বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যে শুরু হয়েছে ব্যাপক সংঘর্ষ। রাখাইন রাজ্য এখন আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। সেখানে সেনাবাহিনী, আরাকান আর্মি ও রোহিঙ্গাদের কয়েকটি সংগঠনের সংঘর্ষের উত্তাপ এসে পড়েছে বাংলাদেশেও। রবিবার (১১ জানুয়ারি) সকালে সীমান্তের ওপার থেকে আসা গুলিতে টেকনাফে বাংলাদেশি এক শিশু গুরুতর আহত হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনা করে বাংলাদেশ সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
বাংলাদেশ-মায়ানমার সীমান্তের ওপারে চলা সংঘর্ষের গুলি বাংলাদেশে এসে পড়ায় টেকনাফসহ ওই এলাকার জনগণ নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছেন। এ অবস্থায় বাংলাদেশের অবস্থান কী হবে, তা নিয়ে এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি বাংলাদেশ সরকার। যেহেতু রাখাইন মায়ানমার সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেই, তাই ঢাকায় নিযুক্ত সে দেশের রাষ্ট্রদূতকে তলব করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তবে এই মুহূর্তে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন সৌদি আরবের জেদ্দায় অনুষ্ঠিত ওআইসির কাউন্সিল অব ফরেন মিনিস্টার্সের ২২তম বিশেষ অধিবেশনে রয়েছেন। এ ছাড়া নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমানও বিশেষ আলোচনা করতে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। এই দুই উপদেষ্টা আজ-কালের মধ্যেই দেশে ফিরবেন। এই দুই উপদেষ্টা দেশে ফিরলে তারা সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বৈঠক করবেন এবং রাখাইন পরিস্থিতি নিয়ে সিদ্ধান্ত জানাবেন বলে সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। সে পর্যন্ত অপেক্ষায় রয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
এদিকে বাংলাদেশ সীমান্তে বিশেষ করে টেকনাফ অঞ্চলে বাড়তি নিরাপত্তা জোরদার করার কথা জানিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। গতকাল বিজিবির সদর দপ্তর ও স্থানীয় একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপকালে তারা খবরের কাগজকে জানিয়েছেন, মায়ানমার সীমানায় আরাকান আর্মি বা বিভিন্ন পক্ষের গোলাগুলির জেরে টেকনাফে হতাহতের ঘটনায় বাড়তি টহল জোরদার করা হয়েছে। নাফ নদীসংলগ্ন সীমান্তের কাছে ঝুঁকিপূর্ণ বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া বা সতর্ক করা হচ্ছে। ওই অঞ্চলের সব বর্ডার আউট পোস্টে (বিওপি) বিজিবি সদস্যরা সতর্কাবস্থায় দায়িত্ব পালন করছেন। তবে আরাকান আর্মি যেহেতু স্বীকৃত কোনো কর্তৃপক্ষ বা বাহিনী নয়, সেদিক থেকে তাদের সঙ্গে আলোচনা বা প্রতিরোধের বিষয়গুলো কিছুটা জটিল রূপ নিচ্ছে। নানা কৌশল প্রয়োগ করে পরিস্থিতি শান্ত রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
কক্সবাজারের রামুতে বিজিবির সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, রাখাইনে চলমান সশস্ত্র সংঘর্ষের কারণে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টার অভিযোগে মায়ানমারের ৫৩ জন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্য ও একজন বাংলাদেশিকে আটক করা হয়েছে। পরে পুলিশ, বিজিবি, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, র্যাব ও এপিবিএন নিরাপত্তার মাধ্যমে তাদের পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অলক বিশ্বাস জানান, রাখাইনে চলমান সংঘর্ষের মধ্যে ওপারের গুলিতে আহনাফ নামে টেকনাফে ১১ বছরের এক শিশু আহত হয়েছে। সে ওই গ্রামের জসিম উদ্দিনের মেয়ে। প্রথমে মারা যাওয়ার কথা শোনা গেলেও তা সঠিক নয়। শিশুটিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। গুলিতে আহত হয়েছেন আরও একজন। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় লোকজন ক্ষুব্ধ হয়ে সড়ক অবরোধ করেন।
কূটনৈতিক সূত্র জানায়, মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বিমান হামলা, ড্রোন হামলা, মর্টারশেল ও বোমা হামলা চালাচ্ছে দেশটির সেনাবাহিনী। তিন দিন ধরে রাখাইন রাজ্যের মংডু টাউনশিপের আশপাশের এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির অবস্থানে বিমান হামলা জোরদার করেছে সরকারি জান্তা বাহিনী। অন্যদিকে আরাকান আর্মির সঙ্গে স্থলভাগে সংঘর্ষে জড়িয়েছে রোহিঙ্গাদের সশস্ত্র তিনটি গোষ্ঠী। এ কারণে সীমান্ত পরিস্থিতি দিন দিন জটিল হচ্ছে। ওপারের বিকট শব্দের বিস্ফোরণে টেকনাফের বাংলাদেশ সীমান্তের গ্রামগুলোয় ভূকম্পন দেখা দিচ্ছে। কেঁপে উঠছে লোকজনের ঘরবাড়ি। ওপার থেকে ছোড়া গুলি এসে পড়ছে এপারে, লোকজনের ঘরবাড়ি-চিংড়িঘের ও নাফ নদীতে। বিকট শব্দের বিস্ফোরণে টেকনাফের হোয়াইক্যং ও উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের ১১টি গ্রাম কেঁপে উঠছে। লোকজন রাত জেগে সময় পার করছেন। অনেকে ঘরবাড়ি ফেলে নিরাপদ স্থানে চলে যাচ্ছেন।
সীমান্ত সূত্র জানায়, মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির সঙ্গে রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান স্যালভেশন আর্মি (আরসা), আরাকান রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও) এবং নবী হোসেন বাহিনীর মধ্যে গোলাগুলি ও থেমে থেমে গুলিবর্ষণ চলছে। অন্যদিকে মায়ানমার জান্তা বাহিনীও আরাকান আর্মির অবস্থানে বিমান হামলা ও বোমা হামলা চালাচ্ছে। এ অবস্থায় দেশটিতে চলছে দ্বিতীয় দফার জাতীয় নির্বাচন।