এ বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় আমার কর্মস্থল গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঢাকার জিগাতলার বাসায় ফিরছি। গাড়ি থেকে নেমে খানিকটা হেঁটে জিগাতলা মিষ্টির দোকানের মোড় পেরোতেই হঠাৎ চোখ আটকে গেল বিচিত্র এক প্রাণীর দিকে। প্রাণীটিকে ঢাকায় এভাবে দেখব ভাবতেই পারিনি। কারণ এটি কোনো সাধারণ প্রাণী নয়, সবখানে দেখা যায় না। দেখতে কতকটা বাইসনের মতো।
প্রাণীটিকে প্রথম দর্শনে হতবিহ্বল হয়ে একদৃষ্টিতে ওর দিকে কতক্ষণ তাকিয়ে ছিলাম জানি না। ধাতস্থ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মোবাইল ক্যামেরায় ওর ছবি তুললাম। মনে পড়ে গেল তেরো বছর আগে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়িতে দেখা একই প্রজাতির প্রাণীগুলোর কথা। নাইক্ষ্যংছড়িতে অবস্থিত বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিএলআরআই) গয়াল প্রজনন খামার ও গবেষণা কেন্দ্রের তৎকালীন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও বর্তমানে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. উদয় কুমার মোহন্তর আমন্ত্রণে ওখানে বেড়াতে যাই। সেখানেই প্রাণীগুলোকে প্রথম দেখি। পাহাড়ি এই প্রাণীটির বিভিন্ন দিক নিয়ে সেখানে গবেষণা চলছিল।
বাংলাদেশের বান্টেং (Bos banteng) বা সাপিবালি নামে এক প্রজাতির বনগরু হারিয়ে গেছে ৬৫-৭৫ বছর আগে। আবার অনেকেই জানেন যে, এ দেশের আরেক প্রজাতির বনগরু অর্থাৎ গাউর (Bos gaurus) হারিয়ে গেছে সেই কবে? একদা উত্তরের শালবন থেকে টেকনাফ পর্যন্ত চিরসবুজ বনে এরা বেঁচে ছিল। সূত্রমতে, সর্বশেষ গাউরটি ১৯৭১-এ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে মারা পড়ে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, গাউর বিলুপ্ত হয়নি, ওরা এখনো টিকে আছে বান্দরবানের গহিন অরণ্য সাঙ্গু উপত্যকার সাঙ্গু-মাতামুহুরী বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে। তবে সংখ্যায় নগণ্য হওয়ায় (কমবেশি পঞ্চাশটির মতো) দেশে বর্তমানে মহাবিপন্ন হিসেবে বিবেচিত।
তবে বর্তমানে তিন পার্বত্য জেলাসহ চট্টগ্রামের কয়েকটি উপজেলায় (যেমন- সাতকানিয়া, লোহাগাড়া) সচরাচর যে প্রজাতিটি সবার কাছে বনগরু বলে পরিচিত সেটা হলো গয়াল। যদিও অনেকে এদের গাউরের পোষা সংস্করণ বলে থাকেন; কিন্তু অন্যরা তা মানতে নারাজ। কারণ গাউরকে পোষ মানানো যায় না। গয়াল বনগরুর একটি প্রজাতি কি না, এ নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে যথেষ্ট মতভেদ আছে। অনেকে এদের প্রাকৃতিক প্রজাতি মনে করলেও অন্যরা তা বিবেচনা করেন না। কারণ প্রজাতি হিসেবে গয়ালের বর্ণনা পাওয়া যায় পোষাগুলো থেকেই। অনেকেই মনে করেন ওরা কোনো বিলুপ্ত প্রজাতির বনগরুর পোষা বংশধর বা পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয়দের পোষা পাহাড়ি গরু ও গাউরের সংমিশ্রণে সৃষ্ট সংকর গরু। ভারতে ওরা মিথুন নামে পরিচিত, যেখানে পুরোপুরি বুনো, আধা-বুনো ও পোষা মিথুন দেখা যায়। যেসব বিজ্ঞানী ওদের প্রজাতি হিসেবে গণ্য করেন তারা গয়ালের বৈজ্ঞানিক নাম Bos frontalis বলে উল্লেখ করেছেন।
যা হোক, গয়াল আসলে পুরোপুরি বনগরু নয়। যেহেতু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ওরা পাহাড়িদের পোষা গাভীর গর্ভজাত তাই চেহারা অনেকটা গাউরের মতো হলেও স্বভাবে বেশ শান্ত। কিন্তু কারও কারও মতে, ওদের মধ্যে কিছু গয়াল হারিয়ে গিয়ে মানুষের সান্নিধ্যে না থাকায় ও বনের পরিবেশে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ায় গাউরের মতো বুনো হয়ে গেছে এবং এসব বুনো গয়ালদের বংশধররাই রাঙামাটির গভীর অরণ্যে, যেমন- পাবলাখালী অভয়ারণ্যে এখনো বেঁচে আছে বলে তথ্য পাওয়া যায়। তবে, এ নিয়ে যথেষ্ট মতভেদ আছে। যা হোক, বুনো গয়াল যদি বিলুপ্ত না হয়েও থাকে, তাহলেও এখন ওরা অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি অবশ্যই। আগেই বলেছি বিএলআরআইয়ের বিজ্ঞানীরা বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় গয়াল প্রজনন খামার ও গবেষণা কেন্দ্রে এদের রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় গবেষণা করছেন। জানি না তারপরও এরা বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পাবে কি না?
বুনো গয়াল গাউরের মতোই শক্তিশালী ও সুন্দর; দূর থেকে দেখলে গাউর বলেই ভুল হবে। গয়ালের দেহের গড়ন মোটামুটিভাবে গাউরের মতোই; তবে আকার ও ওজন কম। শিং গাউরের চেয়ে কম বাঁকানো। মাথাও তুলনামূলকভাবে ছোট। পিঠের ওপরের কুঁজ কম দীর্ঘ; কাঁধ থেকে পিঠের এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত বিস্তৃত। গলার চামড়ার ঝুল গাউরের থেকে বেশি থাকায় বাইসনের সঙ্গে কিছুটা মিল আছে। তাই এরা চিটাগাং বাইসন নামেও পরিচিত। গায়ের রং মোটামুটিভাবে গাউরের মতোই। বড়গুলো কালচে বা কালচে-বাদামি। বাছুরগুলো হালকা বাদামি।
যদিও ওরা বেশ বলিষ্ঠ ও কষ্টসহিষ্ণু তথাপি পোষা গয়াল দিয়ে হালচাষ করানো হয় না। পাহাড়িরা ওদের ছেড়ে পালন করেন। ওরা সারা দিন পাহাড়-জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায় ও রাতে ঘরে ফেরে। তবে কোনো কোনোটা ৪ থেকে ৫ দিনও ফেরার নাম নেয় না। আর ৪ থেকে ৫ দিন পর যখন ফেরে তখন ওদের মধ্যে কিছুটা বুনো ভাব দেখা যায়। বুনো গয়ালের স্বভাব-চরিত্র গাউরের মতো বলে ওরা মানুষকে ভয় পায় না; বরং আক্রমণ করার জন্য তেড়ে আসে।
গয়াল তৃণভোজী। গহিন বনের যেখানে ছোট ছোট ঝোপের কচিপাতা ও ডালপালা আছে তেমন জায়গা ওদের বেশ পছন্দ। বুনো গয়ালগুলো গাউরের মতো দলবদ্ধভাবে বাস করে। দলের নেতৃত্বে থাকে একটি বড় ও শক্তিশালী ষাঁড়। সাধারণত ১০ থেকে ১১ মাস গর্ভধারণের পর গয়াল একটি বাছুরের জন্ম দেয়। গাভীর মতো ওদের ওলান না থাকায় এবং স্তনবৃন্ত ছোট হওয়ায় ওদের থেকে দুধ দোহন করা যায় না। গয়ালের আয়ুষ্কাল ১৫ থেকে ১৬ বছর।
লেখক: পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন এবং চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ