ঢাকা ১১ আষাঢ় ১৪৩৩, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
জাপানের বিপক্ষে রক্ষণভাগ আরও শক্তিশালী করতে হবে: গ্রাহাম পটার রাউজানে দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল শিক্ষক দম্পতির পুরুষ বিশ্বকাপে ইতিহাস গড়ছেন নারী রেফারি রেকর্ড গড়ে বিশ্ববাজারে আসছে  বিওয়াইডির এসইউভি ভয়াবহ ভূমিকম্পে বিপর্যস্ত ভেনেজুয়েলা, নিখোঁজ ১১ হাজার সুইডেনকে হারিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হতে জাপান কোচ মহাবিশ্বে আমাদের গতি কত? ‘জানতাম সঠিক সময়েই ব্রাজিলের হয়ে সেরাটা দিতে পারব’: ভিনিসিয়ুস স্কলাস্টিকায় ‘এ’ লেভেলের শিক্ষার্থীদের শিক্ষাসমাপনী উৎসব অ্যানিমেশনের ক্যানভাসে পাহাড় জয়ের গল্প বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের নতুন অধ্যায়, সই হলো ১৩ সমঝোতা স্মারক বিশ্বকাপে হলুদ কার্ডের নিয়মে পরিবর্তন, নিষেধাজ্ঞার শঙ্কায় একঝাঁক তারকা বাতিল আকীদা পন্থীগণ আজ বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে : ছারছীনার পীর ছাহেব একই পরিবারের চারজনকে কুপিয়ে হত্যা, গণপিটুনিতে ঘাতকের মৃত্যু পার্বত্য চট্টগ্রামে অভিন্ন কর ব্যবস্থার দাবি নাগরিক পরিষদের ডে-লেবার নিয়োগ যাচাই-বাছাইয়ের নোটিশ নিয়ে ইবি প্রশাসনের লুকোচুরি কুকুরের গলায় ইট বেঁধে মেঘনায় নিক্ষেপ, নরসিংদীতে যুবক গ্রেপ্তার নোয়াখালীতে আবাসিক হোটেলে অভিযান, ১৪ তরুণ-তরুণী আটক বিশ্বকাপে কুরাসাওয়ের হয়ে ইতিহাস গড়লেন যে নারী শিশু একাডেমির নেতৃত্বে কি এখনো শিশুসাহিত্যিক ফিরিয়ে আনার সময় আসেনি! আশুরার শিক্ষায় সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ জোরদারের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সহায়তায় এসওএস চিলড্রেন’স ভিলেজেস বাংলাদেশের সঙ্গে সেন্ট্রোর অংশীদারিত্ব নবায়ন জলবায়ু সহনশীল বাংলাদেশ গড়তে কিশোরীদের নেতৃত্বে ‘দুর্বার কন্যা’ মডেল বিইউএফটিতে ২২২ ব্যাচের শিক্ষার্থীদের বিদায় উৎসব অনুষ্ঠিত একজন ক্লান্ত মানুষের জন্য আশ্বাসের বাণীটি কী জানেন? রোহিঙ্গাদের সম্পদে পরিণত করুন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে সংগীত উৎসব অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ মহিলা সমিতিতে ‘শ্রুতি সম্ভার’ সম্মাননা পাচ্ছেন ওয়াহিদা মল্লিক জলি প্রিয়াঙ্কার কড়া বার্তা…

উপকারী বৃক্ষ গনিয়ারি

প্রকাশ: ০২ ডিসেম্বর ২০২৫, ১০:১৫ এএম
উপকারী বৃক্ষ গনিয়ারি
গনিয়ারির ফুলসহ শাখা। ছবি: লেখক

ময়মনসিংহ শহরের ব্রহ্মপুত্র তীরের বিশ্বেশ্বরী দেবী রোডে অবস্থিত একটি বাড়িতে সোনালী ব্যাংকের শাখা। এটি মূলত গৌরীপুরের সংস্কৃতিমনা জমিদার ব্রজেন্দ্র কিশোর চৌধুরীর বাড়ি। ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে খান বাহাদুর ইসমাইল হোসেন সড়কে রাজরাজেশ্বরী ওয়াটার ওয়ার্কসের পাশে এর অবস্থান। ওই সময় দ্বিতল পাকা বাড়ি নির্মাণ নিষিদ্ধ থাকার কারণে গৌরীপুরের জমিদার ব্রজেন্দ্র কিশোর চৌধুরী চীন থেকে কারিগর এনে এই কাঠের দোতলা বাড়িটি তার জামাতা জগৎকিশোর আচার্য চৌধুরীর জন্য নির্মাণ করেন। জগৎকিশোর ছিলেন মুক্তাগাছার জমিদার রাম কিশোর আচার্য চৌধুরীর পুত্র। বর্তমানে এই দোতলা কাঠের বাড়িটি সোনালী ব্যাংকের অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ব্যাংকের মূল ভবনটি পরে নির্মিত হয়। এই ভবনের উত্তর-পশ্চিম দিকে দাঁড়িয়ে আছে একটি গনিয়ারি বৃক্ষ।

ময়মনসিংহের ব্রহ্মপুত্র ব্রিজের মোড় থেকে বাসে যারা উত্তরবঙ্গ বা দক্ষিণবঙ্গে যান এই গাছটি তাদের চোখে পড়তে পারে। চলতি বছরের ২৫ জুন গিয়েছিলাম এই গাছের কাছে। অনেক উঁচুতে ফুল ও ফল দেখে নিরাশ হয়েছিলাম। পরে নিচে হাতের নাগালের মধ্যে ফুল ও ফল পেয়ে ছবি তুলে ফেললাম ঝটপট। 

এই গাছ ৭ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। এই গাছের বাকল বেশ পাতলা এবং খানিকটা পীতবর্ণের। পাতায় একটা সুঘ্রাণ আছে। কাঠের রং হয়ে থাকে ফিকে ধূসর। এই গাছের পাতা ৩-৪ ইঞ্চি লম্বা হয়। কিন্তু প্রস্থের দিকে বেশ প্রসারিত হয়। পাতা ডিম্বাকৃতির। তবে এই পাতার শেষ ভাগের বর্ধিত অংশ একটু সুচালো হয়ে থাকে। ফুল উভয় লিঙ্গ হয়। ফুলের রং সবুজাভ সাদা বর্ণের। অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকা, এশিয়াজুড়ে এই গাছের বিস্তৃতি। বাংলাদেশের সুন্দরবন, সিলেট, চট্টগ্রাম, ভারতের সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চলে প্রচুর গনিয়ারিগাছ পাওয়া যায়।

এর মঞ্জরিদণ্ডে গুচ্ছাকারে ফুল জন্মে। ফুলগুলো আকারে ছোট ও লোমযুক্ত। ফুলের রং ফিকে পীতাভ সবুজ। জ্যৈষ্ঠ ও আষাঢ় মাসে ফুল হয়। শ্রাবণ মাসের দিকে ফল ধরে এবং ভাদ্র মাসে ফল পাকে। ফলের আকার ২০ ইঞ্চির মতো। এই গাছের ছাল খুবই পাতলা হয়। পাতায় বিশেষ ধরনের গন্ধ আছে। মূলের ছালে বেশ মিষ্টি গন্ধ আছে, কিন্তু এর স্বাদ তিক্ত। পুষ্পদণ্ডে ঘন ঘন ফুল হয়। ফুল ছোট, কোমল, লোমযুক্ত। ফল ছোট। এর বীজ মটরের মতো। গ্রীষ্ম ও বর্ষা ফুল ও ফলের সময়। 

গনিয়ারির বৈজ্ঞানিক নাম Premna serratifolia, এটি Lamiaceae পরিবারের বৃক্ষ। যার প্রজাতিক অংশ serratifolia-এর অর্থ খাঁজকাটা। আর গ্রিক Premna-এর অর্থ ‘কাণ্ড’। শিশু অবস্থায় এর পাতা খাঁজকাটা থাকে বলে এর এ রকম নামকরণ করা হয়েছে। বাংলায় এই বৃক্ষের অন্য নামগুলো হচ্ছে ভূতভৈরবী, গন্ধপত্রা। সংস্কৃত ভাষায় গনিকারিকা, অগ্নিমন্থ নামে ডাকা হয়। প্রাচীনকালে গনিয়ারিগাছের ডালে ডালে ঘষে আগুন জ্বালানো হতো বলে এর নাম অগ্নিকারিকা বা অগ্নিমন্থ হয়েছে। এই উদ্ভিদ ইংরেজিতে হ্যাডেক ট্রি, পাইনাস ফায়ার ব্যান্ড ট্রি, কোস্টাল প্রেমনা, গ্রিক প্রেমনা ইত্যাদি নামে পরিচিত। 

গনিয়ারিগাছের পাতায় একধরনের সুঘ্রাণ থাকে, যে কারণে এটি কখনো কখনো ডালের সঙ্গে যোগ করা হয়। আবার মাছ রান্নার সময় আঁশটে গন্ধ বের হলে গনিয়ারি পাতা দেওয়া হয়। এতে গন্ধ দূর হয়ে যায়। 

গনিয়ারিগাছের শিকড় বেটে খেলে পাকস্থলীর ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। এ ছাড়া সাধারণ জ্বর নিবারণ এবং আমবাত নিরাময়ে সাহায্য করে। পাতার রস কৃমিনাশক এবং পেটফাঁপা কমায়। গোলমরিচের সঙ্গে পাতা বেটে খেলে সর্দি-জ্বর ভালো হয়। রক্তে কোলেস্টেরল বেড়ে গেলে গাছের বাকলের গুঁড়া দেড় গ্রাম গরম পানিসহ খেলে কমে যায়। গনিয়ারি কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে। শরীরের কোমল স্থান আঘাতে ফুলে গেলে গনিয়ারি পাতা বেটে লাগালে সেরে যায়। কিডনির জটিলতায় স্বল্প প্রস্রাব হলে ও হাত-পা ফুলে গেলে ৩ থেকে ৪ চামচ গনিয়ারি পাতার রস অল্প গরম করে খেলে অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই কিডনির সমস্যা কেটে যায় এবং প্রস্রাব স্বাভাবিক হয়ে হাত-পায়ের ফোলা কমে যায়।

লেখক: অধ্যাপক, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, মুমিনুন্নিসা সরকারি মহিলা কলেজ, ময়মনসিংহ

বর্ষার জলমোরগ

প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২৬, ০৮:২৭ এএম
বর্ষার জলমোরগ
চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুরের চরইল বিলের ধানখেতের ওপর উড়ন্ত পুরুষ জলমোরগ। ছবি: লেখক

২৯ জুন ২০১৮ সালের ঘটনা। অতি বিরল সোনাজঙ্ঘা (Painted Stork), খুন্তে বক (Eurasian Spoonbill) ও মাঝারি পানকৌড়ির (Indian Cormorant) ছবি তোলার জন্য চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভারত সীমান্তবর্তী রহনপুরের চরইল বিলে এসেছি। পুরো সকালটা অরুণ মাঝির নৌকায় চড়ে বিলের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ঘুরে বিরল পাখিগুলোর ছবি তুললাম। এরপর রহনপুর প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক মাশওয়ারুল হক জিকেন ভাইয়ের মাছের খামার কাম আম বাগানে দুপুরের খাবারের আতিথ্য গ্রহণ করলাম। পেটপুরে মজাদার খাবার খেয়ে আবারও অরুণ মাঝির নৌকায় চড়ে বিলে নামলাম। ক্যামেরার ভিউ ফাইন্ডারে চোখ রেখে অপেক্ষায় আছি নতুন বা বিচিত্র কোনো পাখির দেখা পাই কি না। এমন সময় ধানখেতের ভেতর থেকে মাথায় লাল শিরস্ত্রাণযুক্ত একটি পাখি উড়াল দিল। সঙ্গে সঙ্গে ক্যামেরার শাটার গর্জে উঠল। খানিকটা পথ উড়ে পাখিটি মাটিতে নেমে মুহূর্তের মধ্যেই ঝোপের ভেতর যেন হাওয়া হয়ে গেল। যদিও বেশ দূর থেকে ক্লিক করলাম, কিন্তু ছবি একেবারে খারাপ হলো না। ত্রিশ বছর আগে বাগেরহাট জেলার ফকিরহাটের সাতশৈয়া গ্রামে প্রথম এই প্রজাতির একটি স্ত্রী পাখির ছবি তুলেছিলাম। ছেলেবেলায় আব্বার কাছে শুনেছিলাম এই পাখিকে পোষ মানিয়ে একই প্রজাতির বুনো পাখি ধরা হতো। গ্রামের অনেকেই এ কাজ করতেন। তবে বন্যপ্রাণী আইনে বুনো পাখি ধরা ও পোষা নিষিদ্ধ। 

রহনপুরের চরইল বিলের ধানখেতে হাওয়া হয়ে যাওয়া পাখিটি আর কেউ নয়, এ দেশের এক দুর্লভ আবাসিক পাখি জলমোরগ। এগুলো কোড়া বা বন কোড়া নামেও পরিচিত। ইংরেজি নাম Watercock বা Kora। র‌্যালিডি গোত্রের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম গ্যালিক্রেক্স সিনেরিয়া। বাংলাদেশ ছাড়াও চীন এবং ফিলিপিন্সসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশেই পাখিটির দেখা মিলে।  

প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ ও স্ত্রী জলমোরগের দেহের দৈর্ঘ্য যথাক্রমে ৪২-৪৩ ও ৩৬ সেন্টিমিটার। ওজন যথাক্রমে ৩০০-৬৫০ ও ২০০-৪৩৪ গ্রাম। পুরুষ ও স্ত্রী পাখির পালকের রং একনজরে বাদামি। দেহের উপরটায় গাঢ় বাদামির ওপর হলদে রঙের ছোপ দেখা যায়। দেহের নিচের অংশে হলদের ওপর সরু বাদামি ডোরা থাকে। মাথার চাঁদি কালচে-বাদামি। কপালের সামনের ত্রিকোণাকার বর্মটি হলদে। চোখ ও চঞ্চু হলদে। লেজ খাটো ও আঙুল লম্বা। পা ও আঙুলের রং সবুজাভ। কিন্তু প্রজননকালে পুরুষের পালকের রং ধূসরাভ-কালো হয়ে যায়। দেহের উপরটায় ধূসর ও হলদে ছিট-ছোপ দেখা যায়। কপালে দেখা দেয় লাল টুকটুকে খাড়া বর্ম। চোখ ও চঞ্চুর রং হয় লালচে। পা ও আঙুল হয় সবুজাভ-লালচে। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখি দেখতে বড়গুলোর মতোই; তবে দেহতল লালচে-পীত। 

জলমোরগ হাওর, বিল, নলবন, জলাভূমি, প্লাবিত ধানখেত বা ঘাসবনে বিচরণ করে। অতি লাজুক পাখিটি দিবাচর হলেও খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। কারণ এরা লুকিয়ে লুকিয়ে চলাফেরা করে। সচরাচর একাকী বা জোড়ায় দেখা যায়। ভোরবেলা ও গোধূলিলগ্ন ছাড়াও বাদলা দিনে বেশ সক্রিয় থাকে। পানিতে ভাসমান আগাছায় বা ধানখেতে হেঁটে হেঁটে জলজ উদ্ভিদের বীজ ও গোড়া, ধান, খোলকজাতীয় প্রাণী, কীটপতঙ্গ, ছোট মাছ ইত্যাদি খায়। ‘উটুম্ব-উটুম্ব-উটুম্ব...’ স্বরে ডাকে।

আষাঢ় অর্থাৎ জুন থেকে আগস্ট প্রজননকাল। এ সময় পুরুষ পাখি নিজের সীমানা রক্ষা করতে অন্য পুরুষের সঙ্গে মারামারিও করতে পারে। নলবন, ভাসমান ধানগাছ বা জলাভূমির ঝোপঝাড়ে ধানগাছ বা ঘাস দিয়ে গোলাকার বাসা বানায়। ডিম পাড়ে ৫-৬টি। রং হলদে বা লালচে-বাদামি ছিটছোপসহ সাদা, ফ্যাকাশে বা ইট লাল। স্ত্রী একাই ডিমে তা দেয়। ডিম ফুটে ছানা বেরোতে ২৩ দিন সময় লাগে। ছানারা বাসা থেকে নেমে যখন মায়ের পেছন পেছন হেঁটে যায়, তখন দেখতে বেশ লাগে। আয়ুষ্কাল কমবেশি পাঁচ বছর। 

লেখক: পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ
গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

সৌন্দর্যে অনন্য গোলাপি অলকানন্দা

প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২৬, ০৮:১৭ এএম
সৌন্দর্যে অনন্য গোলাপি অলকানন্দা
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানিক্যাল গার্ডেনে গোলাপি অলকানন্দা ছবি: লেখক

গোলাপি অলকানন্দা একটি চমৎকার লতানো গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ। এর মনোহরা গোলাপি রঙের ফুলের জন্য এটি বাগানবিলাসী মানুষের কাছে ভীষণ জনপ্রিয়। মূলত ব্রাজিলের আদি বাসিন্দা হলেও ক্রান্তীয় এবং উপক্রান্তীয় অঞ্চলের আবহাওয়ায় এ গাছটি দারুণভাবে মানিয়ে নিয়েছে। উদ্ভিদের বৈজ্ঞানিক নাম Allamanda blanchetii, এটি Apocynacae পরিবারের উদ্ভিদ। ইংরেজিতে এই উদ্ভিদ purple allamanda, violet allamanda নামে পরিচিত। 

গোলাপি অলকানন্দা একটি চিরসবুজ লতানো গুল্ম। উপযুক্ত অবলম্বন পেলে এটি লতার মতো বেয়ে ১০ থেকে ১৫ ফুট বা তার বেশি উঁচুতে উঠতে পারে। আবার নিয়মিত ছাঁটাই করলে একে সাধারণ গুল্ম বা ঝোপ হিসেবেও চমৎকারভাবে রাখা যায়। এর কাণ্ড কিছুটা নমনীয়, কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা কাষ্ঠল রূপ নেয়।

এর পাতাগুলো গাঢ় সবুজ, মসৃণ এবং চকচকে। পাতাগুলো সাধারণত উপবৃত্তাকার বা ডিম্বাকার হয়ে থাকে। কাণ্ডের চারপাশ ঘিরে চার বা পাঁচটি পাতা চক্রাকারে (Whorled) সাজানো থাকে। পাতার এই ঘন বিন্যাস ফুলহীন অবস্থাতেও গাছটিকে বেশ দৃষ্টিনন্দন করে রাখে।

গোলাপি অলকানন্দার সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হলো এর ফুল। ফুলগুলো দেখতে অনেকটা মাইক বা ট্রাম্পেটের (Trumpet-shaped) মতো। ফুল সাধারণত আড়াই থেকে তিন ইঞ্চি চওড়া হয়। এর রঙের শেডটি অসাধারণ। ফুলের পাপড়িগুলো হালকা বেগুনি থেকে শুরু করে গভীর ম্যাজেন্টা বা পার্পল রঙের হয়ে থাকে, আর ফুলের ভেতরের দিকটা বা গলাটা কিছুটা কালচে বা গাঢ় তামাটে বেগুনি রঙের হয়।

অনুকূল পরিবেশে ফুল শেষে গাছে ছোট, গোলাকার এবং কাঁটাযুক্ত ফল হতে দেখা যায়। তবে গৃহস্থালি বাগানে এই ফল খুব একটা চোখে পড়ে না। এই গাছটি যেমন সুন্দর, এর পরিচর্যা করাও কিন্তু বেশ সহজ। সামান্য যত্নেই এই গাছ থেকে প্রচুর ফুল পাওয়া সম্ভব। 

এই ফুল গাছ মূলত রৌদ্রোজ্জ্বল পরিবেশ পছন্দ করে। প্রচুর আলো পেলে এর ফুলের রং যেমন উজ্জ্বল হয়, তেমনি ফুলের সংখ্যাও বাড়ে। তবে হালকা ছায়াতেও এটি বেঁচে থাকতে পারে। সুনিষ্কাশিত এবং জৈব উপাদানসমৃদ্ধ সামান্য অম্লীয় মাটি এই গাছের বৃদ্ধির জন্য সবচেয়ে ভালো। গাছে নিয়মিত পানি দেওয়া উচিত, তবে গোড়ায় যেন পানি জমে না থাকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

বছরের শুরুর দিকে বা শীতের শেষে গাছটিকে হালকা ছেঁটে দিলে নতুন ডালপালা গজায় এবং বসন্ত ও গ্রীষ্মে প্রচুর ফুল ফোটে।

গোলাপি অলকানন্দা বহুবর্ষজীবী হওয়ায় বছরের প্রায় সিংহভাগ সময়ই, বিশেষ করে গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে এটি ফুলে ফুলে ভরে থাকে। বাগানের দেয়াল, তোরণ (Arch), ট্রেলিস বা বারান্দার গ্রিল বেয়ে ওঠার জন্য এটি আদর্শ। আবার বড় টবে লাগিয়ে ছাঁটাইয়ের মাধ্যমে একে সুন্দর একটি ঝোপের আকারও দেওয়া যায়।

Apocynaceae পরিবারের অন্যান্য গাছের মতো এর কাণ্ড বা পাতা ভাঙলে একধরনের সাদা আঠালো রস বা কষ বের হয়। এই রস ত্বকে লাগলে চুলকানি বা অ্যালার্জি হতে পারে, তাই গাছ ছাঁটাইয়ের সময় কিছুটা সতর্ক থাকা ভালো।

পরিশেষে বলা যায়, গোলাপি অলকানন্দার রাজকীয় বেগুনি আভা যেকোনো প্রকৃতিপ্রেমীর মন কেড়ে নিতে পারে। সামান্য পরিচর্যা আর প্রচুর ভালোবাসায় এ গাছটি আপনার বাগান বা বাড়ির আঙিনাকে করে তুলতে পারে অনন্য ও দৃষ্টিনন্দন।

লেখক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, মুমিনুন্নিসা সরকারি মহিলা কলেজ, ময়মনসিংহ

হারিয়ে যেতে বসা হলুদ পাহাড়ি কচ্ছপ উদ্ধার

প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬, ০৯:২৭ এএম
আপডেট: ২৩ জুন ২০২৬, ০৯:৩১ এএম
হারিয়ে যেতে বসা হলুদ পাহাড়ি কচ্ছপ উদ্ধার
ছবি: খবরের কাগজ

চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় বস্তাবন্দি অবস্থায় হারিয়ে যেতে বসা একটি হলুদ পাহাড়ি কচ্ছপ উদ্ধার করেছে বন বিভাগ। পরে উদ্ধারকৃত কচ্ছপটিকে সংরক্ষিত বনাঞ্চলে অবমুক্ত করা হয়েছে।

গতকাল সোমবার বেলা ১২টার দিকে উপজেলার বাজালিয়া ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্সের সামনে থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় বস্তাবন্দি কচ্ছপটিকে উদ্ধার করা হয়।

জানা যায়, বাজালিয়া ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্সের সামনে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা দাঁড়িয়ে ছিল। চালক একটি দোকান থেকে খাবার খেয়ে অটোরিকশায় ওঠার সময় সামনের সিটের পাশে বস্তাবন্দি অবস্থায় কচ্ছপটি দেখতে পান। এর পর স্থানীয়রা বড়দুয়ারা বিট কাম চেক স্টেশন কর্মকর্তাকে খবর দেন। পরে তারা এসে হলুদ পাহাড়ি কচ্ছপটি উদ্ধার করে সংরক্ষিত বনাঞ্চলে অবমুক্ত করেন।

বড়দুয়ারা বিট কাম থেকে স্টেশন কর্মকর্তা মো. ফজলুল কাদের চৌধুরী বলেন, এটি মূলত মহাবিপন্ন প্রজাতির হলুদ পাহাড়ি কচ্ছপ। সাধারণত এরা ডাঙায় বসবাস করে। উদ্ধারের পরপরই কচ্ছপটি সংরক্ষিত বনাঞ্চলে অবমুক্ত করা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, বন বিভাগ ও প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএনের হিসাবে বাংলাদেশে মোট ৩০ প্রজাতির কচ্ছপ পাওয়া যায়। এদের মধ্যে হলুদ পাহাড়ি কচ্ছপ হচ্ছে একটি মহাবিপন্ন প্রজাতি। এরা ডাঙাতেই বেশি সময় থাকে।

রূপবতী সাদা মথ গাছফড়িং

প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬, ০৮:২৩ এএম
রূপবতী সাদা মথ গাছফড়িং
মিরপুরে জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে সম্প্রতি দেখা সাদা মথ গাছফড়িং। ছবি: লেখক

মিরপুর থেকে প্রকৃতিবন্ধু জিয়া ভাই গত ২৩ মে খবর দিলেন, জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে বন আসরা গাছে ফুল ফুটেছে। দেখতে হলে যেন চট করে চলে যাই সেখানে। পরদিন যেতে পারলাম না, গেলাম তার পরের দিন, ২৫ মে। সকাল সকাল গিয়েও ব্যর্থ হলাম সে ফুল দেখতে। হায়! সব যে ঝরে গেছে। তলায় বাসি ও শুকনো বাদামি ফুল পড়ে আছে। ইয়া লম্বা বিশাল গাছের ডালপালার দিকে যতই তাকিয়ে ফুল খুঁজতে থাকি, কোথাও পাই না। হতাশ হয়ে তাই এবার নিচের দিকে তাকালাম। আশপাশের ঝোপঝাড়ে পোকামাকড় খুঁজতে লাগলাম। বেশ কয়েক রকমের মাকড়সার দেখা পেলাম। কিন্তু একটা গাছের ডালে পাতার আড়ালে লুকিয়ে বসে থাকা এমন একটি পোকার দেখা পেলাম, যা আগে দেখিনি।

পোকাটি দেখতে ছোট সাদা মথের মতো, কিন্তু এর তাঁবুর মতো ডানার গড়ন, সূক্ষ্ম মলিন মেরুন দাগের আঁকিবুঁকির দুধেল চেহারা দেখে মুগ্ধ হলাম। কে সে সুন্দরী? ছবি তুলে সেদিনের মতো ফিরে এলাম। আবার  ১৩ জুন গেলাম সে উদ্যানে। এবার অন্য স্পট, ক্যান্টিনের কাছাকাছি বাতিলতাগাছ।

এবার আরও বিস্মিত হলাম। একটা ডালে অনেকগুলো পোকা লাইন ধরে বসে আছে। একসঙ্গে এত পোকা? ১০-১২টা হবে। বিরক্ত করলেও উড়াল দিল না বা লাফাল না, একটু পাশ ফিরে শোয়ার মতো অবস্থানটা সামান্য বদলাল। কৌতূহল হলো এবার তাদের নিয়ে। এবারও ছবি তুলে ফিরে এসে তাকে চিনতে বসলাম বইপত্র ও ইন্টারনেট নিয়ে। ইন্টারনেট ঘেঁটে ওর পরিচয় জানা গেল অবশেষে। নাম তার সাদা মথ গাছফড়িং বা হোয়াইট মথ প্ল্যান্টহপার, তবে সে মথ না- হপার। এ পোকাটিকে নিয়ে কিছু গবেষণাপত্রও পেলাম নেটে। কিন্তু বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের ২০তম খণ্ডে হেমিপ্টেরা বর্গের মধ্যে এ পোকাটির কোনো উল্লেখ পেলাম না। বাংলাদেশে এটি নথিভুক্ত কি না, তা জানা নেই।

একটি গবেষণাপত্রে দেখলাম, ভারতীয় কীটতত্ত্ববিদরা এ পোকাকে লাক্ষা উৎপাদী উদ্ভিদের ক্ষতিকর পোকা হিসেবে নতুনভাবে চিনেছেন। এ পোকার আশ্রয়দাতা বা পোষক গাছ হিসেবে তারা অড়হর, পলাশ, বরই, শিশুগাছজাতীয় বৃক্ষ ইত্যাদিকে চিহ্নিত করেছেন। এর আগে ফিলিপিন্স ও ভারতে কোকোয়া এবং কাঞ্চনগাছে এ পোকার আক্রমণ লক্ষ্য করা গেছে। এমনকি আসামে লেবুজাতীয় গাছ এদের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেখা গেছে। ডালিয়া, জুঁই ও আমের মুকুলও এ পোকা দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যদিও এদের ক্ষতির মাত্রা খুব কম, তবুও তাকে এসব গাছের অপ্রধান ক্ষতিকর পোকা হিসেবে গণ্য করা হয়। 

গবেষকরা ঝাড়খন্ড রাজ্যের রাজধানী রাঁচির নামকুমে ফেব্রুয়ারি-মার্চে প্রাপ্তবয়স্ক পোকা ও নভেম্বর-ডিসেম্বরে এদের বাচ্চাদের দেখতে পেয়েছেন। আমি প্রাপ্তবয়স্ক পোকার দেখা পেলাম এ দেশে মে-জুনে। প্রাপ্তবয়স্ক স্ত্রী সাদা মথ গাছফড়িং কচি নরম পাতার মধ্যশিরায় ডিম পাড়ে। ডিম ফুটে বাচ্চারা বেরিয়েই প্রাপ্তবয়স্কদের মতো লাফাতে শুরু করে। বয়স ও বৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে বাচ্চাদের আকার ছোট-বড় হয়। পূর্ণবর্ধিত নিম্ফ বা বাচ্চার দেহের দৈর্ঘ্য প্রায় ৪ মিলিমিটার ও মোমবৎ সূক্ষ্ম আঁশ দ্বারা আবৃত। রসাল পাতার নিচের দিকে বা শাখার ডগায় মোমজাতীয় ক্ষরিত পদার্থের লম্বা, কোঁকড়ানো পশমের মতো আঁশ বা তন্তু প্রায়শই বাচ্চাদের আড়াল করে রাখে। এদের ডানার প্যাডগুলো সুগঠিত, তাতে একটি কালো রঙের আড়াআড়ি রেখা ও পায়ুখণ্ডের পিঠে একটি কালো দাগ থাকে। পূর্ণাঙ্গ পোকা সাধারণত সাদা রঙের, ১০ থেকে ২০ মিলিমিটার লম্বা হয়। সবচেয়ে চওড়া অংশের মাপ হয় ৪-৫ মিলিমিটার। এদের সামনের ডানাজোড়া চওড়া, ত্রিভুজাকার, গোড়ার অংশে দুটি কমলা রঙের ডোরা দাগ থাকে। পোকাটিকে হঠাৎ দেখে একটা গোজ বা কীলক-আকৃতির বলে মনে হয়, যা ওপর থেকে দেখলে পার্শ্বীয়ভাবে চাপা দেখায়। পিছনের ডানাজোড়া স্বচ্ছ। 

এই গাছফড়িংরা সাধারণত গাছের কচি ডগা, নতুন পাতা ও ফুল থেকে রস চুষে খেয়ে শুকিয়ে ফেলে। শুধু তাই না, খাওয়ার সময় এরা একধরনের মিষ্টি মধুরস ছাড়ে যার কারণে সেখানে আঠালো চটচটে দাগ হয় ও সেসব আঠালো অংশে এক ধরনের কালো ছাতার মতো আবরণ পড়ে। এটি এক ধরনের ছত্রাক, কালি ছত্রাক বা শুঁটি মোল্ড। এতে পোষকগাছ দুর্বল ও রোগগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এমনকি এর বাচ্চারাও রস চুষে খাওয়ার সময় একই কাজ করে, নিম্ফ বা বাচ্চার নিঃসৃত রসে কচি ডগা ঢেকে যায়।

সাদা মথ গাছফড়িং হেমিপ্টেরা বর্গের ফ্ল্যাটিডি গোত্রের এক ধরনের শোষক পোকা, প্রজাতিগত নাম Lawana conspersa. তিনটি ধাপে এদের জীবনচক্র সম্পন্ন হয়- ডিম, নিম্ফ ও পূর্ণাঙ্গ। যেহেতু এদের জীবনচক্রে কোনো পিউপা বা পুত্তলি  দশা নেই, তাই এদের জীবনচক্রকে অসম্পূর্ণ বলে গণ্য করা হয়। কোকোয়া গাছে এদের জীবনচক্র ১০৪.৭ দিনে সম্পন্ন হতে দেখা গেছে। এ দেশে এ পোকাটি নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা হতে পারে।  

লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ

হঠাৎ দেখা নীলমাথা হাঁস

প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬, ০৮:৩০ এএম
আপডেট: ২০ জুন ২০২৬, ০৮:৩২ এএম
হঠাৎ দেখা নীলমাথা হাঁস
রাজশাহী শহরের কাছে পদ্মা নদীর ওপর একটি উড়ন্ত নীলমাথা হাঁসা। ছবি: লেখক

চলতি বছরের ১৬ জানুয়ারি। বিরল শ্যামলা কাঁকাল (Isabelline Wheatear) পাখির সন্ধানে রাজশাহীর চরসাতবাড়িয়ার ডোগার ঘাটে এসেছি পদ্মা নদীর ১০ নম্বর চরে যাওয়ার জন্য। সঙ্গে আছে রাজশাহীর পক্ষী আলোকচিত্রী মারুফ রানা এবং দুই সহযোগীসহ চুয়াডাঙ্গার পাখি ও বন্যপ্রাণীপ্রেমী বখতিয়ার হামিদ। সকাল সাড়ে ৮টায় জাকারুল মাঝি নৌকা ছাড়লেন। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ভারত সীমান্তবর্তী ১০ নম্বর চরে পৌঁছে গেলাম। পথিমধ্যে চখাচখি (Ruddy Shelduck) ও পিয়ং হাঁসের (Gadwall) ঝাঁক ছাড়াও বড় খোঁপা ডুবুরি (Great-crested Grebe), ছোট সাদা বক (Little Egret) ও বিভিন্ন প্রজাতির সৈকত পাখির (Wader) দেখা পেলাম। চরে নামার ১৫ মিনিটের মধ্যে অতি আরাধ্য শ্যামলা কাঁকালের দেখা পেয়ে গেলাম। কিন্তু এর পরও আরও কটি বিরল ও দুর্লভ পাখির খোঁজে দুপুর সোয়া ২টা পর্যন্ত চরে থাকলাম। 

ফিরতি পথে আবারও চখাচখি ও পিয়ং হাঁসের ঝাঁক এবং বড় খোঁপা ডুবুরির দেখা পেলাম। সঙ্গে ধূপনি বক (Grey Heron), বড় জিরিয়া (Grey Plover), বড় বদরকৈতর (Pallas’s Gull) এবং বড় পানকৌড়িও (Great Cormorant) ছিল। ওদের ছবি তুলে প্রায় আধা ঘণ্টায় ডোগার ঘাটের কাছাকাছি আসতেই বিশাল এক হাঁসের ঝাঁকের দেখা মিলল। মিনিট দশেকের মধ্যেই ডোগার ঘাটে পৌঁছাব। কিন্তু চুয়াডাঙ্গা থেকে আসা পক্ষীপ্রেমী বখতিয়ার হামিদ ও তার সঙ্গীরা হাঁসের ঝাঁকের ছবি তুলতে চাওয়ায় নৌকার ইঞ্জিন থামিয়ে মাঝিকে ধীরে ধীরে বৈঠা মেরে ঝাঁকের পিছু নিতে বললাম।

ঝাঁকের প্রায় সবগুলোই ছিল পিয়ং হাঁস। তবে ওদের ভেতর তিনটি ভিন্ন প্রজাতির হাঁসও দেখলাম। লালচে কমলা রঙের চখাচখি, মাথায় কমলা সিঁথির লালশির এবং নীল মাথার এক দুর্লভ হাঁস। আমি ও মারুফ রানা একসঙ্গে প্রায় ১০ বছর পদ্মা নদীর চরে বহুবার ঘুরেও যে হাঁসটিকে খুঁজে পাইনি আজ সেই নীলমাথার হাঁসটি আমাদের চোখের সামনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ফিরতি পথে বিকেলটাই অর্থপূর্ণ হয়ে উঠল। মারুফ রানা পেল একটি নতুন হাঁস। অন্যরা পেল দুটি। আমি যদিও কোনো নতুন হাঁস পেলাম না, কিন্তু সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরের বাইরে এই প্রথম অন্য কোথাও এই হাঁসটির দেখা পেলাম। নীলমাথার এই হাঁসটিকে ১০ বছর আগে ২০১৬-এ সর্বপ্রথম টাঙ্গুয়ার হাওরেই দেখেছিলাম। এর পর থেকে টাঙ্গুয়ার প্রতিটি অভিযানেই ওকে দেখেছি। খুশি মনে ওর বেশ কিছু ছবি তুলে ডোগার ঘাটে ফিরে এলাম।

নীল মাথার সুদর্শন ও দুর্লভ এই পরিযায়ী হাঁসটির নাম নীলমাথা হাঁস বা নীলশির। বৈরাগী হাঁস নামেও পরিচিত। এরাই পুরো বিশ্বের গৃহপালিত হাঁসের পূর্বপুরুষ, যারা এখনো বুনো পরিবেশে প্রচুর সংখ্যায় বেঁচে আছে। ইংরেজি নাম Mallard। অ্যানাটিডি (Anatidae) গোত্রের হাঁসটির বৈজ্ঞানিক নাম Anas platyrhynchos (অ্যানাস প্ল্যাটিরিনকস)। উত্তর গোলার্ধের বিভিন্ন দেশের আবাসিক এই হাঁসকে দক্ষিণ আমেরিকা ও এশিয়াও দেখা যায়। শীতে পরিযায়ী হয়ে স্বল্পসংখ্যক হাঁস এ দেশে আসে।

নীলমাথা হাঁসের দেহের দৈর্ঘ্য ৫০-৬৫ সেন্টিমিটার। ওজনে হাঁসা ও হাঁসি যথাক্রমে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ ও ৭৯০ থেকে ১ হাজার ৩৫০ গ্রাম। হাঁসা ও হাঁসি দেখতে একেবারেই আলাদা, যদিও দুটিরই ডানায় গাঢ় নীল বন্ধনী থাকে। প্রজননকালীন হাঁসার মাথা ও ঘাড় ধাতব সবুজ, সূর্যের আলোয় যা চিকচিক করে। গলায় থাকে সাদা মালা। পালকের রং গাঢ় ধূসর, পেট হালকা, বুক বেগুনি-বাদামি এবং কালো লেজের মাঝখানের কয়েকটি পালক ওপরের দিকে বাঁকানো। ঠোঁট হলুদ ও পা কমলা। প্রজননকাল বাদে অন্য সময় হাঁসার পালকের রং অনেকটাই হাঁসির মতো হয়ে যায়। হাঁসির পুরো দেহ বাদামি, তার ওপর থাকে গাঢ় বাদামি ও হালকা হলদে দাগছোপ। হাঁসা-হাঁসি নির্বিশেষে চোখ বাদামি, চঞ্চু কালচে কমলা, পা ও পায়ের পাতা কমলা-হলুদ থেকে প্রবাল-লাল। অপ্রাপ্তবয়স্কগুলো দেখতে হাঁসির মতো।

মূল আবাস এলাকায় নীলমাথা হাঁস অগভীর হ্রদ, নদী, পুকুর ও উদ্যানে সচরাচর ঝাঁক বেঁধে ঘুরে বেড়ায়। শীতে এ দেশের সিলেট, বরিশাল ও ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন হাওর ও বিলে বিচরণ করতে দেখা যায়। পানিতে মাথা ডুবিয়ে জলজ লতাপাতা, ঘাস, বিচি, শামুক-গুগলি, ব্যাঙাচি, পোনা মাছ, কেঁচো ইত্যাদি খুঁজে খায়। হাঁসা নিচু স্বরে ‘ওয়াক-ওয়াক-ওয়াক…’ বা ‘মেক-মেক-মেক…’ এবং হাঁসি উচ্চস্বরে ‘কোয়াক-কোয়াক-কোয়াক…’ শব্দে ডাকে।

এপ্রিল থেকে জুলাই এদের প্রজননকাল। প্রজননের পর পরই হাঁসা অন্যত্র চলে যায়। কাজেই বাসা বানানো, ডিমে তা দেওয়া, ছানাদের যত্ন নেওয়া ইত্যাদি সবকিছু হাঁসিকেই একা একা করতে হয়। প্রজনন এলাকায় পানির কাছাকাছি মাটিতে ঘাস ও লতাপাতা দিয়ে হাঁসি বাসা বানায় ও তার ওপর বুকের পালক বিছিয়ে দেয়। ডিম পাড়ে ৬ থেকে ১৩টি। ডিমের রং ফ্যাকাশে সবুজাভ, নীলচে বা ঘিয়ে সাদা। ডিম ফোটে ২৬-২৮ দিনে। ছানারা মায়ের সঙ্গে প্রায় দুই মাস থাকে। চার মাস বয়সে ওরা উড়তে শেখে ও এক বছরে বয়ঃপ্রাপ্ত হয়। আয়ুষ্কাল ছয়-সাত বছর।

লেখক: পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর