ঢাকা ৯ আষাঢ় ১৪৩৩, মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
জাতীয়ভিত্তিক গ্রন্থপাঠ প্রতিযোগিতায় সেরা হলো বাতিঘর আদর্শ পাঠাগার লোহাগাড়ায় দুই বাসের সংঘর্ষে কলেজছাত্রী নিহত জীব ও পরিবেশের পারস্পরিক নির্ভরশীলতা অধ্যায় থেকে ৩টি অনুশীলনীর প্রশ্ন ও  উত্তর, ২য় পর্ব, পঞ্চম শ্রেণির বিজ্ঞান সাতকানিয়ায় যুবলীগ নেতা হাসান মাহমুদ গ্রেপ্তার বেনাপোলে আওয়ামী লীগের নৈরাজ্যের প্রতিবাদে শ্রমিক দলের বিক্ষোভ হ্যারি কেইনের ফর্মকে প্রশংসায় ভাসালেন ডেক্লান রাইস নিষিদ্ধ দলের তৎপরতা চোখে পড়া জাতির জন্য ব্যর্থতা: রেলপথমন্ত্রী ইবির কর্মচারীদের নিয়োগ যাচাইয়ে তদন্ত কমিটি, আতঙ্কে নিয়োগপ্রাপ্তরা বহুমাত্রিক সম্পর্কোন্নয়নে ভূমিকা রাখবে শরীয়তপুরে বিএনপির কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ পাঁচবিবিতে ট্রাকচাপায় যুবক নিহত ২৩ জুন: পাউন্ড ছাড়া সব মুদ্রার দাম কমেছে ইউসিটিসিতে ৭ম সিন্ডিকেট মিটিং অনুষ্ঠিত উখিয়ায় বিজিবির অভিযানে ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবা জব্দ, আটক ১ ভারতের লখনউয়ে অগ্নিকাণ্ডে ১৫ শিক্ষার্থীর মৃত্যু বিশেষ ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা পেল ৬ জেলার সেনা কর্মকর্তারা ২-১ গোলে জর্ডানকে হারিয়ে নকআউটের আশা জিইয়ে রাখলো আলজেরিয়া কাতারে কারখানায় ভয়াবহ বিস্ফোরণ: নিহত ১৩, আহত ৬৬ ইরানের তেল নিষেধাজ্ঞা আংশিক তুলে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র শিরোপার স্বপ্নে ভাসছেন না হালান্ড আশুরা উপলক্ষে ডিএমপির নির্দেশনা তৃণমূলের শীর্ষ পদ থেকে মমতাকে বাদ ১১৫ দিন পর হরমুজ অতিক্রম করল বাংলার জয়যাত্রা পর্তুগাল এখন যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি ঐক্যবদ্ধ: রবার্তো মার্তিনেস বিশ্ববিদ্যালয়ে জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতার চর্চা বাড়াতে হবে: ইবি উপাচার্য ইউএনওর আইডি ব্যবহার করে টেন্ডার কারসাজি টেকনাফে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি থেকে সরে যেতে মাইকিং বাউফল উপজেলা ছাত্রদল সভাপতি কারাগারে জাবিতে রোকনুজ্জামান খান ও বেগম রোকেয়ার জীবনকর্ম নিয়ে আলোচনা কার্যক্রম নিষিদ্ধ আ.লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ

বঙ্গোপসাগরে ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড় হয় ৫ কারণে

প্রকাশ: ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫, ১০:১১ এএম
বঙ্গোপসাগরে ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড় হয় ৫ কারণে
ছবি: সংগৃহীত

বঙ্গোপসাগর ঘূর্ণিঝড়প্রবণ এলাকা। গ্রীষ্মের শেষে মে-জুন মাস থেকে শুরু করে শীতের শুরুতে অক্টোবর-নভেম্বর মাস পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণে অবস্থিত বঙ্গোপসাগরে একের পর এক ছোট-বড় ঘূর্ণিঝড় তৈরি হয়। এর কোনোটি বিধ্বংসী হয়ে উঠে, আবার কোনোটি স্থলভাগের কাছাকাছি আসার আগেই শক্তি হারিয়ে ফেলে। বঙ্গোপসাগরের ঠিক বিপরীতে ভারতের পশ্চিম উপকূলে রয়েছে আরব সাগর। সেখানে বিষয়টা অন্যরকম। আরব সাগরেও মাঝেমধ্যে ঘূর্ণিঝড় দানা বাঁধে। তবে তা সংখ্যায় এত বেশি নয়। বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, বঙ্গোপসাগরে ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড় হওয়ার বিশেষ কারণ রয়েছে। 

সম্প্রতি বঙ্গোপসাগর এবং সংলগ্ন অঞ্চলে পর পর দুটি ঘূর্ণিঝড় তৈরি হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গের উপকূল থেকে অনেক দূরে দক্ষিণ প্রান্তের এই ঝড়গুলো বিস্তর বিপর্যয় ঘটিয়েছে। ঘূর্ণিঝড় সেনিয়ারকে সরাসরি ‘বিরল’ বলে উল্লেখ করেছে ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তর। ঘূর্ণিঝড়টি ইন্দোনেশিয়া এবং থাইল্যান্ডে তাণ্ডব চালিয়েছে। দুই দেশে মৃতের সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে ৬৫০। সেনিয়ার শান্ত হওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে দানা বাঁধে ঘূর্ণিঝড় দিটওয়া। এর প্রভাবে শ্রীলঙ্কায় বিস্তর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। স্থলভাগে আছড়ে না পড়েই ভারতের দক্ষিণের দ্বীপরাষ্ট্রে ৩৫০ জনের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। পরে ঘূর্ণিঝড়টি ভারতের উপকূলের সমান্তরালে ক্রমে উত্তরে এগিয়েছে এবং এক পর্যায়ে শক্তিও হারিয়েছে।

বিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণ বলছে, বঙ্গোপসাগরে বেশি ঘূর্ণিঝড় হওয়ার মোট পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে।

ভৌগোলিক অবস্থান: বঙ্গোপসাগর তিন দিক দিয়ে ভূমি দ্বারা বেষ্টিত। তাই সমুদ্রে উৎপন্ন হওয়া জলীয় বাষ্পপূর্ণ বায়ু অন্য কোনো দিকে যেতে পারে না। সাগরে আটকে পড়ে। পানির ওপর থাকতে থাকতে বায়ুর শক্তি বাড়ে এবং ঘূর্ণিঝড় তৈরি হয়। ক্রমে তা স্থলভাগে আছড়ে পড়ে। আরব সাগরের উত্তর এবং পূর্ব দিকে স্থলভাগ থাকলেও বাকি দুই দিক খোলা। তাই এখানে জলীয় বাষ্পপূর্ণ বায়ু আটকে পড়ার সম্ভাবনা তুলনামূলক কম।

পানির উষ্ণতা: ঘূর্ণিঝড় তৈরির অন্যতম প্রধান কারণ সমুদ্রের পানির উষ্ণতা। আরব সাগরের চেয়ে বঙ্গোপসাগরের পানি অনেক বেশি উষ্ণ। এখানে পানির তাপমাত্রা ২৮ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকে। এর ফলেও ঘূর্ণিঝড় তৈরির সম্ভাবনা বঙ্গোপসাগরে বেশি হয়।

আর্দ্র বায়ু: ঘূর্ণিঝড় তৈরির জন্য জলীয় বাষ্পপূর্ণ বাতাস অত্যন্ত প্রয়োজন। প্রশান্ত মহাসাগর এবং ভারত মহাসাগর থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণ আর্দ্র বায়ু বঙ্গোপসাগরে প্রবেশ করে। আরব সাগরের ক্ষেত্রে তা হয় না। তার চারপাশে পশ্চিম এশিয়ার মতো শুষ্ক স্থলভাগ রয়েছে। সেখান থেকে শুষ্ক বায়ু আরব সাগরের ওপরে আসে। তাতে আর্দ্রতা বেশি থাকে না।

খামখেয়ালি মৌসুমি বায়ু: দক্ষিণ-পশ্চিম এবং উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ু দ্বারা তুলনামূলক বেশি প্রভাবিত হয় বঙ্গোপসাগর। এই বায়ু প্রচুর জলীয় বাষ্প বয়ে আনে। মৌসুমি বায়ুর খামখেয়ালি স্বভাবের কারণে গোটা অঞ্চলে আবহাওয়ার পরিস্থিতি অস্থির, অস্থিতিশীল হয়ে থাকে। এর ফলে বাতাসের গতিবিধি বেশি হয়, যা ঘূর্ণিঝড় তৈরি করে।

পশ্চিমা ঘাট পর্বত: আরব সাগরের দিকে ভারতের পশ্চিম উপকূল জুড়ে রয়েছে বিশাল পশ্চিমঘাট পর্বত। পশ্চিম দিকে ঘূর্ণিঝড়ের অন্যতম প্রতিবন্ধক এই পর্বতমালা। বলা যায়, পশ্চিম উপকূলের রক্ষাকর্তা পশ্চিমঘাট। তার ফলে আর্দ্র বাতাস বাধা পায় এবং ঘূর্ণিঝড়ের প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করতে পারে না। যদিও বর্তমানে আবহাওয়া এবং জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে বিজ্ঞানীদের হিসাব গুলিয়ে যাচ্ছে। আরব সাগরেও আগের চেয়ে অনেক বেশি এবং অনেক বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড় তৈরি হচ্ছে। তবে বঙ্গোপসাগরের পরিস্থিতি বদলায়নি।

বঙ্গোপসাগরের একেবারে পূর্ব প্রান্তে রয়েছে মালাক্কা প্রণালি। ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের ভূখণ্ডকে বিচ্ছিন্ন করে ৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রণালি। এর ঠিক পশ্চিমে রয়েছে বঙ্গোপসাগরের পূর্বাংশ যা আন্দামান সাগর নামেও পরিচিত। কিছু দিন আগে এখানে তৈরি হয়েছিল ঘূর্ণিঝড় সেনিয়ার। বঙ্গোপসাগর ঘূর্ণিঝড়প্রবণ হলেও মালাক্কা প্রণালিতে ঘূর্ণিঝড় তৈরি হওয়া অত্যন্ত বিরল। বিজ্ঞানীরা তাই বিস্মিত হন। ঘূর্ণিঝড় সেনিয়ার ইন্দোনেশিয়ার দিকে এগিয়ে সেখানে তাণ্ডব চালিয়েছে। থাইল্যান্ডেও ১৭৬ জনের মৃত্যু হয়েছে এই বিরল ঘূর্ণিঝড়ের কারণে। মলাক্কা প্রণালি থেকে দূরে শ্রীলঙ্কার উপকূলের কাছে তৈরি হয়েছিল ঘূর্ণিঝড় দিটওয়া। এর প্রভাবে প্রবল বৃষ্টি হয়েছে শ্রীলঙ্কায়। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিও হয়েছে। তথ্যসূত্র: ব্লুমবার্গ

হারিয়ে যেতে বসা হলুদ পাহাড়ি কচ্ছপ উদ্ধার

প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬, ০৯:২৭ এএম
আপডেট: ২৩ জুন ২০২৬, ০৯:৩১ এএম
হারিয়ে যেতে বসা হলুদ পাহাড়ি কচ্ছপ উদ্ধার
ছবি: খবরের কাগজ

চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় বস্তাবন্দি অবস্থায় হারিয়ে যেতে বসা একটি হলুদ পাহাড়ি কচ্ছপ উদ্ধার করেছে বন বিভাগ। পরে উদ্ধারকৃত কচ্ছপটিকে সংরক্ষিত বনাঞ্চলে অবমুক্ত করা হয়েছে।

গতকাল সোমবার বেলা ১২টার দিকে উপজেলার বাজালিয়া ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্সের সামনে থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় বস্তাবন্দি কচ্ছপটিকে উদ্ধার করা হয়।

জানা যায়, বাজালিয়া ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্সের সামনে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা দাঁড়িয়ে ছিল। চালক একটি দোকান থেকে খাবার খেয়ে অটোরিকশায় ওঠার সময় সামনের সিটের পাশে বস্তাবন্দি অবস্থায় কচ্ছপটি দেখতে পান। এর পর স্থানীয়রা বড়দুয়ারা বিট কাম চেক স্টেশন কর্মকর্তাকে খবর দেন। পরে তারা এসে হলুদ পাহাড়ি কচ্ছপটি উদ্ধার করে সংরক্ষিত বনাঞ্চলে অবমুক্ত করেন।

বড়দুয়ারা বিট কাম থেকে স্টেশন কর্মকর্তা মো. ফজলুল কাদের চৌধুরী বলেন, এটি মূলত মহাবিপন্ন প্রজাতির হলুদ পাহাড়ি কচ্ছপ। সাধারণত এরা ডাঙায় বসবাস করে। উদ্ধারের পরপরই কচ্ছপটি সংরক্ষিত বনাঞ্চলে অবমুক্ত করা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, বন বিভাগ ও প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএনের হিসাবে বাংলাদেশে মোট ৩০ প্রজাতির কচ্ছপ পাওয়া যায়। এদের মধ্যে হলুদ পাহাড়ি কচ্ছপ হচ্ছে একটি মহাবিপন্ন প্রজাতি। এরা ডাঙাতেই বেশি সময় থাকে।

রূপবতী সাদা মথ গাছফড়িং

প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬, ০৮:২৩ এএম
রূপবতী সাদা মথ গাছফড়িং
মিরপুরে জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে সম্প্রতি দেখা সাদা মথ গাছফড়িং। ছবি: লেখক

মিরপুর থেকে প্রকৃতিবন্ধু জিয়া ভাই গত ২৩ মে খবর দিলেন, জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে বন আসরা গাছে ফুল ফুটেছে। দেখতে হলে যেন চট করে চলে যাই সেখানে। পরদিন যেতে পারলাম না, গেলাম তার পরের দিন, ২৫ মে। সকাল সকাল গিয়েও ব্যর্থ হলাম সে ফুল দেখতে। হায়! সব যে ঝরে গেছে। তলায় বাসি ও শুকনো বাদামি ফুল পড়ে আছে। ইয়া লম্বা বিশাল গাছের ডালপালার দিকে যতই তাকিয়ে ফুল খুঁজতে থাকি, কোথাও পাই না। হতাশ হয়ে তাই এবার নিচের দিকে তাকালাম। আশপাশের ঝোপঝাড়ে পোকামাকড় খুঁজতে লাগলাম। বেশ কয়েক রকমের মাকড়সার দেখা পেলাম। কিন্তু একটা গাছের ডালে পাতার আড়ালে লুকিয়ে বসে থাকা এমন একটি পোকার দেখা পেলাম, যা আগে দেখিনি।

পোকাটি দেখতে ছোট সাদা মথের মতো, কিন্তু এর তাঁবুর মতো ডানার গড়ন, সূক্ষ্ম মলিন মেরুন দাগের আঁকিবুঁকির দুধেল চেহারা দেখে মুগ্ধ হলাম। কে সে সুন্দরী? ছবি তুলে সেদিনের মতো ফিরে এলাম। আবার  ১৩ জুন গেলাম সে উদ্যানে। এবার অন্য স্পট, ক্যান্টিনের কাছাকাছি বাতিলতাগাছ।

এবার আরও বিস্মিত হলাম। একটা ডালে অনেকগুলো পোকা লাইন ধরে বসে আছে। একসঙ্গে এত পোকা? ১০-১২টা হবে। বিরক্ত করলেও উড়াল দিল না বা লাফাল না, একটু পাশ ফিরে শোয়ার মতো অবস্থানটা সামান্য বদলাল। কৌতূহল হলো এবার তাদের নিয়ে। এবারও ছবি তুলে ফিরে এসে তাকে চিনতে বসলাম বইপত্র ও ইন্টারনেট নিয়ে। ইন্টারনেট ঘেঁটে ওর পরিচয় জানা গেল অবশেষে। নাম তার সাদা মথ গাছফড়িং বা হোয়াইট মথ প্ল্যান্টহপার, তবে সে মথ না- হপার। এ পোকাটিকে নিয়ে কিছু গবেষণাপত্রও পেলাম নেটে। কিন্তু বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষের ২০তম খণ্ডে হেমিপ্টেরা বর্গের মধ্যে এ পোকাটির কোনো উল্লেখ পেলাম না। বাংলাদেশে এটি নথিভুক্ত কি না, তা জানা নেই।

একটি গবেষণাপত্রে দেখলাম, ভারতীয় কীটতত্ত্ববিদরা এ পোকাকে লাক্ষা উৎপাদী উদ্ভিদের ক্ষতিকর পোকা হিসেবে নতুনভাবে চিনেছেন। এ পোকার আশ্রয়দাতা বা পোষক গাছ হিসেবে তারা অড়হর, পলাশ, বরই, শিশুগাছজাতীয় বৃক্ষ ইত্যাদিকে চিহ্নিত করেছেন। এর আগে ফিলিপিন্স ও ভারতে কোকোয়া এবং কাঞ্চনগাছে এ পোকার আক্রমণ লক্ষ্য করা গেছে। এমনকি আসামে লেবুজাতীয় গাছ এদের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেখা গেছে। ডালিয়া, জুঁই ও আমের মুকুলও এ পোকা দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যদিও এদের ক্ষতির মাত্রা খুব কম, তবুও তাকে এসব গাছের অপ্রধান ক্ষতিকর পোকা হিসেবে গণ্য করা হয়। 

গবেষকরা ঝাড়খন্ড রাজ্যের রাজধানী রাঁচির নামকুমে ফেব্রুয়ারি-মার্চে প্রাপ্তবয়স্ক পোকা ও নভেম্বর-ডিসেম্বরে এদের বাচ্চাদের দেখতে পেয়েছেন। আমি প্রাপ্তবয়স্ক পোকার দেখা পেলাম এ দেশে মে-জুনে। প্রাপ্তবয়স্ক স্ত্রী সাদা মথ গাছফড়িং কচি নরম পাতার মধ্যশিরায় ডিম পাড়ে। ডিম ফুটে বাচ্চারা বেরিয়েই প্রাপ্তবয়স্কদের মতো লাফাতে শুরু করে। বয়স ও বৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে বাচ্চাদের আকার ছোট-বড় হয়। পূর্ণবর্ধিত নিম্ফ বা বাচ্চার দেহের দৈর্ঘ্য প্রায় ৪ মিলিমিটার ও মোমবৎ সূক্ষ্ম আঁশ দ্বারা আবৃত। রসাল পাতার নিচের দিকে বা শাখার ডগায় মোমজাতীয় ক্ষরিত পদার্থের লম্বা, কোঁকড়ানো পশমের মতো আঁশ বা তন্তু প্রায়শই বাচ্চাদের আড়াল করে রাখে। এদের ডানার প্যাডগুলো সুগঠিত, তাতে একটি কালো রঙের আড়াআড়ি রেখা ও পায়ুখণ্ডের পিঠে একটি কালো দাগ থাকে। পূর্ণাঙ্গ পোকা সাধারণত সাদা রঙের, ১০ থেকে ২০ মিলিমিটার লম্বা হয়। সবচেয়ে চওড়া অংশের মাপ হয় ৪-৫ মিলিমিটার। এদের সামনের ডানাজোড়া চওড়া, ত্রিভুজাকার, গোড়ার অংশে দুটি কমলা রঙের ডোরা দাগ থাকে। পোকাটিকে হঠাৎ দেখে একটা গোজ বা কীলক-আকৃতির বলে মনে হয়, যা ওপর থেকে দেখলে পার্শ্বীয়ভাবে চাপা দেখায়। পিছনের ডানাজোড়া স্বচ্ছ। 

এই গাছফড়িংরা সাধারণত গাছের কচি ডগা, নতুন পাতা ও ফুল থেকে রস চুষে খেয়ে শুকিয়ে ফেলে। শুধু তাই না, খাওয়ার সময় এরা একধরনের মিষ্টি মধুরস ছাড়ে যার কারণে সেখানে আঠালো চটচটে দাগ হয় ও সেসব আঠালো অংশে এক ধরনের কালো ছাতার মতো আবরণ পড়ে। এটি এক ধরনের ছত্রাক, কালি ছত্রাক বা শুঁটি মোল্ড। এতে পোষকগাছ দুর্বল ও রোগগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এমনকি এর বাচ্চারাও রস চুষে খাওয়ার সময় একই কাজ করে, নিম্ফ বা বাচ্চার নিঃসৃত রসে কচি ডগা ঢেকে যায়।

সাদা মথ গাছফড়িং হেমিপ্টেরা বর্গের ফ্ল্যাটিডি গোত্রের এক ধরনের শোষক পোকা, প্রজাতিগত নাম Lawana conspersa. তিনটি ধাপে এদের জীবনচক্র সম্পন্ন হয়- ডিম, নিম্ফ ও পূর্ণাঙ্গ। যেহেতু এদের জীবনচক্রে কোনো পিউপা বা পুত্তলি  দশা নেই, তাই এদের জীবনচক্রকে অসম্পূর্ণ বলে গণ্য করা হয়। কোকোয়া গাছে এদের জীবনচক্র ১০৪.৭ দিনে সম্পন্ন হতে দেখা গেছে। এ দেশে এ পোকাটি নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা হতে পারে।  

লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ

হঠাৎ দেখা নীলমাথা হাঁস

প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬, ০৮:৩০ এএম
আপডেট: ২০ জুন ২০২৬, ০৮:৩২ এএম
হঠাৎ দেখা নীলমাথা হাঁস
রাজশাহী শহরের কাছে পদ্মা নদীর ওপর একটি উড়ন্ত নীলমাথা হাঁসা। ছবি: লেখক

চলতি বছরের ১৬ জানুয়ারি। বিরল শ্যামলা কাঁকাল (Isabelline Wheatear) পাখির সন্ধানে রাজশাহীর চরসাতবাড়িয়ার ডোগার ঘাটে এসেছি পদ্মা নদীর ১০ নম্বর চরে যাওয়ার জন্য। সঙ্গে আছে রাজশাহীর পক্ষী আলোকচিত্রী মারুফ রানা এবং দুই সহযোগীসহ চুয়াডাঙ্গার পাখি ও বন্যপ্রাণীপ্রেমী বখতিয়ার হামিদ। সকাল সাড়ে ৮টায় জাকারুল মাঝি নৌকা ছাড়লেন। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ভারত সীমান্তবর্তী ১০ নম্বর চরে পৌঁছে গেলাম। পথিমধ্যে চখাচখি (Ruddy Shelduck) ও পিয়ং হাঁসের (Gadwall) ঝাঁক ছাড়াও বড় খোঁপা ডুবুরি (Great-crested Grebe), ছোট সাদা বক (Little Egret) ও বিভিন্ন প্রজাতির সৈকত পাখির (Wader) দেখা পেলাম। চরে নামার ১৫ মিনিটের মধ্যে অতি আরাধ্য শ্যামলা কাঁকালের দেখা পেয়ে গেলাম। কিন্তু এর পরও আরও কটি বিরল ও দুর্লভ পাখির খোঁজে দুপুর সোয়া ২টা পর্যন্ত চরে থাকলাম। 

ফিরতি পথে আবারও চখাচখি ও পিয়ং হাঁসের ঝাঁক এবং বড় খোঁপা ডুবুরির দেখা পেলাম। সঙ্গে ধূপনি বক (Grey Heron), বড় জিরিয়া (Grey Plover), বড় বদরকৈতর (Pallas’s Gull) এবং বড় পানকৌড়িও (Great Cormorant) ছিল। ওদের ছবি তুলে প্রায় আধা ঘণ্টায় ডোগার ঘাটের কাছাকাছি আসতেই বিশাল এক হাঁসের ঝাঁকের দেখা মিলল। মিনিট দশেকের মধ্যেই ডোগার ঘাটে পৌঁছাব। কিন্তু চুয়াডাঙ্গা থেকে আসা পক্ষীপ্রেমী বখতিয়ার হামিদ ও তার সঙ্গীরা হাঁসের ঝাঁকের ছবি তুলতে চাওয়ায় নৌকার ইঞ্জিন থামিয়ে মাঝিকে ধীরে ধীরে বৈঠা মেরে ঝাঁকের পিছু নিতে বললাম।

ঝাঁকের প্রায় সবগুলোই ছিল পিয়ং হাঁস। তবে ওদের ভেতর তিনটি ভিন্ন প্রজাতির হাঁসও দেখলাম। লালচে কমলা রঙের চখাচখি, মাথায় কমলা সিঁথির লালশির এবং নীল মাথার এক দুর্লভ হাঁস। আমি ও মারুফ রানা একসঙ্গে প্রায় ১০ বছর পদ্মা নদীর চরে বহুবার ঘুরেও যে হাঁসটিকে খুঁজে পাইনি আজ সেই নীলমাথার হাঁসটি আমাদের চোখের সামনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ফিরতি পথে বিকেলটাই অর্থপূর্ণ হয়ে উঠল। মারুফ রানা পেল একটি নতুন হাঁস। অন্যরা পেল দুটি। আমি যদিও কোনো নতুন হাঁস পেলাম না, কিন্তু সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরের বাইরে এই প্রথম অন্য কোথাও এই হাঁসটির দেখা পেলাম। নীলমাথার এই হাঁসটিকে ১০ বছর আগে ২০১৬-এ সর্বপ্রথম টাঙ্গুয়ার হাওরেই দেখেছিলাম। এর পর থেকে টাঙ্গুয়ার প্রতিটি অভিযানেই ওকে দেখেছি। খুশি মনে ওর বেশ কিছু ছবি তুলে ডোগার ঘাটে ফিরে এলাম।

নীল মাথার সুদর্শন ও দুর্লভ এই পরিযায়ী হাঁসটির নাম নীলমাথা হাঁস বা নীলশির। বৈরাগী হাঁস নামেও পরিচিত। এরাই পুরো বিশ্বের গৃহপালিত হাঁসের পূর্বপুরুষ, যারা এখনো বুনো পরিবেশে প্রচুর সংখ্যায় বেঁচে আছে। ইংরেজি নাম Mallard। অ্যানাটিডি (Anatidae) গোত্রের হাঁসটির বৈজ্ঞানিক নাম Anas platyrhynchos (অ্যানাস প্ল্যাটিরিনকস)। উত্তর গোলার্ধের বিভিন্ন দেশের আবাসিক এই হাঁসকে দক্ষিণ আমেরিকা ও এশিয়াও দেখা যায়। শীতে পরিযায়ী হয়ে স্বল্পসংখ্যক হাঁস এ দেশে আসে।

নীলমাথা হাঁসের দেহের দৈর্ঘ্য ৫০-৬৫ সেন্টিমিটার। ওজনে হাঁসা ও হাঁসি যথাক্রমে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ ও ৭৯০ থেকে ১ হাজার ৩৫০ গ্রাম। হাঁসা ও হাঁসি দেখতে একেবারেই আলাদা, যদিও দুটিরই ডানায় গাঢ় নীল বন্ধনী থাকে। প্রজননকালীন হাঁসার মাথা ও ঘাড় ধাতব সবুজ, সূর্যের আলোয় যা চিকচিক করে। গলায় থাকে সাদা মালা। পালকের রং গাঢ় ধূসর, পেট হালকা, বুক বেগুনি-বাদামি এবং কালো লেজের মাঝখানের কয়েকটি পালক ওপরের দিকে বাঁকানো। ঠোঁট হলুদ ও পা কমলা। প্রজননকাল বাদে অন্য সময় হাঁসার পালকের রং অনেকটাই হাঁসির মতো হয়ে যায়। হাঁসির পুরো দেহ বাদামি, তার ওপর থাকে গাঢ় বাদামি ও হালকা হলদে দাগছোপ। হাঁসা-হাঁসি নির্বিশেষে চোখ বাদামি, চঞ্চু কালচে কমলা, পা ও পায়ের পাতা কমলা-হলুদ থেকে প্রবাল-লাল। অপ্রাপ্তবয়স্কগুলো দেখতে হাঁসির মতো।

মূল আবাস এলাকায় নীলমাথা হাঁস অগভীর হ্রদ, নদী, পুকুর ও উদ্যানে সচরাচর ঝাঁক বেঁধে ঘুরে বেড়ায়। শীতে এ দেশের সিলেট, বরিশাল ও ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন হাওর ও বিলে বিচরণ করতে দেখা যায়। পানিতে মাথা ডুবিয়ে জলজ লতাপাতা, ঘাস, বিচি, শামুক-গুগলি, ব্যাঙাচি, পোনা মাছ, কেঁচো ইত্যাদি খুঁজে খায়। হাঁসা নিচু স্বরে ‘ওয়াক-ওয়াক-ওয়াক…’ বা ‘মেক-মেক-মেক…’ এবং হাঁসি উচ্চস্বরে ‘কোয়াক-কোয়াক-কোয়াক…’ শব্দে ডাকে।

এপ্রিল থেকে জুলাই এদের প্রজননকাল। প্রজননের পর পরই হাঁসা অন্যত্র চলে যায়। কাজেই বাসা বানানো, ডিমে তা দেওয়া, ছানাদের যত্ন নেওয়া ইত্যাদি সবকিছু হাঁসিকেই একা একা করতে হয়। প্রজনন এলাকায় পানির কাছাকাছি মাটিতে ঘাস ও লতাপাতা দিয়ে হাঁসি বাসা বানায় ও তার ওপর বুকের পালক বিছিয়ে দেয়। ডিম পাড়ে ৬ থেকে ১৩টি। ডিমের রং ফ্যাকাশে সবুজাভ, নীলচে বা ঘিয়ে সাদা। ডিম ফোটে ২৬-২৮ দিনে। ছানারা মায়ের সঙ্গে প্রায় দুই মাস থাকে। চার মাস বয়সে ওরা উড়তে শেখে ও এক বছরে বয়ঃপ্রাপ্ত হয়। আয়ুষ্কাল ছয়-সাত বছর।

লেখক: পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর 

ইয়াংজির বুনো পরিবেশেই হচ্ছে স্টার্জন মাছের প্রজনন

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ০৬:২৩ পিএম
ইয়াংজির বুনো পরিবেশেই হচ্ছে স্টার্জন মাছের প্রজনন
স্টার্জন মাছ।

চীনের সিছুয়ান প্রদেশের চিয়াং’আন কাউন্টিতে ইয়াংজি নদীর উজান অংশে ইয়াংজি স্টার্জন মাছকে ঘিরে রচিত হচ্ছে আশাব্যঞ্জক নতুন অধ্যায়। সেখানে এখন বুনো পরিবেশেই এ মাছের প্রজনন ঘটে চলেছে। 


ইয়াংজি স্টার্জন হলো পৃথিবীর প্রাচীনতম মেরুদণ্ডী প্রাণীগুলোর একটি। ডাইনোসরদের যুগেও এরা ছিল। এখন শুধু ইয়াংজি নদী অববাহিকায় পাওয়া এই মাছ চীনের প্রথম শ্রেণির জাতীয় সুরক্ষাপ্রাপ্ত বন্যপ্রাণী হিসেবে তালিকাভুক্ত।


২০২২ সালের জুলাইয়ে আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সুরক্ষা ইউনিয়ন ইয়াংজি স্টার্জনকে প্রকৃতিতে বিলুপ্ত ঘোষণা করেছিল। এরপর থেকে চীন এই বিরল প্রজাতি রক্ষায় ব্যাপক উদ্যোগ নেয়। এরপরই এ মাছটি ধরায় নিষেধাজ্ঞা, আইনগত সুরক্ষা, কৃত্রিম প্রজনন, নদীতে মাছ অবমুক্তকরণ এবং প্রাকৃতিক পরিবেশে স্বাভাবিক প্রজনন উৎসাহিত করার কর্মসূচি শুরু হয় জোরেসোরে।

 


২০২২ সালের শেষ দিকে একাধিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইয়াংজি স্টার্জনের বন্য পরিবেশে প্রজনন ঘটানোর লক্ষ্যে পরীক্ষামূলক প্রকল্প শুরু করে। সেই প্রচেষ্টার ফল পাওয়া যায় চলতি বছরের ১৪ এপ্রিল, যখন একটি বৈজ্ঞানিক দল ঘোষণা করে—প্রথমবারের মতো মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই প্রাকৃতিক ডিম পাড়ার স্থানে ইয়াংজি স্টার্জনের ডিম পাড়া এবং সফলভাবে পোনা ফোটার ঘটনা পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।


গবেষকদের মতে, এটি প্রকৃতিতে বিলুপ্ত ঘোষিত একটি প্রজাতির সংখ্যা বৃদ্ধির পথে ঐতিহাসিক অগ্রগতি এবং ইয়াংজি নদীর পরিবেশগত পুনরুদ্ধার ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।


পূর্ব চীন সাগর ফিশারিস গবেষণা কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক চুয়াং পিং জানালেন প্রাকৃতিক প্রজননের এই ঘটনা অত্যন্ত উৎসাহব্যঞ্জক এবং এটি প্রমাণ করে ইয়াংজি নদীর পরিবেশ পুনরুদ্ধার কার্যক্রম ইতিবাচক ফল দিচ্ছে।


তিনি আরও উল্লেখ করেন, শুধু উজান অংশেই ১০০টিরও বেশি বিরল মাছের প্রজাতি রয়েছে, যেগুলো পৃথিবীর অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। তাই ইয়াংজি স্টার্জনের দীর্ঘমেয়াদি পুনরুদ্ধারের জন্য পুরো নদী অববাহিকার বাস্তুতন্ত্রের সুস্থতা নিশ্চিত করা জরুরি বলেও জানান তিনি।


ভবিষ্যতে গবেষকরা ডিম পাড়ার স্থানের পরিবেশগত পরিবর্তন সারা বছর পর্যবেক্ষণ করবেন এবং স্টার্জনের অভিবাসন আচরণ নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাবেন, যাতে প্রাকৃতিক প্রজনন কর্মসূচির সাফল্য বৈজ্ঞানিকভাবে মূল্যায়ন করা যায়। সূত্র: সিএমজি

দেখা পেলাম দুষ্প্রাপ্য চামেলির

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ১০:০৩ এএম
আপডেট: ১৯ জুন ২০২৬, ১০:৩৪ এএম
দেখা পেলাম দুষ্প্রাপ্য চামেলির
মিরপুরে জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে সম্প্রতি ফোটা চামেলি ফুল। ছবি: লেখক

‘গ্রীষ্মকাল, জ্যৈষ্ঠের ত্রিশ তারিখ, সকাল সাতটা সাঁইত্রিশ মিনিট। অবশেষে দেখা হলো চামেলির সঙ্গে। আহা কী শুভ্র স্নিগ্ধ ফুল! তীব্র সুগন্ধে ভরা ফুলের ঝোপটার নিচে দাঁড়িয়ে আমি বিমোহিত হয়ে গেলাম। এক অনাবিল আনন্দে মনটা ভরে উঠল। আহা, কতদিন যে এই ক্ষণটির জন্য অপেক্ষা করেছি!’

গত বসন্ত থেকে প্রতি মাসেই দু-চারবার করে জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে যাই আর চামেলিকে দেখব বলে নার্সারির গেটে কড়া নাড়ি, লতানো ঝোপটার কাছে যাই। প্রতিবারই হতাশ হই। অবশেষে ১২ জুন বৃক্ষবন্ধু আজহার ভাইয়ের একটা পোস্টে চামেলি ফুলের ছবি দেখে ভোর হতেই ছুটে যাই সে ফুল চাক্ষুষ করতে। রোদের তেজ নেই, ফুল সকালেও সতেজ রয়েছে।

কত জায়গায় যে খুঁজেছি চামেলিকে! কিন্তু প্রতিবারই হতাশ হয়ে ফিরে এসেছি। এর আগে রমনা ও বলধায় খুঁজেছি চামেলিকে, দেখা পাইনি। নিসর্গী বিপ্রদাশ বড়ুয়া বলেছিলেন, চামেলি হাউসে (সিরডাপ) চামেলি আছে, এখন সেখানেও নেই। অবশেষে জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের এই সবেধন নীলমণি একটি গাছের চামেলি ফুলকে দেখে নজরুলসংগীতের একটা লাইন মনে পড়ল–‘বনে মোর ফুটেছে হেনা চামেলি যূথী বেলি।’

পাঁচ পাপড়ির ফুলগুলো যেন সদ্যঃস্নাতা রমণী, পবিত্র ও শুভ্র। মিষ্টি গন্ধের নেশায় তার কাছে ছুটে গেলাম। খুব কাছ থেকে এই প্রথম চামেলিকে দেখা। চামেলি ফুলকে একজন সুন্দরী রমণীর সঙ্গে তুলনা করা বোধহয় ভুলই হলো। কেননা, সে তুলনা তো কবি কাজী নজরুল ইসলামই করতে পারেননি। তার একটি গানেই তিনি এ কথা স্বীকার করে লিখেছেন: ‘গোলাপ বেলী যুঁই চামেলী–কোন্ ফুল তারি তুল্ গো/ তার যৌবন-নদী বয় নিরবধি ভাসায়ে দুকূল গো..।’ চামেলির সঙ্গে আর কোনো ফুলের তুলনাই যেন হয় না। চামেলি যেন কবিদের ফুল, এ জন্য এর এক ইংরেজি নাম রাখা হয়েছে পোয়েট’স জেসমিন।

চামেলিকে দেখে মনে হলো, ফুল ও নারী–এর মধ্যে কোনটি বেশি সুন্দর? ফুল যেমন বীজ উৎপাদী, নারী তেমন সন্তান উৎপাদী। দুটিই উর্বরতার প্রতীক। প্রকৃতিকে টিকিয়ে রাখতে এ দুটি সত্তারই প্রয়োজন অনিবার্য, এ দুটির কোনো একটি না থাকলেই এ বিশ্ব সৃষ্টিতে ঘটবে চরম বিশৃঙ্খলা। এসব কথা চিন্তা করতে করতেই ভাবলাম চামেলিকে নিয়ে বাংলা সাহিত্যে কত যে মাতামাতি, সেই চামেলি এখন আমার সামনে ফুটে রয়েছে, লতায় লতায় দোল খাচ্ছে। অবাক হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম। কেননা, চামেলি এ দেশে দুষ্প্রাপ্য ফুল বলে প্রকৃতিবন্ধু মোকারম হোসেন তার বাংলাদেশের পুষ্প-বৃক্ষ লতা-গুল্ম বইয়ে লিখেছেন। সেই দুষ্প্রাপ্য ফুলকে দেখতে পাব ভাবিনি। সঙ্গে ছিলেন আরেক প্রকৃতিবন্ধু সৌমিক। দুজনে তখন চামেলির ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে উঠলাম।

চামেলির আরেক বাংলা নাম জাঁতি। চামেলি জুঁইজাতীয় ফুল হলেও জুঁই ফুলের সঙ্গে এর কিছুটা পার্থক্য আছে। সেটি খুব ভালো করে খেয়াল না করলে চামেলিকেই জুঁই বলে মনে হতে পারে। চামেলি ফুল জুঁই ফুলের চেয়ে বড়, পাপড়ি জুঁই ফুলের চেয়ে লম্বা ও সরু, কিন্তু রং ও সুগন্ধ প্রায় জুঁই ফুলের মতোই, যেন আতরের ঘ্রাণমাখা। প্রধানত গ্রীষ্ম-বর্ষায় ফুল ফোটে।

চামেলি ফুলের উর্দু নাম চাম্বেলী। ধারণা করা হয়, সেই উর্দু নাম কালক্রমে বাংলায় হয়েছে চামেলী বা চামেলি। চামেলি মূলত সংস্কৃত ভাষার মিলগত স্ত্রীবাচক নাম, যা সৌন্দর্য, পবিত্রতা, ভালোবাসা ও সুগন্ধকে প্রকাশ করে। এর ইংরেজি নাম স্প্যানিশ জেসমিন ও রয়্যাল জেসমিন। সব জুঁইজাতীয় ফুলকেই জেসমিন বলা হয়, পার্সি ভাষায় বলে ইয়াসমিন। সেখান থেকেই এর গণগত নাম হয়েছে জেসমিনাম ও প্রজাতিগত নাম Jasminum grandiflorum. গ্র্যান্ডিফ্লোরোম অর্থ ‘মিষ্টি সুগন্ধযুক্ত’, গোত্র ওলিয়েসি।

চামেলি একটি চিরসবুজ কাষ্ঠল লতা। লতার গিঁট থেকে কোনো আকর্ষি বের হয় না। প্রতিটি গিঁটের দুপাশে বিপরীতমুখীভাবে দুটি যৌগিক পক্ষল পাতা জন্মে। পত্রক ডিম্বাকার, ছোট, অগ্রভাগ সরু, চকচকে সবুজ, মসৃণ। বাইতে দিলে এ গাছ ২ থেকে ৩ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। তবে গাছ ছেঁটে ছোট করে রাখা যায়। ফুলের পাপড়ি সাদা, সুগন্ধী ও ফোটা ফুলের বিস্তৃতি প্রায় ৫ সেন্টিমিটার। গাছ কষ্ট সইতে পারে, দিনের প্রখর রোদ ও গরমেও গাছের ক্ষতি হয় না, এমনকি রাতে নিম্ন তাপমাত্রাতেও গাছের কোনো ক্ষতি হয় না। ধীর বৃদ্ধিসম্পন্ন গাছ, বিশেষ করে চারা লাগানোর পর প্রথম দুই বছর পর্যন্ত বাড়ে কম, ভোরে ফুল ফোটে, বেলা বাড়লেই নেতিয়ে যায়। বীজ ও গুটিকলমের মাধ্যমে চারা তৈরি করা যায়।

লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ