বিরল দুটি প্যাঁচার খোঁজে গত বছরের ডিসেম্বরে সুন্দরবনে যাই। ২৪ ডিসেম্বর রাতে আটজনের একটি টিম মোংলা থেকে ছোট্ট লঞ্চ ‘আলোর কোল’-এ রওনা হয়ে খুলনা রেঞ্জের কালাবগী ও শেখেরটেক ইকো ট্যুরিজম কেন্দ্র হয়ে ২৬ ডিসেম্বর রাতে বাগেরহাটের শরণখোলা রেঞ্জের কোকিলমণিতে পৌঁছাই। সচরাচর দিনের আলোতে সুন্দরবনের বিভিন্ন খালে নৌকা নিয়ে পাখি-প্রাণী খুঁজি। কিন্তু এবারের অভিযানটি অন্যবারের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন রকম এ কারণে যে এবার আমরা রাতেও নৌকা নিয়ে বিভিন্ন খালে ঢুকেছি বিরল দুটি প্যাঁচার খোঁজে। এই নাইট সাফারি কিন্তু মোটেও সুখকর ছিল না। একে তো প্রচণ্ড শীত, তার ওপর মাঝে মাঝে বয়ে যাওয়া মৃদু বাতাসে শীত যেন আরও বেড়ে যাচ্ছিল। তা ছাড়া বাঘের ভয় তো ছিলই। কখন কোথা থেকে বাঘ মামা আমাদের ওপর লাফিয়ে পড়বে কে জানে? তাই অত্যন্ত সাবধানতা অবলম্বন করতে হচ্ছিল।
কালাবগীর বিভিন্ন খালের অভিজ্ঞতার আলোকে কোকিলমণি এসেও রাতের খাবারের আগে নাইট সাফারিতে বেরিয়ে পড়লাম। প্রথমে কোকিলমণি থেকে লঞ্চ নিয়ে তিন কোনা আইল্যান্ডের কাছে নোঙর করালাম। এরপর নৌকা নিয়ে আগুনজ্বলা খালে ঢুকে গেলাম। নিকষ কালো অন্ধকারে খালের দুপাশের বড় বড় গাছে টর্চের লাল আলো ফেলে এগিয়ে চলছি যেন পাখিরা বিরক্ত না হয়। মোবাইলে বাজছে দুটি প্যাঁচার ডাক। কিন্তু অনেকক্ষণ ডাক বাজিয়েও কোনো ডাকেরই প্রত্যুত্তর পেলাম না। রাত ঠিক ৯টা ৪২ মিনিট ২৮ সেকেন্ডে আমাদের ডান পাশের বনের একটি গাছে টর্চের লাল আলোতে কিছু একটাকে নড়তে দেখলাম। নৌকা থামিয়ে স্পট নিশ্চিত হয়ে টর্চের স্বাভাবিক আলো ফেললাম। নৌকা যতটা সম্ভব স্পটের কাছাকাছি নিয়ে গেলাম। এরপর ক্যামেরার ভিউ ফাইন্ডারে চোখ রেখে শাটারে ক্লিক করে গেলাম। ছবি রিভিউ করতেই চোখ ছানাবড়া! আরে এটা তো প্যাঁচা নয়; বরং নিশাচর কপটবেশী বা ছদ্মবেশী (Camouflage) পাখি, যার পালকের রং অনেকটা প্যাঁচার মতো। প্রায় ৮ মিনিটে ২০৬টি ছবি তুললাম। যদিও পাখিটি দেশব্যাপী বিস্তৃত, কিন্তু সুন্দরবনে ওকে আমি এই প্রথম দেখলাম। আসলে এবারের মতো কখনো তো রাতে পাখি খুঁজিনি, তাই ওকে কখনো পাইনি। রাত ৯টা ৫০ মিনিট ৭ সেকেন্ডে শেষ ছবি তুলে ‘আলোর কোল’-এর দিকে নৌকা ঘোরালাম।
এতক্ষণ ছদ্মবেশী যে নিশাচর পাখিটির গল্প বললাম, সে এ দেশের বহুল দৃশ্যমান আবাসিক পাখি নলপিটানি রাতচরা। এটি মেটে প্যাঁচা, চরপ্যাঁচা, দিনেকানা, বাঁশপাতা, বক্কা, ঠুক্ঠুকিয়া (পশ্চিমবঙ্গ) নামেও পরিচিত। ইংরেজি নাম Large-tailed/Long-tailed Nightjar। Caprimulgidae বা ছিপ্পক গোত্রের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Caprimulgus macrurus (ক্যাপ্রিমুলগাস ম্যাক্রুরাস)। এশিয়ার বিভিন্ন দেশসহ পাপুয়া নিউগিনি ও অস্ট্রেলিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও দেখা যায়।
নলপিটানি রাতচরার দেহের দৈর্ঘ্য ২৫ থেকে ৩৩ সেন্টিমিটার। ওজনে পুরুষ ৫৪ থেকে ৭৯ গ্রাম ও স্ত্রী ৬০ থেকে ৭৭ গ্রাম। মাথা চ্যাপটা। চঞ্চু অত্যন্ত ছোট ও সরু। মুখের হা অনেক বড়। নাকের পাশে গোঁফের মতো সরু সরু লোম থাকে। ঘাড় খাটো। পা খাটো ও নখ ছোট। একনজরে পালকের রং ধূসর-বাদামি। স্ত্রী-পুরুষের পালকের রঙে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের ডানা-ঢাকনির মধ্যভাগ কালো ও ডানার প্রথম চারটি প্রাথমিক পালকে সাদা ছোপ রয়েছে। লেজের বাইরের পালকের ৫ সেন্টিমিটার অংশ চকচকে সাদা। গলার নিচ ও মুখমণ্ডলের দুপাশে রয়েছে সাদা বলয়। চঞ্চু মাংসল-বাদামি। চোখ ঘোলাটে ও বাদামি। পা ও আঙুল লালচে থেকে বেগুনি-বাদামি। ডানা ও লেজের বাইরের পালকের সাদা রং ছাড়া স্ত্রী পাখির বাকি সবকিছুই পুরুষের মতো। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির লালচে প্রাথমিক পালকে রয়েছে সাদা তিল। তলপেট ও পায়ুতে সাদা ডোরা এবং লেজের পালকের ভেতরে সাদা ও বাইরে লালচে।
এরা দেশজুড়ে বনজঙ্গলের আশপাশে বিচরণ করে। নিশাচর ও সান্ধ্যচারী পাখিটিকে একাকী বা জোড়ায় দেখা যায়। দিনে চোখে ভালো দেখে না। তাই পুরো দিন ঘুমিয়ে কাটায়, আর রাতে হয় সক্রিয়। চমৎকারভাবে উড়তে পারে। সুন্দরভাবে ডাইভও দিতে পারে। বাঁক নিতে পারে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে। প্রয়োজনে কাত-চিৎ হয়েও উড়তে পারে। মূলত উড়ন্ত পোকামাকড়, গুবরে পোকা ও মথ ধরে খায়। ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে কৃষকের বেশ উপকার করে। ভোর ও গোধূলিতে ‘চঙ্ক-চঙ্ক-চঙ্ক...’ শব্দে ডাকে। ফকিরহাটের সাতশৈয়া গ্রাম, কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ও গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ওদের এ ডাক শুনেছি।
ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাস প্রজননকাল। ওরা এমন এক বিশেষ ধরনের পাখি, যারা না তৈরি করে বাসা, না পাড়ে অন্যের বাসায় ডিম। ওরা মাটিতে ডিম পাড়ে। বাসা তৈরি না করলেও স্বামী-স্ত্রী দুজনে মিলেই মাটিতে ডিম পাড়ার জায়গা পছন্দ করে। স্ত্রী রং-বেরঙের দাগছোপসহ সাদাটে রঙের এক থেকে দুটি ডিম পাড়ে। স্ত্রী-পুরুষ দুজনেই ডিমে তা দেয়। প্রয়োজনে মুখের সাহায্যে ডিম-ছানা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরায়। ডিম ফোটে ১৬ থেকে ২০ দিনে। সদ্য ফোটা ছানা দেখতে অনেকটা মুরগির ছানার মতো। ছানার গায়ের কোমল পালকের রং ঘিয়ে বা হালকা হলুদ। ছানারা দিনে একটুও রা করে না, চুপটি করে মাটিতে ঘাপটি মেরে বসে থাকে। তবে রাতে বেশ নড়াচড়া করে। মা-বাবা মুখে খাবার নিয়ে ফিরলে ছোট ছোট চঞ্চু ফাঁক করে ধরে। আবার অনেক সময় মা-বাবার চঞ্চুর ভেতর চঞ্চু ঢুকিয়ে খাবার খায়। ছানারা ২৮ থেকে ৩৪ দিনে উড়তে শেখে। আয়ুষ্কাল ছয়-সাত বছর।
লেখক: পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ
অধ্যাপক, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়