রাজধানী ঢাকার খালগুলো একসময় ছিল নগর জীবনের প্রাণভোমরা। এসব খাল দিয়ে নগরবাসী নৌকায় এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যাতায়াত করেছে। পণ্য পরিবহনও হয়েছে এসব খাল দিয়ে। বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানি খাল হয়ে দ্রুতই নদীতে পড়েছে। প্রাকৃতিক এই পানি ব্যবস্থাপনাতেই ঢাকা সব সময় জলাবদ্ধতার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। কিন্তু অপরিকল্পিত নগরায়ণ, লাগামহীন দখল ও চরম দূষণের কারণে সেই খালগুলো আজ মৃতপ্রায়, কোনো কোনোটির অস্তিত্ব আছে শুধু পুরোনো মানচিত্রে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের আওতাধীন খালগুলো এখন নগরবাসীর স্বস্তির জায়গা নয়, বরং দুর্ভোগের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজধানীতে জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য প্রতিবছরই জাতীয় বাজেট ও সিটি করপোরেশনের উন্নয়ন পরিকল্পনায় বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নেওয়া হয় খাল খনন, ড্রেনেজ উন্নয়ন ও পানি নিষ্কাশন প্রকল্প। বাজেট বক্তৃতা ও পরিকল্পনায় দেওয়া হয় দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের আশ্বাস। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। খালগুলোর দূষণ ও দখলমুক্ত করতে না পারায় অল্প বৃষ্টিতেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় হাঁটু থেকে কোমর পর্যন্ত পানি জমে যাচ্ছে।
কদর নেই সিটি করপোরেশনে
দুই সিটি করপোরেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খাল নিয়ে সংস্থাগুলোর পরিকল্পনা ও অগ্রগতি বাস্তবসম্মত নয়। যেখানে দৈনিক বা সপ্তাহে পরিষ্কার করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, সেখানে বার্ষিকভাবে খাল পরিষ্কার ও খননের পরিকল্পনা করা হয়। দখলদারদের হাত থেকে খাল উদ্ধারে এখন কোনো অভিযানও হচ্ছে না। দুই সিটি করপোরেশনে খালের কদর এতটাই কম যে, তদারকির জন্য নেই কোনো টিম বা কমিটি। তাই রাজধানীর খালগুলো এখন দখলদারদের অর্থ উপার্জনের হাতিয়ার হয়ে গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকায় খালের সংখ্যা নিয়ে সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান কোনো সংস্থার কাছে নেই। তবে বিভিন্ন গবেষণা ও প্রতিবেদন অনুযায়ী- একসময় ঢাকায় ৭৭টি বা তারও বেশি খাল ছিল। ঢাকা জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় ৫০টি খাল রয়েছে। ২০২০ সালে জলাবদ্ধতা নিরসনের অংশ হিসেবে ঢাকা ওয়াসা ২৬টি খাল ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে হস্তান্তর করে। অন্যগুলো গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে রয়েছে। বর্তমানে দুই সিটি করপোরেশন দেখভাল করে প্রায় ২ হাজার ২১১ কিলোমিটার নালা। রাজধানীর খালগুলোর প্রায় অর্ধেকই বেদখল ও দূষণের শিকার হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বহু এলাকার খালে এখন স্বাভাবিক পানির প্রবাহ নেই। গৃহস্থালি বর্জ্য, পলিথিন, প্লাস্টিক, বাজারের ময়লা, হাসপাতালের আবর্জনা ও শিল্পকারখানার তরল বর্জ্যে খালের পানি কালো হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও খাল এতটাই ভরাট যে তা আর খাল হিসেবে চেনার উপায় নেই। পানির ওপর ভাসছে আবর্জনা, নিচে জমেছে পলিথিন ও পচা বর্জ্য। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই পানি নামার পথ বন্ধ হয়ে পুরো এলাকায় জলাবদ্ধতা হচ্ছে।
রামচন্দ্রপুর খাল: ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকার রামচন্দ্রপুর খাল একসময় বৃষ্টির পানি সরাসরি তুরাগ নদীতে নিয়ে যেত। বর্তমানে খালটির বড় অংশ দখল হয়ে গেছে। খালের পাড়ে ও ওপরেই গড়ে উঠেছে দোকান, বসতবাড়ি ও স্থাপনা। খনন করা হলেও নিয়মিত ময়লা ফেলার কারণে পানি প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। ফলে বর্ষা এলেই মোহাম্মদপুর, শ্যামলী ও আদাবর এলাকায় তীব্র জলাবদ্ধতা দেখা দেয়।
রায়েরবাজার বা হাইক্কার খাল: মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার বেড়িবাঁধ থেকে বুড়িগঙ্গা নদী পর্যন্ত বিস্তৃত রায়েরবাজার খালটি এখন ময়লা-আবর্জনায় ভরাট। খালপাড় দখল করে গড়ে উঠেছে ঘরবাড়ি, দোকানপাট ও গরুর খামার। ফলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। এর প্রভাবে মোহাম্মদপুর ও আশপাশের এলাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই ভয়াবহ জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। দখল এতটাই বেড়েছে যে, সাদেক খান ফিলিং স্টেশন খালের উপরেই নির্মিত হয়েছে। দখল, দূষণ ও ভরাটের কারণে হাইক্কার খালটিও মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছে। ময়লা-আবর্জনায় খালটি মশার প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালী খাল: যাত্রাবাড়ীর কুতুবখালী খাল বর্তমানে চরম অবহেলা ও দূষণের শিকার। সারা বছরই খালটিতে আবর্জনার স্তূপ জমে থাকে। ফলে পানির রং কালো হয়ে গেছে এবং ছড়াচ্ছে তীব্র দুর্গন্ধ। স্থানীয়দের একটি অংশ নিয়মিত খালে ময়লা ফেলছে। কোনো কার্যকর নজরদারি না থাকায় পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হচ্ছে। অতিরিক্ত আবর্জনা ও পলি জমে খালটি ভরাট হয়ে এখন কার্যত সরু ড্রেনে পরিণত হয়েছে।
এর ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই যাত্রাবাড়ী ও আশপাশের এলাকায় তীব্র জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। স্থির নোংরা ও দূষিত পানিতে মশা-মাছির ব্যাপক বংশবিস্তার ঘটছে, বাড়ছে ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি। পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেললেও কুতুবখালী খাল রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ এখনো চোখে পড়ছে না।
বেড়েছে স্বাস্থ্যঝুকি ও ভোগান্তি: দূষিত ও স্থির পানির কারণে খালগুলো এখন ‘মশার আদর্শ’ প্রজননক্ষেত্র। ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ও মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি বেড়েই চলেছে। খালের আশপাশে বসবাসকারী মানুষ দুর্গন্ধ ও মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দিনের পর দিন জলাবদ্ধতার কারণে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। শিশুদের স্কুলে যাওয়া, কর্মজীবীদের অফিসে পৌঁছানো- সবকিছুই হয়ে পড়ছে দুর্বিষহ।
শুধু সাধারণ মানুষ নয়, জলাবদ্ধতার কারণে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ছেন ব্যবসায়ীরাও। গত কয়েক বছরে রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ও বাণিজ্যিক এলাকায় বৃষ্টির পানি দোকানে ঢুকে পড়ায় নষ্ট হয়েছে মজুত পণ্য, ব্যবসা বন্ধ রাখতে হয়েছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, খাল দখলমুক্ত না করে শুধু খনন বা পরিষ্কার করার কাজ চালানো মানে অর্থের অপচয়। পাশাপাশি পানি ব্যবস্থাপনায় সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি পরিকল্পনাবিদ ও অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান খবরের কাগজকে বলেন, সিটি করপোরেশন হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিচ্ছে, কিন্তু খাল রক্ষার্থে যথাযথ কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যায়নি। খাল যে বাসাবাড়ির ময়লা ফেলার জায়গা না, এমন অবস্থা আমরা তৈরি করতে পারিনি। উন্নত বিশ্বে খাল রক্ষা করা হয়। আমাদের দেশের খালগুলো দখল-দূষণ-বাসাবাড়ির ময়লা ফেলার স্থান হয়ে গেছে। খাল রক্ষার্থে জনসচেতনতার পাশাপাশি সম্মলিত উদ্যোগ গ্রহণ ও সঠিক পরিকল্পনা করে এগুতে হবে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের খাল ব্যবস্থাপনা (পরিষ্কার) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ড. মোহাম্মদ সফিউল্লাহ সিদ্দিক ভুঁইয়া খবরের কাগজকে বলেন, ‘খাল রক্ষণাবেক্ষণ দীর্ঘমেয়াদি একটি পরিকল্পনা। আমরা বার্ষিক পরিকল্পনা হিসেবে খাল পরিষ্কার করছি, কিন্তু তা যথেষ্ট না। আমাদের নিজস্ব লোকবল দিয়ে পরিষ্কার করছি। খালের জন্য আলাদা কোনো টিম বা জনবল নেই। এ জন্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, এখন চারটি খাল পরিষ্কারের কাজ চলমান রয়েছে। ধীরে ধীরে তা বাড়তে থাকবে। স্থানীয়দের সংযুক্ত করে এই কাজগুলো করা হচ্ছে। আগে যেমন খাল উদ্ধারে অভিযান চলত, এখন সেই অভিযান নেই। আশা করি, নির্বাচনের পর সরকার বিষয়টিতে নজর দেবে।
খাল রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়ে জানতে উত্তর সিটি করপোরেশনে যোগাযোগ করা হলে সংস্থাটি খবরের কাগজকে জানায়, খাল ও ড্রেনেজ রক্ষার্থে ১৭টি প্রকল্প চলমান রয়েছে। শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে এসব প্রকল্পে বাজেট বরাদ্দ দেওয়া আছে। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে ‘নীল নেটওয়ার্ক’ প্রকল্পে প্রায় ১২.৫ কিলোমিটার খাল ও ১২.৩ কিলোমিটার নদী উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। স্থায়ী জলাবদ্ধতা সমাধানে একটি সংশোধিত ড্রেনেজ মহাপরিকল্পনা প্রণয়নে টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে।
এ ছাড়াও সংস্থাটি জানায়, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাউনিয়া ও রূপনগর খাল উন্নয়নসহ কঠিন ও তরল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।