পাতালপথে মেট্রোরেল প্রকল্পের (এমআরটি-১) দুটি ঠিকাদারি প্যাকেজের দরপত্র বাতিল করতে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)-এর অনুরোধে সাড়া দেয়নি মেট্রোরেলের মূল পরামর্শক ও ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান জাপান ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন এজেন্সি (জাইকা)।
গত রবিবার (৯ নভেম্বর) পাতালপথে মেট্রোরেল প্রকল্পের পরিচালক মো. আফতাব হোসেন খানকে চিঠি দিয়ে সব দরপত্র বাতিল করতে অপরাগতার কথা জানায় জাইকা।
এরআগে পাতাল পথে মেট্রোরেল প্রকল্পের দুইটি ঠিকাদারি প্যাকেজ সিপি-০২, সিপি-০৫ বাতিল করতে গত ২ নভেম্বর জাইকাকে চিঠি দিয়েছিল ডিএমটিসিএল।
ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফারুক আহমেদের যুক্তি ছিল, এমআরটি-লাইন ১ এর এই দুটি প্যাকেজে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান যে দরপ্রস্তাব (কোটেশন) করেছে তা ওই দুটি প্যাকেজের প্রাক্কলিত ব্যয়ের প্রায় দ্বিগুণ। সরকারি ক্রয় বিধিমালার বিধি অনুসারে ডিএমটিসিএল এই দুটি প্যাকেজের চুক্তি বাতিলের অধিকার রাখে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। পরে এই দুই প্যাকেজের সব দরপত্র বাতিল করতে জাইকার সম্মতি পেতে চিঠি দেয় এমআরটি-১ এর প্রকল্প পরিচালক। এতে দুই প্রকল্পের কাজ পেতে যাওয়া জাপান ও চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রাক-প্রাথমিক চুক্তিও বাতিল হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়।
সিপি-০২ প্যাকেজের আওতায় নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ডিপো এলাকার পূর্ত কাজ ও ভবন নির্মাণের কাজ পেয়েছিল চীনা প্রতিষ্ঠান সিনোহাইড্রো। তারা সর্বনিম্ন দর হেঁকেছিল ৩৩৫৩ কোটি টাকা, যা প্রাক্কলিত ব্যয় থেকে ২ হাজার ১২৩ কোটি টাকা বেশি। উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ১২৩০ কোটি ৯১ লাখ টাকা।
পূর্বাচলের ৩০০ ফিট সড়কের ট্রানজিশন পয়েন্ট থেকে শুরু করে নতুন বাজার পর্যন্ত মেইন লাইন স্থাপন ও স্টেশন নির্মাণ কাজ বাস্তবায়িত হচ্ছে প্যাকেজ-০৫ এর আওতায়। এই প্যাকেজের ডিপিপিতে প্রাক্কলিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪ হাজার ১২ কোটি টাকায়। জাপানের কাজিমা করপোরেশন দরপত্রে সর্বনিম্ন দর হাঁকে ৫ হাজার ৫৫ কোটি টাকা।
ডিএমটিসিলের এই তৎপরতার জবাবে জাইকা গত রবিবার চিঠিতে বলে, ‘সিপি-০৫ এবং সিপি-০২-এর দরপত্র প্রক্রিয়া বাতিল করার ডিএমটিসিএলের প্রস্তাবের ব্যাপারে আমরা আপত্তি প্রকাশ করছি। কারণ, ডিএমটিসিএল ইতোমধ্যে কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়ন সম্পন্ন করে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, এই দুই প্যাকেজের সর্বনিম্ন মূল্যায়িত দর যথেষ্ট প্রতিযোগিতামূলক এবং গ্রহণযোগ্য ছিল। এ পরিস্থিতিতে দুটি প্যাকেজের সব দরপত্র বাতিল করা হলে জাইকার ক্রয় নির্দেশিকার ধারা ৫.১০-এর লঙ্ঘন হবে। ঋণ চুক্তি অনুযায়ী আইনি বাধ্যবাধকতা থাকায় জাইকা ডিএমটিসিএলের এ ধরনের অনুরোধে সম্মতি দেবে না।’
ডিএমটিসিএলের অনুরোধে এর আগে বিভিন্ন দরপত্র বাতিল প্রক্রিয়ায় সম্মতি দিয়েছিল জাইকা। এ প্রসঙ্গে জাইকার চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘এই সম্মতিগুলো অভিন্ন ধারণার ভিত্তিতে প্রদান করা হয়েছিল। এতে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে। প্যাকেজগুলোর মূল্যায়িত যেন ন্যায্য ও প্রতিযোগিতামূলক হয়, সে প্রচেষ্টা করা হয়েছে।’
ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফারুক আহমেদের একটি কথোপকথনের খণ্ডাংশ ভাইরাল হয়েছে। ওই অডিও রেকর্ডে শোনা যায়, ফারুক আহমেদ দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় জাইকার কর্মকর্তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করছেন। এই অডিও রেকর্ডটি ফারুক আহমেদের বলে খবরের কাগজকে নিশ্চিত করেছেন ডিএমটিসিএলের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। ডিএমটিসিএল পরিচালনা পর্ষদের একজন সদস্যও জানান, ফারুক আহমেদ জাইকা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বাজে আচরণ করেছেন। সেই সদস্য খবরের কাগজকে বলেন, ডিএমটিসিএল এমডির এমন আচরণে জাইকা কর্মকর্তারা ক্ষুব্ধ হয়েছেন। তারা ইতোমধ্যে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের মৌখিকভাবে অভিযোগ জানিয়েছে। এতে করে বাংলাদেশের অনেক উন্নয়ন প্রকল্পের সহযোগী জাইকার বিনিয়োগ থমকে যাওয়ার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।
মেট্রোরেল প্রকল্পের চুক্তি অনুযায়ী, ডিএমটিসিএলের সব ঠিকাদারি প্যাকেজে কেবল জাইকা মনোনীত ঠিকাদাররাই অংশ নিতে পারবেন। মেট্রোরেলে বাস্তবায়নের জন্য পরামর্শক নিয়োগ, কেনাকাটা, কারিগরি, রক্ষণাবেক্ষণ খাতে সব ধরনের কর্মকাণ্ডের জন্য জাইকার অনুমতি নিতে হবে।
মো. ফারুক আহমেদ ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব নেওয়ার পরে জাইকার এমন শর্ত নিয়ে আপত্তি তোলেন। জাইকার এমন কঠিন শর্ত আরোপ করায় মেট্রোরেলের প্রকল্পগুলোতে তিনি এখন এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) পাশাপাশি চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার ঋণ পেতে তোড়জোড় শুরু করেছেন। গত রবিবার সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী শেখ মইনউদ্দিন খবরের কাগজকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
জয়ন্ত সাহা/সুমন/