বার্লিনভিত্তিক আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) কর্তৃক প্রকাশিত দুর্নীতির ধারণা সূচক (করাপশন পারসেপশনস ইনডেক্স বা সিপিআই) ২০২৫ অনুযায়ী সূচকে অন্তর্ভুক্ত ১৮২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের স্কোর ২৪। নিম্নক্রম অনুযায়ী বাংলাদেশের অবস্থান ১৩তম, যা দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয় সর্বনিম্ন এবং এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে চতুর্থ সর্বনিম্ন স্কোর ও অবস্থান।
মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সকালে রাজধানীর ধানমন্ডিতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবি কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়৷
এবারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈশ্বিকভাবে গত বছরের তুলনায় এ বছর ৪৮টি দেশের স্কোর বৃদ্ধি পেয়েছে, ৬৮টি দেশের স্কোর কমেছে এবং ৬৪টি দেশের স্কোর অপরিবর্তিত রয়েছে।
সূচকের ০ থেকে ১০০ স্কেলে কোনো দেশই শতভাগ স্কোর অর্জন করেনি। বিশ্বের দুই তৃতীয়াংশ দেশ (১২২টি) এ বছর ৫০ এর কম স্কোর পেয়েছে। এবার বৈশ্বিক গড় স্কোর ৪২, যা গত এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন।
২০১২ সাল থেকে এই সূচকে ৩১টি দেশের উন্নতি হলেও, ৫০টি দেশের অবনতি হয়েছে। সূচকে ৮৯ স্কোর পেয়ে ২০২৫ সালে সবচেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে তালিকার শীর্ষে অবস্থান করছে ডেনমার্ক, ৮৮ স্কোর নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে ফিনল্যান্ড এবং ৮৪ স্কোর পেয়ে তৃতীয় স্থানে সিঙ্গাপুর। আর ৯ স্কোর পেয়ে যৌথভাবে তালিকার সর্বনিম্নে অবস্থান করছে দক্ষিণ সুদান ও সোমালিয়া, ১০ স্কোর পেয়ে নিম্নক্রম অনুযায়ী দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ভেনেজুয়েলা এবং ১৩ স্কোর পেয়ে যৌথভাবে তৃতীয় সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে ইয়েমেন, লিবিয়া ও ইরিত্রিয়া।
সিপিআই ২০২৫ অনুযায়ী বাংলাদেশের স্কোর ২৪; যা গত বছরের তুলনায় ১ পয়েন্ট বেশি হলেও চৌদ্দ বছরের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। সূচকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই এক পয়েন্ট স্কোর বৃদ্ধির পেছনে জুলাই অভ্যুত্থানের ফলশ্রুতিতে সূচিত গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক সুশাসন অর্জনে অব্যবহিত ইতিবাচক সম্ভাবনার প্রভাব কাজ করেছে। তবে রাষ্ট্রসংস্কার প্রক্রিয়ার পরবর্তী বাস্তবতার প্রতিফলন- সংশ্লিষ্ট তথ্যসূত্রের মেয়াদভূক্ত ছিলো না। এ বছর স্কোর বিবেচনায় উচ্চক্রম অনুসারে এক ধাপ ওপরে উঠে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮২টি দেশের মধ্যে ১৫০তম এবং নিম্নক্রম অনুসারে গত বছরের তুলনায় এক ধাপ অবনতি হয়ে ১৩তম।
একই স্কোর নিয়ে তালিকার উচ্চক্রম অনুযায়ী বাংলাদেশের সঙ্গে যৌথভাবে ১৫০তম অবস্থানে রয়েছে সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক ও প্যারাগুয়ে। আর দক্ষিণ এশিয়ায় ১৬ পয়েন্ট ও উর্ধ্বক্রম অনুযায়ী ১৬৯তম অবস্থান নিয়ে সর্বনিম্ন স্কোর ও অবস্থানে রয়েছে আফগানিস্তান। এ অঞ্চলে আফগানিস্তানের পরই বাংলাদেশের স্কোর ও অবস্থান দ্বিতীয় সর্বনিম্ন।
সূচক অনুযায়ী ২০২৫ সালে বাংলাদেশের অবস্থান-সংক্রান্ত ব্যাখ্যা
সিপিআই ২০২৫ অনুযায়ী ১০০ এর মধ্যে বৈশ্বিক গড় স্কোর ৪২, যেখানে বাংলাদেশের স্কোর ২৪-যা বৈশ্বিক গড় স্কোরের তুলনায় ১৮ পয়েন্ট এবং এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের গড় স্কোর ৪৫-এর তুলনায় ২১ পয়েন্ট কম। বাংলাদেশের স্কোর সর্বশেষ ১৪ বছরের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন- যা ২০২৩ এর অনুরূপ।
টিআইবির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দেশে দুর্নীতির ব্যাপকতা গভীর উদ্বেগজনক বলেই প্রতীয়মান হয়।
টিআইবি বলছে, বাংলাদেশ এই সূচক অনুযায়ী এমন দেশসমূহের মধ্যে আছে, যারা দুর্নীতির লাগাম টানতে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। তবে দুর্নীতির ব্যাপকতা ও গভীরতার কারণে ‘বাংলাদেশ দুর্নীতিগ্রস্ত বা বাংলাদেশের অধিবাসীরা সবাই দুর্নীতিতে নিমজ্জিত’-এ ধরনের ব্যাখ্যা ঠিক নয়। যদিও দুর্নীতি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও দারিদ্র্য দূরীকরণ- সর্বোপরি, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে কঠিনতম অন্তরায়, তথাপি দেশের আপামর জনগণ দুর্নীতিগ্রস্ত নয়; তারা দুর্নীতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ও ভুক্তভোগীমাত্র এবং দুর্নীতির হাতে জিম্মিদশার কারণে তাদের অনেকক্ষেত্রে অবৈধ লেনদেনে বাধ্য হতে হয়। তাই ক্ষমতাবানদের দুর্নীতি ও তা প্রতিরোধে ব্যর্থতার কারণে দেশ বা জনগণকে কোনোভাবেই দুর্নীতিগ্রস্ত বলা যাবে না।
২০১২-২০২৫ পর্যন্ত বাংলাদেশের অবস্থানের তুলনামূলক বিশ্লেষণ
সিপিআই সূচকের বিশ্লেষণ বলছে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের স্কোর সর্বশেষ ১৪ বছরের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। অর্থাৎ স্কোর বিবেচনায় বাংলাদেশ একই চক্রে আবর্তিত হচ্ছে। ২০১২ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সূচকে ব্যবহৃত ১০০ স্কেলে বাংলাদেশের স্কোর ২৫ থেকে ২৮ এর মধ্যে আবর্তিত ছিল। ২০২৩ সালে এই স্কোর এক পয়েন্ট অবনমন হয়ে ২৪ এবং ২০২৪-এ আরও এক পয়েন্ট অবনমন হয়ে ২৩-এ নেমে আসে। এবারের স্কোর এক পয়েন্ট বেড়ে ২৪ হলেও, বাংলাদেশের নিম্নগামী অবস্থানের কোনো বাস্তব পরিবর্তন আসেনি, বরং জুলাই অভ্যুত্থানের ফলে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও সুশাসনের পথে যে অগ্রগতির সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছিল, এই এই স্কোরে স্কোরে তার তার তাৎক্ষণিক প্রতিফলন ঘটেছে।
২০১২ থেকে ২০২৫ মেয়াদে সিপিআই স্কোরের প্রবণতা বিশ্লেষণ (Trend Analysis) অনুযায়ী বাংলাদেশের এবারের স্কোর ১৪ বছরের গড় স্কোর ২৫.৫ এর তুলনায় দেড় পয়েন্ট কম এবং এই মেয়াদে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। এর মধ্যে টানা চার বছরসহ মোট ছয় বার বাংলাদেশের স্কোর ছিল ২৬, তিনবার ২৫, দুইবার ২৪ এবং একবার করে ২৩, ২৭ ও ২৮। নিম্নক্রম অনুযায়ী এ বছরসহ বাংলাদেশের অবস্থান ছিল সর্বোচ্চ পাঁচ বার ১৩তম, তিন বার ১৪তম, দুই বার ১২তম এবং একবার করে ১০, ১৫, ১৬ ও ১৭তম।
বাংলাদেশের বর্তমান স্কোর ও অবস্থান প্রমাণ করে যে, গত দেড় বছরে অর্ন্তবর্তীকালীন সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থ হয়েছে। এমনকি আমলাতন্ত্র এবং রাজনৈতিক ও অন্যান্যভাবে ক্ষমতাবান নানা শক্তির প্রভাবে দুর্নীতি প্রতিরোধক। রাধক আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো তৈরি, মামলার কার্যকর বিচার, স্বপ্রণোদিত তথ্যপ্রকাশকারী, সাংবাদিক ও অনুসন্ধানী সাংবাদিক বা তদন্তকারীদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিতে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরিতেও সরকারের ব্যর্থতা স্পষ্ট। অন্যদিকে দুর্নীতি দমনে দায়িত্বপ্রাপ্ত দুর্নীতি দমন কমিশন-সহ (দুদক) অন্যান্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকর্তৃক প্রস্তাবিত সংস্কার প্রস্তাবসমূহ অবহেলিত হওয়া অথবা বাস্তবায়িত না হওয়ায় তাদের প্রকৃত ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে।
জয়ন্ত সাহা/অমিয়/