আজকে আমাদের সরকার চা বাগানের মায়েদের কাছে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দিয়েছে। আজ আমরা হয়ত সবাইকে কার্ড দিতে পারিনি, কিন্তু আগামী একবছরের মধ্যে আমরা সব চা শ্রমিককে ফ্যামিলি কার্ড দেব বলে ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বুধবার (১৭ জুন) দুপুরে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় আয়োজিত ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমার জন্য আজ অনেক আনন্দের দিন। আজ থেকে কয়েকমাস আগে আমি যখন নির্বাচনি প্রচারণায় সিলেটে আসি, তখন হবিগঞ্জে আমি বলেছিলাম, বিএনপি যদি সরকার গঠন করতে সক্ষম হয় তাহলে আমরা চা শ্রমিক মায়েদের ফ্যামিলি কার্ড দেব। আজ আমি আমার কথা রাখতে পেরেছি। আজ আমাদের সরকার চা বাগানের মায়েদের কাছে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দিয়েছে। আজ আমরা সবাইকে হয়ত কার্ড দিতে পারিনি কিন্তু আগামী একবছরের মধ্যে সব চা শ্রমিককে আমরা ফ্যামিলি কার্ড দেব।
বাংলাদেশে মোট চার কোটির মতো পরিবার রয়েছে, পর্যায়ক্রমে আমরা সবার কাছে ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেব। আজকে আমরা শুধু ফ্যামিলি কার্ডই নয়, পাশাপাশি নারী চা শ্রমিকদের কাছে ঘর নির্মাণের জন্য ৫০ জনকে দুই লাখ টাকা করে দিয়েছি। এর বাইরেও চা শ্রমিকদের সন্তানরা যাতে লেখাপড়া করতে পারে সেজন্য তাদের প্রায় ১৫০ চা শ্রমিক সন্তানদেরকে বিশেষ স্কলারশিপ দিয়েছি। আজ আমরা প্রতিবন্ধীদেরও আর্থিক সহায়তা দিয়েছি।
আগামী জুলাই মাসের ১ তারিখ থেকে পর্যায়ক্রমে দেশের ৪০ লাখ কৃষককে কৃষক কার্ড দেব, এর জন্য আমরা বাজেটে বিশেষ বরাদ্দও রেখেছি।
এ ছাড়া ধর্মীয় গুরুরা মানবেতর জীবনযাপন করেন, আমরা নির্বাচনে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, ধর্মীয় গুরুদের আমরা সম্মানিত ব্যবস্থা করবো। আমরা আমাদের সেই প্রতিশ্রুতিও ধীরে ধীরে পূরণ করছি। আমরা মানুষের পাশে দাঁড়াতে চাই, মানুষকে সহযোগিতা করতে চাই।
তিনি আরও বলেন, কয়েকদিন ধরে পত্রিকাগুলো দেখেন। আমরা দেখছি, আমরা যে বাজেট সংসদে উপস্থাপন করেছি সেই বাজেটে সব কার্ডের জন্য অর্থ বরাদ্দ রেখেছি। বাজেটে শিক্ষার্থীদের জন্য পড়ালেখা ও খেলাধুলার জন্য অর্থ বরাদ্দ করেছি। সারাদেশের কোটি কোটি মানুষ যাতে সঠিকভাবে চিকিৎসা পেতে পারে সেজন্য আমরা প্রতি উপজেলার ৫০ শয্যার হাসপাতালকে ১ বছরের মধ্যে ১০০ শয্যায় উন্নীত করার জন্য বাজেটে অর্থ বরাদ্দ করেছি, যাতে উপজেলার মানুষ স্বাস্থ্যসেবা পেতে পারেন। কিন্তু বাজেটের পরে নিশ্চয়ই আপনারা দেখেছেন, যেই আমরা সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের জন্য অর্থ বরাদ্দ রেখেছি, অনেকে বলেছে এই বাজেট তারা মানে না। যেই বাজেটে আমরা ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্যসেবা ও প্রতিবন্ধীদের জন্য অর্থ বরাদ্দ রেখেছি, সেই বাজেট নাকি চানাচুরের মতো।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, যেই বাজেট জনগণের বাজেট, যেই বাজেটের মাধ্যমে আমরা জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তন করতে চাই, সেই বাজেটকে যারা চানাচুরের সঙ্গে তুলনা করে, যেই বাজেটে জনগণের জন্য স্বাস্থ্য সুবিধার অর্থ বরাদ্দ রেখেছি, কৃষক ভাইদের জন্য বরাদ্দ রেখেছি, আমাদের সন্তানরা যাতে ভালোভাবে লেখাপড়া শিখতে পারে তার সর্বোচ্চ বাজেট রেখেছি, সেই বাজেটকে তারা বলে গণবিরোধী বাজেট।
এই দেশের যারা শিল্পোদ্যোক্তা আছে, যারা মিল ফ্যাক্টরি তৈরি করতে পারে, যার ফলে আমার দেশের বেকার যুবকদের যাতে কর্মসংস্থান হয় সেজন্য আমরা এই দেশে যেসব দ্রব্য তৈরি হয় সেই একই দ্রব্য যদি কেউ বিদেশ থেকে আমদানি করে তার উপরে আমরা শুল্ক বাড়িয়ে দিয়েছি। যাতে করে বাংলাদেশের মিল কারখানাগুলো রক্ষা পায়। দেশের মিল কলকারখানাগুলো যদি চলে তাহলে আমাদের ছেলেমেয়েরা সেখানে চাকরি করতে পারবে। সেইজন্যেই আমরা দেশের মিল কলকারখানাকে বাজেটে সুরক্ষা দিয়েছি। আমরা সব নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস যেমন চাল, ডাল, তেল, চিনির ওপর আরোপিত পূর্বের সব শুল্ক উঠিয়ে দিয়েছি যাতে করে জিনিসের দাম না বাড়ে। জনগণের কথা চিন্তা করে আমরা ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের ওপর থেকে শুল্ক তুলে দিয়েছি। যেই বাজেটে ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য থেকে শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়, সেই বাজেটকে একটি দল বলে গণবিরোধী বাজেট।
এখন জনগণের জন্য যেই বাজেটে সব ব্যবস্থা রেখেছি, সেই বাজেটকে যারা গণবিরোধী বলে তারা কি কখনো জনগণের বন্ধু হতে পারে? তারা কখনোই জনগণের বন্ধু হতে পারে না। যারা জনগণকে বিভ্রান্ত করতে চায়, সেটি সংসদের ভেতরে হোক কিংবা বাইরেই হোক, তাদের ব্যাপারে আপনাদেরকে সচেতন থাকতে হবে কারণ এসব লোকেরা, এসব দলগুলো দেশে যদি অশান্তি করার সুযোগ পায় তাহলে আমরা ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়ন করতে পারবো না। এ দলগুলো যদি দেশে অশান্তি সৃষ্টি করে তাহলে আমরা জনগণকে দেওয়া সুবিধাগুলো জারি রাখতে পারবো না। যারা এসব কাজে বাধা দেবে তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে এবং জনগণকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
তিনি বলেন, বিএনপি হচ্ছে জনগণের দল, যতবারই এই দেশে নিরপেক্ষ নির্বাচন হয়েছে, যতবার মানুষ স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পেরেছে, প্রত্যেকবার মানুষ ধানের শীষকে বিজয়ী করেছে এবং মৌলভীবাজারে যত বড় বড় স্কুল কলেজ, রাস্তাঘাট হয়েছে সবই বিএনপির নেতা মরহুম সাইফুর রহমানের সময়েই হয়েছিল। জনগণ যদি ঐক্যবদ্ধ থাকে তাহলে কোনো ষড়যন্ত্র সফল হতে পারবে না। জনগণ ঐক্যবদ্ধ থাকলে বাংলাদেশের গণতন্ত্র কেউ নষ্ট করতে পারবে না। বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে কারা নষ্ট করেছিল আমরা সেটি ভালো করে জানি। আমরা দেখেছি, দেশ স্বাধীনের সময়, দেশ স্বাধীনের আগে এবং পরবর্তী সময়ে গণতন্ত্র বিনষ্টকারী, গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে ষড়্যন্ত্রকারীরা একসঙ্গে ছিল। মুখে মুখে বলতো আমরা একসঙ্গে নাই, কিন্তু ভেতরে ভেতরে তারা একসঙ্গে কাজ করেছে এবং সবসময় বিএনপি বাংলাদেশের জনগণের কাতারে ছিল। সেজন্যে বিএনপির সবচেয়ে বড় শক্তি জনগণের শক্তি সেইজন্য বিএনপি সবসময় বলে জনগণই আমাদের সব ক্ষমতার উৎস। আমরা দেখেছি, বিভিন্ন সময় যখন দেশে জনগণ গণতন্ত্র রক্ষা করার জন্য ফুঁসে ওঠে, তখন আমরা বিভিন্ন সময় দেখেছি বিভিন্ন জনকে বিদেশে চলে যেতে। খালেদা জিয়া আপনাদেরকে রেখে কোথাও যাননি। খালেদা জিয়া বলেছিলেন, বাংলাদেশই হচ্ছে আমার প্রথম এবং শেষ ঠিকানা। আমরা হচ্ছি খালেদা জিয়ার সৈনিক, তাই আমাদের সবার প্রথম ও শেষ ঠিকানা হচ্ছে বাংলাদেশ। আমাদের একটাই কাজ বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় আয়োজিত ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন, মৌলভীবাজার ৪ আসনের সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান চৌধুরী, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ফয়জুল করিম ময়ূন।
স্বাগত বক্তব্য রাখেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব কামাল উদ্দিন বিশ্বাস। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, এমপি।
প্রধানমন্ত্রী ল্যাপটপের বাটন টিপে ফ্যামিলি কার্ডের ১৫৫ জন উপকারভোগীগন নগদ অর্থ সহায়তা উদ্বোধন করেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, হায়াতুন বিবি, জখাতুন বিবি, সুলতানা আক্তার, রাশেদা বেগম, অনিতা রানী দাশ, সবিতা চন্দ, শিউলি দাশ, বাসনা দাশ চৌধুরী, ওয়াজেদা বেগম, আয়মনা বিবির হাতে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেন।
পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী দুরারোগ্যব্যাধীতে আক্রান্ত সুধাংশু সূত্রধর, বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য ও কান্তা সবরের হাতে অনুদানের চেক তুলে দেন।
এ ছাড়াও তিনি ক্ষুদ্র জাতিসত্তার শিক্ষার্থী রাখী সিনহা, প্রভা দেববর্মা ও নিপামনি দেবীকে শিক্ষা সহসহায়তার অনুদানের চেক তুলে দেন।
পাশাপাশি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে অর্চনা মুন্ডা, ললিতা গঞ্জু, কাজলী গঞ্জুকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন।
তিনি চা শ্রমিকদের টেকসই আবাসন সহায়তার জন্য ভগবতী ভর, কীর্তিমান শীল ও হালিমা বেগমের হাতে অনুদানের চেক তুলে দেন। এ ছাড়া দুঃস্থ অসহায় প্রতিবন্ধীদের বিশেষ অনুদান বাবদ কেশব আচার্য ও সিজিয়া খাতুনের কাছে চেক তুলে দেন।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে আয়োজিত ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ অনুষ্ঠান থেকে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে মোট ২৭৫ জনকে সহায়তা প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
শুভ/নাঈম