বরিশাল বিভাগ দেশের দক্ষিণ জনপদের ৬টি জেলা নিয়ে গঠিত। সমুদ্র উপকূলকেন্দ্রিক একাধিক মেগা প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ফলে অবকাঠামোগত কিছু দৃশ্যমান উন্নয়ন হয়েছে। তবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ জীবনমান উন্নয়নে এসব প্রকল্পের সুফল এখনো প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায়নি এমন অভিযোগ স্থানীয়দের।
নদীভাঙন, টেকসই বেড়িবাঁধের অভাব, নৌ-যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা, আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা ও শিল্পভিত্তিক কর্মসংস্থানের ঘাটতি এখনো প্রকট। ঘূর্ণিঝড় ও দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থার কারণে উপকূলীয় অঞ্চলের সাধারণ মানুষের জীবন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
নতুন মন্ত্রিসভায় দক্ষিণাঞ্চলের দুই সংসদ সদস্য পূর্ণমন্ত্রী এবং তিনজন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ায় উন্নয়ন নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিন পর এ অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি পাওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে আশাবাদ তৈরি হয়েছে।
দক্ষিণাঞ্চলের বাসিন্দারা বলছেন, নদীশাসন, সড়ক ও রেল যোগাযোগ সম্প্রসারণ, মৎস্য ও কৃষি খাতের আধুনিকায়ন, পর্যটন সম্ভাবনার বিকাশ এবং জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে মানসম্মত সেবা নিশ্চিত না হলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয় বলেও তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের মতে, কেবল প্রকল্প ঘোষণা নয়; সময়মতো বাস্তবায়ন ও দুর্নীতিমুক্ত ব্যবস্থাপনাই দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি। এতে বিনিয়োগ বাড়বে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
নদীভাঙন কবলিত হিজলা এলাকার হাবিবুল্লাহ বলেন, ‘গত কয়েক বছরে পরিবারের কয়েক বিঘা আবাদি জমি নদীতে বিলীন হয়েছে। শুধু ত্রাণ দিলে হবে না, স্থায়ী নদীশাসন ও শক্ত বাঁধ প্রয়োজন। না হলে আমরা বারবার ঘরছাড়া হবো।’
বরিশাল নগরীর রিকশাচালক কালাম জানান, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে কিন্তু আয় বাড়েনি। তিনি বলেন, ‘আগে যা আয় করতাম, তাতে কোনোমতে চলত। এখন চাল, ডাল, তেল–সবকিছুর দাম বেড়েছে। দিন শেষে হাতে কিছুই থাকে না। বাজারদর নিয়ন্ত্রণ ও সরবরাহব্যবস্থার স্বচ্ছতা জরুরি।’
নাগরিকদের অভিযোগ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও সেবার মান এখনো প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। আমানতগঞ্জের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী জাকির হোসেন বলেন, ‘সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা তৈরি হয়, রাস্তা ভাঙাচোরা। নগর পরিকল্পনা করে উন্নয়ন করতে হবে।’
বাকেরগঞ্জের সাইয়্যেদুর রহমান সন্যামত বলেন, ‘২০২৬ সালেও যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত নয়। শিল্পকারখানা না থাকায় যুবকরা কাজের জন্য বাইরে যাচ্ছে। নদীর ওপর সেতু ও শিল্প স্থাপন হলে এলাকার অর্থনীতি বদলে যাবে। নদীভাঙন রোধে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।’
চরফ্যাশনের এক রোগীর স্বজন জানান, গুরুতর অসুস্থ রোগীদের প্রায়ই বরিশাল শহরে আনা হয়। তারা চান, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হোক। উপকূলীয় এলাকায় মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল স্থাপন এবং বিদ্যমান হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানো গেলে ভোগান্তি কমবে।
বরিশাল সাংস্কৃতিক সংগঠন সমন্বয় পরিষদের সভাপতি ও বরিশাল বিভাগের পরিবেশ ও জনসুরক্ষা ফোরামের আহ্বায়ক শুভংকর চক্রবর্তী বলেন, ‘বিগত সময়ে দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়ন হয়নি এমন কথা বলা ঠিক নয়, তবে বাজেটের সুষম বণ্টন হয়নি। মেগা প্রকল্প কেন্দ্রীয় ও দৃষ্টিনন্দন প্রকল্প হিসেবে বাস্তবায়ন হয়েছে। কিন্তু প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমানের সঙ্গে সরাসরি জড়িত উন্নয়ন তেমন দেখা যায়নি।’
তিনি আরও বলেন, ‘নতুন সরকারের মন্ত্রিসভায় শক্ত প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সরাসরি উন্নয়ন বাস্তবায়নের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে, নদীভাঙন রোধ, শিল্পায়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান, পর্যটন উন্নয়ন এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় বিনিয়োগ নিশ্চিত করে দক্ষিণাঞ্চলকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করার এখনই সময়।’
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) বরিশাল মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক রফিকুল আলম বলেন, ‘দক্ষিণাঞ্চলের জন্য সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান জরুরি। নদী শাসন, শিল্পায়ন, যোগাযোগব্যবস্থা ও বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও রেল সংযোগেও নজর দিতে হবে।’