রাজধানীর রমনা পার্কে পাখি দেখতে আমার নিয়মিত যাওয়া হতো, বিশেষ করে ছুটির দিনে। এই পার্কের গাছপালা ও বন্যপ্রাণী নিয়ে অনেক দিন কাজ করেছি। সেই সময়ে অনেক পাখির দেখা পেয়েছি। সেখানে কয়েক প্রজাতির কাঠঠোকরা পাখিও দেখেছি। প্রধানত দুই প্রজাতির কাঠঠোকরা রমনা পার্কে নিয়মিত বসবাস করে। এ ছাড়া একটি প্রজাতি মাঝে মাঝে সেখানে আসে।
বসন্তে যখন পলাশ ও মান্দারগাছে ফুল ফোটে, তখন ফুলের মধু পান করতে বাংলা কাঠঠোকরা পাখি আসে। বাংলা কাঠঠোকরা আমাদের অতিচেনা কাঠঠোকরা। এরা বন, বাগান, লোকালয়সহ সর্বত্র বিচরণ করে। এরা একাকী, জোড়ায় বা ছোট দলে থাকে। তবে এদের আমি জোড়ায় থাকতেই বেশি দেখেছি।
বাংলা কাঠঠোকরা গাছের কাণ্ড ও ডালে হাতুড়ির মতো আঘাত করে অথবা মাটিতে ঝরাপাতা উল্টে এরা খাবার সংগ্রহ করে। খাদ্যতালিকায় রয়েছে পিঁপড়া, শুঁয়োপোকা, বিছা, মাকড়সা, অন্যান্য পোকামাকড় এবং খেজুর ও ফুলের রস। প্রাপ্তবয়স্ক পাখির পিঠ সোনালি-হলুদ, দেহতলে কালো আঁইশের মতো দাগ থাকে। ওড়ার পালক ও লেজ কালো, থুতনিতে কালো ডোরা থাকে। সাদা ঘাড়ের পাশে কালো দাগ, বুকে মোটা কালো আঁইশের দাগ থাকে। চোখে কালো ডোরা, ডানার গোড়ার ও মধ্যে পালক ঢাকনিতে সাদা বা ফিকে ফুটকি এবং পিঠ ও ডানার অবশেষ সোনালি। সবুজ গোলকসহ এর চোখ লালচে-বাদামি। পা ও পায়ের পাতা ধূসর সবুজ। ঠোঁট শিং রং ও কালোর মিশ্রণ।
ছেলে ও মেয়ে পাখির চেহারায় পার্থক্য থাকে চাঁদি ও ঝুটির রঙে। ছেলে পাখির চাঁদি ও ঝুটি উজ্জ্বল লাল। মেয়ে পাখির সাদা বিন্দুসহ চাঁদির সামনের অংশ কালো ও পেছনের ঝুটি লাল। শক্ত পা ও অনমনীয় লেজে ভর দিয়ে ছোট ছোট লাফ মেরে এরা গাছের কাণ্ড বেয়ে ওপরে ওঠে। ওড়ার সময় উঁচ্চস্বরে ডাকে, কিয়ি কিয়ি কিয়ি কিয়ি কিয়িকিরইররর-র-র-র…।
বাংলা কাঠঠোকরা ফেব্রুয়ারি-জুলাইয়ে গাছের কাণ্ডে গর্ত খুঁড়ে বাসা বাঁধে। ছেলে ও মেয়ে পাখি দুজনেই বাসার কাজ করে। সাধারণত বড় গাছের শুকনো কাণ্ডে গর্ত করে। গর্ত খোঁড়ার প্রাথমিক সময় টক্ টক্ শব্দ হয়। মানুষ দেখলে বাসার কাছ থেকে আড়ালে চলে যায়। বাসায় মেয়ে পাখি ৩টি ডিম পাড়ে। রং সাদা। ছেলে ও মেয়ে পাখি মিলে ডিমে তা দেয়। বাসায় হামলা হলে ছানারা সাপের মতো হিস হিস শব্দ করে।
বাংলা কাঠঠোকরা গাছের পোকামাকড় খেয়ে গাছকে পরিষ্কার রাখে। রমনা পার্কসহ ঢাকা শহরের অন্যান্য উদ্যানে, এমকি গাছগাছালি আছে, এমন বাড়িতেও এদের দেখা যায় এবং কর্কশ ডাক শোনা যায়।
লেখক: নিসর্গী ও পরিবেশবিদ, জার্মান অ্যারোস্পেস সেন্টার
