আকর্ষি বের হয় না। প্রতিটি গিঁটের দুপাশে বিপরীতমুখীভাবে দুটি যৌগিক পক্ষল পাতা জন্মে। পত্রক ডিম্বাকার, ছোট, অগ্রভাগ সরু, চকচকে সবুজ, মসৃণ। বাইতে দিলে এ গাছ ২ থেকে ৩ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। তবে গাছ ছেঁটে ছোট করে রাখা যায়। ফুলের পাপড়ি সাদা, সুগন্ধী ও ফোটা ফুলের বিস্তৃতি প্রায় ৫ সেন্টিমিটার। গাছ কষ্ট সইতে পারে, দিনের প্রখর রোদ ও গরমেও গাছের ক্ষতি হয় না, এমনকি রাতে নিম্ন তাপমাত্রাতেও গাছের কোনো ক্ষতি হয় না। ধীর বৃদ্ধিসম্পন্ন গাছ, বিশেষ করে চারা লাগানোর পর প্রথম দুই বছর পর্যন্ত বাড়ে কম, ভোরে ফুল ফোটে, বেলা বাড়লেই নেতিয়ে যায়। বীজ ও গুটিকলমের মাধ্যমে চারা তৈরি করা যায়।

লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ

সবুজ পাতায় সাদা ফুলের গালিচা

প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৬, ০৮:২২ এএম
সবুজ পাতায় সাদা ফুলের গালিচা
ময়মনসিংহের কাচারিঘাটের নার্সারিতে ফোটা সাদা পর্তুলাকা ফুল ছবি: লেখক

পর্তুলাকা আমাদের কাছে মূলত ‘টাইম ফুল’ বা ‘নাইন ও-ক্লক’ হিসেবে বেশি পরিচিত। এর সাদা রঙের জাতটি বাগানের সৌন্দর্য বর্ধনে এবং ভেষজ চিকিৎসায় এক অনন্য স্থান দখল করে আছে। এর বৈজ্ঞানিক নাম Portulaca Oleracea, এটি Portulacaceae পরিবারের বীরুৎ। এটি সাধারণত একবর্ষজীবী বা বহুবর্ষজীবী রসালো প্রকৃতির লতানো উদ্ভিদ। অনেকের কাছে এই ফুল ‘মস রোজ’ নামে পরিচিত। 

সাদা পর্তুলাকা দেখতে অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং এর শারীরিক গঠন শুষ্ক পরিবেশেও টিকে থাকার জন্য বিশেষভাবে অভিযোজিত। এর কাণ্ড নরম, মাংসল ও রসালো এবং মাটির বুক ঘেঁষে লতানো প্রকৃতির হয়ে থাকে। কাণ্ড সাধারণত মসৃণ এবং সবুজ বা হালকা লালচে-বেগুনি রঙের হয়।
পাতাগুলো আকারে ছোট, পুরু, চামড়ার মতো মসৃণ এবং রসালো। এগুলো কাণ্ডের সঙ্গে পর্যায়ক্রমিক বা বিপরীতমুখীভাবে সাজানো থাকে। পাতাগুলো পানি ধরে রাখতে পারে যা উদ্ভিদটিকে খরাসহিষ্ণু করে তোলে।

এর প্রধান আকর্ষণ হলো এর ধবধবে সাদা ফুল। ফুলগুলো সাধারণত ডালের একদম মাথায় গুচ্ছ আকারে ফোটে। এতে ৫টি নরম পাপড়ি থাকে এবং মাঝখানে হলুদ রঙের পুংকেশর দৃশ্যমান হয়, যা সাদা পাপড়ির মাঝে এক অপূর্ব বৈপরীত্য তৈরি করে। এই ফুলের সবচেয়ে মজার বৈশিষ্ট্য হলো এর ফোটার সময়। সাধারণত কড়া রোদ না উঠলে এই ফুল ফোটে না। সকাল ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে ফুলগুলো পূর্ণতা পায় এবং বিকেল হতেই আবার বুজে যায়। এই কারণেই একে ‘টাইম ফুল’ বলা হয়।

ফুল শুকিয়ে যাওয়ার পর সেখানে ছোট ছোট ডিম্বাকার ক্যাপসুল বা ফল তৈরি হয়। এই ফলের ভেতর অসংখ্য ক্ষুদ্র, কালচে বা ধূসর রঙের বীজ থাকে। বাতাসের মাধ্যমে বা মাটিতে পড়ে এই বীজ থেকেই খুব সহজে নতুন চারা গজায়।

সাধারণত আমরা একে কেবলই শোভাবর্ধনকারী উদ্ভিদ মনে করলেও, এর রয়েছে নানাবিধ পুষ্টি ও ঔষধি গুণ। অন্যান্য পর্তুলাকা ফুলের মতো সাদা পর্তুলাকার রয়েছে নান্দনিক ও উদ্যানতাত্ত্বিক গুরুত্ব। সাদা পর্তুলাকা খুব কম পরিচর্যাতেই ঘন হয়ে চমৎকার একঝাঁক সাদা ফুলের গালিচা তৈরি করতে পারে। বারান্দার ঝুলন্ত টবে বা ছাদবাগানের রক গার্ডেনে এই লতানো গাছটি লাগালে তা দেখতে অত্যন্ত সুন্দর লাগে। তীব্র খরা বা কড়া রোদেও এই গাছ মরে না। ফলে ব্যস্ত মানুষের বাগানের জন্য এটি একটি আদর্শ উদ্ভিদ।

সাদা পর্তুলাকার রয়েছে কিছু ভেষজ গুণ। পর্তুলাকা বা পার্সলেন উদ্ভিদে প্রচুর পরিমাণে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড পাওয়া যায়, যা হৃদযন্ত্রের সুরক্ষায় অত্যন্ত কার্যকরী। এতে রয়েছে ভিটামিন-এ, ভিটামিন-সি এবং ভিটামিন-ই, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং ত্বকের বার্ধক্য রোধে সাহায্য করে। ঐতিহ্যগত চিকিৎসায় এর রস পেটের অসুখ, আমাশয় এবং লিভারের নানাবিধ সমস্যায় পথ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এ গাছের রস পোকা-মাকড়ের কামড়, হালকা পুড়ে যাওয়া বা ত্বকের অ্যালার্জি দূর করতে বাহ্যিকভাবে ব্যবহার করা হয়।

এর উজ্জ্বল হলুদ পুংকেশর ও সাদা পাপড়ি মৌমাছি, প্রজাপতি এবং অন্যান্য পরাগায়নকারী কীটপতঙ্গকে তীব্রভাবে আকর্ষণ করে, যা আশপাশের পরিবেশের পরাগায়নে সহায়তা করে। লতানো স্বভাবের কারণে এটি মাটির উপরিভাগ দ্রুত ঢেকে ফেলে, যা তীব্র রোদে মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখতে এবং মাটির ক্ষয় রোধ করতে সাহায্য করে।

সাদা পর্তুলাকা শুধু একটি সাধারণ ফুলগাছই নয়, বরং এটি প্রকৃতি, স্বাস্থ্য এবং সৌন্দর্যের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ। স্বল্প যত্নে বেশি আনন্দ পেতে আপনার ঘরের বারান্দা বা ছাদবাগানে অনায়াসেই এই গাছের জায়গা হতে পারে।

লেখক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, মুমিনুন্নিসা সরকারি মহিলা কলেজ, ময়মনসিংহ।

চমৎকার জয়ফুল মথ

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬, ০৮:৪০ এএম
আপডেট: ১৫ জুন ২০২৬, ০৮:৪৯ এএম
চমৎকার জয়ফুল মথ
খুলনার দৌলতপুরে সম্প্রতি দেখা জয়ফুল মথ।

জ্যৈষ্ঠ মাসে সাধারণত প্রচণ্ড গরম পড়ে। তবে এ বছরের ৩০ মে ভোরবেলাটা অন্যরকম লাগছিল। মেঘমাখা রোদ্দুর আর বিস্তীর্ণ পাটখেতের গাছগুলোর হাওয়া, তার পাশের আইল দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় যেন এক আলাদা প্রশান্তি পাচ্ছিলাম। পাটগাছগুলো আমার বুক বা মাথা সমান লম্বা হয়েছে, কোনো কোনো গাছের ডগার পাতাগুলো ডিঙি নৌকার মতো কুঁকড়ে গেছে।

কাছে গিয়ে কিসে এমন হলো তা পরখ করতে দাঁড়িয়ে পড়লাম। অনুমান, পাটের লাল মাকড়ই পাটগাছের এ দশা করেছে। তবু না দেখে বিশ্বাস নেই। পাতা উল্টে দেখার চেষ্টা করলাম। নাহ্, মাকড়রা এত ক্ষুদ্র হয় যে সেগুলো আতশ কাচ দিয়ে দেখা ছাড়া বোঝার উপায় নেই। কিছু সাদাটে আঁশের মতো দেখতে পেলাম। তাতে অনুমান সত্য বলে মনে হলো। আরও কোনো পোকামাকড় পাটগাছে পাই কি না, তা খুঁজতে লাগলাম। 

ডগায় একটি বড় বাদামি রঙের কেড়ি পোকার দেখা পেলাম। ওরা বোধ হয় ভালো দেখতে পায়। কিছুতেই নিজেকে আড়ালে রাখতে ছাড়ছে না। আমি যতই তার কাছে গিয়ে ছবি তোলার চেষ্টা করি, ততই সে স্থান বদলায়। ফোকাসই করতে পারছিলাম না। দু-একটি ছবি তুলে শেষে হাল ছাড়তে হলো। কেননা ওটা হঠাৎ টুপ করে লাফ দিয়ে নিচে পড়ে হারিয়ে গেল। ওটাকে খুঁজতে গিয়েই খুলনার দৌলতপুর কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের বিশাল পাটখেতের মধ্যে ঘাগড়া আগাছার পাতার ওপর দেখতে পেলাম আরেকটি পোকাকে।

পোকাটি এত্ত ছোট যে কেউ ভালো করে খেয়াল না করলে তাকে দেখাই যায় না। লম্বা আধা সেন্টিমিটারের চেয়ে একটু বেশি হতে পারে, তবে এক সেন্টিমিটার হবে না। কিন্তু পোকাটির রং-রূপ আমাকে মুগ্ধ করল। এত ক্ষুদ্র একটি পোকার দেহে প্রকৃতির কোন শিল্পী এত রূপ দিয়েছে? বিস্ময়কর! 

কালচে বাদামি পাখার ওপর হলদে-সাদা কয়েকটি ফোঁটা, প্রাকৃতিক রংগুলোর এমন সামঞ্জস্যপূর্ণ মিল বা ম্যাচিং ফুল, কুঁড়ি ও পাতায় বহুবার দেখেছি। কিন্তু পোকার ক্ষেত্রে এটি যেন আমার কাছে আরও বেশি বিস্ময়কর বলে মনে হয়।

জানি যে ওদের এই আকর্ষণীয় রং ও চেহারা রাখতে হয় সাথিকে মিলনে আমন্ত্রণের জন্য, কেউ কেউ আবার নেচে নেচে সে আমন্ত্রণ জানায়, আবার কেউ আমন্ত্রণ জানায় গা থেকে বিশেষ একধরনের ঘ্রাণ বাতাসে ছেড়ে। মেয়েরা যেমন সাজুগুজুর পর পারফিউম স্প্রে করে বের হয়, অনেকটা তেমনই। পোকাদের এ বিস্ময়কর জগৎ দেখা ও অনুভব করার মজাটাই আলাদা।

যাহোক, নিচু হয়ে পাটখেতের মধ্যেই বসে পড়লাম সে নকশাদার ডানার সুন্দরীকে ভালো করে দেখার আশায়। পাখার ওপরে ফোঁটাগুলোর মধ্যে তিনটি একটু বড় ও পাখার ওপরের দিকে ত্রিভুজাকারে সজ্জিত, পাখার পেছনের দিকে আবার কয়েকটি ফোঁটা সারি করে সাজানো। পাখার পেছন প্রান্ত ঝালরের মতো। এবার এ পোকাটি আর আমাকে নিরাশ করল না, স্থির হয়ে ঘাগড়া পাতার ওপর বেশ কিছুক্ষণ বসে রইল। আমিও আনন্দের সঙ্গে ওর বেশ কিছু ছবি তুলে নিলাম।

পোকাটির চেহারা দেখে একবার ভেবেছিলাম স্পিটল বাগ বা থুতু পোকা। কিন্তু আকার ও পাখার রঙের সঙ্গে থুতু পোকার কিছুটা মিল থাকলেও পাখার দাগ, মাথা, মুখ–এসবের মিল নেই। তাই বাড়ি ফিরে বসলাম সেই অচেনা পোকাটিকে চেনার জন্য।

গুগল পণ্ডিতের সাহায্যে জানতে পেলাম ওর বংশ-পরিচয়, এমনকি নামও। ওই খুদে পোকাটি সাইথ্রিডিডি গোত্রের ইরেটমোচেরা গণের একটি মথজাতীয় পোকা, বর্গ লেপিডোপ্টেরা। প্রজাতিগত নাম পেলাম Eretmocera impactella, ইংরেজি নাম জয়ফুল মথ বা ফ্লাওয়ার মথ। 

জানা গেল এটি একটি ক্ষতিকর পোকা, বিশেষ করে ডাঁটা ও লালশাকের। বথুয়া, হেলেঞ্চা, নটেশাকও এ পোকার আশ্রয়দাতা। বহুদিন আগে একবার ভুট্টাপাতায় একে চোখে পড়েছিল, জানি না সে গাছের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক আছে কি না। এ পোকার বাচ্চারা এসব গাছের পাতা খায়। খাওয়ার আগে মুখের লালার সুতো দিয়ে পাতা মুড়ে ফেলে, তার ভেতরে বসে কুরে কুরে পাতা খায়। চলার সময় ওরা বেশ কায়দা করে হাঁটে। সামনে যেতে সমস্যা মনে হলে হামাগুড়ি দিয়ে হাঁটার মতো খানিকটা পেছনে যায়, আবার সামনে আসে। ওদের প্রায়ই মিলনরত অবস্থায় পাতার ওপর বসে থাকতে দেখা যায়।

এ পোকাটি দেখা যায় এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে। বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড, তাইওয়ান ও ওমানে এ পোকা আছে। এ দেশে এটি একটি আবাসিক পোকা, বিক্ষিপ্তভাবে এদের দেখা যায়। আলোতে এরা প্রবলভাবে আকৃষ্ট হয়। দিনের বেলায় এরা চলাচল করে।