শেরপুরে বন্যায় নদ-নদীর পানি কমলেও ঢলের পানি যেদিক দিয়ে নেমে যাচ্ছে, সেই সব অঞ্চল নতুন করে প্লাবিত হচ্ছে। রবিবার (৬ অক্টোবর) বিকেল থেকে বৃষ্টি কমে যাওয়ায় জেলার শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলা থেকে পানি কমতে শুরু করেছে। বন্যায় এখন পর্যন্ত জেলায় সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। আরও নিখোঁজ রয়েছেন এক নারীসহ দুজন। এদিকে ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা ও নোয়াখালীতে প্রায় ১৪ লাখ মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-
শেরপুর: এ জেলায় নিহতরা হলেন নালিতাবাড়ীর খলিসাকুড়া এলাকার খলিলুর রহমান (৬৫), আন্ধারুপাড়া এলাকার ইদ্রিস আলী (৬৩), নিশ্চিন্তপুর কুতুবাকুড়া গ্রামের দুই ভাই আলম (১৭) ও হাতেম (৩০), বাঘবেড় বালুরচরের ওমেজা বেওয়া (৫৫), চিকনা এলাকার উজ্জ্বল (৫০) ও নকলার গজারিয়া এলাকার আব্দুর রাজ্জাক (৫০) পানিতে ডুবে মারা গেছেন। আর নিখোঁজ রয়েছেন এক নারীসহ দুজন।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যানুযায়ী, জেলার ভোগাই নদীর পানি ৫৩ সেন্টিমিটার, চেল্লাখালী নদীর পানি ৫৩ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ ছাড়া অপর দুটি পাহাড়ি নদী মহারশি ও সোমেশ্বরীর পানি বিপৎসীমার নিচে রয়েছে। এদিকে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, মৃগী ও দশানী নদীর পানি বৃদ্ধি পেলেও বিপৎসীমার অনেক নিচ দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে।
জানা গেছে, রবিবার দুপুর থেকে উজানের পানি নামতে শুরু করেছে। এর ফলে নিম্নাঞ্চলের নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। এরই মধ্যে নতুন করে শেরপুর সদর ও নকলা উপজেলার অন্তত ১০টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। আর শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী উপজেলা থেকে পানি নামতে শুরু করেছে। বর্তমানে ঝিনাইগাতী উপজেলা সদর, ধানশাইল, গৌরীপুর, নলকুড়া, হাতিবান্ধা ও মালিঝিকান্দা ইউনিয়ন, শ্রীবরদী উপজেলার সিঙ্গাবরুনা, রানীশিমুল, কাকিলাকুড়া, তাঁতীহাটি, গোসাইপুর ও গড়জরিপা ইউনিয়ন, শেরপুর সদর উপজেলার গাজীরখামার, ধলা ও বাজিতখিলা ইউনিয়ন এবং নকলা উপজেলার পৌরসভা (আংশিক), গণপদ্দি, নকলা সদর ও উরফা ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে পানিবন্দি রয়েছে বহু মানুষ।
ময়মনসিংহে দেড় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি: অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট, ধোবাউড়া ও ফুলপুর উপজেলার বন্যা পরিস্থিতি অবনতি হয়েছে। এতে জেলার তিন উপজেলার ২১টি ইউনিয়নের দেড় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বিচ্ছিন্ন রয়েছে বিদ্যুৎ সংযোগ এবং মোবাইল নেটওয়ার্ক।
রবিবার বিকেলে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. সানোয়ার হোসেন এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
তিনি বলেন, ‘হালুয়াঘাটের পানিবন্দি এলাকার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোকে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এসব কেন্দ্রে বতর্মানে নারী-শিশুসহ দেড় সহস্রাধিক মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। এতে দুর্গতদের জন্য তিন উপজেলায় ৩০ মেট্রিক টন খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে দুর্গতদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম চলছে। এ ছাড়া রান্না করা খাবারও দেওয়া হচ্ছে দুর্গতদের মাঝে। তবে অপর একটি সূত্র জানায়, ধোবাউড়া উপজেলার কলসিন্দুর, জিগাতলা, পঞ্চনন্দপুরসহ বিভিন্ন পয়েন্টে নেতাই নদীর বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করে। এতে পুরো উপজেলা প্লাবিত হয়েছে। দুর্গতদের মাঝে শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানির চরম সংকট দেখা দিয়েছে। তবে তাদের খাবারের ব্যবস্থা করছে প্রশাসন। এ ছাড়া পানিবন্দি অনেক মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিচ্ছে।’
নেত্রকোনায় ২৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি: একটানা বৃষ্টি ও ঢলের পানিতে সীমান্তবর্তী দুর্গাপুর, কলমাকান্দা, পূর্বধলা, সদর উপজেলাসহ বারহাট্টা উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। আকস্মিকভাবে পানিতে ডুবে গেছে অন্তত ২৫টি গ্ৰাম। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে অন্তত ২৫ হাজার মানুষ। বন্যায় ফসল হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে এলাকাবাসী। গবাদিপশুর খাদ্যসংকট ও দেখা দিযে়ছে।
রবিবার দুপুর পর্যন্ত জেলার পূর্বধলা উপজেলাধীন জারিয়ায় ২৫০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। জেলা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সারোয়ার জাহান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন, যা শুধু জেলায় নয়- সারা দেশে সর্বোচ্চ। বৃষ্টিপাত এখনো হচ্ছে। অন্যদিকে পাশাপাশি উপজেলা দুর্গাপুরে ও ১৮৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে।
নোয়াখালীতে আবারও পানিবন্দি ১২ লাখ মানুষ: টানা ভারী বর্ষণে ফের বন্যা দেখা দিয়েছে নোয়াখালীতে। জলাবদ্ধতায় এরই মধ্যে আটকা পড়েছে অন্তত ১২ লাখ মানুষ। পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় জলাবদ্ধতায় চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে জেলার বাসিন্দাদের। ডুবে গেছে সড়ক, বাসাবাড়িতেও ঢুকছে পানি।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ৮৭ ইউনিয়নের ১১ লাখ ৯৫ হাজার ৩০০ মানুষ এখনো পানিবন্দি। ২৩টি কেন্দ্রে আশ্রিত আছে ১ হাজার ২৫ জন। এ পর্যন্ত জেলায় মৃতের সংখ্যা ১২ জন।
সরেজমিনে নোয়াখালীর বিভিন্ন উপজেলা ঘুরে দেখা যায়, গতকাল শনিবার ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে প্লাবিত হয়েছে। ডুবে আছে বসতঘর ও সড়ক। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঘরের বাইরে বের হচ্ছেন না। তবে জীবিকার তাগিদে বৃষ্টি উপেক্ষা করে বের হয়েছেন রিকশাচালক, শ্রমিক ও খেটে খাওয়া মানুষ। রাস্তাঘাটে মানুষ কম থাকায় তারাও পড়েছেন বিপাকে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোও তেমন খোলেনি। অনেকেই ঘরবন্দি হয়ে পড়েছেন। এ ছাড়া টানা বৃষ্টিতে শহরের বিভিন্ন জায়গায় পানি জমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।
বেগমগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা মো. ইমরান হোসেন বলেন, ‘টানা বৃষ্টিতে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের প্রায় সব গ্রামের মানুষ পানিবন্দি। নিচু এলাকাগুলোতে বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় আগের বন্যার পানিও এখনো নামেনি। নতুন করে বৃষ্টি হওয়ায় ভোগান্তি আরও বেড়েছে।’