ময়মনসিংহ শহরের ব্রহ্মপুত্র তীরের বিশ্বেশ্বরী দেবী রোডে অবস্থিত একটি বাড়িতে সোনালী ব্যাংকের শাখা। এটি মূলত গৌরীপুরের সংস্কৃতিমনা জমিদার ব্রজেন্দ্র কিশোর চৌধুরীর বাড়ি। ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে খান বাহাদুর ইসমাইল হোসেন সড়কে রাজরাজেশ্বরী ওয়াটার ওয়ার্কসের পাশে এর অবস্থান। ওই সময় দ্বিতল পাকা বাড়ি নির্মাণ নিষিদ্ধ থাকার কারণে গৌরীপুরের জমিদার ব্রজেন্দ্র কিশোর চৌধুরী চীন থেকে কারিগর এনে এই কাঠের দোতলা বাড়িটি তার জামাতা জগৎকিশোর আচার্য চৌধুরীর জন্য নির্মাণ করেন। জগৎকিশোর ছিলেন মুক্তাগাছার জমিদার রাম কিশোর আচার্য চৌধুরীর পুত্র। বর্তমানে এই দোতলা কাঠের বাড়িটি সোনালী ব্যাংকের অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ব্যাংকের মূল ভবনটি পরে নির্মিত হয়। এই ভবনের উত্তর-পশ্চিম দিকে দাঁড়িয়ে আছে একটি গনিয়ারি বৃক্ষ।
ময়মনসিংহের ব্রহ্মপুত্র ব্রিজের মোড় থেকে বাসে যারা উত্তরবঙ্গ বা দক্ষিণবঙ্গে যান এই গাছটি তাদের চোখে পড়তে পারে। চলতি বছরের ২৫ জুন গিয়েছিলাম এই গাছের কাছে। অনেক উঁচুতে ফুল ও ফল দেখে নিরাশ হয়েছিলাম। পরে নিচে হাতের নাগালের মধ্যে ফুল ও ফল পেয়ে ছবি তুলে ফেললাম ঝটপট।
এই গাছ ৭ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। এই গাছের বাকল বেশ পাতলা এবং খানিকটা পীতবর্ণের। পাতায় একটা সুঘ্রাণ আছে। কাঠের রং হয়ে থাকে ফিকে ধূসর। এই গাছের পাতা ৩-৪ ইঞ্চি লম্বা হয়। কিন্তু প্রস্থের দিকে বেশ প্রসারিত হয়। পাতা ডিম্বাকৃতির। তবে এই পাতার শেষ ভাগের বর্ধিত অংশ একটু সুচালো হয়ে থাকে। ফুল উভয় লিঙ্গ হয়। ফুলের রং সবুজাভ সাদা বর্ণের। অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকা, এশিয়াজুড়ে এই গাছের বিস্তৃতি। বাংলাদেশের সুন্দরবন, সিলেট, চট্টগ্রাম, ভারতের সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চলে প্রচুর গনিয়ারিগাছ পাওয়া যায়।
এর মঞ্জরিদণ্ডে গুচ্ছাকারে ফুল জন্মে। ফুলগুলো আকারে ছোট ও লোমযুক্ত। ফুলের রং ফিকে পীতাভ সবুজ। জ্যৈষ্ঠ ও আষাঢ় মাসে ফুল হয়। শ্রাবণ মাসের দিকে ফল ধরে এবং ভাদ্র মাসে ফল পাকে। ফলের আকার ২০ ইঞ্চির মতো। এই গাছের ছাল খুবই পাতলা হয়। পাতায় বিশেষ ধরনের গন্ধ আছে। মূলের ছালে বেশ মিষ্টি গন্ধ আছে, কিন্তু এর স্বাদ তিক্ত। পুষ্পদণ্ডে ঘন ঘন ফুল হয়। ফুল ছোট, কোমল, লোমযুক্ত। ফল ছোট। এর বীজ মটরের মতো। গ্রীষ্ম ও বর্ষা ফুল ও ফলের সময়।
গনিয়ারির বৈজ্ঞানিক নাম Premna serratifolia, এটি Lamiaceae পরিবারের বৃক্ষ। যার প্রজাতিক অংশ serratifolia-এর অর্থ খাঁজকাটা। আর গ্রিক Premna-এর অর্থ ‘কাণ্ড’। শিশু অবস্থায় এর পাতা খাঁজকাটা থাকে বলে এর এ রকম নামকরণ করা হয়েছে। বাংলায় এই বৃক্ষের অন্য নামগুলো হচ্ছে ভূতভৈরবী, গন্ধপত্রা। সংস্কৃত ভাষায় গনিকারিকা, অগ্নিমন্থ নামে ডাকা হয়। প্রাচীনকালে গনিয়ারিগাছের ডালে ডালে ঘষে আগুন জ্বালানো হতো বলে এর নাম অগ্নিকারিকা বা অগ্নিমন্থ হয়েছে। এই উদ্ভিদ ইংরেজিতে হ্যাডেক ট্রি, পাইনাস ফায়ার ব্যান্ড ট্রি, কোস্টাল প্রেমনা, গ্রিক প্রেমনা ইত্যাদি নামে পরিচিত।
গনিয়ারিগাছের পাতায় একধরনের সুঘ্রাণ থাকে, যে কারণে এটি কখনো কখনো ডালের সঙ্গে যোগ করা হয়। আবার মাছ রান্নার সময় আঁশটে গন্ধ বের হলে গনিয়ারি পাতা দেওয়া হয়। এতে গন্ধ দূর হয়ে যায়।
গনিয়ারিগাছের শিকড় বেটে খেলে পাকস্থলীর ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। এ ছাড়া সাধারণ জ্বর নিবারণ এবং আমবাত নিরাময়ে সাহায্য করে। পাতার রস কৃমিনাশক এবং পেটফাঁপা কমায়। গোলমরিচের সঙ্গে পাতা বেটে খেলে সর্দি-জ্বর ভালো হয়। রক্তে কোলেস্টেরল বেড়ে গেলে গাছের বাকলের গুঁড়া দেড় গ্রাম গরম পানিসহ খেলে কমে যায়। গনিয়ারি কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে। শরীরের কোমল স্থান আঘাতে ফুলে গেলে গনিয়ারি পাতা বেটে লাগালে সেরে যায়। কিডনির জটিলতায় স্বল্প প্রস্রাব হলে ও হাত-পা ফুলে গেলে ৩ থেকে ৪ চামচ গনিয়ারি পাতার রস অল্প গরম করে খেলে অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই কিডনির সমস্যা কেটে যায় এবং প্রস্রাব স্বাভাবিক হয়ে হাত-পায়ের ফোলা কমে যায়।
লেখক: অধ্যাপক, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, মুমিনুন্নিসা সরকারি মহিলা কলেজ, ময়মনসিংহ