ফার্মগেট মেট্রোরেল স্টেশনের কাছে বিয়ারিং প্যাড সরে যাওয়ার ঘটনায় প্রাথমিক অনুসন্ধানে নকশাগত ত্রুটি ও উপকরণের মান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে বলে জানিয়েছে তদন্ত কমিটি। কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, বিচ্যুত বিয়ারিং প্যাডের হার্ডনেস, কম্প্রেশন সেট এবং নিওপ্রিনের পরিমাণ প্রচলিত মানদণ্ড অনুযায়ী সঠিক ছিল না। তবে বিষয়টি নিশ্চিত করতে দেশের বাইরে ল্যাবরেটরিতে আরও পরীক্ষা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) সংশ্লিষ্ট কমিটি সচিবালয়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সভাকক্ষে ফার্মগেটের দুর্ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন।
গত ২৬ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায় মেট্রোরেলের একটি পিলারের বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়ে একজন পথচারী নিহত হওয়ার ঘটনায় সরকার একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। নিহত পথচারীর নাম আবুল কালাম (৩৫)। তার বাড়ি শরীয়তপুর জেলায়। দুর্ঘটনার দিনই সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ আবদুর রউফের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
পরবর্তীতে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীকে কমিটিতে যুক্ত করা হয়। এছাড়া কমিটি আরও দুইজন বিশেষজ্ঞকে কো-অপ্ট করে। তারা হলেন-বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. খান মাহমুদ আমানত এবং অধ্যাপক ড. রাকিব আহসান।
দুর্ঘটনায় নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের কোনো যোগসাজশ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে ফরেনসিক প্রতিনিধি হিসেবে সিআইডির এসএসপি মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলামকেও তদন্ত কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
এ সময় সড়ক পরিবহন ও সেতু উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান উপস্থিত ছিলেন। তদন্ত কমিটির সদস্যদের মধ্যে ছিলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. এ বি এম তৌফিক হাসান, এমআইএসটি-এর সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. জাহিদুল ইসলাম এবং ডিএমটিসিএল-এর লাইন-৫ প্রকল্প পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আব্দুল ওহাব। উপ-সচিব আসফিয়া সুলতানা কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
যা জানা গেল তদন্ত প্রতিবেদনে
তদন্ত কমিটির অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিয়ারিং প্যাডগুলো প্রায় ০.৮ শতাংশ ঢালু অবস্থায় বসানো হয়েছিল, যা সরে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।
কমিটি জানিয়েছে, ফার্মগেট মেট্রোরেল স্টেশনের উভয় প্রান্তেই বৃত্তাকার এলাইনমেন্ট রয়েছে। কিন্তু ভায়াডাক্টের সোজা অংশ থেকে বৃত্তাকার অংশে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ট্রানজিশন কার্ভ ব্যবহার করা হয়নি। ফলে এলাইনমেন্টের নকশায় ত্রুটি থাকতে পারে বলে মনে করছে কমিটি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, কার্ভ এলাইনমেন্টের জন্য আলাদাভাবে মডেলিং ও বিশ্লেষণ না করে সোজা এলাইনমেন্টের নকশার ভিত্তিতেই ডিজাইন করা হয়েছে।
ট্রেন চলাকালে কম্পন পরিমাপে দেখা যায়, বিয়ারিং প্যাড বিচ্যুত পিয়ারগুলোতে-বিশেষ করে পিলার নম্বর ৪৩০ ও ৪৩৩-এ অন্যান্য পিলারের তুলনায় কম্পন অনেক বেশি। নকশাগত ত্রুটির কারণে এখানে অপ্রয়োজনীয় পার্শ্ববল ও অতিরিক্ত কম্পন তৈরি হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কমিটি আরও জানিয়েছে, কার্ভ এলাইনমেন্ট ও স্টেশনের কাছে রেললাইনের নিচে নিওপ্রিন রাবার ম্যাস-স্প্রিং ড্যাম্পার সিস্টেম ব্যবহার করা হলেও দুর্ঘটনাস্থলের মধ্যবর্তী অংশে রিজিড ট্র্যাক ব্যবহৃত হয়েছে। এসব স্থানে ড্যাম্পার সিস্টেম থাকলে কম্পন কমানো সম্ভব হতো বলে মত দিয়েছে কমিটি। তবে তদন্তে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ফার্মগেটের কাছে খেজুরবাগান এলাকাতেও মেট্রোরেলের বিয়ারিং প্যাড সরে যায়। ওই দুর্ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদনও পর্যালোচনা করা হয় এবার । এতে দেখা যায়, ওই প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার সম্ভাব্য কিছু কারণ উল্লেখ থাকলেও কোনোটিই নিশ্চিতভাবে চিহ্নিত করা হয়নি।
এছাড়া প্রথম দুর্ঘটনার পর পর্যাপ্ত সময় পাওয়া সত্ত্বেও ঠিকাদার ও পরামর্শকদের পক্ষ থেকে বিস্তারিত প্রকৌশল বিশ্লেষণের মাধ্যমে মূল কারণ নির্ধারণ করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
কমিটির সুপারিশ
ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে কমিটি কয়েকটি সুপারিশ প্রদান করেছে। এর মধ্যে রয়েছে-কার্ভ এলাইনমেন্টে বিয়ারিং প্যাড সরে যাওয়া রোধে জরুরি কারিগরি ব্যবস্থা নেওয়া, ভায়াডাক্ট ও ট্র্যাকের নকশা থার্ড পার্টি কনসালট্যান্ট দিয়ে পুনঃপর্যালোচনা, পুরো মেট্রোরেল প্রকল্পে স্বাধীন সেফটি অডিট, দ্রুত স্ট্রাকচারাল হেলথ মনিটরিং সিস্টেম স্থাপন এবং স্থানীয় প্রকৌশলীদের দক্ষতা বাড়াতে বিদেশি পরামর্শকদের কাছ থেকে প্রযুক্তি হস্তান্তর নিশ্চিত করা।
ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড-ডিএমটিসিএল জানিয়েছে, সুপারিশ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।
জয়ন্ত/নাঈম/