সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে কেনাকাটায় অস্বাভাবিক দাম দেখিয়ে অর্থ আত্মসাতের ঘটনা নতুন নয়। তবে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের ২০২১-২২ অর্থবছরের অডিট প্রতিবেদনে যে অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে, তা চমকে দেওয়ার মতো। মাত্র ৫০০ টাকা দামের প্রিন্টারের টোনার ক্রয়মূল্য দেখানো হয়েছে ৫ হাজার ১৯০ টাকা। বাজারমূল্যের চেয়ে ৭ গুণ বেশি দামে কেনা হয়েছে সিসিটিভি ক্যামেরা। এমন অসংখ্য উদাহরণ মিলেছে অডিট রিপোর্টে।
অডিট প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সরকারের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩২ লাখ ৪৫ হাজার ৩৯২ টাকা। বাজারে প্রতি পিস ৩ হাজার ৫৩০ টাকা করে পাওয়া যায় এমন ৭০টি আইপি সিসিটিভি ক্যামেরা রেলওয়ে কিনেছে ২২ হাজার ৭৯০ টাকা করে। ফটোকপি মেশিন, প্রিন্টার, প্রজেক্টর, এসি- সবই কেনা হয়েছে প্রায় দ্বিগুণ বা তারও বেশি দামে।
অডিট প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, ফটোকপি মেশিন কেনা হয়েছে প্রায় দ্বিগুণ দামে। ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা দামের মেশিন কেনা হয়েছে ২ লাখ ৫৫ হাজার টাকায়। অপর একটি ফটোকপি মেশিনের বাজার দাম ৬১ হাজার টাকা হলেও কেনা হয়েছে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৯৮০ টাকায়। ১ হাজার ২০০ টাকা দামের পানির ফিল্টার কিট কেনা হয়েছে ৩ হাজার ৫৭০ টাকায়। মিমিব্রেন কেনা হয়েছে ৯২০ টাকার জায়গায় ২ হাজার ৮৬০ টাকায়। এ ছাড়া ৪১ হাজার ৫০০ টাকার প্রজেক্টর কেনা হয়েছে ৮৩ হাজার ৯০০ টাকায়। অপর আরেকটি ৫৫ হাজার টাকার প্রজেক্টর কেনা হয়েছে ৯৯ হাজার ৫০০ টাকায়। ২১ হাজার টাকার প্রিন্টার কেনা হয়েছে ৪৭ হাজার টাকায়। ২০ হাজার টাকার স্ক্যানার মেশিন কেনা হয়েছে ৩৭ হাজার টাকায়। ৬৫ হাজার টাকার এসি কেনা হয়েছে ১ লাখ ৮৫ হাজার টাকায়। এ ছাড়া ৫০০ টাকার প্রিন্টারের টোনার কেনা হয়েছে ৫ হাজার ১৯০ টাকায়।
শুধু তা-ই নয়, কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে কেনাকাটাই হয়নি। অথচ বিল হয়েছে- এমন নজিরও পাওয়া গেছে।
এ বিষয়ে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) ফরিদ আহম্মেদ বলেন, ‘আমি নতুন যোগ দিয়েছি। যোগদানের দিনই বিষয়টি সম্পর্কে প্রাথমিকভাবে জেনেছি। অডিট আপত্তির জবাব আমাদের দিতে হয়। প্রাথমিক ও সেকেন্ডারি জবাবে আপত্তি থেকে গেলে তা সংসদীয় কমিটিতে যায়। কেউ দোষী হলে অবশ্যই তাকে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।’
এ বিষয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. ফরিদ উদ্দিন খান মনে করেন, রেলওয়ে দুর্নীতির ‘আদর্শ ক্ষেত্র’ হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, ‘এখানে দুর্নীতির সুযোগ নিয়ে অনেক কর্মকর্তা বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, তাদের চাকরির শুরুতে ও বর্তমান সম্পদের হিসাব নেওয়া দরকার। তবেই প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে।’
তিনি আরও বলেন, রেলওয়ে যেন ‘দায়মুক্ত দুর্নীতির ঘাঁটি’। সে জন্য স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন জরুরি। দুদককে আরও সক্রিয় হতে হবে। অডিট নিষ্পত্তির জন্য সময়সীমা বেঁধে দেওয়া উচিত, যাতে পরবর্তী অর্থবছরের আগে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়।