মেট্রোরেলের মতিঝিল থেকে কমলাপুর সেকশনের বৈদ্যুতিক-কারিগরি (ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল সিস্টেম- ইঅ্যান্ডএম) কাজ ৬৯ দশমিক ৭০ শতাংশ বেশি দরে পেয়েছে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান মারুবেনি এলঅ্যান্ডটি।
মেট্রোরেলের ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল সিস্টেমের কাজের জন্য ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (আরডিপিপি দ্বিতীয় সংশোধনী) কাজের জন্য ২৭৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছিল। কিন্তু ভারতীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এই কাজের জন্য ৬৫০ কোটি টাকা দাবি করে। অন্তর্বর্তী সরকার প্রথমে এত বেশি দরে কাজ করাতে অনীহা প্রকাশ করলে তাদের সঙ্গে দীর্ঘ দর-কষাকষির পর ঠিকাদারি কাজের বিল ৪৬৫ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। হিসাব কষে দেখা গেছে, ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল সিস্টেমের কাজের জন্য প্রাক্কলিত ব্যয় থেকে এই দর ৬৯ দশমিক ৭০ শতাংশ বেশি।
বুধবার (২৯ অক্টোবর) মেট্রোরেলের পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিএমটিসিএল সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে। ডিএমটিসিএল দর-কষাকষি করে ১৮৫ কোটি টাকা সাশ্রয় করার কৃতিত্বও দাবি করছে।
২০২২ সালের ২৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশে প্রথম মেট্রোরেল চালু হয়। সেদিন উত্তরা-উত্তর স্টেশন থেকে আগারগাঁও স্টেশন পর্যন্ত মেট্রোরেল চলাচল করে। এর প্রায় এক বছর পর ২০২৩ সালের ৫ নভেম্বর উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেল চলাচল শুরু করে। এ সময়ে মেট্রোরেলের ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল সিস্টেমের কাজ করেছে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান মারুবেনি এলঅ্যান্ডটি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল সিস্টেমের কাজের জন্য ডিএমটিসিএল ২০১৮ সালের দরপত্র উন্মুক্ত করে। মেট্রোরেলের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান জাইকার সঙ্গে চুক্তির শর্ত হলো কেবল তাদের মনোনীত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো এই দরপত্র প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারে। জাইকা মনোনীত বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে টপকে এবার কাজ পেয়ে যায় মারুবেনি এলঅ্যান্ডটি। ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল সিস্টেমের কাজ মূলত মেট্রোরেলের বিভিন্ন স্টেশনের লিফট স্থাপন-প্রতিস্থাপন, বৈদ্যুতিক সংযোগ স্থাপন, কনকোর্স লেভেল ও পেইড জোনের এক্সেলেটর চলমান রাখার কাজ।
উত্তরা-উত্তর স্টেশন থেকে মতিঝিল স্টেশন পর্যন্ত ভারতীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজ নিয়ে বড় কোনো আপত্তি ওঠেনি সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে। এখন মতিঝিল থেকে কমলাপুর স্টেশন পর্যন্ত মেট্রোরেল পরিষেবা বিস্তৃত করতে কাজ করছে ডিএমটিসিএল।
মতিঝিল থেকে কমলাপুর রুটে ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল কাজের জন্য নতুন করে আর কোনো দরপত্র উন্মুক্ত করা হয়নি। ভারতীয় প্রতিষ্ঠানের ওপরই ভরসা রেখেছে ডিএমটিসিএল। তবে এ জন্য এই ঠিকাদারি কার্যক্রমের জন্য দর-কষাকষি করতে হয় মারুবেনির কর্মকর্তাদের সঙ্গে। প্রথমে মারুবেনি ১৩৭ শতাংশ বেশি দর হাঁকায়। ডিএমটিসিএল এত বেশি দর দিতে রাজি ছিল না। তারা বিকল্প উপায় বা অন্য কোনো ঠিকাদারও নিয়োগ করতে পারছিল না। জাইকার সঙ্গে চুক্তির কারণে দরপত্র উন্মুক্ত করা যায়নি।
পরে জাইকার মধ্যস্থতায় ভারতীয় প্রতিষ্ঠান মারুবেনি এলঅ্যান্ডটির সঙ্গে সমঝোতা বৈঠকে বসেন ডিএমটিসিএলের কর্মকর্তারা। ২০২৩ সাল থেকে এই আলোচনা চলমান ছিল। দুই বছর পর ভারতীয় প্রতিষ্ঠান দর কমাতে রাজি হয়।
উত্তরা-উত্তর স্টেশন থেকে কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেল পরিষেবা বাস্তবায়িত হচ্ছে ডিএমটিসিএলের এমআরটি-৬ প্রকল্পের আওতায়। ডিএমটিসিএলের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই পুরো পথে ইঅ্যান্ডএম কার্যক্রমের জন্য প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা রয়েছে। শুধু ইলেকট্রিক্যাল কার্যক্রম নয়, একই সঙ্গে সিগনালিং ও টেলিকম পরিষেবাও এই কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। উত্তরা-উত্তর থেকে মতিঝিল স্টেশন পর্যন্ত এই কার্যক্রম এখনো চলমান রয়েছে।
দর বৃদ্ধির কারণ হিসেবে ডিএমটিসিএলের একজন কর্মকর্তা খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা যখন আরডিপিপি প্রণয়ন করি, তখন ডলারের বিপরীতে টাকার মান ছিল ৮৪ টাকা। এখন তা উন্নীত হয়েছে ১২০ টাকায়। এ কারণে নির্মাতা বা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোও উচ্চমূল্যে দর হাঁকাচ্ছে। মেট্রোরেলের ইঅ্যান্ডএম কার্যক্রমের সব ইক্যুইপমেন্ট কিনতে হবে বিদেশ থেকে। এখানেও অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হবে।’
ডিএমটিসিএলের কোম্পানি সচিব খোন্দকার এহতেশামুল কবীর খবরের কাগজকে জানান, মারুবেবি এলঅ্যান্ডটির ইঅ্যান্ডএম কার্যক্রম নিয়ে ডিএমটিসিএলের অনেক আপত্তি ছিল। শুরুতেই তারা বিভিন্ন স্টেশনে যে ১০০টি কম্পিউটার দিয়েছিল সেগুলো ছিল মানহীন। তা ছাড়া বিভিন্ন স্টেশনে ইলেকট্রিক্যাল ও সিগনাল সিস্টেমের কাজেও তাদের গাফিলতি প্রমাণিত হয়েছে। ডিফেক্ট নোটিফিকেশন পিরিয়ড (নির্মাণকাজের ত্রুটি মেরামতে বেঁধে দেওয়া সময়) ছিল বলে তাদের ডেকে এনে সব কটি স্টেশনে পুনরায় কাজ করাতে হয়েছে। তারা মেট্রোরেলে নিম্নমানের জিনিস সরবরাহ করেছে। কিন্তু জাইকার শর্তের কারণে ডিএমটিসিএল তাদের ওপরই ঠিকাদারি কার্যক্রমের দায়িত্ব বহাল রাখে।
মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেল পরিষেবা বিস্তৃতিতে কেন আবার এলঅ্যান্ডটির ওপরই ভরসা রাখতে হচ্ছে, এ প্রসঙ্গে খোন্দকার এহতেশামুল কবীর বলেন, ‘এলঅ্যান্ডটি এমআরটি-৬-এর পুরো রুটে ইঅ্যান্ডএম কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেছে। এখন নতুন কাউকে (ঠিকাদার) নিয়োগ দিলে তারা নতুন সিস্টেমে সব বদলে দিতে চাইবে। তখন নতুন ঠিকাদার আবার দর বাড়াতে পারে। তাই এলঅ্যান্ডটিকেই আবার কাজটা দেওয়া হয়েছে। ওরা দর-কষাকষির পর এখন একটা দরে রাজি হয়েছে। সে দরটা একটু বেশি। কিন্তু কাজের মানে কোনো গাফিলতি রাখা হবে না বলে কথা দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।’
তিনি জানান, মতিঝিল থেকে কমলাপুর বর্ধিত মেট্রোরেল পথে ইঅ্যান্ডএম কার্যক্রম শেষ করলে ঠিকাদারি কাজের শর্ত হিসেবে ত্রুটিজনিত ক্ষতি সংশোধন করতে হবে ভারতীয় প্রতিষ্ঠানকেই। এ জন্য তাদের অতিরিক্ত এক বছর সময় দেওয়া হয়েছে।