কথিত আছে সিলেট অঞ্চলের প্রতিটি পরিবারের কেউ না কেউ প্রবাসে থাকেন। ফলে প্রবাসী অধ্যুষিত এ অঞ্চলের বেশির ভাগ মানুষের স্বপ্ন থাকে প্রবাসে যাওয়ার। তাদের মধ্যে তরুণরা এখন দেশের বাইরে উচ্চশিক্ষা বা ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্ন বেশি দেখছেন। একসময় সিলেটিদের ওয়ার্ক পারমিটে বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা থাকলেও বিগত বছরগুলোতে এটা কমেছে। সিলেটের শিক্ষার্থীরা এখন বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণে বেশি ঝুঁকছেন। যার প্রমাণ পাওয়া যায় সিলেটে অনুষ্ঠিত দুই দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক শিক্ষা মেলায়। এখানে দুই দিনে তিন হাজারের বেশি শিক্ষার্থী রেজিস্ট্রেশন করে উচ্চশিক্ষায় প্রবাসে যাওয়ার জন্য পরামর্শ, অন-দ্য-স্পট এডমিশন, স্কলারশিপ সুবিধাসহ ভিসা আবেদন প্রক্রিয়া সম্পর্কে জেনেছেন।
সুনামগঞ্জের চানপুর এলাকা থেকে আন্তর্জাতিক শিক্ষা মেলায় এসেছেন আইন উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘আমি এইচএসি পাস করেছি। হাইস্কুলে পড়ার সময় থেকে প্রবাসে লেখাপড়া করার স্বপ্ন দেখি। কারণ আমার গ্রামের অনেক ছেলেমেয়ে গত কয়েক বছর ধরে প্রবাসে গিয়ে লেখাপড়া করছে। নিজেদের ভালো ক্যারিয়ার গড়ছে। তাদের দেখেই প্রবাসে পড়ালেখা করতে অনুপ্রাণিত হয়েছি।’
ফরেন এডমিশন অ্যান্ড ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট কনসালট্যান্টস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ফ্যাকড-ক্যাব) সিলেট জোন আয়োজিত এ মেলা গত শনিবার দুপুরে সিলেট নগরীর আমানউল্লাহ কনভেনশন সেন্টারে উদ্বোধন হয়। সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত শিক্ষার্থী, পেশাজীবী এবং দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত ছিল এই আন্তর্জাতিক শিক্ষা মেলা। রবিবার রাত ৮টায় এই মেলা শেষ হয়।
সিলেট নগরীর কুশিঘাট নয়া বাজার এলাকার বাসিন্দা রূপক মদাক। অনার্স পাস করা এই শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা নিতে প্রবাসে যাওয়ার জন্য আবেদন করেন। কিন্তু আবেদন প্রক্রিয়ায় ত্রুটি থাকার কারণে তিনি এডমিশন পাননি। তাই আন্তর্জাতিক শিক্ষা মেলাতে আসেন তিনি। রূপক বলেন, ‘আমি শুনেছিলাম মেলায় অন-দ্য-স্পট এডমিশনের ব্যবস্থা আছে। বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি উচ্চশিক্ষায় প্রবাসে যাওয়ার ব্যাপারে পরামর্শ দিতে আসবেন। তাই মেলাতে এসেছিলাম পরার্মশ নিতে। আমার সৌভাগ্য এখানে এসে আমি বিনামূল্যে লন্ডনের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করতে পেরেছি।’
আয়োজকরা জানান, এবারের এই আয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ডেনমার্ক, সুইডেন, আয়ারল্যান্ড, মালয়েশিয়া, চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়াসহ এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকার ৩০০টিরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। তারা শিক্ষার্থীদের কোর্স সিলেকশন, ভর্তি প্রক্রিয়া, ভিসা প্রসেসিং, স্কলারশিপ সম্পর্কে তথ্য দেন।
এই মেলায় দেশের প্রথম সারির ৪০টির বেশি এডুকেশন কনসালটেন্সি ফার্মের এক্সপার্টরা উচ্চশিক্ষার স্বপ্নপূরণে শিক্ষার্থীদের পরামর্শ দেন। অংশগ্রহণকারীদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ ছিল অন-দ্য-স্পট এডমিশন এবং ফ্রি অ্যাপ্লিকেশন প্রসেসিং। এ ছাড়া এক্সপো চলাকালে শিক্ষার্থীরা সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে তাদের পছন্দসই প্রোগ্রাম, টিউশন ফি এবং ভর্তি প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করেন। বিশেষ কনসালটেশন বুথগুলোতে পার্সোনালাইজড গাইডেন্স দিয়েছেন বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা।
আন্তর্জাতিক শিক্ষা মেলায় গ্রেস ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশন অ্যান্ড ইমিগ্রেশনের বুথে অস্ট্রেলিয়ার প্রতিনিধি উজ্জ্বল শ্রেষ্টাকে সরাসরি শিক্ষার্থীদের পরামর্শ দিতে দেখা যায়। তার কাছ থেকে পরামর্শ নিতে পেরে অনেক শিক্ষার্থীই উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার নিপা সুলতানা বলেন, ‘আইইএলটিএস করার জন্য গত এক বছর ধরে আমি সিলেটে বসবাস করছি। এখন প্রবাসে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে যাওয়ার প্রক্রিয়াটা অনেক সহজ হয়েছে। তাই আমার মতো গ্রামের একজন সাধারণ কৃষকের মেয়েও এখন বিদেশে পড়তে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে।’
আন্তর্জাতিক মেলা শিক্ষার্থীদের বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে আগ্রহী করে তুলে উল্লেখ করে ফ্যাকড-ক্যাব সিলেট জোনের সেক্রেটারি আবু তৈয়ব দীপু বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ করে দিতে আমরা এই শিক্ষা মেলার আয়োজন করেছি। আমরা চাই আমাদের শিক্ষার্থীরা কোনো অসাধু চক্রের কাছে না গিয়ে বৈধভাবে সহজ প্রক্রিয়ায় প্রবাসে গিয়ে পড়ালেখা করে নিজেদের ক্যারিয়ার গড়বে। এই মেলায় এসে শিক্ষার্থীদের সরাসরি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে নিজেদের পছন্দের প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে পারার সুযোগ ছিল। অনেকে এই সুযোগ কাজেও লাগিয়েছেন।’