জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে গণভোট আয়োজনের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো একমত হয়েছে। তবে জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি নিশ্চিতকরণের এই গণভোট কখন এবং কীভাবে আয়োজন করা হবে, তা নিয়ে ফের দলগুলোর মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে।
জানা গেছে, গণভোটের জন্য অধ্যাদেশ জারির পক্ষে বিএনপি। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই নভেম্বর অথবা ডিসেম্বরে গণভোট চায় জামায়াতে ইসলামী। অন্যদিকে আগামী জাতীয় নির্বাচনই গণপরিষদ নির্বাচন- এমন দাবি জানিয়েছে এনসিপি। তবে রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া নিয়ে ঐকমত্য না হলে আরেকটি অভ্যুত্থান অনিবার্য বলে মনে করছে এবি পার্টি।
রবিবার (৫ অক্টোবর) জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রস্তাবিত পদ্ধতি নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের চতুর্থ দিনের বৈঠকে রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে এমন মতামত উঠে এসেছে। রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) প্রায় ৩০টি রাজনৈতিক দল অংশ নেয়।
দিনভর বৈঠকের পর জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ সাংবাদিকদের জানান, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো একমত হয়েছে। তবে গণভোট কবে হবে, সেটা নিয়ে দলগুলোর অবস্থান ভিন্ন। বৈঠকে দলগুলোর মধ্যে এ বিষয়ে ঐক্য প্রতিষ্ঠা হোক বা না হোক, শিগগিরই সরকারের কাছে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট একাধিক প্রস্তাব তুলে দেওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী ঐকমত্য কমিশন।
বিএনপি মনে করে, গণভোট আয়োজনের জন্য রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারি করা জরুরি। ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে বৈঠকের পর দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ জানান, আলোচনায় অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে প্রায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে অগ্রসর হয়েছে। গণভোটের জন্য সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘গণভোটের যে আর্টিকেল (১৪২) ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার উড়িয়ে দিয়েছিল, সেটা হাইকোর্টের রায়ের মধ্য দিয়ে পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়েছে। এখন সংবিধানের আর কোথাও গণভোট করা যাবে না- এমন কোনো বিধান নেই। সুতরাং একটা অধ্যাদেশ জারি করে নির্বাচন কমিশনকে এখতিয়ার দেওয়া যেতে পারে। একই দিনে সংসদ নির্বাচনের ব্যালটের সঙ্গে আলাদা ব্যালটে গণভোট করা যেতে পারে। গণভোটের মাধ্যমে যে জনরায় আসবে, সেটা সার্বভৌম ক্ষমতার একটা রায়। সুতরাং সব সংসদ সদস্য সেটা মানতে বাধ্য হবেন।’
জুলাই সনদের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ থাকা ইস্যুগুলোর ব্যাপারে প্রশ্ন করলে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘জুলাই সনদ প্রণীত হবে, স্বাক্ষরিত হবে, অঙ্গীকারনামায় সবাই সই করবে, ওয়েবসাইটে যাবে, সব পার্টির ইশতেহারে থাকবে, জনগণ জানবে জুলাই সনদে কী আছে। যারা ম্যান্ডেট পাবে, তারা তাদের নোট অব ডিসেন্ট অনুসারে যেতে পারবে।’
জুলাই সনদ বাস্তবায়নে আইনি ভিত্তির জন্য নির্বাচনের আগে গণভোট চায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়নে আইনি ভিত্তির জন্য গণভোটের বিষয়ে বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দল একমত। তবে তার দল গণভোট জাতীয় নির্বাচনের আগেই চায়। গণভোট কবে হতে পারে, এমন প্রশ্নের উত্তরে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, ‘জনগণ গণভোটে অভ্যস্ত নয়। আমরা মনে করি, জাতীয় নির্বাচনকে কোনো ধরনের বিঘ্নিত না করতে নভেম্বর অথবা ডিসেম্বরে এটা হতে পারে। তফসিলের আগেও হতে পারে।
গণভোট হয়ে গেলে ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হতে কোনো ধরনের বাধা নেই। জনগণকে একটা জটিল অবস্থায় ফেলে না দিয়ে সহজভাবে এগোলে আমরাও বাঁচি, জাতিও বাঁচে। গণভোট হলে এটা কখনো চ্যালেঞ্জ করতে গেলে টিকবে না। পার্লামেন্ট এটাকে প্রত্যাখ্যান করতে পারবে না।’
অন্যদিকে বর্তমান সরকারের সময়েই জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি চায় জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, “এ সরকারের সময়েই জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি দিতে হবে। কারণ পরবর্তী সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে তা বাদ দিয়ে দিতে পারে। জনগণের অভিপ্রায় অনুযায়ী এ সরকারকেই বিষয়টি সমাধান করতে হবে। এ ক্ষেত্রে জাতীয় নির্বাচনের দিন সাধারণ ভোটের পাশাপাশি গণভোটের জন্য আলাদা ব্যালট থাকবে। যেখানে সনদের আইনি ভিত্তির বিষয়ে জনগণ মতামত দেবে। এ বিষয়ে বেশির ভাগ দল একমত হয়েছে। ভাষাগত ভিন্নতা বাদ দিলে জুলাই সনদের আইনি ভিত্তির বিষয়ে দলগুলো মোটামুটি একমত। যেখানে সনদ বাস্তবায়নে জনগণ ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দেবে।”
জুলাই সনদ বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দলগুলোকে ঐকমত্যে আসার আহ্বান জানিয়ে আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেছেন, ‘সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে আমরা যদি ঐকমত্যের ভিত্তিতে সমঝোতা বা সমাধানে না আসি, তাহলে আরেকটি অভ্যুত্থান অনিবার্য। তখন কেউ পালানোর পথ পাবে না।’ তার মতে, অহেতুক সাংবিধানিক বিতর্ক তুলে রাজনৈতিক সংকটকে দীর্ঘায়িত করা হলে পরিস্থিতি আবারও ‘অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে’। একই সঙ্গে বিএনপিকে ছাড় দিয়ে কিছু ইস্যুতে নোট অব ডিসেন্ট তুলে নেওয়ার আহ্বান জানান এবি পার্টির এই নেতা।
গণভোটের মাধ্যমে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার পক্ষে এবং কমিশনের প্রস্তাবগুলোর সমর্থন করেছে গণঅধিকার পরিষদ। সনদ বাস্তবায়নে জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গেই গণভোটের পক্ষে গণসংহতি পরিষদ। তবে আইনি জটিলতা এড়িয়ে সরাসরি প্রধান উপদেষ্টার আদেশে বাস্তবায়নের প্রস্তাব দিয়েছে। এ ছাড়া বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টিসহ অন্য রাজনৈতিক দলগুলোও গণভোটের পক্ষে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যের গুরুত্বে জোর দিয়েছে। তারা মনে করে, মৌলিক সংস্কারে আপত্তি থাকলেও সংলাপ অব্যাহত রাখা উচিত।
বৈঠকের সমাপনী বক্তব্যে অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, ‘আলোচনায় আজ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। গণভোটের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একধরনের ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এটি বড় ধরনের অর্জন। আশা করি, তারা পর্যায়ক্রমে অন্যগুলোতেও তারা ঐকমত্য হবে। আইনসভাকে আলাদা বৈশিষ্ট্য দেওয়া দরকার, যাতে সংস্কার টেকসই হয়, তা নিয়েও কার্যত ঐকমত্য হয়েছে। ১০৬ অনুচ্ছেদে বিচার বিভাগের পরামর্শ নেওয়ার জন্য অনেক দল বলেছিল। তবে এখন অনেকে বলছে তার দরকার নাও হতে পারে। নোট অব ডিসেন্ট থাকা বিষয়গুলো রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনি ইশতেহারে থাকবে।
সনদে কী থাকবে, তা জনগণের কাছে উন্মুক্ত থাকবে। এই জনরায় হবে চূড়ান্ত। আগামী সংসদ গণভোটের রায় মানতে বাধ্য থাকবে। আইনি ও সাংবিধানিক বৈধতা দিতে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গেও আমরা বসব। প্রধান উপদেষ্টাকে বলেছি, ১৫ অক্টোবরের পর আর সময় বাড়ানোর প্রয়োজন হবে না। আশা করি, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই চূড়ান্ত সনদ এবং সনদ বাস্তবায়নের জন্য একটি গ্রহণযোগ্য এবং সুস্পষ্ট প্রস্তাব সরকারের কাছে দিতে পারব।’
জুলাই সনদ বাস্তবায়নের উপায় নির্ধারণে গত ১১ সেপ্টেম্বর থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা শুরু করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। প্রায় আট মাসের আলোচনায় ৮৪টি বিষয়ে দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য তৈরি হয়েছে। তবে মৌলিক সংস্কারের ৯টি বিষয়ে এখনো আপত্তি রয়েছে। ফলে জুলাই জাতীয় সনদের খসড়া চূড়ান্ত হলেও এর বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রেখেছে কমিশন। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আগামী ৮ অক্টোবর বেলা ২টায় পুনরায় বৈঠকে বসবে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন।
ঐকমত্য কমিশন সূত্রে জানা গেছে, কমিশনের এবারের বৈঠকে চূড়ান্ত সনদে দলগুলোর স্বাক্ষরের তারিখ নির্ধারণ, রাজনৈতিক দলের সম্মিলিত ঘোষণা, বাস্তবায়ন কমিটি গঠন এবং জাতিসংঘ পর্যবেক্ষক দলের সঙ্গে সমন্বয়ের বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা। এরপর প্রকাশ করা হবে চূড়ান্ত স্বাক্ষরকারীদের তালিকা এবং বাস্তবায়নের রূপরেখা। এসব কাজ শেষ করতে কমিশনের হাতে সময় আছে মাত্র ৯ দিন। কারণ ঐকমত্য কমিশনের বর্ধিত মেয়াদ শেষ হবে আগামী ১৫ অক্টোবর।