শরৎপ্রকৃতির এক অপরূপ শোভা হলো, নীলাকাশে হেলান দেওয়া দিগন্ত বিস্তৃত ধানখেত। বাংলায় এখন শরৎকাল হলেও বৃষ্টির কারণে আমন ধানখেতগুলো হয়ে উঠেছে বড্ড বেশি লাবণ্যময়ী। ধানগাছের শ্যামল পাতায় বাতাসের এমন ঢেউ খেলানো সৌন্দর্য আর কোথায় পাব?
খুলনায় এক ধানখেতের আইলে বসে এই দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হতে হতে হঠাৎ একটা পাতার আড়ালে চোখ পড়ল। আহা, কী দারুণ দেখতে! যেন কোনো রূপসী সাদা রঙের শাড়ির আঁচল উড়িয়ে এ গাছ থেকে ও গাছে ভেসে বেড়াচ্ছে। জলসিক্ত ধানখেতের মধ্যে হঠাৎ দেখা সেই রূপসী পোকাটিকে চিনতে মোটেই কষ্ট হলো না। তার নাম চুঙ্গিপোকা। এ মথের বা পোকার বাচ্চারা ধানের পাতামুড়ে চোঙ্গা তৈরি করে বলে এদের নাম দেওয়া হয়েছে চুঙ্গিপোকা। ইংরেজিতে একে বলে রাইস কেসওয়ার্ম।
পোকাটিকে ভালোভাবে দেখতে খালি পায়ে আমি খেতে নেমে গেলাম। জল-কাদা দিয়ে খুব সন্তর্পণে সেই পোকাটির দিকে এগিয়ে যেতে লাগলাম। পোকাটি পাতার ওপরে বসছে না। সে পাতার আড়ালে গিয়ে বসছে। তাই কাত হয়ে নিচে বসে ওকে ভালোভাবে দেখতে লাগলাম। ধানের গাছগুলো তখন কুশি ছাড়তে ব্যস্ত। সেসব ধানগাছের পাতায় চুঙ্গিপোকারা এসেছে ডিম পাড়তে। পাতার নিচে রাতে একটি পোকা প্রায় ৫০টির মতো ডিম পাড়ে। আর নিজেরাও থাকে পাতার নিচে। কেননা এ পোকারা জানে, পাখিরা দেখলে তাদের ছিঁড়েখুঁড়ে খাবে। আর মাকড়সারা দেখলে তাদের দেহটা ডাল বানিয়ে স্যুপের মতো খাবে।
তাই তাদের সাবধানে চলতে হয়, সব সময় থাকতে হয় সতর্ক। তাই এক জায়গায় বেশিক্ষণ বসে থাকার প্রশ্নই ওঠে না। বিপদের আঁচ পেলেই তারা উড়াল দেয়। তবে তারা আকাশে ওড়ে না। আকাশে উড়লেই বিপদ, ওদের ধবধবে সাদা দেহটা কালো কুচকুচে ফিঙে পাখির নজরে পড়ে যাবে। আর ছোঁ মেরে ফিঙে পাখি ওদের খেয়ে ফেলবে। এসব কথা ওরা বেশ ভালোভাবেই জানে! তাই ওরা বেশ কৌশলী। তাই তো তারা ধানগাছগুলোর মধ্যেই উড়ে বেড়ায়।
চুঙ্গিপোকা দেখতে যতই সুন্দর দেখাক না কেন, ওরা ধানের একটি প্রধান ক্ষতিকর পোকা। পাতার নিচে পাড়া ডিম ফুটে যেসব বাচ্চা বের হয়, তারা হামাগুঁড়ি দিয়ে পাতার ওপরে ওঠে। এরপর পাতার ওপরের দিকটা আড়াআড়িভাবে কেটে চুঙ্গি তৈরি করে তার মধ্যে তারা অবস্থান নেয়। কাটাপাতা দিয়ে তৈরি চুঙ্গিগুলো বাতাসে বা পানিতে ভেসে ক্ষেতের এক পাশে জমা হয়। চুঙ্গিগুলো দেখে মনে হয়, কেউ যেন কাঁচি দিয়ে পাতাগুলো কুচি করে ফেলেছে।
চুঙ্গিগুলো এক ইঞ্চিরও কম লম্বা হয়। অনেকটা পাইপের মতো বানিয়ে এক প্রান্ত লালার আঠা দিয়ে বন্ধ করে দেয়। অন্যপ্রান্ত পাতার সঙ্গে লালার আঠা দিয়ে আটকে রাখে। আর সেই প্রান্ত দিয়ে কিড়া বা পোকার বাচ্চারা মাথা বের করে পাতার সবুজ অংশ কুরে কুরে খেতে থাকে। একসময় সে পাতা শেষে শুকিয়ে যায়।
চুঙ্গিপোকার আরও এক শত্রু বিভিন্ন প্রজাতির বোলতা। চোঙ্গের মধ্যে থাকা অবস্থায় বোলতারা কিড়ার গায়ে হুল ফুটাতে পারে না। ধানগাছের কুশি ছাড়ার শেষ অবস্থা আসার আগে কিড়াগুলো পাতার সবুজ অংশ লম্বালম্বিভাবে কুরে কুরে খায়। ধানের চারা অবস্থায় এরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে। পাতা শক্ত হয়ে গেলে ক্ষতি করে কম।
বাংলাদেশে ক্রামবিডি গোত্রের দুটি প্রজাতির চুঙ্গিপোকা দেখা যায়। সচরাচর দেখা যায় Parapoynx stagnalis (সমনাম বা পূর্বনাম Nymphula depunctalis) প্রজাতির চুঙ্গিপোকা। এ ছাড়া আরও এক প্রজাতির চুঙ্গিপোকা এ দেশে দেখা গেছে। ছবির চুঙ্গিপোকাটির প্রজাতিগত নাম Parapoynx fluctuosalis. এরা ধানের চেয়ে ঘাসজাতীয় আগাছার পাতা খেতে বেশি পছন্দ করে।
প্রথম প্রজাতির পূর্ণবয়স্ক চুঙ্গিপোকার পাখা দুধের মতো সাদা, পাখায় হালকা বাদামি ঢেউ খেলানো রেখা ও কালো ফুটকি দাগ থাকে। দ্বিতীয় প্রজাতির চুঙ্গিপোকার পাখার ওপর ডোরাকাটা হলে বাদামি দাগ থাকে। কিড়া অবস্থায় অর্ধস্বচ্ছ ফিকে সবুজ ও মাথা কমলা রঙের হয়ে থাকে। বাচ্চারা ছয় বার খোলস বদলায়। প্রতিবারই তারা নতুন চোঙ্গা তৈরি করে। চোঙ্গা পুত্তলি ঘিয়া রঙের হয়। কেবলমাত্র সেসব চোঙ্গের ভেতরে থাকা চুঙ্গিপোকার কিড়ারাই পুত্তলিতে যায়, যেসব চোঙ্গা ধানগাছের সঙ্গে আটকে থাকে। সপ্তাহখানেক এভাবে পুত্তলি বা পিউপা অবস্থায় থাকার পর পূর্ণাঙ্গ মথ হয়ে বেরিয়ে আসে।
চুঙ্গিপোকা রাতের বেলায় বেশি তৎপর থাকে ও আলোর প্রতি আকর্ষিত হয়। ধানগাছ ছাড়াও এরা শ্যামা, আরাইল, ছন, কাশ, চাপড়া ও কিছু জলজ আগাছায় জীবন কাটাতে পারে। এরা কেবল সেসব ধানের জমিতেই থাকে, যেখানে পানি থাকে। বর্ষাকালে পূর্ণিমার জ্যোস্নাময় রাতে এদের সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।
লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ
