স্বাধীন বাংলা বেতারের শিল্পী সুজয় শ্যাম মারা গেছেন।
বৃহস্পতিবার (১৭ অক্টোবর) রাত ২টা ৫০ মিনিটের দিকে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।
তার মেয়ে রূপমঞ্জুরী শ্যাম লিজা এ তথ্য জানিয়েছেন।
ক্যান্সার, ডায়েবেটিস, কিডনিসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত ছিলেন সুজেয় শ্যাম। গত সেপ্টেম্বর তার হার্টে পেসমেকার বসানোর পর ইনফেকশন হয়ে যায়। পরে গত ২৪ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করানো হয় তাকে।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের উপদেষ্টা কাজল দেবনাথ জানান, বেলা সোয়া ১১টার দিকে সুজেয় শ্যামের মরদেহ নিয়ে আসা হয় ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে। সেখানে ঢাকা জেলা প্রশাসনের পক্ষে পুলিশের একটি চৌকষ দল প্রথমেই জাতীয় পতাকায় কফিন মুড়িয়ে দেয়। এরপর ঢাকা জেলা প্রশাসন পক্ষ থেকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পর্বে ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। এসময় বিউগলে বেজে উঠে করুণ সুর। গান স্যালুটে শ্রদ্ধা নিবেদন করা একাত্তরের বীর কণ্ঠযোদ্ধা সুজেয় শ্যামের প্রতি।
ততক্ষণে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে পৌঁছে যান স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের শিল্পী বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহীন সামাদ, তিমির নন্দী, প্রবীণতম শিল্পী খোরশেদ আলম, শুভ্র দেব, বিজন চন্দ্র মিস্ত্রিসহ সংগীত ভুবনের অনেকে। শেষ দেখায় প্রিয় সহযোদ্ধার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তারা। শোকাতুর আবহে শ্রদ্ধা জানায় বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ, মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সদস্যরা। ব্যক্তিগত পর্যায়ে অনেকে শ্রদ্ধা জানান সুজেয় শ্যামের মরদেহে।
পরে শুক্রবার দুপুর একটার দিকে বাসাবোর রাজারবাগে বরদেশ্বরী কালি মন্দিরে সুজেয় শ্যামের মরদেহ সৎকার করা হয় বলে জানান কাজল দেবনাথ।
স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সুজেয় শ্যামের নাম। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের নয়টি গানে সুর করেছিলেন সুজেয় শ্যাম, যেগুলো একাত্তরের জুন থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত গাওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে রয়েছে ‘মুক্তির একই পথ সংগ্রাম’, ‘ওরে শোনরে তোরা শোন’, ‘রক্ত চাই রক্ত চাই’, ‘আজ রণ সাজে বাজিয়ে বিষাণ’, ‘আহা ধন্য আমার’, ‘আয়রে চাষী মজুর কুলি’।
তার সুর করা গানের মধ্যে রয়েছে ‘রক্ত দিয়ে নাম লিখেছি’ এবং ‘বিজয় নিশান উড়ছে ওই’ গান দুটি। বাংলাদেশের যেকোনো জাতীয় দিবসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে গান দুটি।
গিটার বাদক ও শিশুতোষ গানের পরিচালক হিসেবে ১৯৬৪ সালে তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তান চট্টগ্রাম বেতারে কর্মজীবন শুরু করেন সুজেয় শ্যাম। পরে তিনি ঢাকা বেতারে যোগ দেন। ১৯৬৯ সালে চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালক হিসেবে কাজ শুরু করেন সুজেয় শ্যাম। ঢাকাই চলচ্চিত্রে অবদানের জন্য তিনবার শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালক হিসেবে তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। বাংলাদেশ বেতারের প্রধান সংগীত প্রযোজক পদ থেকে ২০০১ সালে অবসরে যান সুজেয় শ্যাম।
২০০৬ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশ বেতারে প্রচারিত ৪৬টি গানের সংকলন নিয়ে ‘স্বাধীন বাংলা বেতারের গান’ শিরোনামে একটি অ্যালবামের সংগীত পরিচালনা করেন তিনি।
এর ধারাবাহিকতায় ২০১৩ সালে আরও ৫০টি গানের সংকলন নিয়ে ‘স্বাধীন বাংলা বেতারের গান-২’ নামে আরেকটি অ্যালবামের সংগীত পরিচালনা করেন এই শিল্পী। ‘টুনাটুনি অডিও’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সংগীত পরিচালক হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি।
১৯৪৬ সালে সিলেটে জন্ম নেওয়া সুজেয় শ্যামকে সংগীতে অবদানের জন্য ২০১৮ সালে একুশে পদক দেওয়া হয়। তার আগে ২০১৫ সালে শিল্পকলা পদক পান তিনি।
তার মরদেহ বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত ঢাকেশ্বরী মন্দিরে রাখা হবে। এরপর সবুজবাগ মন্দিরে শেষকৃত্য হবে বলে জানান তার মেয়ে রূপমঞ্জুরী।
জয়ন্ত সাহা/সাদিয়া নাহার/