বিরল ও দুর্লভ কয়েকটি পাখির সন্ধানে ঢাকার মিরপুরের বাংলাদেশ জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে যাই এ বছরের ৭ নভেম্বর। কিন্তু ১ ঘণ্টা ২০ মিনিট ধরে খুঁজেও পাখিগুলোর দেখা পেলাম না। তবে বাঁশবাগানে ছোট্ট পাখি ফুটফুটি (Grey-headed Canary Flycatcher) এবং ছোট ভিংরাজের (Lesser Racket-tailed Drongo) দেখা পেলাম, বহু ছবি তুললাম ওদের। বেলা ১১টা ২১ মিনিটে চিড়িয়াখানার পাশের বড় পুকুরের সামনের প্রজাপতি পার্কে এলাম। পার্কের ন্যাড়া গাছটিতে একজোড়া বাঁশপাতি (Asian Green Bee-eater) পাখি বসে ছিল।
যথেষ্ট রোদ, কিন্তু তেমন একটা প্রজাপতি নেই। কাজেই পার্ক থেকে বের হয়ে পুকুর পাড়ে এসে দাঁড়ালাম। এমন সময় একজন পক্ষীসঙ্গী এসে বললেন-
‘স্যার, মাছখেকো ঈগলের ছবি তুলবেন?’
বহুদিন ওদের দেখি না। একসময় প্রতিবছর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ওদের দেখতাম। বাসা, ছানা ও বড় পাখি সব কটির ছবিই তুলেছি। সুন্দরবনেও বারকয়েক দেখেছি। কাজেই আমি বললাম-
‘অবশ্যই তুলব। কোথায় পাখিটি?’
এরপর পক্ষীসঙ্গীটি বললেন-
‘পুকুরের ওপারে, নারিকেলগাছের ওপর।’
দ্রুত পুকুরের এপার থেকে প্রায় ৩০০ গজ পথ পেরিয়ে ওপারে চলে গেলাম। নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে বেশ কিছু ছবি তুললাম। পাখিটি একদৃষ্টিতে পুকুরের দিকে তাকিয়েছিল মাছের আশায়। এরপর ধীরে ধীরে ওর কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করলাম। প্রায় সোয়া ৭ মিনিট পাখিটি ওখানে বসে ছিল। এমন সময় দুজন সাধারণ দর্শনার্থী পাখিটিকে দেখার জন্য নারিকেলগাছের গোড়ায় এসে দাঁড়াল। আর সঙ্গে সঙ্গে শিকারি পাখিটি বিরক্ত হয়ে উড়ে গিয়ে প্রজাপতি পার্কের পাড়ের বড় একটি গাছের ঘন পাতার আড়ালে হারিয়ে গেল। আমরাও তখন লেকের দিকে হাঁটা দিলাম কালেম পাখির ছবি তোলার জন্য।
জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে দেখা এই শিকারি পাখিটি এ দেশের দুর্লভ ও প্রায় শঙ্কাগ্রস্ত আবাসিক পাখি বউলি ঈগল। এটা উখস ঈগল বা ধূসর-মাথা কুড়া ঈগল নামেও পরিচিত। পশ্চিমবঙ্গে বলে মাছমার বাজ। ইংরেজি নাম Grey-headed Fish Eagle, Grey-headed Fishing Eagle বা Greater Fishing Eagle। অ্যাক্সিপিট্রিডি (Accipitridae) গোত্রের ঈগলটির বৈজ্ঞানিক নাম Icthyophaga ichthyaetus (ইকথায়োফ্যাগা ইকথাইটাস)। বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশের আবাসিক পাখি এটি।
বউলি ঈগল বড় আকারের পাখি। প্রাপ্তবয়স্ক ঈগলের দেহের দৈর্ঘ্য ৬১ থেকে ৭৫ সেন্টিমিটার, প্রসারিত অবস্থায় ডানার মাপ ১৫৫ থেকে ১৭০ সেন্টিমিটার। ওজন ১.৬ থেকে ২.৭ কিলোগ্রাম। মাথা ও ঘাড়-গলার পালক ছাই-ধূসর। ডানার ওড়ার পালক কালচে। দেহের ওপরের বাকি পালকগুলো বাদামি। বুকের পালক খয়েরি-বাদামি। পেট, লেজতল ও ঊরু সাদা। সাদা লেজের আগা কালো। চোখ সোনালি-হলুদ। ঠোঁট কালচে-বাদামি। পা, আঙুল ও পায়ের পাতা ধূসরাভ। স্ত্রী ও পুরুষ পাখি দেখতে একই রকম হলেও আকারে স্ত্রী পাখি কিছুটা বড় হয়। সাদাটে ডানার তলা ছাড়া অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির পুরো দেহ ডোরাকাটা বাদামি বর্ণের।
ওরা সারা দেশের পুকুর, বিল ও জলাশয়ে সচরাচর একাকী বিচরণ করে। তবে জোড়ায়ও বিচরণ করে। গাছের ডালে বসে পানিতে খাবার খোঁজে ও মাছের সন্ধান পেলে লাফ দিয়ে নেমে পায়ের ধারালো নখ দিয়ে ছোঁ মেরে শিকার করে। মাছ ছাড়াও সাপ, ব্যাঙ, পাখি, ইঁদুর ইত্যাদিও খায়। অনেক সময় গাছে বসে উচ্চস্বরে ‘কু-ওক---’ শব্দে ডাকে।
নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি প্রজননকাল। এ সময় আবাস এলাকার জলাধারের আশপাশের উঁচু গাছের মগডালে ডালপালা দিয়ে ১.৫ মিটার ব্যাসবিশিষ্ট ও ২.০ মিটার গভীরতাসম্পন্ন বিশাল আকারের মাচানের মতো বাসা তৈরি করে। সবুজ পাতা দিয়ে বাসার গদি সাজায়। ডিম পাড়ে ১ থেকে ৩টি, রং সাদা। স্ত্রী ও পুরুষ ঈগল পালাক্রমে ডিমে তা দেয়। ডিম ফোটে ৪৫ থেকে ৫০ দিনে। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই মিলেমিশে ছানাদের লালন-পালন করে। ছানারা প্রায় ৭০ দিন বয়সে উড়তে শেখে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ উদ্যানের একটি বিশাল গাছে ওদের বহু বছর ডিম-ছানা তুলতে দেখেছি। এদের আয়ুষ্কাল ১৭ থেকে ১৮ বছর।
লেখক: পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ
গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়