বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা অসহযোগ আন্দোলনের দ্বিতীয় দিন সোমবার (৫ আগস্ট) সারা দেশে নজিরবিহীন নৈরাজ্য হয়েছে। এ নৈরাজ্য-সহিংসতায় অন্তত ৮২ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে শুধু রাজধানী ঢাকায় নিহত হয়েছেন ৫৩ জন। এ ছাড়া দেশের ৯টি জেলায় অন্তত ২৯ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন কয়েক শ। আমাদের ব্যুরো ও প্রতিনিধিদের পাঠানো বিস্তারিত খবর:
ঢাকায় নিহত ৫৩
রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় নিহত হয়েছেন ৪০ জন। যাত্রাবাড়ীতে বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা থানা ঘেরাও করতে গেলে পুলিশ এলোপাতাড়ি গুলি করে। এতে সেখানে ১৫০ জন গুলিবিদ্ধ হন। আহতদের সহকর্মীরা তাদের উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নিয়ে যান। এ ছাড়া উত্তরায় ১০ জন ও মিটফোর্ড হাসপাতালে একজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। নিহতরা হলেন রাসেল (২৮), সুমন (৩৩), সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাকিব হোসেন (২৪), তোলারাম কলেজের শিক্ষার্থী আব্দুর রহমান (২২), অজ্ঞাতনামা (২৭), সাইফুল ইসলাম তন্ময় (২২), প্রবাসী আবু ইসহাক (৫২), আজমত মিয়া (৪০), পূবালী ব্যাংকের স্টাফ মানিক মিয়া (২৭), অজ্ঞাতনামা (২৫), আশিকুর রহমান (১২), সোহেল (৪৫), আজাদ হোসেন (২৩), আকবর হোসেন (৩৩), আরমান মিয়া (২০), মমিন হোসেন (২৩)। অন্যদের নাম জানা যায়নি। এ ছাড়া গতকাল ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ৩৭৬ জন। এর মধ্যে ৫১ জন ভর্তি রয়েছেন।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রে জানা গেছে, সোমবার দুপুর ১২টার দিকে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর থানায় উত্তেজিত লোকজন ঘেরাও করতে গেলে পুলিশ গুলি ছোড়ে। পুলিশ তাদের বারবার সেখান থেকে সরে যাওয়ার অনুরোধ করলে তারা যাননি। এতে সেখানে পুলিশের গুলিতে প্রায় ৬০ জন আহত হন।
পরে আহতদের সহকর্মীরা তাদের উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। এ ছাড়া যাত্রাবাড়ীর কাজলা এলাকায় দুপুর ১টার দিকে কারফিউ ভঙ্গ করে শিক্ষার্থী ও স্থানীয় লোকজন জড়ো হওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ গুলি করে। এতে সেখানে ৭০ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এ ছাড়া সাইনবোর্ড এলাকায় পুলিশের রাবার বুলেট ও গুলিতে ৪০ জন আহতের খবর পাওয়া গেছে। যাত্রাবাড়ীর তিনটি স্পটের মোট ৪০ জন নিহতের খবর পাওয়া গেছে। এদিকে গতকাল রাজধানীর পুরান ঢাকায় গোলাগুলিতে একজন নিহতের খবর পাওয়া গেছে। নিহত ব্যক্তির বয়স ৩০। তিনি মিটফোর্ড হাসপাতালে মারা গেছেন। এ ছাড়া গতকাল দুপুর ১২টার দিকে উত্তরার আজমপুর এলাকায় ও উত্তরা পশ্চিম থানায় গোলাগুলিতে ১৯ জন আহতের খবর পাওয়া গেছে। এতে ৫ জন নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
রাজধানীর পল্টন, খিলক্ষেত, ভাটারা, মিরপুর, আদাবর, উত্তরা পূর্ব থানা, যাত্রাবাড়ী ও কদমতলী থানায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের খবর পাওয়া গেছে। বাড্ডা থানার মধ্য থেকে টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়ার খবর পাওয়া গেছে। বিক্ষুব্ধ জনতা থানায় ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। পরে সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এদিকে পুলিশ সদর দপ্তরে ভাঙচুর করার খবর পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে ঢামেক হাসপাতালের পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ বাচ্চু মিয়া জানান, যাত্রাবাড়ীতে গোলাগুলিতে অনেক হতাহতের খবর পাওয়া গেছে। এদিকে ধানমন্ডিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসায় আগুন দেন বিক্ষোভকারীরা। খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে।
বরিশালে সাদিক আব্দুল্লাহর বাড়িতে আগুন, পুড়ে মৃত্যু তিনজনের
বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহর পোড়া বাসভবন থেকে তিনটি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। আগুনে পুড়ে চেহারা বিকৃত হয়ে যাওয়ায় লাশের পরিচয় জানা সম্ভব হয়নি।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ফায়ারম্যান মো. বশির উদ্দিন। তিনি বলেন, দুপুরে সাদিক আব্দুল্লাহ বাসভবনে একদল দুর্বৃত্ত আগুন দেয়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট ৪ ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার পর ওই বাড়ির দ্বিতীয় তলার একটি কক্ষ থেকে লাশ তিনটি উদ্ধার করা হয়েছে। পরে মায়নাতদন্তের জন্য শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ঘটনার সময় সাদিক আব্দুল্লাহ সেখানে ছিলেন কি না, নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
হবিগঞ্জে নিহত ৬, থানায় আগুন
হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ে পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ চলাকালে গুলিবিদ্ধ হয়ে ছয়জন নিহত হয়েছেন। পুলিশ সদস্যসহ আহত হয়েছেন শতাধিক। তাদের মধ্যে অন্তত আটজনের অবস্থা গুরুতর।
সোমবার সকাল ১০টার দিকে ছাত্র-জনতার একটি মিছিল বড় বাজার থেকে থানার দিকে আসতে থাকে। ঈদগাহের সামনে মিছিলে বাধা দেয় পুলিশ। একপর্যায়ে সংঘর্ষ হয়। আন্দোলনকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়তে থাকেন। জবাবে পুলিশ রাবার বুলেট, কাঁদানে গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়তে থাকে। কিন্তু গণজোয়ারের মুখে পুলিশ পিছু হটে। পরে আন্দোলনকারীরা থানায় হামলা করেন। ডাকবাংলোয় আগুন ধরিয়ে দেন।
নিহত ব্যক্তিরা হলেন বানিয়াচংয়ের যাত্রাপাশা মহল্লার সানু মিয়ার ছেলে হাসান মিয়া (১২), মাঝের মহল্লা গ্রামের আব্দুর নূরের ছেলে আশরাফুল ইসলাম (১৭), পাড়াগাঁও মহল্লার মোজাক্কির মিয়া (৪০), কামালহানি মহল্লার নয়ন মিয়া (১৮), যাতুকর্ণপাড়া মহল্লার তোফাজ্জল (১৮) ও পূর্বঘর গ্রামের সাদিকুর (৩০)।
হবিগঞ্জ জেলা সিভিল সার্জন নূরুল হক বলেন, গুলিবিদ্ধ হয়ে ছয়জন নিহত হয়েছেন। আরও কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
খুলনায় বাড়িতে আগুন, পুড়ে মৃত্যু আ.লীগ নেতার
বিক্ষুব্ধ জনতার পিটুনিতে কয়রা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জি এম মহসিন রেজাসহ তিনজন নিহত হয়েছেন। নিহত অন্য দুজন হলেন জি এম মহসিন রেজার গাড়িচালক আলমগীর ও ব্যক্তিগত সহকারী মফিজুল ইসলাম। সোমবার বিকেলে এ ঘটনা ঘটে।
শেখ হাসিনা পদত্যাগের পর ও দেশত্যাগের খবর পেয়ে বিক্ষুব্ধ জনতা জি এম মহসিন রেজার বাসভবনে হামলা করেন। এ সময় তিনি ব্যক্তিগত পিস্তল দিয়ে সাতটি গুলি করেন। এতে সাতজন গুলিবিদ্ধ হন।
পরে বিক্ষুব্ধ জনতা জি এম মহসিন রেজার বাসায় ঢুকে তাকে ব্যাপক মারধর ও মালপত্রে আগুন ধরিয়ে দেন। আগুনে পুড়ে রেজার মৃত্যু হয়। একই সময় ঘটনাস্থলে থাকা তার আরও দুই সহযোগী নিহত হন।
কয়রা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মিজানুর রহমান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
রাজশাহীতে শিক্ষার্থী নিহত, গুলিবিদ্ধ ৩০
রাজশাহীতে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষে সবুজ নামের এক শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন। সোমবার দুপুর ১টার দিকে নগরীর স্বচ্ছ টাওয়ার মোড়ে এ ঘটনা ঘটে। এ সংঘর্ষে ৩০ জন গুলিবিদ্ধ হন। সবুজ বেসরকারি বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। তার বাড়ি নগরীর রানীনগর এলাকায়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সোমবার সকাল থেকে নগরীর তালাইমারীসংলগ্ন রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) সামনে জড়ো হতে থাকেন শিক্ষার্থীরা। পরে দুপুর ১টার দিকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে নগরীর স্বচ্ছ টাওয়ার মোড়ে আসেন বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। এদিকে নগরীর আলুপট্টি মোড়ে সশস্ত্র অবস্থায় অপেক্ষা করছিলেন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। মিছিলটি সাগরপাড়া মোড়ে পৌঁছলে তারা আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করেন। মিছিল থেকে ককটেল ছুড়ে মারা হয়। এ সময় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা কিছুটা পিছু হটেন। এরপর পুলিশ এলে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা আন্দোলনকারীদের ওপর আক্রমণ করেন। এ সময় বেশ কিছু ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। গুলি ছোড়েন নেতা-কর্মীরা। পুলিশও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়ে। এতে আন্দোলনকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। এ সময় বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সবুজ পালিয়ে শাহ মখদুম কলেজের পাশে একটি বাড়িতে আশ্রয় নেন। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা ওই বাড়িতে ঢুকে সবুজকে কুপিয়ে হত্যা করেন।
রামেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ইনচার্জ শংকর কুমার বিশ্বাস জানান, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ৪০ জনের মধ্যে ৩৭ জন এসেছেন রাজশাহী মহানগর থেকে। তিনজন এসেছেন জেলার গোদাগাড়ী উপজেলা থেকে। ভর্তি ৪০ জনের মধ্যে ৩০ জনই গুলিবিদ্ধ।
রাজশাহী মহানগরীর বোয়ালিয়া থানার ওসি হুমায়ুন কবীর বলেন, সংঘর্ষে হতাহতের সঠিক সংখ্যা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
ফরিদপুরে থানায় আগুন, নিহত ১
ফরিদপুর সদর থানায় আগুন ও অস্ত্রাগার লুট করেছেন বিক্ষুব্ধ জনতা। সোমবার সন্ধ্যার আগে তারা থানাটি দখলে নিয়ে নেন। এর আগে পুলিশ থানা থেকে বের হয়ে গুলি ছুড়তে ছুড়তে বের হয়ে যায়। এ সময় কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হন। তাদের মধ্যে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একজনের মৃত্যু হয়। তার নাম সামসু বলে জানা গেছে।
টাঙ্গাইলে পুলিশের গুলিতে নিহত ৩
টাঙ্গাইল সদরে দুজন এবং ধনবাড়ী উপজেলায় একজন আন্দোলনকারী নিহত হয়েছেন। সোমবার সন্ধ্যায় টাঙ্গাইল সদর থানা এবং বিকেলে ধনবাড়ী থানার সামনে এ ঘটনা ঘটে। এ সময় অন্তত ৪০ জন আহত হয়েছেন।
নিহতদের মধ্যে একজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তার নাম সোহেল। বাড়ি ভূঞাপুরে। সে এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিল।
পুলিশ জানায়, সন্ধ্যায় আন্দোলনকারীরা মিছিল নিয়ে টাঙ্গাইল সদর থানায় ঢুকে পুলিশের ওপর হামলা চালান। এ সময় পুলিশ আত্মরক্ষার্থে গুলি ছোড়ে। এতে বেশ কয়েকজন আহত হন।
টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক (আরএমও) নাহিদ আরেফিন জানান, গুলিবিদ্ধ দুজনের লাশ মর্গে পাঠানো হয়েছে। আহতদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
এ ছাড়া ধনবাড়ীতে থানায় হামলা করার সময় পুলিশের গুলিতে একজন নিহত হয়েছেন।
চুয়াডাঙ্গায় যুবলীগ নেতার বাসায় আগুন, ৪ জনের মৃত্যু
চুয়াডাঙ্গা শহরের সিনেমা হলপাড়ায় যুবলীগের সাবেক নেতা আরেফিন আলম রঞ্জুর ভবনে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। এতে পুড়ে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে আটজনকে। সোমবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে ঘটনা ঘটে।
পরে চুয়াডাঙ্গা ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের কর্মীরা গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। ভবনের চতুর্থ তলা থেকে চারজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া আটজনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। তবে নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
চুয়াডাঙ্গা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক মো. রফিকুজ্জামান বলেন, ‘নিচ থেকে চারতলা পর্যন্ত আগুন লেগেছিল। আমরা এসে নিয়ন্ত্রণে আনি। পরে ভবনের চতুর্থ তলা থেকে আটজনকে জীবিত উদ্ধার করেছি। এখন চারজনের লাশ পাওয়া গেছে।’
এদিকে গাজীপুরে ছয়জন ও সাতক্ষীরায় চারজন নিহত হয়েছেন।