হেমন্তের এক সকালে গেলাম মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলায়। উদ্দেশ ড. নওয়াজেশ আহমদের পৈতৃক বাড়ি জহির মঞ্জিলে যাওয়া। সিংগাইর বাসস্টেশনে নেমে সেখান থেকে গেলাম পারিল বাজারে। বাজার থেকে স্কুলের পাশের রাস্তা ধরে একটু এগিয়ে যেতে বাম পাশে একটা দীঘি পড়ল। দীঘির পাড়ে রয়েছে অল্প-স্বল্প ঝোপঝাড় আর বৃক্ষ। সেগুলোর মধ্যে ধুতরাগাছের কয়েকটা ঝোপ দেখতে পেলাম। ডালপালা আর পাতার ওপর দিয়ে ঊর্ধ্বমুখী হয়ে ফুটে রয়েছে কয়েকটা সাদা রঙের ধুতরা ফুল।
ধুতরাগাছ এখন তেমন একটা চোখে পড়ে না, তার আবার ফুল! গ্রামের বন-জঙ্গলে আপনা-আপনি ধুতরাগাছ জন্মে। তাই ধুতরাকে এ দেশে অবহেলিত আগাছা হিসেবে দেখা হয়। সে অর্থে ধুতরা ফুলকে বলা যায় বুনোফুল। এ গাছের সর্বাঙ্গ বিষে ভরা। ধুতরাতে শক্তিশালী ট্রোপেন জাতীয় অ্যালকালয়েড থাকায়, এটি বিষাক্ত উদ্ভিদ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। এর ফল খেলে পাগল হয়ে যাওয়াও বিচিত্র নয়।
শুনেছি, অজ্ঞান পার্টির লোকরা মানুষকে অজ্ঞান করে সব লুটে নিতে ধুতরার বিষ ব্যবহার করে। বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর লোকেরা এ গাছের বিভিন্ন অংশকে জাদুবিদ্যা, রোগ নিরাময় ও নেশাজাতীয় দ্রব্য তৈরিতে ব্যবহার করে। সে খবরটা বোধহয়, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামেরও জানা ছিল। তা না হলে দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত কবি সে কষ্টকে ভুলে থাকতে কেন ধুতরার নেশায় মত্ত হতে চেয়েছিলেন। তার ‘সিন্ধু-হিন্দোল’ কাব্যগ্রন্থের ‘দারিদ্র্য’ কবিতায় সে কথার উল্লেখ রয়েছে-
‘আমার দুয়ার ধরি’! কে বাজাবে বাঁশি?
কোথা পাব আনন্দিত সুন্দরের হাসি?
কোথা পাব পুষ্পাসব? ধুতরা-গেলাস
ভরিয়া করেছি পান নয়-নির্যাস! ...’
ধুতরার ইংরেজি নাম জিমসন উইড এবং থর্ন অ্যাপেল। জিমসন উইড নামকরণের পিছনে একটা গল্প আছে। ১৬০৭ সালের দিকে ব্রিটিশ ক্যাপ্টেন জন স্মিথ তার সৈন্যদের নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ার জেমস টাউনে উপনিবেশ স্থাপনের চেষ্টা করেন। তবে তিনি ব্যর্থ হন। একদিন তার সৈন্যদের সালাদের সঙ্গে সেখানকার জেমস টাউন উইডের (আগাছা জাতীয় গাছ) পাতা সিদ্ধ করে খেতে দেওয়া হয়েছিল। সে পাতা খাওয়ার পর সৈন্যরা খামখেয়ালি আচরণ করতে শুরু করে। পরবর্তী সময় এই জেমস টাউন উইডের নাম বদলে যেতে যেতে হয়ে যায় ‘জেমসন উইড’। ১৭০৫ সালে রবার্ট বেভারলি জুনিয়রের লেখা দ্য হিস্ট্রি অ্যান্ড প্রেজেন্ট স্টেট অব ভার্জিনিয়া বইয়ের (চার খণ্ড) দ্বিতীয় খণ্ডে এসব তথ্য রয়েছে। এই জেমসন উইডই হলো কালো ধুতরা, যার ডালের রং কালচে-বেগুনি ও ফুলের রং সাদা। তবে বেগুনি-সাদা ফুলও আছে (Datura metel)। কাঁটাযুক্ত গোলাকার বলের মতো ফলের কারণে এ গাছের নাম হয়েছে থর্ন অ্যাপেল। এর ফুলকে শয়তানের ভেরি বা ডেভিলস ট্রাম্পিট বলেও ডাকা হয়। ধুতরা সম্ভবত আমেরিকার স্থানীয় গাছ।
ধুতরাগাছ সোলানেসি বা বেগুন পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। এটি বর্ষজীবী গুল্মশ্রেণির উদ্ভিদ। গাছ ৬০ থেকে ১৫০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। এর কাণ্ড শক্ত। কাণ্ডের বাকলের রং হলদে সবুজ থেকে লালচে বেগুনি। পাতা নরম, কিনারা ঢেউ খেলানো ও খাঁজ কাটা। পাতার ওপরের পিঠ গাঢ় সবুজ, নিচের পিঠ হালকা সবুজ। পাতা তিক্ত স্বাদের। প্রায় সারা বছর ধুতরা ফুল ফোটে। ফুলের রং ঘিয়া সাদা বা বেগুনী। ফুল ঘণ্টাকৃতির ও পাঁপড়ির গোড়ার দিক নলাকার। ফুটন্ত ফুল খাড়াভাবে থাকে। খাটো কাণ্ডে বা পাতার কোলে ফুল ফোটে ও ফল ধরে। রাতের বেলায় ফুল থেকে সুঘ্রাণ ভেসে আসে। ফল গোলাকার ও কাঁটাযুক্ত। এর রং হালকা সবুজ। ফল পাকলে ফেটে চার খণ্ডে ভাগ হয়ে যায়। প্রতিটি খণ্ডের ভেতর ডজনখানেক কালো রঙের বীজ থাকে। বীজ থেকে চারা হয়।
ধুতরাগাছ বিষাক্ত হলেও কেউ কেউ ফুল তুলে খোঁপায় গুঁজে সাজেন। নজরুল সংগীতেও সে পুষ্পসজ্জার উল্লেখ আছে- ‘কে দিল খোঁপাতে ধুঁতুরা ফুল লো/ খোঁপা খুলে কেশ হলো বাউল লো॥’
১৯৩৭ সালের অক্টোবরে এইচএমভি কোম্পানিতে নজরুলের একটি গান রেকর্ড করা হয়েছিল। নজরুলের বয়স তখন ৩৮ বছর ৪ মাস। কণ্ঠশিল্পী ছিলেন সীতা দেবী। সে গানেও ধুতরার নাম পায়,
‘বাঘ-ছাল প’রে আয় হৃদয়-বনের শিকারি
ঘাগরা প’রে, প’রে পলার মালার আয় বেদের নারী
মহুয়ার মধু পিয়ে ধুতরা ফলের পিয়ালায়॥’
অনেকে অ্যাজমা, জ্বর, সর্দি ইত্যাদি রোগ নিরাময়ে ধুতরাগাছ ব্যবহার করেন। হাঁপানি উপশমের জন্য ধুতরা পাতা দিয়ে তৈরি করা হয় অ্যাজমা সিগারেট। তবে এর স্বপক্ষে জোরালো কোনো বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য নেই।
লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ