অসাম্প্রদায়িক ও উদারপন্থি গণতান্ত্রিক দেশ গড়ার প্রত্যাশা ও প্রত্যয়ে বাংলা নববর্ষকে ১৪৩৩ স্বাগত জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) চারুকলার ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। রঙ-ঢঙ আর বৈশাখের আমেজে ছোট থেকে বড়, এমনকি বিদেশিরাও শোভাযাত্রায় অংশ নেন; সবার চোখেমুখে ছিল বর্ষবরণের আনন্দ আর উচ্ছ্বাসের ছাপ।
মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) সকাল ৯টা ৬ মিনিটে চারুকলা অনুষদের সামনে থেকে শোভাযাত্রাটি শুরু হয়। চারুকলা অনুষদ প্রাঙ্গণে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে শোভাযাত্রার আনুষ্ঠানিক সূচনা করা হয়। শোভাযাত্রার সামনে ও পেছনে পুলিশ, র্যাব, এপিবিএন, বিজিবিসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা নিরাপত্তার বলয় তৈরি করে রাখে। নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে শোভাযাত্রাটি চারুকলা অনুষদ থেকে শুরু হয়ে শাহবাগ, দোয়েল চত্বর ও বেগম রোকেয়া হল এলাকা ঘুরে আবার চারুকলার সামনে এসে প্রায় সকাল ১০টার দিকে শেষ হয়।
শোভাযাত্রার শুরুতে ছিল বাংলাদেশ পুলিশের ঘোড়সওয়ার দল। এরপর জাতীয় পতাকা বহনকারী শিক্ষার্থীদের দল, মূল ব্যানারসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলের প্রাধ্যক্ষ, বিভাগীয় চেয়ারম্যান, শিক্ষকবৃন্দ, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন, কবিতা পরিষদ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তারা শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করেন।
এবারের শোভাযাত্রায় বাউল সংস্কৃতির ওপর আঘাতের প্রতিবাদে বিশেষ গুরুত্ব হিসেবে মূল কাঠামো ছিল ‘দোতারা’। এছাড়া শান্তির প্রতীক হিসেবে পায়রা, লোকজ মোটিফ হিসেবে হাতি ও টেপা ঘোড়া এবং নতুন দিনের সূচনার বার্তা দিতে মোরগ ছিল। এছাড়া হারিয়ে যাওয়া নিজস্ব কৃষ্টি ও ঐতিহ্য তুলে ধরতে মারমা, ম্রো, চাকমা, বম, খুমি, ত্রিপুরা, পাঙখুয়া, রাখাইন, তঞ্চঙ্গ্যা, সাঁওতালসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর অংশগ্রহণ ছিল। প্রায় ৪০ জন শিল্পীর বাদ্যযন্ত্র পরিবেশনা এবং প্রায় ১৫০ ফুট দীর্ঘ পটচিত্রের স্ক্রল পেইন্টিং শোভাযাত্রায় বিশেষ মাত্রা যোগ করে। এসব পটে সুন্দরবনের দেবী বনবিবি, সম্রাট আকবর, বাংলাদেশের অভ্যুদয় ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, গাজীর পট এবং মনসামঙ্গলের বেহুলার কাহিনি তুলে ধরা হয়।
আনন্দের মধ্যে ছন্দপতন: বৈশাখী শোভাযাত্রার আনন্দ ও উচ্ছ্বাসের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় মেট্রো স্টেশনের পিলারে আটকে যায় শোভাযাত্রার চারটি মোটিফ। এর মধ্যে তিনটি পার হতে পারলেও টেপা ঘোড়া পার হতে পারেনি। জানা যায়, এতে এটি আটকে গিয়ে আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে কিছু সময়ের জন্য শোভাযাত্রার গতি থেমে গেলেও পরে তা স্বাভাবিক হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, শোভাযাত্রার অগ্রভাগে থাকা হাতি ও ঘোড়ার মোটিফ দুটি কোনো বাধা ছাড়াই পার হতে পারলেও লাল ঝুঁটি মোরগ, পায়রা এবং অন্য একটি ঘোড়া নিয়ে বিপত্তি ঘটে। হাতিসহ বাকি মোটিফগুলো পার হলেও টেপা ঘোড়া পার হতে পারেনি। ফলে এটি পরে ফিরে আসা শোভাযাত্রায় আবার যুক্ত হয়।
উল্লেখ্য, আশির দশকে স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ঐক্য এবং একইসঙ্গে শান্তির বিজয় ও অপশক্তির অবসান কামনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে ১৯৮৯ সালে সর্বপ্রথম ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ শুরু হয়। ওই বছরই ঢাকাবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয় এই আয়োজন। এরপর প্রতি বছর পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে চারুকলার শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা এই শোভাযাত্রা আয়োজন করে আসছেন। জানা যায়, ১৯৯৬ সাল থেকে এটি ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামে পরিচিতি পায়। প্রায় তিন দশক পর গত বছর ২০২৫ সালে এটি আবার ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ নামে ফিরে আসে। পরবর্তীতে নানা তর্ক-বিতর্কের পর এ বছর ২০২৬ সালে প্রথমবারের মতো ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ নামে অনুষ্ঠিত হলো।
২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর বাংলাদেশের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের আবেদনক্রমে ইউনেস্কো ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’কে মানবতার অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। গত বছর নাম পরিবর্তনের পর ইউনেস্কো জানায়, নামকরণ সংক্রান্ত জাতীয় সিদ্ধান্তে তারা কোনো অবস্থান নেয় না। তবে সরকার নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিলে তা আনুষ্ঠানিকভাবে জানাতে হবে। এ বছর নাম পরিবর্তনের বিষয়টি ইউনেস্কোকে জানানো হবে বলে একাধিক গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী।
আরিফ জাওয়াদ/রিফাত/