বৃষ্টি ও উজানের পাহাড়ি ঢলের কারণে সিলেট, রংপুর, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, গাইবান্ধা, টাঙ্গাইল, কুড়িগ্রাম, সিরাজগঞ্জ ও গাইবান্ধায় বন্যা দেখা দিয়েছে। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে এসব জেলার ১৬ লাখ মানুষ। এদিকে চলমান বন্যা পরিস্থিতি আরও দীর্ঘ হতে পারে বলে জানিয়েছেন ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী মহিবুর রহমান। গতকাল সচিবালয়ে বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে ব্রিফিংকালে তিনি এ আশঙ্কা প্রকাশ করেন। চলমান পরিস্থিতিতে খাবার, বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন, গবাদিপশুর খাবার, বাসস্থান ও পানিবাহিত রোগবালাই নিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছে বানভাসিরা। তার মধ্যে খাদ্যের অভাবে শিশু ও বয়স্ক মানুষ নিয়ে মহাসংকটে পড়েছে পানিবন্দি মানুষ। আমাদের ব্যুরো ও প্রতিনিধিরা জানান-
সিলেট ব্যুরো: সিলেট এবং ভারতের চেরাপুঞ্জিতে বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় জেলায় নদ-নদীগুলোর পানি ধীরে ধীরে নামছে। এর ফলে কমতে শুরু করেছে বন্যার পানি। সিলেটে তৃতীয় দফা বন্যায় গতকাল শনিবার পর্যন্ত বন্যা আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ৫ লাখ ৮৮ হাজার ২৮৭। দুর্গত এলাকায় খাদ্যসংকট নেই। গত শুক্রবার সিলেটের সব উপজেলায় বন্যা আক্রান্তদের মাঝে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে জনপ্রতিনিদের সহায়তায় প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে রান্না করা খাবার ও ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক এবং ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে বন্যার্ত এলাকায় ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে। তবে প্রত্যন্ত এলাকার মানুষজনের বাড়িঘরে পানি থাকার কারণে খাবার রান্না করতে অনেক ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। অনেকেই খাটের ওপর আবার অনেক মানুষ আশপাশের উঁচু জায়গায় রান্না করে ঘরে নিয়ে আসে। সিলেট আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, সিলেটে গত ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাত হয়েছে ২১ দশমিক ৫ মিলিমিটার।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাস বলেন, গতকাল বেশির ভাগ নদীর পানি স্থিতিশীল ছিল। তবে সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর চার পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। যেহেতু বর্ষাকাল তাই বৃষ্টিপাত বেড়ে যেকোনো সময় পানি বাড়তে পারে। তাই সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
সুনামগঞ্জে পানিবন্দি ৫ লাখ মানুষ
সুনামগঞ্জের ১২ উপজেলার অন্তত পাঁচ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। বানভাসিদের অভিযোগ, দ্বিতীয় দফার বন্যায় অসহায়ের মতো পড়ে থাকা ছাড়া কিছু করার নেই। মেম্বার-চেয়ারম্যানসহ কোনো জনপ্রতিনিধি তাদের খোঁজখবর নেননি।
এ বিষয়ে সেলিম মিয়া বলেন, ‘শুনেছি সরকারি ত্রাণ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এতদিন হয়ে গেল আমরা সরকারের দেওয়া ত্রাণ পাইনি। ত্রাণ যাও আসে, তার সবটুকু চেয়ারম্যান-মেম্বারের মানুষজনকে দিয়ে দেওয়া হয়।’
সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রাশেদ ইকবাল চৌধুরী জানান, সরকারের দেওয়া ত্রাণ সহায়তা ১২ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তাদের মাধ্যমে বন্যাদুর্গতদের মাঝে দেওয়া হচ্ছে।
রংপুরে ত্রাণ পায়নি বানভাসিরা
রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার চরাঞ্চল থেকে পানি নামতে শুরু করলেও এখনো পানিবন্দি রয়েছে ১ হাজার ২০০ মানুষ। চরাঞ্চলের এসব বানভাসি মানুষের ত্রাণ তো দূরের কথা, তাদের সঙ্গে কোনো জনপ্রতিনিধি দেখা পর্যন্ত করেননি। এদিকে প্রশাসন বলছে, ‘আমাদের পর্যাপ্ত ত্রাণ মজুত রয়েছে। বন্যাকবলিত এলাকায় ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে।’
গতকাল কথা হয় গঙ্গাচড়া উপজেলার লক্ষ্মীটারি ইউনিয়নের বাসিন্দা শফিকুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘তিন দফায় বন্যায় আমাদের ব্যাপক ক্ষতি হলেও কেউ কোনো রকম সাহায্য করতে আসেনি। শুধু ইউনিয়ন পরিষদ থেকে কিছু শুকনো খাবার তারা পেয়েছেন।’
বানভাসি এলাকার আব্দুর রহমান ও নূর ইসলাম বলেন, ‘আমরা খুব কষ্টে আছি। আমাদের কাছে এখনো সরকারি ত্রাণ পৌঁছায়নি। খেয়ে না খেয়ে আমাদের দিন কাটছে।’
রংপুর জেলা প্রশাসক মোবাশ্বের হাসান জানিয়েছেন, দুই উপজেলায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের মাধ্যমে উপদ্রত এলাকায় ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে। বানভাসি মানুষদের জন্য কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় ত্রাণ অপ্রতুল কথাটি তিনি মানতে রাজি হননি। তিনি বলেছেন, ‘আমাদের পর্যাপ্ত ত্রাণ রয়েছে, যেখানে যখন ত্রাণের প্রয়োজন হবে, সেখানেই দেওয়া হবে।’
মৌলভীবাজারে পানিবন্দি ৩ লাখ মানুষ
মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলায় তিন সপ্তাহ ধরে পানিবন্দি রয়েছে লক্ষাধিক পরিবারের প্রায় তিন লাখ মানুষ।
ভূকশিমইল ইউনিয়নের রশিদ উদ্দিন বলেন, ‘আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা মানুষ খাদ্যসংকটের সঙ্গে বিশুদ্ধ পানির সমস্যায় ভুগছে। এর ফলে হাকালুকি হাওর এলাকায় পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে।’
কুলাউড়া পৌর এলাকার একটি আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা তৌফিক মিয়া বলেন, ‘পানি কমছে না, বাসায় যাওয়াও হচ্ছে না। পাঁচজনের পরিবার নিয়ে এখানে থাকি। প্রথমে রান্না ও শুকনো খাবার পেতাম। এখন পাচ্ছি না।’
কুলাউড়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. শিমুল আলী জানান, সরকারিভাবে নগদ ২ লাখ ১০ হাজার টাকা ও ৬২০ প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। এ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে ১০ কেজি করে চাল বিতরণ করা হয়েছে।
গাইবান্ধার ৭০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা
গাইবান্ধার চার উপজেলার ২৯টি ইউনিয়নের ৭০ হাজার পরিবারের প্রায় দুই লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া অনেকেই ঘরবাড়ি ছেড়ে উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির চরম সংকটে পড়েছে বানভাসি মানুষ। পাশাপাশি গবাদিপশু রাখার জায়গা ও খাবার নিয়ে চিন্তায় পড়েছে বানভাসি মানুষরা। এদিকে পানি ওঠায় চার উপজেলায় ৭০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সাময়িক বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
গুপ্তমণি চরের আলামিন মিয়া জানান, তিন দিন ধরে মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এখনো মানুষ ত্রাণ সহায়তা পায়নি। একই এলাকার রাজু মিয়া বলেন, ‘আমি দিনমজুর। এখনো কোনো খাদ্য সহায়তা পাইনি। দূরে বাজার থেকে শুকনো খাবার আর পানি কিনে আনতে হয়। কাজকাম নাই। খুব কষ্টের মধ্যে আছি।’ পেপুলিয়া চরের আব্দুল্লাহ বলেন, কেউ খোঁজ নেয়নি।
জেলা প্রশাসক কাজী নাহিদ রসুল জানান, জেলা প্রশাসন ৩ হাজার ৫০ প্যাকেট শুকনা খাবার ও ১৬৫ টন চাল উপজেলায় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
টাঙ্গাইলে পৌঁছায়নি কেউ
টাঙ্গাইলে ঝিনাই, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা ও ধলেশ্বরী নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে জেলার ভূঞাপুর, গোপালপুর, টাঙ্গাইল সদর, কালিহাতী, নাগরপুর ও মির্জাপুর উপজেলার নিম্নাঞ্চলে লোকায়গুলো পানি প্রবেশ করছে। ইতোমধ্যে ভূঞাপুর উপজেলার গোবিন্দাসী বাজারে খালে আংশিক কিছু পানিতে তলিয়ে গেছে এবং চরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকার হাজারও মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। তবে এখনো প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোথাও কোনো ত্রাণ দেয়নি বলে অভিযোগ বন্যাকবলিত মানুষদের। এদিকে পানি বৃদ্ধির কারণে কয়েকটি উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় নদীভাঙনও অব্যাহত আছে।
সরেজমিনে ভূঞাপুর উপজেলার গাবসারা ইউনিয়নের দুর্গম চরাঞ্চল ঘুরে দেখা যায়, ফসলি জমি ও অসংখ্য ঘরবাড়িতে পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে করে গবাদিপশু নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছে তারা। অনেকের বাড়িতে দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির সংকট। অনেকে আবার পলিথিন কাগজের ছাউনি তুলে রাস্তার পাশে মানবেতর জীবনযাপন করছে। আবার অনেকে তাদের স্বজনদের বাড়িতে আশ্রয় নিচ্ছে।
এ ছাড়া পানি বৃদ্ধির ফলে ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে ভূঞাপুর উপজেলার চিতুলিয়াপাড়া, মাটিকাটা, পাটিতাপাড়া, কোনাবাড়ী, জয়পুর, রেহাইগাবসারা, ভদ্রশিমুল, চরশুশুয়া, বাসুদেবকোল, রুলীপাড়া, রাজাপুরসহ আরও বিভিন্ন এলাকা। এর মধ্যে পাটিতাপাড়া ও মাটিকাটা এলাকায় ১০ থেকে ১৫টি পরিবারের ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হয়েছে এবং ভাঙন অব্যাহত থাকায় আরও অনেকের বসতভিটা ভাঙনের হুমকির মুখে পড়েছে।
কুড়িগ্রামে খাদ্যসংকটে লক্ষাধিক মানুষ
ব্রহ্মপুত্রসহ ১৬টি নদ-নদীর পানিতে সম্পূর্ণ বা আংশিক তলিয়ে যাওয়া উত্তরের জেলা কুড়িগ্রামের লক্ষাধিক মানুষের একটি বড় অংশই খাদ্যসংকটে পড়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, জেলার চিলমারী ও নাগেশ্বরী উপজেলার পাশাপাশি অন্যান্য উপজেলার নিম্নাঞ্চল পানিতে তলিয়ে গেছে। এ অবস্থায় প্রায় ১০ দিন বাড়িঘরে পানি থাকায় খাদ্যসংকটে পড়েছে বন্যাদুর্গত এলাকার মানুষ। তবে শুক্রবার পর্যন্ত ২৬টি আশ্রয়কেন্দ্রে আসা তিন হাজারের বেশি দুর্গত মানুষের কেউ খাদ্যসংকটে আছে, এমন অভিযোগ পাওয়া যায়নি।
কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মাদ সাইদুল আরীফ জানান, গত শুক্রবার পর্যন্ত বানভাসির মাঝে ২১ লাখ ৮৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। স্থানীয়ভাবে প্যাকেট করা খাবার দেওয়া হয়েছে ৩ হাজার ৬৬৭ পরিবারকে। চালও দেওয়া হয়েছে ২৮১ টন।
সিরাজগঞ্জে ২৪ হাজার মানুষ পানিবন্দি
সিরাজগঞ্জ জেলার বন্যা পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে। জেলার কাজীপুর, সদর বেলকুচি, চৌহালী ও শাহজাদপুর উপজেলার চরাঞ্চলবেষ্টিত ৩৪টি ইউনিয়নের ৫ হাজার পরিবারের প্রায় ২৪ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। অনেকে বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ওপর আশ্রয় নিয়েছে। বাঁধের ওপর খোলা আকাশের নিচে পলিথন টানিয়ে কোনোমতে ঘর তুলে থাকছে বানভাসিরা। এসব এলাকায় দেখা দিয়েছে শুকনা খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট। একই সঙ্গে দেখা গেছে গবাদিপশুর খাদ্যসংকট। তবে এখন পর্যন্ত সরকারি দল, কোনো জনপ্রতিনিধি ও কোনো এনজিওকর্মী সহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসেননি বলে অভিযোগ জানিয়েছে বানভাসিরা।
সায়দাবাদ ইউনিয়নের ছাতিয়ানতলী গ্রামের বাসিন্দা জাকারিয়া হোসেন বলেন, ‘কয়েক দিন ধরে বাড়িতে পানি উঠেছে। গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি নিয়ে চরম ভোগান্তির মধ্যে রয়েছি। এখন পর্যন্ত কোনো জনপ্রতিনিধি ও সরকারি লোকজন এসে খোঁজখবর নেয়নি।’
একই ইউনিয়নের মোহনপুর গ্রামের নূরনবী বলেন, ‘প্রতিদিন ব্যাপকভাবে পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে, তিন-চার দিন ধরে বাড়িতে পানি ওঠায় বাসস্থান, রান্নাঘর পানিতে তলিয়ে গেছে। তাই রান্না করা, খাওয়া-দাওয়া নিয়ে চরম ভোগান্তি ও কষ্ট হচ্ছে। চুরির ভয়ে এখনো পানির মধ্যে ঘরে থাকতে হচ্ছে।’