মানুষ ও পশুপাখির মধ্যে সখ্য বহু পুরোনো হলেও তাদের ভাষা বোঝা ছিল এক দুর্ভেদ্য রহস্য। কয়েক দশক ধরে বিজ্ঞানীরা এই রহস্য উন্মোচনের চেষ্টা করছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে মানুষ এখন প্রাণীদের মনের ভাব বোঝার পথে অনেকটাই এগিয়েছে। ২০২৫ সালে ‘কুলার ডুলিটল’ চ্যালেঞ্জ নামে একটি বৈজ্ঞানিক প্রতিযোগিতায় এই অগ্রগতির প্রতিফলন দেখা গেছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি দল প্রতিযোগিতায় জয়লাভ করেছে। তারা প্রমাণ করেছে, ডলফিনের বিশেষ কিছু শিস মানুষের শব্দের মতো সুনির্দিষ্ট অর্থ বহন করে। একসময়ে যা ছিল সায়েন্স ফিকশন বা রূপকথার গল্প, তা এখন বাস্তবের দোরগোড়ায়।
প্রযুক্তির উৎকর্ষে এখন এমন সব মাইক্রোফোন তৈরি হয়েছে, যেগুলো মানুষের শ্রবণসীমার বাইরের শব্দও নির্ভুলভাবে রেকর্ড করতে পারে। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক কেট জোনস জানান, মানুষের কান সর্বোচ্চ ২০ কিলোহার্টজ পর্যন্ত শব্দ শুনতে পায়। অথচ কিছু বাদুড় ২১২ কিলোহার্টজ পর্যন্ত শব্দ তৈরি করে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ সারে। এই স্তন্যপায়ী প্রাণীরা ভয়, যৌন আকাঙ্ক্ষা বা সতীর্থদের সতর্ক করতে এসব শব্দ ব্যবহার করে। প্রযুক্তির কল্যাণে প্রকৃতির এই অদৃশ্য জগৎটি এখন আমাদের সামনে উন্মোচিত হচ্ছে।
হাতিদের যোগাযোগের ক্ষেত্রেও ঘটেছে বৈপ্লবিক আবিষ্কার। আশির দশকে জীববিজ্ঞানী কেটি পেন প্রথম লক্ষ করেন, হাতিদের কাছাকাছি গেলে বাতাসে একধরনের কম্পন বা গুঞ্জন অনুভূত হয়। পরে বিশেষ সরঞ্জামের সাহায্যে ধরা পড়ে, হাতিরা অত্যন্ত নিম্ন কম্পাঙ্কের শব্দ তৈরি করে। এটি মানুষের কানে ধরা পড়ে না। কেটি পেনের প্রতিষ্ঠিত ‘এলিফ্যান্ট লিসেনিং প্রজেক্ট’ দীর্ঘ সময় ধরে বন্যহাতিদের এসব শব্দ সংগ্রহ করেছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানীরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ওই বিশাল তথ্যভান্ডার বিশ্লেষণ করছেন।
ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের গবেষক অ্যালাস্টেয়ার পিকারিং হাতিদের ডাক বিশ্লেষণের বিশেষ এআই অ্যালগরিদম তৈরি করেছেন। এই সিস্টেমে হাতির বয়স, লিঙ্গ ও মানসিক অবস্থা অনুযায়ী হাজারও ডাকের রেকর্ড জমা করা হয়েছে। এআই এখন অডিও শুনেই বলে দিতে পারে কোনটি বিপদগ্রস্ত পুরুষ হাতির ডাক। পিকারিংয়ের মতে, এই প্রযুক্তি রিয়েল টাইমে বা তাৎক্ষণিকভাবে হাতির ভাষা বিশ্লেষণ করতে সক্ষম। এর ফলে হাতিরা কখন লোকালয়ে ঢুকে ফসল নষ্ট করতে পারে, তার পূর্বাভাস পাওয়া সম্ভব হবে। ভবিষ্যতে হাতির আক্রমণাত্মক মেজাজ বা তীব্র আবেগ শনাক্ত করাও সহজ হবে।
তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখনো শতভাগ নির্ভুল নয়। পিকারিং জানান, একটি রেকর্ডিং ডিভাইসে হাতির শব্দের সঙ্গে বৃষ্টি বা হাঁসের ডাকও রেকর্ড হতে পারে। অনেক সময় সিস্টেম ভুলবশত অন্য কোনো প্রাণীর শব্দকে হাতির ডাক বলে মনে করে। তাই সঠিক ফলাফলের জন্য মানুষের নিবিড় তত্ত্বাবধান ও এআইকে যথাযথ প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। স্মার্টফোনের ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট যেভাবে নির্দিষ্ট কণ্ঠস্বর চেনে, ঠিক সেভাবেই এআইকে নির্দিষ্ট প্রজাতির প্রাণীর শব্দ চিনতে শেখানো হয়।
সমুদ্রের গভীরে স্পার্ম তিমির ভাষা বুঝতেও দারুণ সাফল্য দেখিয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। তিমির দল সাধারণত ‘ক্লিক’ শব্দের মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করে। সিটি ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্কের অধ্যাপক ডেভিড গ্রুবার মানুষের ভাষা অনুবাদ করার সফটওয়্যারের মতো একটি বিশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন। তিনি তিমির পরবর্তী ক্লিকের পূর্বাভাস দেওয়ার চেষ্টা করছেন। গ্রুবার অত্যন্ত আশাবাদী, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষ অদূর ভবিষ্যতে যেকোনো যোগাযোগব্যবস্থা অনুবাদের ক্ষমতা অর্জন করবে। এমনকি পৃথিবীর বাইরের কোনো প্রাণের অস্তিত্ব পাওয়া গেলেও এই পদ্ধতি কাজে লাগতে পারে।
তবে প্রাণীদের ভাষা বোঝার চেষ্টার মূল লক্ষ্য তাদের সঙ্গে কথা বলা নয়। তাদের কথা শোনা। গ্রুবার ব্যাখ্যা করেন, তিমিদের সঙ্গে কথা বলার চেয়ে তাদের জীবন ও ভাষা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করাই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য। ডলফিন গবেষক অধ্যাপক ভিনসেন্ট জ্যাঙ্ক বলেন, ‘প্রযুক্তি আমাদের পশুদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সুযোগ দেবে, এমন আশা করা ঠিক হবে না। কারণ প্রাণীদের ইন্দ্রিয় ও শারীরিক গঠন মানুষের থেকে আলাদা। তারা পরিবেশকে যেভাবে অনুভব করে, মানুষের পক্ষে তা হুবহু বোঝা কঠিন।’
ডলফিন বা তিমির ভাষা শেখাকে কোনো বিদেশি ভাষা শেখার সঙ্গে তুলনা করা চলে না। এটি মূলত একটি ভিন্ন প্রজাতির অস্তিত্ব ও তাদের বেঁচে থাকার লড়াইকে বোঝার চেষ্টা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের সেই সুযোগ করে দিচ্ছে। আমরা হয়তো এখনো ডলফিনকে জিজ্ঞেস করতে পারছি না তাদের প্রিয় রং কী। কিন্তু তাদের দুঃখ, ভয় বা আনন্দের সংকেতগুলো এখন আমাদের কাছে আগের চেয়ে অনেক বেশি স্পষ্ট। প্রযুক্তির এই জয়যাত্রা জারি থাকলে হয়তো একদিন বন্যপ্রাণের সংরক্ষণে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।
মানুষ তার নিজের সীমাবদ্ধতার গণ্ডি পেরিয়ে প্রকৃতির বিশালতাকে অনুভব করতে শুরু করেছে। এই নতুন উপলব্ধি আমাদের পৃথিবীকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বিজ্ঞানের মেলবন্ধনে প্রাণিজগতের সঙ্গে মানুষের অদৃশ্য দেয়ালটি ধীরে ধীরে ধসে পড়ছে। এই অগ্রযাত্রা শুধু জ্ঞানচর্চার বিষয় নয়। প্রাণীদের প্রতি মানুষের সংবেদনশীলতা ও সহমর্মিতা বাড়ানোর একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে। অনাগত দিনে হয়তো প্রতিটি প্রাণীই তার নিজের ভাষায় আমাদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবে। সূত্র: বিবিসি
