মাস্টার্সের থিসিস ডিফেন্স পরীক্ষা শেষ করে ডিফেন্স রুম থেকে বের হলাম। সহকর্মী প্রফেসর তৈমুর ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে গ্র্যাজুয়েট অনুষদ থেকে আমাদের বিভাগের দিকে হাঁটা দিলাম। ভিসি দপ্তরের পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পুরোনো কৃষি অনুষদের সামনের রাস্তায় চলে এলাম। এদিক-ওদিক তাকিয়ে অটো খুঁজছি। কিন্তু কোনো খালি অটো পাচ্ছি না। কাজেই হেঁটেই চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম।
হাঁটতে হাঁটতে মিনিটখানেকের মধ্যেই উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের গবেষণা মাঠের সামনে চলে এলাম। দুপুর ঠিক ১২টা বাজে। চমৎকার রোদ। কিন্তু শীত শীত আমেজ থাকায় বেশ ভালো লাগছে। গবেষণা মাঠের লোহার গেটের সামনে আসতেই দুটি সাদা-কালো অতি সুন্দর পতঙ্গ উড়ে যেতে দেখলাম। সঙ্গে কোনো ক্যামেরা নেই। তাই ছবি তুলতে পারছি না। মনে পড়ে গেল এক যুগ আগের কথা। তখন শীতকালে প্রায়ই এখান দিয়ে ক্যামেরা হাতে হাঁটাহাঁটি করতাম। প্রচুর রংবেরঙের পতঙ্গ উড়ে বেড়াতে দেখা যেত। সুন্দর সুন্দর ছবি তুলেছি এসব রঙিন পতঙ্গের। অবশ্য ব্যস্ততার জন্য বহুদিন ধরে ক্যাম্পাসে পতঙ্গগুলোর পিছু নেওয়া হয় না। ক্যামেরা নেই, তাতে কোনো সমস্যা নেই। চুপিচুপি ওদের কাছাকাছি গেলে মোবাইলেই তোলা যাবে। যেই ভাবা সেই কাজ। মোবাইল বের করে ছবি তোলার প্রস্তুতি নিলাম। কিন্তু ১০-১২ মিনিট চেষ্টা করেও ভালো ছবি তুলতে পারলাম না। ইতোমধ্যে সাদা-কালো পতঙ্গগুলো হঠাৎ করে হারিয়ে গেল। কিন্তু মিটার দশেক দূরে আরও দুটিকে উড়ে বেড়াতে দেখলাম। ধীরে ধীরে আমরা দুজন ওদের কাছে চলে এলাম। মিনিট পাঁচেকের চেষ্টার পর সাদা-কালো একটি পতঙ্গের দুটি ভালো ছবি তুলতে পারলাম। যথেষ্ট হয়েছে, আজ এ পর্যন্তই। হাতে বেশ কাজ জমে আছে। কাজেই বিভাগের দিকে হাঁটা দিলাম। গত ২১ নভেম্বরের ঘটনা এটি।
গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দেখা সাদা-কালো যে পতঙ্গটির কথা বললাম সে আর কেউ নয়, এ দেশের সচরাচর দৃশ্যমান ও স্বল্প ঝুঁকিসম্পন্ন এক প্রজাপতি রৈখি মথন। পশ্চিমবঙ্গে এর নাম ধুলকাপাস। ইংরেজি নাম Stripped Albatross. সাদা ও হলুদ প্রজাপতির গোত্র পাইরিডি (Pieridae)-এর এই সদস্যের বৈজ্ঞানিক নাম Appias libythea (আপিয়াস লিভিথিয়া)। বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশ এবং মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে দেখা যায়।
রৈখি মথন ছোট থেকে মাঝারি আকারের প্রজাপতি। প্রসারিত অবস্থায় ডানার মাপ ৫৫ থেকে ৬৫ মিলিমিটার। সামনের ডানার শীর্ষদেশ পুরুষ প্রজাপতির ক্ষেত্রে চোখা, কিন্তু স্ত্রী প্রজাপতির ক্ষেত্রে গোলাকার হয়। পুরুষের ডানার উপরাংশ সাদা; ডানার কিনারার দিকে প্রান্তিক খাঁজকাটা কালো ফিতার মতো থাকে। স্ত্রী প্রজাপতির সামনের ডানায় কয়েকটি বিস্তৃত সাদা রেখা ও এক সারি হলুদ উপপ্রান্তিক ফুটকি রয়েছে। তা ছাড়া ডানায় প্রচুর কালো-ধূলির মতো থাকে। পুরুষের ডানার নিচটা সাদা ও স্ত্রীরটা হলদে-ধূলিযুক্ত। ডানার শিরাগুলো গাঢ় ধূলিযুক্ত।
প্রজাপতিটিকে দেশের সর্বত্র, যেমন- উন্মুক্ত পরিবেশ, বনের প্রান্ত, অনাবাদি জমি, ঘাসবন, শহর, এমনকি আবাসিক এলাকায়ও দেখা যায়। বয়স্ক প্রজাপতিগুলো রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়ায় বেশি সক্রিয় থাকে। এরা দ্রুতগতিতে উড়তে পারে। স্ত্রীগুলো নিয়মিত ফুলে ফুলে ঘুরে ঘুরে ফুলের রস পান করে। খনিজ পদার্থের জন্য পুরুষগুলো প্রায় সময়ই ভেজা মাটির রস চুষে খায়। এরা পরিযায়ী স্বভাবেরও হয়ে থাকে।
রৈখি মথনের জীবনচক্র বরুন ফুল ও বিভিন্ন প্রজাতির আষাঢ়ী লতা নামক পোষক গাছে সম্পন্ন হয়। স্ত্রী পোষক গাছের পাতা বা ফুলের ওপর একটি করে টাকু আকারের (লম্বাটে) ডিম পাড়ে। ডিমের গায়ে লম্বালম্বি খাঁজ ও অসংখ্য আড়াআড়ি রেখা থাকে। ডিমের রং শুরুতে সাদা হলেও রাতারাতি তা কমলা বা হলুদ বর্ণ ধারণ করে।
ডিম ফুটে হলুদ রঙের শূককীট বের হতে মাত্র দুদিন সময় লাগে। এদের দেহে ছোট ছোট চুলের মতো থাকে। শুরুতে শূককীটের রং হলুদ থাকলেও ধীরে ধীরে তা সবুজ হতে থাকে। ডিম থেকে ফোটার পর প্রথমে শূককীট ডিমের খোলসটি খেয়ে ফেলে। এরপর পোষক গাছের পাতা খেয়ে বড় হয়। সাত থেকে সাড়ে সাত দিনে পাঁচবার খোলস পাল্টে শূককীট গাছের কাণ্ডে স্থির হয় এবং অর্ধদিনের মধ্যে খোলস পাল্টে মূককীটের শক্ত আবরণে নিজেকে ঢেকে ফেলে।
খোলসের ভেতর পাঁচ দিন থাকার পর মূককীট খোলস কেটে পূর্ণাঙ্গ প্রজাপতি হয়ে বেরিয়ে আসে। জীবনচক্র সম্পন্ন হতে অর্থাৎ ডিম থেকে শূককীট, শূককীট থেকে মূককীট ও মূককীটের খোলস কেটে পূর্ণাঙ্গ প্রজাপতি হতে সচরাচর ১৪ থেকে ১৬ দিন সময় লাগে। তবে পূর্ণবয়স্ক প্রজাপতি সাধারণত দুই থেকে চার সপ্তাহের বেশি বাঁচে না।
লেখক: পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ
গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
