অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের পক্ষ থেকে রোডম্যাপ ঘোষণার আগে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) সব ধরনের নির্বাচনি তৎপরতা বন্ধ রাখার দাবি জানিয়েছে নবগঠিত রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
রবিবার (২০ এপ্রিল) দুপুরে আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে বৈঠকের পর সংবাদিকদের কাছে এমন তথ্য জানান এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী।
তিনি বলেছেন, ‘সরকারি রোডম্যাপ ঘোষণার আগেই নির্বাচন নিয়ে ইসির তৎপরতা সন্দেহজনক। আর ঐকমত্য কমিশনের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে এই কমিশন (ইসি) থাকবে, না পুনর্গঠন হবে।’
নাসীরুদ্দীন জানান, নির্বাচনের আগে ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন, বিগত নির্বাচনগুলোতে অনিয়মে জড়িতদের বিচার এবং মসজিদের ইমামও যেন এমপি প্রার্থী হতে পারেন সে ধরনের ব্যবস্থাসহ নানা বিষয়ে সিইসির সঙ্গে তাদের আলোচনা হয়েছে।
এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক জানান, প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ বিষয়ে তাদের আশ্বস্ত করেছেন। একই সঙ্গে প্রয়োজনে নির্বাচন কমিশন সংস্কারের কথাও বলেছে এনসিপি।
এর আগে দল নিবন্ধনের সময়সীমা ৯০ দিন বাড়ানোসহ জাতীয় নির্বাচনসংক্রান্ত বিভিন্ন ইস্যুতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে এনসিপির ৫ সদস্যের প্রতিনিধিদল প্রায় দুই ঘণ্টা বৈঠক করে। বৈঠকে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর নেতৃত্বে ওই প্রতিনিধিদলে ছিলেন দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক অনিক রায়, খালেদ সাইফুল্লাহ, মুজাহিদুল ইসলাম শাহিন ও তাজনুভা জাবীন।
এরপর বৈঠকের আলোচ্য বিষয় সম্পর্কে দলটির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, ‘নির্বাচনের রোডম্যাপ বা নির্বাচনের বিষয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা না করে ইসিকে সে বিষয়ে বক্তব্য দেওয়ার সময় সতর্ক থাকতে হবে। কারণ সরকারের আগে ইসি কিছু বললে তাতে সন্দেহ সৃষ্টি হবে।’
এরই মধ্যে ইসি জানায়, নির্বাচনের পথে ডিসেম্বরকে মাথায় রেখে অগ্রাধিকারমূলক সব ধরনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন। সে জন্য রোডম্যাপের আদলে ‘অ্যাকশন প্ল্যান’ নিয়ে খসড়া তৈরির কাজ চলছে বলেও জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা। গত ৮ এপ্রিল নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেছেন, ভোটের প্রাথমিক কাজ শেষ করে জুন-জুলাইয়ে ‘কর্মপরিকল্পনা বা অ্যাকশন প্ল্যান’ ঘোষণা করা হবে ইনশাআল্লাহ। ইসির এমন অবস্থান ও তৎপরতার মধ্যেই এনসিপির পক্ষ থেকে এমন বক্তব্য এল। গতকালের বৈঠক শেষে ইসির নির্বাচন নিয়ে এই কর্মতৎপরতার সমালোচনা করেন এনসিপির এই মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী।
তিনি বলেন, ‘সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমরা অনেকগুলো কথা ইসি থেকে শুনতে পাই, যেগুলো আমাদের প্রধান উপদেষ্টা থেকে শুনিনি। রোডম্যাপের কথা শুনিনি, ইসি থেকে এসেছে। এ জন্য আমরা বলব, কথা বলার আগে ইসিকে সতর্ক থাকতে হবে বরং এ বছরের ডিসেম্বর থেকে আগামী বছরের জুনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করা হবে বলে প্রধান উপদেষ্টা যে সময়সীমা জানিয়ে দিয়েছেন, ইসি সে বিষয়ে কাজ শুরু করতে পারে।’
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, ‘আমরা চাই ঐকমত্য কমিশন থেকে আসা সিদ্ধান্তের আলোকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন করা হোক। কারণ পুরোনো ব্যবস্থায় নির্বাচনে আমরা যেতে চাই না। আমরা একটি সংস্কার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। এ প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত করে নির্বাচন কমিশনকেও সংস্কারের আওতায় আনার বিষয়ে সিইসির সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। ঐকমত্য কমিশনের প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করবে বর্তমান কমিশন থাকবে কি থাকবে না। গত তিনটি নির্বাচনে যেসব কর্মকর্তা অনিয়মে জড়িত ছিলেন, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। গত ১৫ বছরে যেসব ব্যক্তি জড়িত ছিলেন, তাদেরও যথাযথ আইনি ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে।’
এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক বলেন, ‘নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন অক্ষরে অক্ষরে প্রয়োগের মধ্য দিয়ে ভবিষ্যতে একটি নির্বাচনে যেতে হবে। কারণ পুরোনো যে সিস্টেম (ব্যবস্থা) রয়েছে, তা কাঠের পেরেক মারার মতো। যখন ইচ্ছা তখন একটি দ্রুত নির্বাচনের আয়োজন করে দেওয়া, একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে নষ্ট করা- এই সুযোগ ছাত্র-জনতা এবার আর হতে দেবেন না। বিগত নির্বাচনগুলোতে যারা প্রার্থী হয়ে অংশ নিয়েছেন, নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের যারা অনিয়মে যুক্ত হয়েছেন, তাদের বিষয়ে তদন্ত করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছি। আওয়ামী লীগ দেশ ও প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠানকে ফ্যাসিস্ট কাঠামোতে নিয়ে গিয়েছিল। মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়েছিল, এর দায় নির্বাচন কমিশনেরও। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ বিষয়ে আমাদের আশ্বস্ত করেছেন।’
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনকে আমরা বলেছি, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে নির্বাচনের বিষয়ে সার্টিফিকেশন দিতে হবে যে নির্বাচন বিশ্বাসযোগ্য হয়েছে কি না, যেন পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনে প্রাতিষ্ঠানিক আকারে নির্বাচন কমিশনকে আইনের আওতায় আনা যায়। তারা দেখেছেন, নির্বাচন কমিশন গত ১৫ বছরে কোনো সার্টিফিকেশন দেয়নি। বরং বিভিন্ন দলীয় অফিস থেকে সার্টিফিকেশনগুলো এসেছে।’
নাসীরুদ্দীন বলেন, আলোচনায় যেসব বিষয় প্রাধান্য পেয়েছে সেগুলো হলো মনোনয়নপত্র জমা দিতে সশরীরে আসার বিধান করা, প্রার্থীদের হলফনামা তদন্ত করে তার সত্যতা নিরূপণ করা, নির্বাচনি সহিংসতা রোধে আচরণবিধি ও ব্যয়ের বিধিতে পরিবর্তন আনা, ঋণখেলাপিদের নির্বাচনে অংশ নেওয়া বন্ধ করা, হলফনামায় ভুল তথ্য থাকলে প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল ও নির্বাচিত হলেও যেন তারা সংসদে থাকতে না সেই ব্যবস্থা করা, প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা, রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের জন্য সময় বাড়ানো, রাজনৈতিক দলগুলো যেন অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক চর্চা করে তা মনিটরিং করা; রাজনৈতিক দলের অফিসের অস্তিত্ব পর্যবেক্ষণ করা, প্রত্যেকটা দলকে নতুন করে নবায়ন করা এবং নির্বাচন ইস্যুতে সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন বাস্তবায়ন করা।