উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে স্থবিরতা, কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করতে যাচ্ছে সরকার।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) সংসদে বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত এ বাজেটে অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা, উৎপাদন ও বিনিয়োগ বাড়ানো, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সম্প্রসারণ, কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা, শিক্ষা-স্বাস্থ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলাকেও অগ্রাধিকার তালিকায় রাখা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এবারের বাজেটের মূল দর্শন হচ্ছে উৎপাদনমুখী ও কর্মসংস্থানবান্ধব অর্থনীতি গড়ে তোলা। সে লক্ষ্য সামনে রেখে বেশ কয়েকটি খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও খাদ্য নিরাপত্তা: নতুন বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে। গত কয়েক বছর ধরে খাদ্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর বড় চাপ তৈরি করেছে। তাই চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, পেঁয়াজ, রসুন, আলু, মাছ ও মাংসসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের করহার কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি খাদ্য মজুত বৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর মাধ্যমে বাজার স্থিতিশীল রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের লক্ষ্য আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা।
কৃষি ও কৃষি-প্রক্রিয়াজাত শিল্প: খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কৃষকের আয় বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে কৃষি খাতকে অন্যতম অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। সারে প্রায় ২৭ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি অব্যাহত রাখা হচ্ছে। কৃষক কার্ডের মাধ্যমে সরাসরি আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। পাশাপাশি কৃষি-প্রক্রিয়াজাত শিল্পে কর ছাড়, সহজ শর্তে ঋণ এবং রপ্তানি সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সরকারের ধারণা, কৃষিভিত্তিক শিল্পের সম্প্রসারণ গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করবে।
কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন: দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়তে থাকায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবারের বাজেটের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্প খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া হতে পারে। যুব উদ্যোক্তাদের জন্য প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা এবং নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন সুবিধার বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। একই সঙ্গে নতুন ব্যবসা শুরু এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠান সম্প্রসারণে ঋণপ্রাপ্তি সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
শিক্ষা ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন: দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে শিক্ষা খাতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে কারিগরি শিক্ষা, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা এবং দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচিতে জোর দেওয়া হচ্ছে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি তৈরির লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচির জন্য বরাদ্দ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। মানবসম্পদ উন্নয়নকে ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে দেখছে সরকার।
স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসা ব্যয় হ্রাস: সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয় কমাতে স্বাস্থ্য খাতে একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে কর-সুবিধা, জীবনরক্ষাকারী ওষুধে ভ্যাট রেয়াত এবং চিকিৎসা সরঞ্জামের ওপর কর কমানোর প্রস্তাব রয়েছে। ক্যানসার, কিডনি ও লিভারের মতো জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা সহায়তার বরাদ্দও বাড়ানো হতে পারে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়ন ও সেবার বিস্তৃতি ঘটানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী: দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের সুরক্ষায় সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে। ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আওতায় লাখো পরিবারকে মাসিক আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা ও প্রতিবন্ধী ভাতার উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি ভাতার পরিমাণও বৃদ্ধি করা হতে পারে। সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ এক লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
শিল্পায়ন ও উৎপাদন খাত: দেশীয় শিল্পের বিকাশে এবারের বাজেটে বড় ধরনের কর-প্রণোদনা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ইলেকট্রনিক্স, ইলেকট্রিক্যাল ও উৎপাদনমুখী শিল্প খাতকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হতে পারে। দেশে উৎপাদিত টেলিভিশন, ফ্রিজ, এয়ার কন্ডিশনার, ওয়াশিং মেশিনসহ বিভিন্ন পণ্যে ভ্যাট কমানোর আলোচনা রয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় শিল্পকে সুরক্ষা দিতে কিছু আমদানিনির্ভর পণ্যের ওপর কর ও শুল্ক বাড়ানো হতে পারে।
তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল অর্থনীতি: ডিজিটাল অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে তথ্যপ্রযুক্তি খাতেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ল্যাপটপ, কম্পিউটার, মনিটর ও মোবাইল ফোন উৎপাদনে কর-সুবিধা অব্যাহত থাকতে পারে। ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাতা, ফ্রিল্যান্সার এবং অনলাইনভিত্তিক সৃজনশীল পেশাজীবীদের জন্যও কর-স্বস্তির প্রস্তাব আলোচনায় রয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প বিকাশ এবং উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করাই এ খাতের মূল লক্ষ্য।
জ্বালানি নিরাপত্তা ও নবায়নযোগ্য শক্তি: বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি খাতকে কৌশলগত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা এবং এলএনজি খাতে কয়েক হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে দীর্ঘমেয়াদি কর-সুবিধা অব্যাহত রাখা হতে পারে। নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করছে সরকার।
অবকাঠামো, পরিবহন ও যোগাযোগ: অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গতিশীল করতে অবকাঠামো উন্নয়ন খাতেও বড় বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। সড়ক, মহাসড়ক, সেতু, বন্দর এবং যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে লজিস্টিক ব্যয় কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকারও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা সরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা: বাংলাদেশের জন্য জলবায়ু পরিবর্তন অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হওয়ায় এ খাতেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। উপকূলীয় বাঁধ নির্মাণ, নদীভাঙন রোধ, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলা এবং জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণে বরাদ্দ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও সবুজ অর্থনীতিকে উৎসাহিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
আর্থিক খাত সংস্কার: ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, কর আহরণ বাড়ানো এবং রাজস্ব ব্যবস্থাকে আধুনিক করার উদ্যোগও নতুন বাজেটের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো, কর ফাঁকি কমানো, করদাতাবান্ধব সেবা চালু এবং আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, নতুন বাজেটে উৎপাদন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক সুরক্ষার মধ্যে ভারসাম্য আনার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি এবং বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিশ্চিত করা না গেলে এসব উদ্যোগের কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন হবে। তাই বাজেটের আকারের চেয়ে এর কার্যকর বাস্তবায়নই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
অন্তরা/