সারা দেশে অবৈধভাবে তেল মজুত, অতিরিক্ত মূল্য আদায় ও পাম্পে তেল নিতে গিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির ঘটনায় বিভিন্ন জেলায় অভিযান চালিয়েছে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
বুধবার (৮ এপ্রিল) এসব অভিযানে বিপুল পরিমাণ সয়াবিন তেল ও ডিজেল জব্দ করার পাশাপাশি জড়িতদের অর্থদণ্ড ও কারাদণ্ড দেওয়া হয়। অনেক স্থানে তেল না পেয়ে সড়ক অবরোধের ঘটনাও ঘটেছে। জনস্বার্থে এই তৎপরতা অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর–
চট্টগ্রামে আবাসিক এলাকায় তেল জব্দ
চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী ও ষোলশহর এলাকায় অভিযান চালিয়ে ২২ হাজার ৬৪২ লিটার ভোজ্যতেল জব্দ করেছে র্যাব। বায়েজিদ বোস্তামীর গুলবাগ আবাসিক এলাকার একটি গুদাম থেকে ১ হাজার ৪২ লিটার সয়াবিন তেল জব্দ করা হয়। এ সময় ওই গুদামমালিকের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন র্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। পাশাপাশি ষোলশহর ২ নম্বর গেট এলাকায় অভিযানে দুটি প্রতিষ্ঠান থেকে ২১ হাজার ৬০০ লিটার তেল উদ্ধার করা হয়। অবৈধ মজুতের দায়ে প্রতিষ্ঠান দুটিকে ৬০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। র্যাব-৭-এর সহকারী পরিচালক এ আর এম মোজাফ্ফর হোসেন জানান, গোপন তথ্যে অভিযান চালিয়ে এই বিপুল পরিমাণ তেল উদ্ধার করা হয়। বাজার পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে র্যাবের এমন অভিযান চলবে।
গোপালগঞ্জে বাড়তি দামে গ্যাস ও ডিজেল মজুত
গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় দুই ব্যবসায়ীকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি মূল্যে গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি ও অবৈধভাবে ডিজেল মজুতের দায়ে এই শাস্তি দেওয়া হয়। টুঙ্গিপাড়া পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডে অতিরিক্ত দামে গ্যাস বিক্রির অপরাধে সাদ্দাম শেখকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এ ছাড়া পাটগাতী ইউনিয়নের চৌরঙ্গী এলাকায় ডিজেল মজুতের দায়ে মাসুদ মোল্লাকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আল-আমিন হালদার। তিনি জানান, সরকার-নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে পণ্য বিক্রি অপরাধ। বাজারমূল্য স্থিতিশীল রাখতে উপজেলা প্রশাসনের এই নিয়মিত অভিযান অব্যাহত থাকবে। জনভোগান্তি কমাতে প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে।
জয়পুরহাটে ফিলিং স্টেশনে র্যাবের হানা
জয়পুরহাটে অবৈধভাবে তেল মজুতের অপরাধে একটি ফিলিং স্টেশনকে জরিমানা করেছেন র্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। সদর উপজেলার মেসার্স জামালগঞ্জ ফিলিং স্টেশনে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে এই অভিযান চালানো হয়। সেখানে অবৈধভাবে তেল মজুতের সত্যতা মেলায় ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এ ছাড়া পাকারমাথা এলাকায় ট্রাফিক আইন অমান্য করায় চার মোটরসাইকেলচালককে ১ হাজার ৭০০ টাকা জরিমানা করা হয়। জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এস এম তানভীর উল আলম এই অভিযান পরিচালনা করেন। র্যাব ক্যাম্পের পক্ষ থেকে জানানো হয়, অসাধু ব্যবসায়ীদের রুখতে তাদের নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
কুষ্টিয়ায় তেলের কালোবাজারি নিয়ে সংঘর্ষ
কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে রফিক ফিলিং স্টেশনে তেলের কালোবাজারি ও মজুতকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ সংঘর্ষ হয়েছে। গতকাল রাতে উপজেলার আল্লারদরগায় এই ঘটনায় নারীসহ অন্তত সাতজন আহত হন। স্থানীয়দের অভিযোগ, পাম্প কর্তৃপক্ষ দিনে সরবরাহ সীমিত করে রাতে বেশি দামে তেল বিক্রি করে আসছিল। ঘটনার রাতে বিদ্যুৎবিভ্রাটের সুযোগে তেল সরাচ্ছিল একটি চক্র। বণ্টন নিয়ে নিজেদের বিরোধে সংঘর্ষ শুরু হলে দুই পক্ষের মধ্যে ইটপাটকেল নিক্ষেপ চলে। দৌলতপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রদীপ কুমার দাশ জানান, রাতে তেল উত্তোলনের খবর ইউএনওকে জানানো হয়েছে। উচ্চপর্যায়ের সঙ্গে আলোচনা করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুলিশ জানিয়েছে, লিখিত অভিযোগ পেলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে তারা।
ময়মনসিংহে বিশৃঙ্খলা করায় যুবকের কারাদণ্ড
ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে সরকারি নিয়ম না মেনে তেল নিতে গিয়ে পাম্পে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির দায়ে মোবারক হোসেন নামে এক যুবককে ১৫ দিনের কারাদণ্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। গতকাল দুপুরে ঈশ্বরগঞ্জ ফিলিং স্টেশনে এ ঘটনা ঘটে। পাম্প কর্তৃপক্ষ জানায়, লাইনে দাঁড়ানো সবাইকে ৫০০ টাকার তেল দেওয়া হচ্ছিল। মোবারক ৫০০ টাকার তেল নেওয়ার পরও লাইন থেকে সরছিলেন না এবং আরও তেলের দাবি করেন। এ নিয়ে তর্কের জেরে ইউএনও সানজিদা রহমান ঘটনাস্থলে গিয়ে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করলে তার সঙ্গেও অশোভন আচরণ করেন ওই যুবক। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সালাউদ্দিন বিশ্বাস বলেন, ‘বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির দায়ে মোবারককে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।’ ওসি রবিউল আজম জানান, দণ্ডপ্রাপ্ত যুবককে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
রংপুরে তারিখহীন তেল বিক্রিতে দণ্ড
রংপুরে ভোজ্যতেলের টিনে উৎপাদনের তারিখ উল্লেখ না থাকায় একটি গুদামকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। নগরীর সেনপাড়ায় মেসার্স এসএস ট্রেডার্সে যৌথ অভিযান চালায় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও র্যাব। অভিযানে নেতৃত্ব দেন উপপরিচালক জাহাঙ্গীর আলম ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বিপ্লব গোস্বামী। জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এবং অতিরিক্ত দাম নেওয়া রোধে এই অভিযান চলছে। বোতলজাত তেলের গায়ে তারিখ স্পষ্ট না থাকায় ওই প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়েছে।’ তিনি আরও জানান, কোনো ধরনের ম্যানিপুলেশন বা কৃত্রিম সংকট তৈরি যেন কেউ না করতে পারে, সেদিকে প্রশাসন কড়া নজর রাখছে।
চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গায় সয়াবিন তেলের কারসাজি
চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গায় নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি মূল্যে সয়াবিন তেল বিক্রির দায়ে ‘খান স্টোর’কে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর মুন্সীগঞ্জ বাজারে তদারকিমূলক অভিযান চালিয়ে এই দণ্ড দেয়। সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ মামুনুল হাসান জানান, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনের ৪০ ধারায় এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অভিযানে ব্যবসায়ীদের সঠিক ভাউচার সংরক্ষণ ও মানসম্মত পণ্য বিক্রির নির্দেশ দেওয়া হয়। ক্যাব প্রতিনিধি ও জেলা পুলিশের একটি টিম এই অভিযানে সহযোগিতা করেন। অধিদপ্তর সূত্রে জানানো হয়েছে, জনস্বার্থে এ ধরনের অভিযান নিয়মিত চলবে। সাধারণ ক্রেতারা যেন হয়রানির শিকার না হন, সেটিই অধিদপ্তরের মূল লক্ষ্য। এই উদ্যোগে স্থানীয় বাজারে সচেতনতা বেড়েছে।
নাটোরে মহাসড়ক অবরোধ ও পাম্পে জরিমানা
নাটোরে তেল না পেয়ে মহাসড়ক অবরোধ করেছেন বিক্ষুব্ধ মোটরসাইকেলচালকরা। বড়াইগ্রামের পাটোয়ারী ফিলিং স্টেশনে তেল মজুতের অভিযোগ পেয়ে সেখানে অভিযান চালায় প্রশাসন। বড়াইগ্রাম ইউএনও লায়লা জান্নাতুল ফেরদৌস জানান, পাম্প কর্তৃপক্ষ মেশিন নষ্টের অজুহাত দিলেও গুদামে ৩ হাজার ৭০০ লিটার তেল ছিল। সেখান থেকে তারা প্রশাসনকে না জানিয়ে গোপনে ২ হাজার ৬০০ লিটার তেল রাতে বিক্রি করে দেয়। অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় পাম্পটিকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। ইউএনওর নির্দেশে অবিলম্বে সাধারণ মানুষের কাছে তেল বিক্রি শুরু করে কর্তৃপক্ষ। প্রশাসন জানিয়েছে, সংকটকালে অবৈধ মজুত বা অনিয়ম সহ্য করা হবে না।
নারায়ণগঞ্জে অনুমোদনহীন তেল উৎপাদনে জরিমানা
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে অবৈধভাবে তেল উৎপাদন ও বাজারজাতের দায়ে একটি প্রতিষ্ঠানকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। কাঁচপুর ইউনিয়নের চেংগাইন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ‘মেয়াজ ফুড প্রডাক্টস’-এর মালিক মহিন ভূঁইয়াকে এই দণ্ড দেওয়া হয়। র্যাব-১১ ও জেলা প্রশাসনের অভিযানে প্রতিষ্ঠানটি থেকে প্রায় ১ হাজার ২০০ লিটার অবৈধ ভোজ্যতেল জব্দ করা হয়। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট খন্দকার শমিত রাজা জানান, প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে অনুমোদন ছাড়া তেল উৎপাদন করছিল। তিনি বলেন, ‘ভেজাল পণ্য উৎপাদন ও অবৈধ মজুতের বিরুদ্ধে আমাদের জিরো টলারেন্স নীতি বজায় থাকবে।’ জব্দ করা তেল ধ্বংস করা হয়েছে এবং মালিককে সতর্ক করা হয়েছে। জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বিবেচনায় প্রশাসনের এই অভিযান অব্যাহত থাকবে।