সাড়ে এগারো বছর আগের কথা। বিরল ও দুর্লভ পাখির গবেষণাকাজে কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানে এসেছি। সকাল থেকে উদ্যানের বড় ছড়া ধরে হাঁটছি। মার্চ মাস। পাখির আনাগোনা ভালোই। তবে বৃহৎ কালি কাঠঠোকরা ও কালামাথা বুলবুলের ধূসর রূপ ছাড়া তেমন কোনো বিরল ও দুর্লভ পাখির দেখা পেলাম না। পাখির পাশাপাশি বেশ কিছু প্রজাতির প্রজাপতিরও দেখা পেলাম। চৈতালী দূত (Common Immigrant), সিঁদুরী পদ্মরাগ (Crimson Rose), উদয়াবল্লী (Common Mormon), কৃষ্ণকটক (Common Mime) ও রাজকিঙ্করের (Common Yeoman) মতো সুন্দর সুন্দর প্রজাপতি দেখলাম।
এসব পাখি-প্রজাপতি দেখতে দেখতে ও ওদের ছবি তুলতে তুলতে কখন যে সকাল পেরিয়ে দুপুর হয়ে গেল খেয়ালই করিনি। তখন দুপুর ১২টা বেজে ১৯ মিনিট ১০ সেকেন্ড। ছড়ার পাশের একটি বুনো গুল্মজাতীয় গাছের ছোট ছোট সাদা ফুলের ওপর লালচে বাদামির ওপর চকচকে সাদা ফোঁটাযুক্ত অতিসুন্দর এক প্রজাপতিকে ফুলের রস পান করতে দেখলাম। এর আগে এই প্রজাপতিটিকে দেখেছি বলে মনে হলো না। দ্রুত ওর কয়েকটি ছবি তুলে নিলাম। ছবি তুলতে তুলতে ওর কাছে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রজাপতিটি উড়ে চলে গেল। এর পর থেকে সুন্দর এই প্রজাপতিটিকে চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের বিভিন্ন বনে বহুবার দেখেছি।
লালচে বাদামি ডানায় সাদা ফোঁটাযুক্ত অতিসুন্দর এই প্রজাপতিটি এ দেশের এক বহুল দৃশ্যমান ও স্বল্প ঝুঁকিসম্পন্ন প্রজাপতি। এর কোনো প্রচলিত বাংলা নাম নেই। ইংরেজি নাম Punchinello (পানচিনিলো), যার বাংলা নাম বিদূষক। বিদূষক অর্থ হলো নাটকের বা রাজদরবারের রসিক সহচর বা ভাঁড়, যিনি হাস্যরসের মাধ্যমে বিনোদন দেন এবং কখনো কখনো সমাজের সমালোচনা করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক শ্রদ্ধেয় বাশার স্যার তার বইয়ে এই প্রজাপতিটির নাম বিদূষক বলে উল্লেখ করেছেন। এটি ধাতব চিহ্নযুক্ত প্রজাপতির গোত্র রিওডিনিডি (Riodinidae)-এর সদস্য। বৈজ্ঞানিক নাম Zemeros flegyus (জেমারোস ফ্লেজিয়াস)। প্রজাপতিটি দেশের উত্তর-পূর্ব (সিলেট বিভাগ) ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে (চট্টগ্রাম বিভাগ) বাস করে। বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এটির দেখা মেলে।
বিদূষক ছোট থেকে মাঝারি আকারের প্রজাপতি। প্রসারিত অবস্থায় ডানার বিস্তার ৪০ থেকে ৫০ মিলিমিটার। তবে অনেক সময় এর চেয়ে ছোট প্রজাপতিও চোখে পড়ে। ছোট ছোট সাদা চকচকে ফুটকিসহ দেহ ও ডানার ওপরটা লালচে বা বেগুনি বাদামি।ফুটকিগুলোর ভেতর দিকে কালো ফোঁটা রয়েছে। দেহ ও ডানার নিচের দিক একই রকম হলেও তার ভিত্তি রং ফ্যাকাশে।
দেশের মিশ্র চিরসবুজ বনের নিম্ন থেকে মাঝারি উচ্চতায় প্রজাপতিটির দেখা মেলে। সচরাচর উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ুর ছায়াযুক্ত বন, ঝোপঝাড়, বাগান ও জলধারার আশপাশে বিচরণ করে। এরা দিনের বেলা সক্রিয়। ডানা অর্ধখোলা অবস্থায় ঘোরাঘুরি করে।
দুর্বলভাবে ডানা ঝাপটে উড়ে বেড়ায়। তবে বিরক্ত হলে দ্রুত ওড়ে। মাঝে মাঝে পাতা বা গাছের গুঁড়ির ওপর বসে বিশ্রাম নেয়। স্ত্রী প্রজাপতি ফুলের নির্যাস ও পুরুষ ভেজা মাটির রস চুষতে পছন্দ করে। পুরুষ প্রজাপতি রোদে ডানা মেলে বসে থাকে। বিপদের সময় দেহের রং পরিবর্তন করে পরিবেশের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে শিকারির চোখ ফাঁকি দিয়ে জীবন বাঁচায়।
বিদূষক প্রজাপতির জীবনচক্র সম্পন্ন হতে ২৫ থেকে ৩৫ দিন সময় লাগে। স্ত্রী প্রজাপতি মিসা, পাহাড়ি মিসা, রমজানি প্রভৃতি পোষক গাছের পাতার ওপর দিকে পাতাপ্রতি একটি করে ছোট, সাদা ও মসৃণ ডিম পাড়ে। ডিম ফুটে শূককীট বের হতে ৩ থেকে ৫ দিন সময় লাগে। নবজাতক শূককীট ডিম্বাকৃতির ও বেশ চ্যাপ্টা; দেহের প্রতিটি খণ্ড গোলাকার হওয়ায় শূককীটটিকে কতকটা ঢেউখেলানো মনে হয়। বৃদ্ধি পর্যায়ে শূককীটটি ফ্যাকাশে সবুজ রঙের থাকে ও সূক্ষ্ম রোয়ায় দেহ আবৃত থাকে। শূককীট অন্তত প্রায় পাঁচবার দেহের খোলস পাল্টে ১০ থেকে ১৪ দিনে মূককীটে পরিণত হয়। মূককীট মসৃণ, হালকা সবুজ বর্ণের; যা পাতার নিচের দিকে একটি রেশমি কোমরবন্ধ দিয়ে সুন্দরভাবে সংযুক্ত অবস্থায় ঝুলে থাকে। অনুকূল পরিবেশে ৭ থেকে ১০ দিনে মূককীটের খোলস কেটে পূর্ণবয়স্ক প্রজাপতি বেরিয়ে আসে। পূর্ণবয়স্ক প্রজাপতি সচরাচর দুই থেকে তিন সপ্তাহ পর্যন্ত বাঁচে, তবে অনুকূল পরিবেশে ২৫ দিন পর্যন্ত বাঁচতে পারে।
লেখক: পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ
