প্রতিক্রিয়াশীল মৌলবাদী শক্তির উত্থান এবং পুঁজিবাদের আগ্রাসন রুখতে সাংস্কৃতিক জাগরণের বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি বলেছেন, সংস্কৃতিকে ধ্বংস করতে পারলেই মানুষকে রাজনৈতিকভাবে পরাধীন করা সহজ হয়- এই সত্যকে পুঁজি করেই বর্তমানে সংস্কৃতির ওপর বারবার আঘাত আসছে।
শুক্রবার (১০ এপ্রিল) সকালে রাজধানীর শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মেলন পরিষদের ৪৪তম বার্ষিক অধিবেশনের উদ্বোধন করে এসব কথা বলেন তিনি।
অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বর্তমান সময়ের সংকট মোকাবিলায় রবীন্দ্রদর্শনকে পাথেয় করার আহ্বান জানান।
দেশের বর্তমান শাসনব্যবস্থা ও শিক্ষা পদ্ধতির সমালোচনা করে সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষা দান ছিল আমাদের দেশপ্রেমের অন্যতম অংশ। কিন্তু আজ আমরা তিন ধারার শিক্ষা পদ্ধতি দেখছি, যা সমাজকে বিভক্ত করছে। অন্যদিকে, সাধারণ মানুষের শ্রমে অর্জিত সম্পদ শাসকরা বিদেশে পাচার করে দিচ্ছে। সাধারণ মানুষের হাতে আজ কোনো সম্পদ নেই।’
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রথযাত্রা’ নাটকের উদাহরণ টেনে এই বিশিষ্ট চিন্তাবিদ বলেন, ‘ইতিহাসের রথ যখন আটকে যায়, তখন সব শ্রেণির মানুষ চেষ্টা করেও তা সচল করতে পারে না। রথ তখনই চলে যখন মেহনতি মানুষ এসে রশি ধরে টান দেয়। সভ্যতার অগ্রগতি এই মেহনতি মানুষের ওপরই নির্ভর করছে।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘রবীন্দ্রনাথ নিজেও আক্ষেপ করেছিলেন যে তিনি সাধারণ মানুষের জীবনের খুব কাছে পৌঁছাতে পারেননি। আজকের দিনে সেই ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটানোই বড় চ্যালেঞ্জ।’
বাঙালি সংস্কৃতির চিরায়ত রূপ বদলে যাওয়ার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘বাঙালির সব অনুষ্ঠান শুরু হয় ভোরে পাখির গানে। কিন্তু আজ ২১ ফেব্রুয়ারির উদযাপন শুরু হচ্ছে মধ্যরাতে। থার্টি ফার্স্ট নাইটের প্রবল দাপটে পহেলা বৈশাখ আজ ম্রিয়মাণ হয়ে পড়ছে। ঘরে ঘরে যে সংগীতের চর্চা হতো, তাও আজ সংকুচিত হয়ে গেছে।’
সভ্যতার বর্তমান ক্রান্তিলগ্ন নিয়ে অধ্যাপক চৌধুরী বলেন, ‘পুঁজিবাদী উন্নয়নের যে পথ ধরে আমরা এগোচ্ছি, তা পৃথিবীকে মানুষ বসবাসের অযোগ্য করে তুলছে। এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই চরম অগ্রগতির যুগেও আমাদের ভাববার সময় এসেছে, পৃথিবী কি ব্যক্তিগত মালিকানায় থাকবে নাকি সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হবে?’
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘পুঁজিবাদকে বিদায় দিয়ে সামাজিক মালিকানার নতুন পৃথিবী গড়তে না পারলে মানুষের মনুষ্যত্ব রক্ষা করা সম্ভব হবে না।’
ছায়ানট বা উদীচীর ওপর হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গানের শিক্ষক নিয়োগ বাতিলের যে দাবি ওঠে, তা সংস্কৃতি ও মনুষ্যত্ববিরোধী। এর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম গড়ে তুলতে হবে।’
পিতৃতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে মায়ের মমতা ও লালন-পালন করার যে শক্তি, তাকেই পরিবর্তনের মূল শক্তি হিসেবে দেখেন অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। রবীন্দ্রদর্শনকে পাথেয় করে সমাজ পরিবর্তনের এই সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
উদ্বোধনী অধিবেশনে সম্মেলক গান পরিবেশন করেন পরিষদের শিল্পীরা। সম্মেলক নৃত্যও পরিবেশিত হয় এ সময়। এ অধিবেশনে স্বাগত ভাষণ দেন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক লিলি ইসলাম, সভাপতিত্ব করেন পরিষদের সভাপতি মফিদুল হক৷
জয়ন্ত/এসজি/