আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করার জন্য যত রকমের প্রস্তুতি দরকার তার অনেক কিছু এগিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। তিনি বলেন, সুষ্ঠু, সুন্দর ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন করতে তার কমিশন প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। তবে দুষ্কৃতকারীরা ভোট নস্যাতের চেষ্টা করবে- এমন আশঙ্কা প্রকাশ করে দেশবাসীকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান সিইসি। গতকাল রবিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধির সঙ্গে সংলাপে তিনি এসব কথা বলেন।
এই সংলাপের প্রথম দিন দুই দফায় সংলাপে ৬০ জনের বেশি প্রতিনিধিকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও এতে যোগ দেন ২৮ জন। বেলা ১১টা থেকে ২টা পর্যন্ত প্রথম দফা সংলাপে অংশ নেন বুদ্ধিজীবী ও সুশীল সমাজের ১৩ জন। আর দ্বিতীয় দফায় বেলা আড়াইটা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত সংলাপে যোগ দেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের ১৫ জন বর্তমান-সাবেক উপাচার্য ও শিক্ষক। সংলাপে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সভাপতিত্বে চার নির্বাচন কমিশনার, ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
আলোচনায় বিগত দিনে সুষ্ঠু নির্বাচন না হওয়ার পরিণতি কী হয়, তা বর্তমান কমিশনারদের মনে করিয়ে দেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও বুদ্ধিজীবীরা। আগামী জাতীয় নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য একটা ট্রানজিশন উল্লেখ করে তারা বলেন, দেশের চলমান ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে বর্তমান নির্বাচন কমিশন এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নিয়েছে। কাজেই এই কমিশনকে সাংবিধানিক ও আইনি দায়িত্ব পালনে মেরুদণ্ড সোজা রাখতে হবে এবং নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিশ্চিতে ভোটের মাঠে গণমাধ্যমের সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও নারীদের জন্য মাত্র ৫ থেকে ৭ শতাংশ আসনের সংস্কার প্রস্তাব অগ্রহণযোগ্য বলেও মন্তব্য করেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। একই সঙ্গে সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ নির্বাচনের জন্য এই নাসির উদ্দিন কমিশনকে সাহস দেখানোর পরামর্শ দিয়ে প্রয়োজনে পদত্যাগেরও আহ্বান জানান।
সংলাপে সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেন, ‘সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় বেশির ভাগ প্রস্তুতি ইতোমধ্যেই আমরা সম্পন্ন করেছি। তার মধ্যে ভোটার তালিকা হালনাগাদের কাজ বাড়ি বাড়ি গিয়ে শেষ করেছি। নারী ভোটার ব্যবধান কমিয়েছি। সংস্কার কমিশনের আলোচনায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব এসেছে। ৯টি আইন আমরা সংশোধন করেছি। ২১ লাখ মৃত ভোটার বাদ ও নারী ভোটারের অতিরিক্ত সংখ্যা কমিয়ে আনা হয়েছে। আইটি সাপোর্ট পোস্টাল ব্যালট অনেক পরীক্ষা করার পর আমরা তা হাতে নিয়েছি। ভোটের মাঠে এবার ১০ লাখ মানুষ দায়িত্ব পালন করবেন- রিটার্নিং অফিসার, ভোট গ্রহণ কর্মকর্তা, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী। অতীতে তারা ভোট দিতে পারতেন না। আমরা এবার তাদেরও ভোটের ব্যবস্থা করব। যারা আইনি হেফাজতে আছেন তাদেরও ভোটের ব্যবস্থা করব। প্রবাসীদের ভোট দেওয়ার ব্যবস্থাও মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।
সংলাপে যা বললেন বিজ্ঞজনেরা
আলোচনায় সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলেন, ‘আগামী নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য একটা ট্রানজিশন। সার্বিক পরিস্থিতিতে জনগণ আপনাদের প্রতি অনেক প্রত্যাশা রাখে। ১৫ বছর ধরে বা এখনো সহিংসতা নরমালাইজ হয়ে গেছে। নির্বাচনের সময় আপনারা এটা কীভাবে মোকাবিলা করবেন সেটা দেখার বিষয়। কারণ আপনারা যে চ্যালেঞ্জের মধ্যে আছেন, সেটা নিয়েই আপনাদের দায়িত্ব পালন করতে হবে। এটা সুচারুভাবে পালন করবেন সেটা কিন্তু মানুষ দেখতে চায়। একটা ভালো নির্বাচন করতে পারবেন আশা করি।
দেশের ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে সাংবাদিক, কলামিস্ট ও চর্চার সম্পাদক সোহরাব হাসান বলেন, ‘আমরা কারিগরি সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেছি। রাজনৈতিক সমস্যা নিয়ে কম আলোচনা হয়েছে। আর আমাদের একটা ধারণা হয়েছে যে পাঁচজন নির্বাচন কমিশনার মঙ্গলগ্রহ থেকে এসেছেন, সমস্ত কিছুর দায় তাদের। আমরা অন্যায় করব, অনিয়ম করব, ভোট জালিয়াতি করব, চুরি করব, ভোটার আনতে দেব না- কিন্তু ইসিকে কাজটা করতে হবে। এটা সম্ভব নয়। আগামী পাঁচ মাসে সরকারের কী করা উচিত তা জনসমক্ষে জানাতে হবে। তাহলে ইসির প্রতি জন-আস্থা আসবে। যদি মনে করেন সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়, তাহলে নির্বাচন থেকে সরে আসা উচিত, আপনাদের পদত্যাগ করা উচিত। বিগত ইসিকেও একই কথা বলেছিলাম। নির্বাচন মানেই উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা। সেটা না থাকার যথেষ্ট পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। কারণ আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি হলো জিততেই হবে। দলগুলোর সহায়তা ছাড়া ইসির পক্ষে সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব নয়।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, ‘৫৫ বছর পরও নারীদের জন্য মাত্র ৫ থেকে ৭ শতাংশ আসনের কথা শুনে আমি স্তব্ধ হয়ে গেছি। এটা মেনে নেওয়া যায় না। আমাদের ন্যূনতম দাবি ৩৩ শতাংশ আসন নারীদের জন্য নিশ্চিত করা। এ ছাড়া প্রবাসীদের সন্তানরা পড়াশোনার জন্য দেশে থাকে। তাদের নিরাপত্তা ও অংশগ্রহণও গুরুত্ব দিতে হবে।’ রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, ‘৫৫ বছর পরও নারীদের জন্য মাত্র ৫ থেকে ৭ শতাংশ আসনের কথা শুনে আমি স্তব্ধ হয়ে গেছি। এটা মেনে নেওয়া যায় না। আমাদের ন্যূনতম দাবি- ৩৩ শতাংশ আসন নারীদের জন্য নিশ্চিত করা।
আগামী সংসদ নির্বাচনে গণমাধ্যমের সম্পৃক্ততা বাড়াতে ইসিকে পরামর্শ দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. নিয়াজ আহমদ। তিনি বলেন, ‘ডাকসু নির্বাচনে আমরা এক রকম যুদ্ধের ভেতর দিয়ে গেছি। সেখানে আমরা সাংবাদিকদের পাশে পেয়েছি। তাদের সঙ্গে সব সময় কথা বলেছি। কখনো কখনো বিরক্তিকর কথাবার্তাও তাদের সঙ্গে হয়েছে। কিন্তু তাদের সাপোর্ট অমূল্য হয়েছে। তাদের ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ব্যালট বাক্স খেলা থেকে গোনা পর্যন্ত সাংবাদিকরা ছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রুবায়েত ফেরদৌস বলেন, ‘অনেক অর্জন থাকার পরও আমরা খুব দুঃখী ও দুর্ভাগা। কারণ আমরা এখনো নির্বাচন প্রক্রিয়া ঠিক করতে পারিনি। আপনারা সাবেক নির্বাচন কমিশনারদের পরিণতিও দেখেছেন। মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, সংসদ, এমনকি পুলিশের ওপর মানুষের কোনো আস্থা নেই। এমন অবস্থায় কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না। নির্বাচন কমিশনের প্রতি অনুরোধ, যদি মেরুদণ্ড থাকে, যদি সাহস থাকে, তবেই স্বাধীন হতে পারবেন। সাংবিধানিক ও আইনি দায়িত্ব পালনে ইসিকে অবশ্যই মেরুদণ্ড সোজা রাখতে হবে।’
এ ছাড়া ইসির সংলাপে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আল মাহমুদ হাসানউজ্জামান, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. এ এস এম আমানুল্লাহ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মুহাম্মদ ইয়াহইয়া আখতার, নিরাপত্তা বিশ্লেষক মো. মাহফুজুর রহমান, অধ্যাপক আব্দুল ওয়াজেদ, পুলিশ সংস্কার কমিশনের সদস্য মোহাম্মদ হারুন চৌধুরী, টিআইবির পরিচালক মোহাম্মদ বদিউজ্জামান, বিজিএমইএর পরিচালক রশিদ আহমেদ হোসাইনি, কবি মোহন রায়হান, শিক্ষার্থী প্রতিনিধি জারিফ রহমান বক্তব্য রাখেন।
সংলাপের সমাপনী বক্তব্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেন, ‘আমরা জানি যারা নির্বাচনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া নস্যাৎ করতে চায়, তারা সর্বশক্তি প্রয়োগ করবে। সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ আমরা নির্বাচনকে স্বচ্ছ করতে চাই। আমরা চেষ্টা করব আপনাদের পরামর্শ বাস্তবায়ন করার। ভোটে অনিয়ম হলে পুরো আসনের নির্বাচন বাতিল করার ক্ষমতা আমরা ফিরিয়ে এনেছি। আমাদের দরজা সব সময় খোলা। যেকোনো সময়ে আপনাদের সুপারিশ আমরা গ্রহণ করব।’ তবে কল ফাঁস হওয়ার ভয়ে সব কল তিনি ধরেন না বলে জানান সিইসি। তিনি বলেন, ‘অনেকের ফোন কল ধরি না। কল ফাঁসের ভয়ে ফোনে কথা বলি না। কিন্তু আমাদের দরজা খোলা। যেকোনো সময়ে আপনাদের সুপারিশ আমরা গ্রহণ করব।’
এরপর আগামী মাসে (অক্টোবর) রাজনৈতিক দল, নারীনেত্রী, জুলাইযোদ্ধা, গণমাধ্যমের সঙ্গে সংলাপে বসবে সংস্থাটি।