সোনাদিয়া দ্বীপ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে কক্সবাজার জেলার মহেশখালী উপজেলার কুতুবজোম ইউনিয়নে অবস্থিত। এটি মূলত মহেশখালী দ্বীপের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত এবং মহেশখালী থেকে একটি সংকীর্ণ খাল বা চ্যানেল দ্বারা বিচ্ছিন্ন। কক্সবাজার শহর থেকে এর দূরত্ব উত্তর-পশ্চিমে প্রায় ১৫ কিলোমিটার। এই দ্বীপে একসময় ছিল ৫৬৭ প্রজাতির উদ্ভিদ, ১৫২ প্রজাতির শামুক, ২১ প্রজাতির কাঁকড়া, ৯ প্রজাতির চিংড়ি, ২০৭ প্রজাতির মাছ, ১২ প্রজাতির উভচর, ১৯ প্রজাতির সরীসৃপ এবং ২০৬ প্রজাতির পাখির অভয়ারণ্য। দ্বীপটি পরিযায়ী পাখি, বিপন্ন প্রজাতির সামুদ্রিক কচ্ছপের ডিম পাড়ার স্থান এবং লাল কাঁকড়ার নিরাপদ আবাসস্থল। দ্বীপটি বঙ্গোপসাগরের কোলে লুকিয়ে থাকা এক টুকরো শান্ত প্রকৃতি, যা তার নিজস্ব বাস্তুতন্ত্র এবং সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত।
পরিবেশগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় সরকার সোনাদিয়া দ্বীপকে ‘পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ ঘোষণা করে। আইন অনুযায়ী এখানে যেকোনো ধরনের স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ, গাছ কাটা এবং পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর বাণিজ্যিক কার্যক্রম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু সেই নিষেধাজ্ঞাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সোনাদিয়ায় অবাধে চলছে কটেজ ও রিসোর্ট নির্মাণের মহোৎসব। প্রভাবশালী একটি মহল বনের জমি দখল করে অনুমোদনহীন কটেজ ও রিসোর্ট নির্মাণে সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বন বিভাগের নীরবতায় সম্প্রতি সোনাদিয়া দ্বীপে অন্তত ১৫টি কটেজ ও রিসোর্ট নির্মাণ করা হয়েছে এবং আরও কয়েকটির নির্মাণকাজ চলছে। তিনতলা পর্যন্ত কটেজসহ একাধিক অবৈধ স্থাপনা নির্মিত হচ্ছে। তারা আশঙ্কা করছেন, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে সোনাদিয়ার ঝাউবন পুরোপুরি উজাড় হয়ে যাবে। অভিযোগের তির বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের দিকে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সোনাদিয়ার একজন পরিবেশকর্মী জানান, সোনাদিয়া দ্বীপে গত এক মাসে ঝাউগাছ কেটে এবং বন বিভাগের জমি দখল করে একাধিক কটেজ ও বহুতল রিসোর্ট নির্মাণ করা হয়েছে। আরও কয়েকটির নির্মাণকাজ চলছে। গভীর রাত পর্যন্ত দ্বীপে জেনারেটর চালিয়ে বাতি জ্বালিয়ে রাখা ও রাতে পর্যটকের বিচরণের কারণে ডিম পাড়তে আসতে পারছে না মা কচ্ছপ। অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত কচ্ছপের ডিম পাড়ার মৌসুম হলেও চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত কোনো কচ্ছপ সৈকতে ডিম দিতে আসেনি।
নেচার কনজারভেশন ম্যানেজমেন্ট (নেকম) কক্সবাজারের ব্যবস্থাপক আবদুল কাইয়ুম বলেন, ‘সোনাদিয়া দ্বীপে পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা না করা হলে দ্বীপটি সংকটাপন্ন হয়ে যাবে।’ ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটির (ইয়েস) তথ্যমতে, দ্বীপের অন্তত ৭০ একর সরকারি জমি অবৈধভাবে দখল করা হয়েছে।
দ্বীপের পূর্ব পাশে মগচরে সৈকতের তীরে প্রায় পাঁচ একর ঝাউবন উজাড় করে স্যান্ডি বিচ রিসোর্ট নির্মাণ করা হয়েছে। বাঁশ ও কাঠ দিয়ে পাঁচটি কটেজ গড়ে তোলা হয়েছে। আগে কখনো মগচরে রিসোর্ট ছিল না। বিশেষ সূত্রে জানা গেছে, মোহাম্মদ ফারুক নামের একজন স্থানীয় বাসিন্দা ও চারজন ব্যবসায়ী এই রিসোর্টটি তৈরি করেছেন।
সদ্য বিদায়ী মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. হেদায়েত উল্যাহ বলেন, ‘সম্প্রতি সোনাদিয়ায় নতুন বিট চালু হয়েছে। যারা বিটের দায়িত্বে আছেন, তাদের কাজ হচ্ছে যাতে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ না হয়, সে জন্য পাহারা দেওয়া এবং কোনো কারণে যদি কেউ কটেজ নির্মাণের চেষ্টা করে তবে তাৎক্ষণিকভাবে প্রশাসনকে জানানো।’ তিনি জানান, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং দ্রুত সময়ে সেখানে অভিযান পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে বন বিভাগের গোরকঘাটা রেঞ্জ কর্মকর্তা আয়ুব আলী বলেন, ‘সরকার সোনাদিয়ার জায়গাটি এখনো বন বিভাগকে বুঝিয়ে দেয়নি। ওই ভূমি বন বিভাগের অনুকূলে ন্যস্ত করা হলে আমরা পূর্ণ শক্তি নিয়ে কাজ করতে পারব। দ্বীপের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কাজ করা হচ্ছে।’ তিনি জানান, বন বিভাগ ‘সোনাদিয়া বন বিট’ চালু করেছে এবং অবৈধভাবে কটেজ নির্মাণ বন্ধ করতে উদ্যোগ নিয়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সোনাদিয়া দ্বীপ দেশের ১৩টি প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকার (ইসিএ) একটি। এ ধরনের এলাকায় পানি, মাটি, বায়ু বা জীবজন্তুর ক্ষতি করলে শাস্তি হিসেবে সর্বোচ্চ তিন বছর কারাদণ্ড বা তিন লাখ টাকা জরিমানা হতে পারে। পরিবেশ আদালত আইনের অধীনে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড এবং পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা হতে পারে।
এদিকে সাম্প্রতিক কিছু খবর সোনাদিয়ায় আশার আলো হাতছানি দিচ্ছে। চারদিক দিয়ে জলরাশিতে আচ্ছাদিত এ দ্বীপে মিলেছে ভারী প্রাকৃতিক খনিজ ইলমেনাইট, ম্যাগনেটাইট, গারনেট, জিরকন, রুটাইল ও মোনাজাইট। মূল্যবান এ সম্পদের আর্থিক হিসাব না মিললেও বাণিজ্যিকভাবে তা উত্তোলন করা গেলে দেশের অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা দেবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও ভূতত্ত্ব বিশেষজ্ঞরা।
সচেতন মহলের দাবি, লোক দেখানো উচ্ছেদ অভিযান নয়, বরং দ্বীপের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় নিয়মিত মনিটরিং এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা জরুরি। পর্যটন বিকাশের নামে প্রকৃতি ধ্বংসের এই আয়োজন বন্ধ না হলে সোনাদিয়া তার নিজস্ব রূপ হারাবে।
