‘সংস্কার সুরক্ষা স্বাধীনতা- এই প্রতিপাদ্যে আয়োজিত এবারের বিজেসির পঞ্চম সম্প্রচার সম্মেলনে দেশের ৩০টি টেলিভিশনের ওপর করা একটি জরিপের ফল প্রকাশ করে বিজেসি (ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টার)। তাতে বলা হয়, গেলো এক বছরে টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে কর্মরত ১৫০ জনের বেশি সাংবাদিককে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। ৩৫ শতাংশ টেলিভিশনে কর্মরতদের বেতন অনিয়মিত। আর ২ থেকে ৫ মাস পর্যন্ত কর্মীদের বকেয়া রেখে বেতন দিচ্ছে ২০ শতাংশ টেলিভিশন।
শনিবার (২১ ডিসেম্বর) রাজধানীর সেগুনবাগিচায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট অডিটরিয়ামে বিজেসির পঞ্চম সম্প্রচার সম্মেলনে এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়।
বিভিন্ন গণমাধ্যমের মালিকরা সাংবাদিকদেরকে নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে মন্তব্য করে তাদের পরিচয় প্রকাশে সংস্কার কমিশনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন সম্মেলনের প্রধান অতিথি সিনিয়র সাংবাদিক শফিক রেহমান।
এ সময় গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ বলেছেন, বিগত দিনে ক্ষমতাসীনদের লেজুড়বৃত্তি আর অতিউৎসাহী সাংবাদিকতা পেশার মান-মর্যাদা নষ্ট করেছে। এ বিষয়ে সম্মেলনের আহ্বায়ক এবং যমুনা টেলিভিশনের প্রধান নির্বাহী ফাহিম আহমেদ বলেন, সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা দূর করে স্বাধীন সাংবাদিকতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করছে বিজেসি।
অনুষ্ঠানে জরিপের তথ্য উপস্থাপন করেন বিজেসির নির্বাহী ও সম্প্রচার সম্মেলনের যুগ্ম আহ্বায়ক শাহনাজ শারমীন। তিনি জানান, ৭৯ শতাংশ টেলিভিশনের কর্মীদের স্বাস্থ্যবিমা নেই। আর জীবনবিমা নেই ৭২ শতাংশের। ভবিষ্যত তহবিল বা প্রভিডেন্ট ফান্ড-সুবিধা নেই প্রায় ৭৬ শতাংশ টেলিভিশনে। গ্র্যাচুইটির চিত্র আরও করুণ। প্রায় ৯০ শতাংশ টেলিভিশনেই এই সুবিধা নেই। বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি বা ইনক্রিমেন্ট হয় না প্রায় ৯০ শতাংশ টেলিভিশনে (এটি টেলিভিশনের কর্তৃপক্ষের ওপর নির্ভর করে)। মাত্র ১০ শতাংশ টেলিভিশনে এই সুবিধা আছে। উৎসব ভাতা হয় না ৩৪ শতাংশের বেশি টেলিভিশনে।
৯০ শতাংশ টেলিভিশনে ‘ডে কেয়ার’ সুবিধা নেই। আর ৯৩ শতাংশ টেলিভিশনে মাতৃত্বকালীন ছুটি থাকলেও অধিকাংশে তা তিন থেকে ৪ মাস। যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি নেই ৮২ শতাংশ টেলিভিশনে। সরকারি ছুটির দিনে অতিরিক্ত সময় কাজের মজুরি বা ওভারটাইম দেয় না ৭২ শতাংশের বেশি, আর বৈশাখী ভাতা দেয় না ৯৭ শতাংশ টেলিভিশন। এমনকি সম্প্রচার সাংবাদিকদের চাকরিচ্যুতিতে যে নোটিশ সময় দেওয়ার কথা, তাতেও ব্যত্যয় হয়। প্রায় ৪৫ শতাংশ টেলিভিশনে তা দেওয়া হয় না।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি প্রবীণ সাংবাদিক শফিক রেহমান বলেন, ‘মালিকরা নিজেদের স্বার্থে সাংবাদিকদের ঢাল বানায়। গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনকে খুঁজতে হবে কোন উদ্দেশ্য নিয়ে, কারা (ব্যবসায়ীরা) পত্রিকা-টেলিভিশন বাজারে আনছেন’। সাংবাদিকদের লেখার স্বাধীনতার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতা রক্ষা করার দায়িত্ব কিন্তু আপনাদের নিজেদের, সাংবাদিকদেরই।’
গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ বলেন, বিগত দিনে অনেক গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা ক্ষমতাসীনদের লেজুড়বৃত্তি করায় এই পেশার মান-মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়েছে। এছাড়া এমনকিছু কালাকানুন হয়েছে যেগুলো সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ন করে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করে- সেগুলো বাতিলের দাবি করতে হবে। মতপ্রকাশের অধিকারের সুরক্ষার পাশাপাশি সাংবাদিকদের রুটিরুজির সুরক্ষাও চাইতে হবে।
সাংবাদিকদের জবাবদিহির ব্যবস্থাও থাকা দরকার। বাজারে চাহিদার অতিরিক্ত টিভি চ্যানেল ও পত্রিকা থাকায় নৈরাজ্য বন্ধ হচ্ছে না বলেও মন্তব্য করেন সংস্কার কমিশন প্রধান। টিভি চ্যানেলগুলোর আধেয় (কনটেন্ট) বৈচিত্র্য না থাকায় গত ১৫ বছরে তাদের সাংবাদিকতার কনটেন্ট বিশ্লেষণ করে তা প্রকাশের ওপর তিনি গুরুত্ব দেন। দলীয়করণের প্রসঙ্গে টেনে কামাল আহমেদ বলেন, ‘আমাদের এমন কিছু ভাবতে হবে, যাতে সাংবাদিকতা দলীয়করণমুক্ত থাকতে পারে’।
সম্মেলনের আহ্বায়ক ফাহিম আহমেদ বলেন, বিগত কর্তৃত্ববাদী আওয়ামী সরকারের আমলে গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করা হতো। অনেক সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এখনও যখন সাংবাদিকদের কাজের জন্য বিপজ্জনক দেশের তালিকায় বাংলাদেশের নাম এসেছে। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলা হচ্ছে- ফলে সাংবাদিক হিসেবে এখনো আমরা আতঙ্কিত হই। আমরা ভয় পাই। আমরা এই অবস্থার অবসান চাই। আমরা যদি দলীয় লেজুড়বৃত্তির বাইরে যেতে পারি, তাহলেই কেবল বাংলাদেশের সাংবাদিকরা স্বাধীনভাবে সাংবাদিকতা করার সুযোগ পাবে। তারা হারানো মনোবল ফিরে পাবে। আমরা শুধু সাংবাদিকতাই করতে চাই’।
বিজেসির পঞ্চম সম্প্রচার সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের চেয়ারম্যান রেজোয়ানুল হক। বক্তব্য রাখেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক খায়রুল আনোয়ার, এমআরডিআইর নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমান, জুলাই শহিদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মীর মাহবুবুর রহমান (স্নিগ্ধ) এবং জুলাই অভ্যুত্থানে শহিদ সাংবাদিক মেহেদী হাসানের স্ত্রী ফারহানা ইসলাম। এছাড়া বিভিন্ন গণমাধ্যমের নীতিনির্ধারক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বসহ সম্প্রচার এ সংবাদপত্র শিল্পের সংশ্লিষ্টজনরা উপস্থিত ছিলেন।
এলিস/মাহফুজ/এমএ