বিরল কিছু পাখি-প্রাণীর খোঁজে আমিসহ ছয়জনের একটি দল সিলেট-মৌলভীবাজারের উদ্দেশে রওনা হই এ বছরের ২২ জানুয়ারি রাতে। কিন্তু রাস্তায় প্রচণ্ড যানজট থাকায় সিলেট পৌঁছাতে ৪-৫ ঘণ্টা দেরি হয়ে গেল। ফলে রোদে পুড়ে কানাইঘাট-হরিপুরের বড় বিলে যেতে হলো। যদিও বিরল সারস পাখিগুলোর দেখা পেলাম, কিন্তু শীতের দুপুরের প্রচণ্ড গরমে ক্লান্ত হয়ে পড়লাম। সন্ধ্যায় সিলেটে ফিরে পক্ষীবিদ আব্দুল মজিদ শাহ শাকিল এবং পাখি ও প্রজাপতিপ্রেমী শাহাদাত ও তানিমকে নিয়ে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের উদ্দেশে বাসে চড়লাম। রাতটা বন্ধুপ্রতিম রেজা ভাইয়ের মেরিনা হোটেলে কাটিয়ে সকালে কমলগঞ্জের আদমপুর বিটের উদ্দেশে রওনা হলাম।
সকাল ৯টায় আদমপুর পৌঁছে দ্রুত বনে ঢুকে গেলাম। বনের ছড়া ও অন্যান্য স্থানে প্রায় ১ ঘণ্টা ঘোরাঘুরি করে ২০ প্রজাতির পাখি-প্রাণী-প্রজাপতির ছবি তুললাম। এরপর সামনের দিকে এগিয়ে যেতেই অন্ধকারের মধ্যে ঝোপালো ছোট্ট একটি গাছে কমলা-বাদামি বা লালচে-বাদামি রঙের একটি প্রজাপতিকে বসে থাকতে দেখলাম। দ্রুত গাছের কাছে গেলাম। খানিকটা ঝুঁকে পড়ে পাতার ওপর তাকাতেই প্রজাপতিটিকে চিনে ফেললাম। অতি বিরল এই প্রজাপতিটিকে আমি বাদে বাকি তিনজন জীবনে প্রথম দেখল। প্রয়াত বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রী মুনির খান ও তানিয়া খান দম্পতি এ দেশে অতি বিরল প্রজাপতিটিকে প্রথম দেখেন। তাদের সঙ্গে গিয়ে দেশের চতুর্থ ব্যক্তি হিসেবে ২০১৩ সালের এপ্রিলের এক সকালে এই বনেই প্রজাপতিটিকে প্রথম দেখেছিলাম। লালচে-বাদামি অদ্ভুতদর্শন প্রজাপতিটিকে প্রথম দেখার পর যতবারই আদমপুর ও আশপাশের বনে গিয়েছি, ততবারই ওর খোঁজ করেছি। দ্বিতীয়বার প্রজাপতিটিকে দেখি ২০১৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর। দীর্ঘ প্রায় ১০ বছর পর ওকে আবার দেখে মনটা খুশিতে নেচে উঠল। ২০১৬ সালে দেখা প্রজাপতিটি ছিল স্ত্রী আর এবারেরটি পুরুষ।
মৌলভীবাজারের আদমপুর বন বিটে দেখা অতি বিরল ও অদ্ভুতদর্শন এই প্রজাপতিটি এ দেশের এক বিপন্ন প্রজাপতি। এর কোনো বাংলা নাম নেই। ইংরেজি নাম হারলেকুইন বা অরেঞ্জ হারলেকুইন। ছোট্ট, বর্ণিল ও অদ্ভুতদর্শন প্রজাপতিটি হারলেকুইন নামটি পেয়েছে ইতালিয়ান একটি পোশাকের প্যাটার্ন থেকে। ইংরেজি নামের অনুবাদে বাংলায় একে ভাঁড় নামে ডাকা যায়। রিওডিনিডি (Riodinidae) গোত্রভুক্ত প্রজাপতিটির বৈজ্ঞানিক নাম Taxila haquinus. বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, মায়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ব্রুনাই ও ইন্দোনেশিয়ায় প্রজাপতিটির দেখা মেলে।
প্রসারিত অবস্থায় ভাঁড় প্রজাপতির এক ডানার প্রান্ত থেকে অন্য ডানার প্রান্ত পর্যন্ত গড় দৈর্ঘ্য ৪৫ মিলিমিটার। স্ত্রী-পুরুষের বর্ণে পার্থক্য থাকে। ডানা খোলা অবস্থায় দেহের ওপরটা দেখা যায়। পুরুষের ডানার ওপরটার মূল রং গাঢ় বাদামি। সামনের ডানার অগ্রভাগে হালকা লালচে-বাদামি আভা রয়েছে। স্ত্রীর মূল রং গাঢ় লালচে-বাদামি হলেও তাতে কালো ফোটা রয়েছে। তা ছাড়া সামনের ডানার অগ্রভাগে সাদা বন্ধনী বা পট্টির মতো থাকে। অন্যদিকে ডানা বন্ধ থাকলে দেহের নিচের অংশ দেখা যায়। স্ত্রী-পুরুষ উভয়েরই মূল রং লালচে-বাদামি। ডানায় অসংখ্য সাদা ও কালো ধাতব ফোটা দেখা যায়। কালো ফোটাগুলোর প্রান্ত ধাতব সাদা বা রুপালি। উভয়ের সামনের ডানার প্রান্তে সাদা পট্টি থাকলেও স্ত্রীটি অত্যন্ত পুরু ও সুস্পষ্ট। ডানার মতো মাথা, ধড় ও পিঠের রং গাঢ় বা লালচে-বাদামি। বুক ও পেট কিছুটা ফ্যাকাশে। চোখ ও পা লালচে-বাদামি। শুড়ে রয়েছে অসংখ্য লালচে-বাদামি ও কালচে রিং।
প্রজাপতিটিকে এ দেশে এখন পর্যন্ত মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ ও কক্সবাজারের চেরিঙ্গা এলাকায় দেখা গেছে। মিশ্র চিরসবুজ বনের গহিনে বসবাসকারী প্রজাপতিটি সমুদ্রপৃষ্ঠের ১০০-৪০০ মিটার ওপরে ছড়া বা পানিপ্রবাহের কাছের ঝোঁপঝাড়ে থাকে। দিবাচর পতঙ্গটি সচরাচর একাকী বিচরণ করে। গহিন বনের ছায়াঘেরা স্থান পছন্দ করে। পাতার ওপরের দিকে বসে আধা খোলা ডানায় ঝাঁকুনি দিয়ে হেঁটে বেড়ায়। ফুলের রস, পরাগরেণু ও পাকা বা পচা ফল প্রিয় খাবার। ভূমির কাছাকাছি থেকে মাঝারি উচ্চতায় দ্রুত উড়তে পারে।
স্ত্রী বিভিন্ন প্রজাতির প্যাশান ফুল গাছের (পোষক গাছ) পাতার নিচের দিকে একটি করে ডিম পাড়ে। সঙ্কু (Conical) আকৃতির উজ্জ্বল ডিমগুলো হালকা হলদে হয়। তিন-চার দিনে ডিম ফুটে হালকা হলদে রঙের কণ্টকময় শূককীট বের হয়। পাঁচবার খোলস পাল্টে শূককীট ১৫-২১ দিনে মূককীটে রূপান্তরিত হয়। এ সময়ের মধ্যে এর দেহের রং হালকা হলদে থেকে সবুজাভ হয়ে যায়, সঙ্গে থাকে লালচে আভা। মূককীটের রং সবুজ, যা শেষ অবস্থায় কালচে হয়। ছয় থেকে সাত দিন পর মূককীটের খোলস কেটে নতুন প্রজাপতি বেরিয়ে আসে। জীবনচক্র অর্থাৎ ডিম থেকে পূর্ণাঙ্গ প্রজাপতি হতে ২৪-৩২ দিন লাগে।
লেখক: পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ
ও অধ্যাপক, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়