একটি খুদে পোকা যে বিশাল একটি দেশের জন্য কতটা ভয়ংকর ও ভীতিকর হয়ে উঠতে পারে, তা যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সে পোকাটি না দেখলে ও সে সম্পর্কে না জানলে তা বিশ্বাসই হতো না। ২০২৪ সালের অক্টোবর মাস, চারদিকে শীতের হাওয়ার কাঁপন শুরু হয়েছে। প্রকৃতিতে চলছে পাতায় পাতায় রং বদলের খেলা, ঝরাপাতার গান। এমন এক চমৎকার ফল সিজনের বিকেল বেলায় পেনসিলভানিয়ার পিটসবার্গ শহরের মধ্যে থাকা মনোরম পাহাড়ি উদ্যান শেনলি পার্কের আপার প্যান্থার হলো ট্রেইল (Upper Panther Hollow Trail) ধরে হাঁটছিলাম। একটি ঝরনাধারা দেখা আর স্টোন ব্রিজ ডিঙানো ছিল উদ্দেশ্য। দুপাশে প্রচুর গাছপালা, অরণ্য পরিবেশ। ট্রেইল ধরে হাঁটতে হাঁটতে একটি ছোট্ট ব্রিজের ওপর উঠে হঠাৎ থামতে হলো। ইস্, আরেকটু হলেই জুতার নিচে চাপা পড়ত পোকাটি। থেমে সে পোকাটির একটি ছবি তুলে আবার হাঁটতে শুরু করলাম। কিন্তু নিজের অজান্তেই সেদিন যে পোকাটির ছবি তুলেছিলাম, সে পোকাকেই যে যুক্তরাষ্ট্রের লোকজন হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে, তাকে শাসন করার জন্য এত শোরগোল তুলে ফেলেছে তা বুঝেছিলাম আরও কয়েক দিন পর ফ্রিক পার্কে গিয়ে।
ফ্রিক পার্কের ব্রাডক ট্রেইল ধরে বেশ খানিকটা হাঁটার পর একটি বেঞ্চের মতো পেলাম, পেছনে নোটিশ বোর্ডের মতো একটি বোর্ডে অনেক কিছুর বিজ্ঞপ্তি ও বিজ্ঞাপন লাগানো। এগুলোর মধ্যে একটি মাঝারি আকারের পোস্টারে সেই পোকাটির ছবি দেখে কৌতূহলী হলাম। কাছে গিয়ে সেটি পড়ে তো থ! কী ভয়ংকর পোকা রে বাবা! কৃষি আর বন দপ্তরের লোকদের তো ল্যান্টার্নফ্লাই নামের এ পোকা ঘোল খাইয়ে ছাড়ছে দেখছি। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, যেখানেই এর ডিম, বাচ্চা ও বড় পোকা দেখবেন দয়া করে ওগুলো ধ্বংস করুন আর কর্তৃপক্ষকে খবর দিন।
কী এমন করছে পোকাটি? ভীষণ ক্ষতি নিশ্চয়ই করছে, না হলে এ পোকাটি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকার কেন এত উতলা হয়েছে? বিদেশি পোকা ভেবে সেটিকে নিয়ে আমার তেমন আগ্রহ হয়নি। আবারও ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে গিয়ে তুষারময় সেই ফ্রিক পার্কের নোটিশ বোর্ডে সেই পোস্টারটি আবারও চোখে পড়ল। তবে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ পোকাটিকে নিয়ে শোরগোল শুরু হতেই আবারও তা আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। গত ৫ ফেব্রুয়ারি লাইভসায়েন্স ম্যাগাজিনে ক্রিস সিমস এক প্রতিবেদনে লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে ২০১৪ সালে সর্বপ্রথম পেনসিলভানিয়ায় এ পোকাটিকে দেখা যায়। এখন তা আর শুধু পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় ১৯টি অঙ্গরাজ্যে এখন এ পোকাটি ছড়িয়ে পড়েছে। এ পোকা সে দেশের কৃষি ও বনজ সম্পদের বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৯ সালে শুধু পেনসিলভানিয়াতেই এ পোকা দ্বারা আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ নিরূপিত হয়েছিল বার্ষিক ৩২৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং তখন এ পোকা ছিল তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
গবেষকরা বলেছেন, ২০১৪ সালের আগে যুক্তরাষ্ট্রে এ পোকাটি ছিল না। চীন, জাপান, কোরিয়া, ভিয়েতনাম, ভারত ইত্যাদি দেশ থেকে এ পোকা সে দেশে ঢুকেছে। এরা এত বেশি পরিমাণে ডিম পাড়ে যে ওদের নিয়ন্ত্রণ করা এক প্রকার দুঃসাধ্য হয়ে উঠেছে। এরা দ্রুত বিভিন্ন সামগ্রী ও যানবাহনের মাধ্যমে ছড়ায়। ফুলগোরিডি গোত্রের স্পটেড ল্যান্টার্নফ্লাই (Lycorma delicatula) হপারজাতীয় শোষক পোকা। মাত্র এক ইঞ্চি লম্বা ও আধা ইঞ্চি চওড়া, সামনের বাদামি রঙের পাখার ওপর ছোট বিন্দুর মতো অনেকগুলো কালো দাগ থাকে, পাখার পেছনের কিছুটা অংশে আবার দাগ নেই। পেছনের পাখাজোড়া উজ্জ্বল লাল, পায়ের রং কালো। বাচ্চারা সাদা ফুটকিযুক্ত কালো রঙের। স্ত্রী পোকা গাদা করে ডিম পাড়ে, একটি গাদায় ৩০ থেকে ৫০টি ডিম পাড়ে। ডিমগুলো ধূসর, অনেকটা কাদামাটির মতো আবরণযুক্ত। বিভিন্ন স্থানে এরা ডিম পাড়ে।
যুক্তরাষ্ট্রে ট্রি অব হ্যাভেনসহ প্রায় ৭০ প্রজাতির গাছে এরা আক্রমণ করে, সারা বিশ্বে এদের আশ্রয়দাতা উদ্ভিদ প্রজাতির সংখ্যা ১৭৩টি। এগুলোর মধ্যে আপেল ও আঙুরও রয়েছে। তবে বনজ গাছই এদের দ্বারা ক্ষতি হচ্ছে বেশি। এরা কলোনি বেঁধে যেসব গাছে থাকে, সেসব গাছ থেকে রস চুষে খেয়ে দূর্বল করে দেয়। শেষে সেসব গাছ মরে যায়। শুধু তা-ই নয়, এরা খাওয়ার সময় সেসব গাছের ওপর আঠালো এক প্রকার মধুরস নিঃসরণ করে। সে রসের ওপর কালো ছত্রাক জন্মে, যা আশ্রয়দাতা গাছের আরও সর্বনাশ করে। যুক্তরাষ্ট্র নানাভাবে এদের দমন করার চেষ্টা করছে, আঠা ফাঁদ দিয়ে এদের বাচ্চাদের আটকানো গেলেও বড়দের আটকানো যাচ্ছে না। এরা কীটনাশকের বিরুদ্ধেও প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করেছে। গবেষকরা বলছেন, বাংলাদেশেও কোনো কোনো এলাকায় এ পোকাটি আছে। খোঁজ পেলে এর দ্বারা চরম সর্বনাশ হওয়ার আগেই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ