মার্কেন্টাইল ব্যাংক থেকে প্রায় ৫০৭ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে আত্মসাতের অভিযোগে ওরিয়ন গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ওবায়দুল করিমসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) দুদক প্রধান কার্যালয়ে এক নিয়মিত মিডিয়া ব্রিফিংয়ে কমিশনের মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন এ তথ্য জানান।
অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯, ৪২০ ও ১০৯ ধারা, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ৪(২) ধারায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
মামলার প্রধান অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন- ওরিয়ন গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ওবায়দুল করিম, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও সালমান ওবায়দুল করিম, মার্কেন্টাইল ব্যাংক লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মো. কামরুল ইসলাম চৌধুরী, বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক মতিউল হাসান, সাবেক ডিএমডি ও শাখা ব্যবস্থাপক গাউস-উল-ওয়ারা মোর্তজা, সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ক্রেডিট ইনচার্জ প্রতাপ কুমার দেশমুখ্য, সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ম্যানেজার অপারেশন মো. অলিউল্লাহ, সাবেক ও বর্তমান ক্রেডিট ইনচার্জ মো. আব্দুল কাদের, মো. বাবর আলী মোল্লা, মো. ইকরামুল ইসলাম খান, মো. আব্দুল হালিম এবং মো. আতিকুর রহমান।
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যের বরাতে দুদক বলছে, আসামিরা ‘পরস্পর যোগসাজশে অপর্যাপ্ত জামানতের বিপরীতে’ ঋণ অনুমোদন দেন। ব্যাংকিং আইন ‘লঙ্ঘন করে’ ব্যাংকের অফশোর ব্যাংকিং ইউনিট থেকে নেওয়া বৈদেশিক মুদ্রার দুটি মেয়াদি ঋণকে ডমেস্টিক ব্যাংকিং ইউনিটের আওতায় এনে দেশীয় মুদ্রায় নতুন দুটি মেয়াদি ঋণে রূপান্তর করা হয়।
পরে শ্রেণিকরণযোগ্য ঋণের দায় পরিশোধের নামে নতুন ঋণ সৃষ্টি করে ওই ঋণের মেয়াদ আরও সাত বছর বাড়ানো হয়, যা গ্রাহককে ‘অযৌক্তিক সুবিধা দিয়েছে’ বলে অভিযোগ করা হয়েছে মামলায়।
দুদকের ভাষ্য, ঋণের ডাউন পেমেন্ট যথাযথভাবে পরিশোধ না হওয়া সত্ত্বেও পুনঃতফসিলিকরণের মাধ্যমে প্রায় ৫০৭ কোটি ৫১ লাখ টাকা ‘আত্মসাৎ’ করা হয়েছে।
এদিকে ওরিয়ন গ্রুপের চেয়ারম্যান ওবায়দুল করিম এবং তার স্ত্রী আরজুদা করিমের সম্পদের হিসাব চেয়েও নোটিশ দিয়েছে দুদক।
তাদের ‘নামে-বেনামে অর্জিত সম্পদের সঠিক হিসাব যাচাইয়ের লক্ষ্যে’ এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে দুদকের মহাপরিচালক জানান।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, মার্কেন্টাইল ব্যাংকের প্রধান শাখা থেকে ওরিয়ন গ্রুপ সংশ্লিষ্ট দুই বিদ্যুৎ প্রকল্প ওরিয়ন পাওয়ার রূপসা লিমিটেড ও ওরিয়ন পাওয়ার সোনারগাঁও লিমিটেডের নামে নেওয়া ঋণ অনুমোদন ও ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগে মামলাটি করা হয়েছে।
এতে অভিযোগ করা হয়, প্রয়োজনীয় নথিপত্র যথাযথভাবে যাচাই ও সংরক্ষণ না করে এবং পর্যাপ্ত সহায়ক জামানত ছাড়াই ক্ষমতার অপব্যবহার ও প্রতারণার মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে।
এজাহারের বর্ণনা অনুযায়ী, ২০১৭ সালে ওরিয়ন পাওয়ার রূপসা লিমিটেডের পক্ষে ১০৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য মূলধনি যন্ত্রাংশ আমদানির লক্ষ্যে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের প্রধান শাখায় ঋণের আবেদন করা হয়। আবেদনের পরদিনই শাখা থেকে প্রকল্প ঋণ অনুমোদনের সুপারিশ পাঠানো হয় এবং পরে প্রধান কার্যালয়ের ক্রেডিট রিস্ক ম্যানেজমেন্ট ডিভিশন থেকে বড় অঙ্কের ঋণ অনুমোদন দেওয়া হয়।
অনুমোদনের পর পর্যায়ক্রমে একাধিক টার্ম লোন বিতরণ করা হয়। ঋণের একটি অংশ পরিশোধ করা হলেও পরে বিপুল অঙ্কের দায় অপরিশোধিত থেকে যায়, যা আত্মসাৎ হিসেবে এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে।
মামলার বলা হয়েছে, কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থতার পরও ঋণ শ্রেণিকরণ (ক্লাসিফিকেশন) এড়াতে বারবার পুনঃতফসিলের পথ নেওয়া হয়। নীতিমালা অনুযায়ী কিস্তি যথাযথভাবে পরিশোধ না হলে ঋণ সুবিধা বাতিল করে শ্রেণিকরণের নির্দেশনা থাকলেও সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে তা অনুসরণ করা হয়নি। বরং পুনঃতফসিল ও রূপান্তরের মাধ্যমে ঋণকে ‘শ্রেণিকরণযোগ্য’ অবস্থা থেকে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।
এজাহারে অভিযোগ করা হয়, ওরিয়ন পাওয়ার সোনারগাঁও লিমিটেডের অনুকূলে সর্বশেষ ২০২৪ সালের ৩০ জুন একটি মেয়াদি ঋণ বিতরণ করা হয়। সেখানে গ্রাহক যে জামানত দেখিয়েছিল, তার মূল্যমান ছিল ঋণের তুলনায় অনেক কম। ব্যাবসায়িক সক্ষমতা ও প্রকল্পের সম্ভাব্য নগদ প্রবাহ বিবেচনায় বন্ধকের মূল্যমানের কয়েক গুণ বেশি ঋণ বিতরণ করা হয়েছে–অর্থাৎ ঋণটি পর্যাপ্ত সহায়ক জামানত দ্বারা আবৃত ছিল না।
ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়ায় নথি ও যাচাইয়ের গুরুতর ঘাটতির কথাও এজাহারে তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে, করপোরেট গ্যারান্টির ক্ষেত্রে বোর্ড রেজ্যুলেশন ছাড়া কাগজপত্র গ্রহণ, স্যাংশনপত্রে গ্রাহকের গ্রহণপত্র ও স্বাক্ষর–সিল না থাকা, বন্ধকি সম্পত্তি সরকারের অধিগ্রহণ বা দখলে রয়েছে কি না–এ সংক্রান্ত সার্ভেয়ার সনদের অনুপস্থিতি, জমির সঠিকতা যাচাইয়ে প্যানেল আইনজীবীর সনদ শাখায় না থাকা, খাজনা রশিদের ওয়েবসাইট বা কিউআর কোড যাচাই না করা এবং ইন্স্যুরেন্স পলিসিতে ব্যাংকের নাম অন্তর্ভুক্ত না থাকার অভিযোগও আনা হয়েছে এজাহারে।
এসব অনিয়মের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি নিরীক্ষা কমিটির প্রতিবেদনে ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেছে বলেও এজাহারে তুলে ধরা হয়।
এসএন/