জুলাই সনদ-২০২৫ এর সমন্বিত চূড়ান্ত খসড়ার বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত গ্রহণের পর এবার এর বাস্তবায়নের উপায় খুঁজছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। সেই লক্ষ্যে সম্প্রতি বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে আয়োজিত কমিশনের বৈঠকে জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে গণভোট আয়োজনের প্রস্তাব নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন নির্বাচন বিশ্লেষকরা। এসব বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তারা।
তাদের কেউ কেউ বলছেন, জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে গণভোট করতে গেলে জটিলতা বাড়বে। কাজেই জাতীয় নির্বাচনের আগেই এই ইস্যু সমাধান হওয়া উচিত, তা না হলে রাজনৈতিক দলগুলোর বিভক্তি বাড়তে পারে। এক্ষেত্রে জাতীয় ঐকমত্যের দলিলে দলগুলোর কাছ থেকে সই নেওয়া যেতে পারে। তবে কারও কারও মতে, যেহেতু দুটি নির্বাচনেই ভোট দেবেন দেশের সাধারণ মানুষ, সেক্ষেত্রে একসঙ্গে ভোট আয়োজন করতে পারলে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় রোধ হবে। কারণ দুটি ভোট একসঙ্গে আলাদা ব্যালট বাক্সে গ্রহণ করা হবে।
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. তোফায়েল আহমেদ মনে করেন, গণভোট মানে হচ্ছে সংবিধান সংশোধনের জন্য জনগণের রায় নেওয়া। এটা তো খুব সহজ না। আর এর জন্য প্রথম দরকার রাজনৈতিক ঐকমত্য। কারণ, যারা রুলিং পার্টি পজিশন থাকে, যারা ইলেকশনে কনটেস্ট করবেন, সবার এক ধরনের ঐকমত্য লাগবে। ঐকমত্য না হলে পরে এটা বাস্তবায়ন না-ও হতে পারে।
তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি এই সনদের ইস্যু সমাধান না করে নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নতুন করে জটিলতা বাড়াচ্ছে। দেশে এখন নির্বাচনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। এসব ইস্যুতে দলগুলোর মধ্যে বিভক্তি বাড়ছে। এই বিভক্তি আলটিমেটলি আমাদের একটা অজানা গন্তব্যের দিকে যাচ্ছে, যেটা কাম্য নয়। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোকে দায়িত্ব নিয়ে সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে। এক্ষেত্রে বিকল্প হিসেবে নির্বাচনের আগেই এই ইস্যুতে জাতীয় ঐকমত্যের দলিলে দলগুলোর কাছ থেকে সই নেওয়া যেতে পারে। তা না হলে নির্বাচন বানচাল করতে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীরা আরও সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ড. মো. আব্দুল আলীমের মতে, রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা হলে জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে গণভোট করতে কোনো বাধা নেই। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘এটা আয়োজন করা অসম্ভব না। কিন্তু তার আগে দরকার হচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য। সব পলিটিক্যাল পার্টিকে এক জায়গায় আসতে হবে, সমঝোতায় আসতে হবে, আমরা সবাই এটা চাই। তা না হলে এটা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হতে পারে। তিনি বলেন, ধরা যাক কোনো পলিটিক্যাল পার্টি বলল তারা এর বিপক্ষে। তখন তারা একটা ইস্যু তৈরি করবে। কাজেই ঐকমত্য হওয়ার বিকল্প নাই।’
তিনি বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচন হলো জাতীয় প্রতিনিধিত্ব বাছাইয়ের একটা বিশাল আয়োজন এবং গণভোট হলো সংস্কার প্রস্তাবের বিষয়ে জনগণের মতামত। তাতেও প্রবলেম নাই। তবে অনেক পলিটিক্যাল পার্টি আগে চাচ্ছে না। আলাদা একটা গণভোট আবার আয়োজন করা কিন্তু খুব ব্যয়বহুল। আমাদের গরিব দেশ। অনেক টাকা ব্যয় হবে। একসঙ্গে নির্বাচন করলে অর্থের অপচয় রোধ হবে। তবে একটা লজিস্টিক্যাল চ্যালেঞ্জও আছে ইলেকশন কমিশনের জন্য। জনগণ একসঙ্গে হয়ে দুটা ভোট দিয়ে নেবে। তবে তাদের এ বিষয়ে সচেতন করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা হলো দলগুলো একমত হলে জনগণ একসঙ্গে আলাদা ব্যালটে দুটি ভোট দিতেই পারবে।’
ইসির সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ জেসমিন টুলীর মতে, রাজনৈতিক ঐকমত্য হলে একসঙ্গে আলাদা ব্যালট বাক্সে নির্বাচনে বাধা নেই। খবরের কাগজকে তিনি বলেন, ‘একটা শৃঙ্খলার মধ্যে ইলেকশনটা করতে হলে অবশ্যই একক ইলেকশন তুলনামূলক বিবেচনায় ভালো। একসঙ্গে হতেও কোনো বাধা নেই বলে মনে করি। এদেশে এটা নতুন হলেও অনেক দেশেই একসঙ্গে অনেক ভোট হয়। এটা তো নতুন কিছু না। আমি মনে করি, জনগণের রায় পাওয়াই মূল ফ্যাক্টর। তবে আয়োজনকারী যারা- সরকার, নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন, তারা কতটা প্রস্তুত তার ওপর নির্ভর করবে। কারণ একসঙ্গে ভোট করতে হলে ব্যালটের জন্য শুধুতো ব্যালট মুদ্রণ না, কাগজেরও সংস্থান করতে হবে। আরও অনেক কিছু এর সঙ্গে জড়িত। তারপর ডাবল বাক্স লাগবে। কেন্দ্রে ডাবল বাক্স লাগবে, একটা গণভোটের জন্য, আরেকটা জাতীয় নির্বাচনের জন্য।
নির্বাচন কমিশনের সাবেক এই অতিরিক্ত সচিব বলেন, এক সঙ্গে দুটি ভোট হতে কোনো অসুবিধা নেই। শুধু ব্যালট পেপার প্রিন্টিংয়ের জন্য একটু সময় লাগবে। কারণ গণভোটের জন্য প্রায় ১২ কোটি ব্যালট পেপার লাগবে আমাদের, যদি ধরি, প্রায় ১৩ কোটি ভোটার আছে। ব্যালট পেপার মুদ্রণের সময় লাগবে। এ ছাড়া, ভোট দিতে সময় একটু বেশি লাগবে। সে জন্য কেন্দ্র বাড়াতে হবে। দরকার হলে ভোটিং টাইমও বাড়াতে হবে। জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে। মোট কথা, এই বিষয়ে মানুষকে জানতে হবে। মানে তৃণমূল পর্যায়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে বিষয়টি নিয়ে যেতে হবে।
এ বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি ড. আলী রীয়াজ খবরের কাগজকে বলেছেন, সনদ বাস্তবায়নের বিভিন্ন বিকল্পের মধ্যে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে করার প্রস্তাব এসেছে। তবে এক্ষেত্রে সুবিধা-অসুবিধা, গণভোটে কোন কোন বিষয় থাকতে পারে, এসব নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আমাদের আরও আলোচনা হবে। এ ছাড়া আরও কয়েকটি বিকল্প পদ্ধতিও আলোচনায় আছে। এ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। আমরা আশা করছি, শিগগিরই হয়তো এ বিষয়ে সিদ্ধান্তে আসতে পারব।
রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে অধ্যাপক আলী রীয়াজ জানান, সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কমিশনের আলোচনা চলমান। অন্যদিকে জুলাই সনদের সমন্বিত খসড়া নিয়ে ২৬টি রাজনৈতিক দল মতামত দিয়েছে। এ পর্যায়ে কমিশন মতামতগুলো পর্যালোচনা করছে। বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা এবং দলগুলোর মতামত পর্যালোচনার পর সনদ বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে দলগুলোর সঙ্গে আগামী সপ্তাহে কমিশন আবার আলোচনা শুরু করবে।